আমি মাসুদ রানার ছোট ভাইকে দেখেছি!

মূল লেখার লিংক
আমি মাসুদ রানার ছোট ভাইকে দেখেছি!

আমি মাসুদ রানার ছোট ভাইকে দেখেছি। সত্যি বলছি, আমি দেখেছি তাকে। মাসুদ রানার একটা গল্পে পড়েছিলাম একটা বুলেট মাসুদ রানার হৃদপিণ্ডে গিয়ে বেধেঁ। কিন্তু সে মারা যায় না, কারণ বুলেটটি তার হৃদপিণ্ডের ইন্টারভেন্ট্রিকুলার সেপটামে বিধেঁ ছিল, কোন মেজর ব্লিডিং ছাড়াই রানা সেবার বেঁচে যায়। গত ২৪.১০.১৭ তারিখে যে বালকটির সাথে আমার পরিচয় হয় তাকে মাসুদ রানার ছোট ভাই বললে ভুল বলা হবে না।

ডিউটি করছি ঢাকা মেডিকেল ক্যাজুয়ালটিতে। টানা ২৪ ঘন্টা ডিউটির মাত্র সাড়ে ৫ ঘন্টা গেছে। দুপুর দেড়টার একটু পরে হুড়মুড় করে সে ঢুকলো ক্যাজুয়ালটিতে, তার পরিচয় সে একজন কন্সট্রাকশন ওয়ার্কার (এটা তার ছদ্মবেশ, নিশ্চয় সে কোন গোপন মিশনে রানাকে সঙ্গ দিচ্ছিল)। সাথে একগাদা লোক (রানা এজেন্সির এজেন্ট!)। কিন্তু যে নায়কোচিতভাবে তার এন্ট্রি হবার কথা ছিল তা হলো না।

সে এসেছে একটা ট্রলির ওপর শুয়ে। ৪ ফুট লম্বা একটা ৬ সুতার রড (দেড় ইঞ্চি ব্যাসের রড) তার বুকের মাঝ দিয়ে ঢুকে পিঠের ডান দিক দিয়ে বের হয়ে গেছে। সে তখনো শ্বাস নিচ্ছে, কথা বলছে। সাথে সাথে আমাদের পুরো টিমের ইফোর্ট তার ওপর গিয়ে পড়ে। সব ধরনের প্রটোকল-গাইডলাইন মেনে তাকে ওটির (অপারেশন থিয়েটার) এর জন্য রেডি করতে সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠে। সারপ্রাইজিংলি ভাইটালস সব নরমাল, তার মানে কোন মেজর ইন্টার্নাল ব্লিডিং (ভেতরে রক্তক্ষরণ) নাই অথবা রডের প্রেশার ইফেক্টের কারণে বন্ধ আছে।

সাথে আসা কর্মীদের বক্তব্য থেকে যে ঘটনা জানা গেল তা হচ্ছে, মাহমুদুল (ছদ্মনাম নিশ্চয়ই) মিরপুরের একটা কন্সট্রাকশন সাইটে দোতলা থেকে সরাসরি নীচে রাখা খোলা রডের ওপর পড়ে। তার সহকর্মীরা রড কেটে কোনক্রমে তাকে বুকে বেঁধা রডসহই নিয়ে আসে। বাইরে থেকে থেকে যতটুকু অ্যাসেস করা হয় তাতে দেখা যায় যিফিস্টার্নামের বাম দিক থেকে আড়াআড়িভাবে ডানে ওপরের দিকে ঢুকে পিছনে ৮ম রিব (পাঁজরের হাড়) ভেঙে বের হয়ে গেছে, এবং ঢোকার সময় পরনের গেঞ্জির কিছু অংশ ছিঁড়ে ভেতরে নিয়ে গেছে। পরে অবশ্য কাপড় সরাতে গিয়ে আমাদের ভুল ভাঙে, আমরা দেখতে পাই যে রডটা আসলে পেছন দিয়ে ঢুকে সামনে দিয়ে বের হয়েছে। হিসেব করে দেখা গেল এর ফলে লেফট লোব লিভার ইনজুরি, হার্ট ইঞ্জুরি, এওর্টা, ভেনাক্যাভা, ডায়াফ্রাম, স্টমাক, ইসোফেগাস, লাংস ইনজুরি ইত্যাদির যে কোন একটা হতেই পারে। আর এর ফলে অত্যাধিক ব্লিডিং, নিউমো/হিমো থোরাক্স, এমবোলিজম ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে অতি দ্রুত মৃত্যু হবার কথা ছেলেটার। কিন্তু সে দিব্যি শ্বাস নিচ্ছে, ভাইটালস ভালো, অনগোয়িং সিভিয়ার কোন ব্লিডিং ছিল না। ছেলেটা অলৌকিকভাবে বেঁচে আছে।
.
তাকে খুব তাড়াতাড়ি ক্যাজুয়াল্টি ওটি (সিওটি) তে নেওয়া হল। খুব যত্নের সাথে ওটি টেবিলে ট্রান্সফার করা হল, রডসহই অপারেটিভ ফিল্ড ওয়াশ দেওয়া হল। ডাঃ মাহামুদ ভাই (সিএমসি ১৯৯৮-৯৯ সেশন) রাইট থোরাকোটমি ইনসিশন দিয়ে শুরু করলেন। এনেস্থেশিয়ায় ছিলেন তুষার ভাই (বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-শেবাচিম)। আমি আর মাহাবুব ভাই(শেবাচিম ২০০৩-০৫ সেশন)  অ্যাসিস্ট করছিলাম। এন্ট্রি এক্সিট ক্ষতে ইনসিশন বাড়ানোর পরও যখন ব্লাড প্রেসার(বিপি) ঠিক ছিল তখন আমরা একটু সাহস পেলাম যে এবার রড বের করা যায়। মাহামুদ ভাই দুইদিকে ক্ষতে হাত দিয়ে রডের ওপর প্রেশার রিলিজ করলে আমি আস্তে আস্তে রডটা টেনে বের করলাম। যখন পুরোটা বের হল তখন সবার মাথায় চিন্তা যে এই বোধহয় কোন থ্রোম্বাস সরে গিয়ে ব্লিডিং শুরু হয়। আল্লাহর রহমতে তেমন কিছু হয়নি। তখন সুযোগ মিললো ভিতরে নজর দেবার।

রাইট লাংস লোয়ার লোব পুরো ল্যাসারেটেড(ওপেন নিউমোথোরাক্সের কারনে অক্সিজেন স্যাচুরেশনে কোন প্রব্লেম হয়নি)। ক্লট সরায়ে দেখলাম পেরিকার্ডিয়াল ছিড়ে গেছে, তার ভেতরে অল্প ফাঁকা জায়গা দিয়ে হার্ট বিট করছে। হার্টের বা ডায়াফ্রামের কিছুই হয়নি! এই দুইটার মাঝখান দিয়ে রড ঢুকে লাংস রিব ভেদ করে রডটা বের হয়ে গেছে (বুঝতে হবে মাসুদ রানার ছোট ভাই বলে কথা, হার্ট ডায়াফ্রাম দুজনকেই টেনেছে কিন্তু কাউকেই বাঁধনে জড়ায়নি)। ওয়াশ দিতে দিতে বিটিং হার্টের ওপর হাত রাখলাম। তখন যে ফিলিংসটা হলো সেটা ভাষায় প্রকাশ করার মত না। ১২ বছরের মেডিকেল জীবনে প্রথমবারের মতো মনে হল-“ম্যান, আই ডিড সামথিং রিয়েলি কুল”। থোরাসিক সার্জনদের কাছে এগুলো ডালভাত, কিন্তু অন্য যেকোন ডাক্তারের লাইফে সে মানুষের জীবন্ত হৃদপিন্ড হাত দিয়ে ধরেছে, এটা আল্ট্রা রেয়ার ঘটনা। যাই হোক এরপর লাংস রিপেয়ার করে ড্রেন টিউব দিয়ে ক্লোজ করা হল।
.
আজ সকাল পর্যন্ত রোগী ভাল। কোন অসুবিধা নেই। তবে ভয়টা ইনফেকশন নিয়ে। রডটায় যে পরিমাণ ময়লা ছিল, সেপসিস এবং এমপায়েমা হবার চান্স আছে অনেক। আমাদের ওটিতে বেশ কিছু ভুল ছিল। অবশ্য ভুলগুলো করার কারণও ছিল (দোষ স্বীকার করতে চাই না, বাঙালি তো.)। প্রথমত আমরা পিছনটা যতটা এক্সপ্লোর করেছি সামনেরটা ততটা করিনি। আসলে আমাদের মাথায় ছিল এটা ড্যামেজ কন্ট্রোল সার্জারী করবো, ভাবতেও পারিনি যে অবস্থা আরো সিরিয়াস। রড বের হয়ে যাবার আনন্দে আর কোন ব্লিডিং না থাকার উত্তেজনায় পটাপট ক্লোজ করে বের হয়ে এসেছি। দ্বিতীয়ত ছবি ভাল তোলা হয়নি, ছবি তোলার সময় আমরা প্রিন্সিপাল অনুসরণ না করেই ফকিরের মত ফ্লাশ মেরে গেছি, যেকারণে ছবি গুলো কোন পাব্লিকেশনে প্রকাশযোগ্য নয়। তৃতীয়ত, ভিতরে আরো ইভালুয়েট করা উচিত ছিল, ভালোভাবে অ্যানালাইসিস করার দরকার ছিল, কিন্তু মরিস দিয়ে কি থোরাসিক রিট্রাক্টরের কাজ চলে? যাই হোক আমার সহকর্মীদের কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ আমাকে এই ওটিতে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেবার জন্য। দোয়া করবেন সবাই ছেলেটার জন্য। তার জন্য কোন আর্থিক সাহায্য লাগবে না, ঠিকাদার নিজ গরজেই সব খরচ দিচ্ছে। প্রত্যেকটা কন্সট্রাকশন সাইটে নির্মাণশ্রমিকেরা যে অকল্পনীয় অনিরাপদে থাকে, তাতে এমন যে কোন দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। এতে যে ছেলেটা মারা যায় নি, এটাই বরং অলৌকিক একটা ব্যাপার। সুতরাং ছেলেটার চিকিৎসা ব্যয় না দিলে ঠিকাদারের খবর ছিল। ছেলেটাকে ওটি টেবিলে তোলার ঠিক আগ মূহুর্তে তার যে চেহারা হয়েছিল তা আমি অনেকদিন ভুলবো না। সে জানে সে কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যাচ্ছে, সে কাঁদছে নীরবে, এক অনাত্মীয় পরিবেশে। আল্লাহ যেন তার চোখের পানিকে হাসিতে পরিণত করে দেন।

লিখেছেন- ডাঃ মোনতাসির বিল্লাহ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

Advertisements

2 Comments to “আমি মাসুদ রানার ছোট ভাইকে দেখেছি!”

  1. সাধারনতঃ আমাদের দেশের রড মরিচারোধি নয়। তাতে মরিচা এবং অন্যান্য ধুলাবালি থাকতেই পারে। আমার সংশয় এখানেই যে, রডের ময়লা বা মরিচার কারনে ছেলেটার শরীরের মধ্যে যদি কোন infection হয়?? এতে এখন operation success হলেও পরবর্তীতে সে মারা যেতে পারে। তখন এই operation এর সফলতার কতটুকু মূল্য থাকবে!! যাহোক, আপাতত আল্লাহর রহমতে যা করেছেন তার জন্য আপনি সহো অন্যান্য সকল ডাক্তারদের প্রতি চরমভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। ছেলেটির জন্য খুব মায়া হচ্ছে এবং কষ্টও হচ্ছে। আল্লাহ্ যেন ওকে দ্রুত সুস্থ করে ওর পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেন। হতে পারে ও ই ওর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
    ফয়সাল আহমেদ
    MIS OFFICER
    Shah Cement Ind.Ltd.
    (A Unit of Abul Khayer Group)

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: