সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘বুক রিভিউ’

মূল লেখার লিংক

বই কি শুধুমাত্র পড়ার জন্য? কিংবা বই কি শুধুমাত্র নির্মল আনন্দ লাভের জন্য? এমনও তো হতে পারে বই অলস সময়ের সময় ক্ষেপণের হাতিয়ার। এরকম অনেকভাবেই বইকে আপনি ব্যবহার করতে পারেন। বইকে আপনি কিভাবে ব্যবহার করবেন সেটা আপনার ব্যাপার। কিন্তু বই যেন আপনাকে যত্রতত্র ব্যবহার না করতে পারে, সে বিষয়ে সচেতন থাকা অতীব গুরত্বপূর্ণ ব্যাপার। যত্রতত্র ব্যবহার করতে না পারে এই কারণে বলছি যে অনেক সময় অগোচরেই বইয়ের জ্ঞানে আমরা নিজেকে জাহির করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। কিংবা নিজের কাছে কত বই আছে সেটাকেই প্রাধান্য দেই। ফেসবুক ভিত্তিক বই পড়ার গ্রুপগুলোতে এসব বেশি চলে। সাহিত্যের আসল উন্নতি পাঠক কতোটা বাড়লো কিংবা বই বিক্রির উপর নির্ভর করে না। সাহিত্যের উন্নতি অনেকাংশে নির্ভর করে বইটা কতজন কতরকম ভাবে পড়লো তার উপরে। একটা বই অনেকজন অনেকরকম ভাবে পড়তেই পারে, বই পড়ে আমার উপলব্ধি যা অন্যকারো সে উপলব্ধি নাও হতে পারে। কিন্তু আমার সাথে মিললো না বলে ব্যক্তিগত আক্রমণে চলে যাই। কে কত বই পড়েছি তার হিসাব করতে লেগে যাই। এসব বড্ড কৃত্রিম লাগে।

বই পড়ে যখন একটা পাঠক তার অনুভূতি প্রকাশ করে সেটা লেখকের জন্য একটা বিশেষ অনুভূতি। কিংবা যখন তার বইয়ের চুল ছেঁড়া বিশ্লেষণ হয় তখন লেখকও যথেষ্ট সম্মানিত বোধ করেন । বুক রিভিউ এর নামে যখন লেখককে উপদেশ দেওয়া হয়; এখানে এমন করলে হতো, সেখানে তেমন করলে হতো তখন সেটা রীতিমতো লেখকের কাছে অত্যাচার বলে মনে হয়। পাঠকের ভাবখানা এমন যে তার ইচ্ছামত লেখক লিখবেন। লেখক তার বাঁধা গোলাম। হালে ফেসবুকে গ্রুপভিত্তিক বইয়ের যে আলোচনা হয় সেখানে অধিকাংশটাই এমন হয়। আমি এমন বলছি না সেখানে ভাল ক্রিটিক নাই কিন্তু অধিকাংশই রিভিউ দিতে হলে যে পরিমাণ পড়াশোনা করতে হয়ে সে পরিমাণ পড়াশোনা করেন না। আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্যণীয় অনেকেই বইয়ের রিভিউ এর নামে রীতিমতো বইয়ের ক্লাইম্যাক্স বলে দেন। সহজ ভাষায় তাকে আমরা স্পয়লার বলি। কিন্তু বুক রিভিউ কি আসলেও তাই? বুক রিভিউ অনেকটা স্টার্টিং ডিশের মত কাজ করে যেখানে গুরুপাক কোন খাদ্য থাকে না কিন্তু যা খেলে খাওয়ার ইচ্ছেটা বাড়তেই থাকবে। আমার মনে হয় রিভিউ তেমনই হওয়া উচিত। যেটা পাঠকের ক্ষুধাবৃদ্ধি করবে,বইটা পড়তে আগ্রহ বাড়াবে। কিন্তু তার আগেই যদি আপনি ভেতরের মাল মশলা ঢেলে দেন তা লেখকের প্রতি ভারি অবিচার হবে। সে যতই স্পয়লার এ্যালার্ট দিয়ে দেওয়া হোক না কেন।

বইয়ের পাঠক মাত্রই যে তিনি সাহিত্যানুরাগী হবেন এমন কোন কথা নেই। বই কমবেশি সবাই পড়ি কিন্তু সেই বই নিয়ে, লেখকের দর্শন নিয়ে মাথা ঘামাই খুব কমই। যারা এমনটা করেন তাদের প্রতি আমার অভিযোগ নাই। কিন্তু যারা এমনটি করা সত্ত্বেও নিজেকে জাহির করেন সেই দল নিয়ে আমার আপত্তি আছে। ঘোরতর আপত্তি আছে। এই শ্রেণীর মানুষ আদাজল খেয়ে সাহিত্যের লেজ ধরে রাখেন, সামনে আগাতে দেন না।

সব পাঠকের দ্বারা সাহিত্যের গুণমান বৃদ্ধি পাবে এমন আশা করা বোকামি কিন্তু সুশৃঙ্খল পাঠকের আশা আমরা করতেই পারি। বই পড়া যে জাহির করার বস্তু নয় সেটা আমাদের বুঝতে হবে। কিংবা বই কোন শোভা বর্ধক শো পিসও নয়। কিন্তু জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বইয়ের গ্রুপগুলোতে সবাই বইয়ের ছবি দেওয়াতে ব্যস্ত। কার সংগ্রহ কত সেটা বড়াই করে জানাতে প্রস্তুত কিন্তু বই নিয়ে অধিকাংশ পাঠকই আলোচনা করতে বিমুখ। গ্রুপের সদস্যসংখ্যা লক্ষাধিক কিন্তু সে অনুপাতে বই নিয়ে পোস্ট কম। বইয়ের গ্রুপগুলোর কাছে এসব বিষয় কাম্য নয়।

একটা পরিশীলিত পাঠক সমাজ থাকলে তবেই কোন লেখকের ভাল লেখা পূর্ণতা পায় কারণ একটা ভাল লেখার কদর বোধ সম্পন্ন পাঠকরাই করতে পারে। নতুবা সব লেখাই বিফলে যাবে।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: