পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ: মহামতি আকবরের উত্থান উপাখ্যান

মূল লেখার লিংক
মাত্র ত্রিশ বছরের ব্যবধানে ফের পানিপথ প্রান্তরে বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। এক প্রান্তে মোঘলবাহিনী প্রস্তুত। তাদের নেতৃত্বে আছেন সম্রাট আকবরের সুদক্ষ অভিভাবক বৈরাম খান। অপরপ্রান্তে মোঘলদের তুলনায় শক্তিশালী ফৌজ নিয়ে দন্ডায়মান সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য হিমু। পানিপথের প্রথম যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই মোঘলরা ফের জড়ো হয়েছে এক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে।

এখনো কান পাতলে হয়তো বাবর বাহিনীর জয়োল্লাস শুনতে পাওয়া যাবে।  বাতাসে মিলিয়ে যায়নি মোঘলদের বারুদের গন্ধও। কিন্তু হারিয়ে গিয়েছে তাদের সাম্রাজ্য। প্রথম যুদ্ধের তাজা স্মৃতিকে অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়ে মোঘলরা পুনরায় দিল্লী অধিকারের সংকল্পে অটল। অপরদিকে অপরাজিত সম্রাট হিমু তার মসনদ রক্ষার্থে বদ্ধপরিকর।

পানিপথের প্রথম যুদ্ধে মোঘলদের অধিকৃত দিল্লীর পতন হয়েছে আফগানদের হাতে। তারপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মোঘলরা ধীরে ধীরে তাদের শক্তি ফিরে পেতে শুরু করে। কিন্তু মোঘল সম্রাট হুমায়ুনের আকস্মিক মৃত্যুতে থমকে দাঁড়ায় তাদের জয়রথ। মাত্র তের বছর বয়সী সম্রাট আকবর হয়ে ওঠেন তাদের আশা-ভরসার প্রতীক। কিশোর সম্রাটের অভিভাবক হিসেবে নিযুক্ত করা হয় বিশ্বস্ত বৈরাম খানকে। অকুতোভয় বৈরাম খান অপেক্ষাকৃত দুর্বল বাহিনী নিয়ে মোঘলদের হৃত গৌরব উদ্ধারের লক্ষ্যে পানিপথ প্রান্তরে সম্রাট হিমুর বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় সেই ঐতিহাসিক পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধকে ঘিরে।

আফগানদের ত্রাণকর্তা বিক্রমাদিত্য হিমু

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে আফগানদের অধিপতি সম্রাট হিমুর উত্থান বেশ নাটকীয়। কারণ, প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন সামান্য একজন মুদি দোকানদার। শের শাহ (অপর নাম ইসমাইল শাহ) এর অধীনে তিনি দিল্লীর হাট-বাজার পরিদর্শক হিসেবে নিযুক্ত হন। তার কর্মকাণ্ডে মুগ্ধে হয়ে শের শাহ তাকে পাঞ্জাবের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। শের শাহের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি গভর্ণর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


বিক্রমাদিত্য হিমুর মূর্তি

শের শাহের উত্তরসূরী তার সন্তান ফিরোজ শাহ ছিলেন বারো বছরের কিশোর। কিন্তু শের শাহের ভাগ্নে আদিল শাহ ফিরোজ শাহকে হত্যা করে নিজে  সিংহাসনে আরোহণ করেন। আদিল শাহ ছিলেন অযোগ্য এবং আমোদপ্রেমী। ফলে তিনি রাজ্য পরিচালনার অর্থ দিয়ে আমোদ ফূর্তিতে মেতে উঠেন। আফগান শাসনের মহাপ্রাচীরে ফাটল ধরে যায়। আঞ্চলিক গভর্ণরগণ বিদ্রোহ করে বসেন সম্রাটের বিরুদ্ধে।

মাতাল সম্রাট আদিল শাহ হিমুকে পছন্দ করতেন। তিনি হিমুকে রাজসভার উজির হিসেবে নিযুক্ত করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর হিমু একে একে বিদ্রোহী গভর্ণরদের দমন করেন।  ধীরে ধীরে হিমুর ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাংলার গভর্ণর মুহাম্মাদ খানকে দমন করার সময় হিমু মোঘল সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুসংবাদ পান। সম্রাট আদিল শাহ এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না। তিনি হিমুকে পাঠান  দিল্লী এবং আগ্রা অভিযানে।

ততদিনে হিমু যুদ্ধকৌশলে পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন।  তিনি প্রায় ৫০ হাজার যোদ্ধার বিশাল বাহিনী নিয়ে মোঘল শাসক তার্দি বেগকে পরাজিত করে দিল্লী দখল করেন। মোঘল শাসকরা হিমুর আগ্রাসনের ভয়ে পালিয়ে গেলে তিনি প্রায় বিনা বাধায় আগ্রা দখল করতে সক্ষম হন। হিমু ততদিনে প্রায় ২২টি যুদ্ধে অংশ নেন এবং প্রতিটিতে বিজয় লাভ করেন।  ১৫৫৬ সালে দিল্লীর মসনদে আরোহণ করেন সম্রাট হেমচন্দ্র হিমু। তারপর তিনি ‘বিক্রমাদিত্য’ উপাধি গ্রহণ করেন।


দিল্লীর মসনদে সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য

তার অধীনে প্রায় ১৫ হাজার যুদ্ধবাজ হাতি বরাদ্দ ছিল। সেদিনের সামান্য দোকানদার হিমু আপন যোগ্যতাবলে হয়ে উঠলেন দিল্লীর প্রতাপশালী সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য।

সম্রাট আকবরের সুযোগ্য অভিভাবক বৈরাম খান

মাত্র ১৬ বছর বয়সে বৈরাম খান সম্রাট বাবরের রাজদরবারে যোগ দেন। এরপর থেকেই তিনি বিশ্বস্ততার সাথে সম্রাটকে সঙ্গ দিয়েছেন বিরূপ পরিস্থিতিতে। বাবরের মৃত্যুর পর তিনি সম্রাট হুমায়ুনের সভাসদে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শের শাহের নিকট পরাজয়ের পর হুমায়ুন যখন ভারতের পথে পথে ঘুরছিলেন, তখন তাকে পুনরায় রাজ্য ফিরে পেতে সর্বাত্মক সহায়তা করেন বৈরাম খান।


কিশোর সম্রাট আকবর

পরবর্তীতে হুমায়ুনের মৃত্যুর পর কিশোর সম্রাটের অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হন বৈরাম খান। সিংহাসনে কিশোর আকবরকে পরবর্তীকালে মহামতি আকবর হয়ে উঠার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। মোঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সভাসদ হিসেবে তার নাম ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর হিমু দিল্লী এবং আগ্রা দখল করে নিলে মোঘলরা চাপে পড়ে যায়। কিন্তু সেই সময় মাথা ঠাণ্ডা রেখে মোঘলদের সাম্রাজ্য ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বেশ দক্ষতার সাথে তিনি লড়াই করে যান। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ।

যুদ্ধের পটভূমি

হিমুর আগ্রাসনের কারণে ধীরে ধীরে ভেঙে যেতে থাকে মোঘল সাম্রাজ্য। বৈরাম খান যখন আকবরের দায়িত্ব গ্রহণ করলেন তখন মোঘলদের অধীনে কান্দাহার, কাবুল এবং পাঞ্জাবের কিছু গ্রাম ব্যতীত আর কোনো রাজ্য ছিল না। এমনকি মোঘলদের অধীনে পর্যাপ্ত পরিমাণ অস্ত্র, রসদ এবং সেনাবাহিনীও ছিল না। এমতাবস্থায় হিমুর শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়া বোকামি ব্যতীত আর কিছুই নয়।

অন্য সভাসদরা বৈরাম খানকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু বৈরাম খান তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। তিনি সম্রাট আকবরের পক্ষ থেকে হিমুর বিরুদ্ধে যুদ্ধের ফরমান জারি করলেন। পানিপথের যুদ্ধে আকবরের পক্ষে এসে দাঁড়ালেন আলী কুলি খান, সিকান্দার খান, হোসেন কুলি বেগ প্রমুখ। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সৈনিক জড়ো করতে থাকলেন বৈরাম খান। তিনি পদাতিক, অশ্বারোহী এবং তীরন্দাজ বাহিনী নিয়ে মাঝারি আকারের ফৌজ গঠন করেন। শক্তিতে হিমুকে পরাজিত করার মতো অবস্থা তখন মোঘলদের ছিল না, কিন্তু কৌশলে পরাজিত করা সম্ভব। তাই বৈরাম খান তার অভিজ্ঞতা থেকে যুদ্ধের ছক কষতে লাগলেন।


পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ নিয়ে চিত্রকর কঙ্করের ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি

অপরদিকে হিমুর সেনাবাহিনী ছিল বিশাল। সেখান থেকে ৫০০ যুদ্ধবাজ হাতি এবং প্রায় ৩০ হাজার অশ্বারোহী এবং তীরন্দাজ নিয়ে তিনি যে ফৌজ গঠন করলেন, তা শক্তি এবং সংখ্যায় মোঘলদের দ্বিগুণ। কিন্তু হিমু পানিপথের প্রথম যুদ্ধ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি জানতেন মোঘলদের অমিত তেজের কাছে যেকোনো বড় বাহিনী পরাজিত হতে পারে। তাই তিনি কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে রাজি হননি। যুদ্ধ উপলক্ষে হিমু গোলন্দাজ বাহিনীর জন্য উন্নত মানের কামান সরবরাহ করতে লোক পাঠান। কিন্তু ভাগ্য এক্ষেত্রে হিমুর সহায় হয়নি।

হিমুর জন্য অত্যাধুনিক গোলাবারুদ সমৃদ্ধ বহর নিয়ে দিল্লী ফিরে যাচ্ছিলো ছোট আকারের একটি ফৌজ। কিন্তু পথিমধ্যে আলী কুলি খানের অশ্বারোহীদের হাতে ধরা পড়ে যান তারা। আলী কুলি খানের সৈনিকদের সাথে লড়াইয়ে গোলাবারুদ নষ্ট হয়ে যায়। হিমুর সৈনিকরা প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যায়। এর ফলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই মোঘলরা সম্রাট হিমুকে আঘাত করতে সক্ষম হয়।

কিন্তু হিমুও সহজে ভয় পাওয়ার পাত্র নন। সুদক্ষ সৈনিকদের নিয়ে গঠন করেন সুসজ্জিত ফৌজ। শক্তিশালী হাতিদের নিয়ে গঠন করেন বিশাল হস্তিবাহিনী। এরপর রওয়ানা দেন পানিপথের দিকে। পথের কাঁটা মোঘলদের সমূলে উপড়ে ফেলে দিতে এগিয়ে চললেন সম্রাট হিমু।

পানিপথের যুদ্ধ

১৫৫৬ সালের ৫ নভেম্বর পানিপথ প্রান্তরে মুখোমুখি হন সম্রাট হিমু এবং বৈরাম খান। মোঘলদের আশা ভরসার প্রতীক শিশু সম্রাট আকবরকে নিয়ে বৈরাম খান যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রায় ৮ মাইল দূরে অবস্থান করেন। অপরদিকে নিজের প্রিয় হাতি হাওয়াইয়ের উপর তৈরি আসনে বসে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন হিমু। হিমুর দেহ তখন বর্ম দিয়ে আবৃত ছিল।

মোঘলরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করে। বৈরাম খান ডান এবং বামদিকের বাহিনীর দায়িত্ব সিকান্দার খান এবং আব্দুল্লাহ খান উজবেকের মাঝে ভাগাভাগি করে দেন। কেন্দ্রে পদাতিক এবং তীরন্দাজ বাহিনীর দায়িত্বে থাকেন আলী কুলি খান। আর পিছন থেকে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব থাকেন বৈরাম খান।


শিল্পীর চোখে পানিপথের যুদ্ধ

যুদ্ধের প্রথমদিকে মোঘলরা তাদের ঐতিহ্য অনুযায়ী হিমু বাহিনীকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করেন। কিন্তু হিমুর হস্তিবাহিনী মোঘলদের আক্রমণ ব্যর্থ করে দেয়। ফলে মোঘলরা পিছু হটে যায়। প্রথমদিকে আক্রমণাত্মকভাবে অগ্রসর হলেও সম্রাট হিমুর হস্তিবাহিনীর আক্রমণে মোঘলরা নিজেদের পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। তারা আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নেয়।

সম্রাট হিমু মোঘলদের ডান এবং বামদিক মারাত্মকভাবে বিধ্বস্ত করতে সক্ষম হলেও তিনি কেন্দ্রের দিকে আক্রমণ চালাতে পারছিলেন না। কারণ কেন্দ্র দিয়ে অগ্রসর হলে তার সৈনিকরা মোঘল তীরন্দাজদের সীমানায় ঢুকে পড়বে। তাই তিনি ধীরে ধীরে সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে আঘাত হানার প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলেন।

মোঘলবাহিনী তখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে। তাদের শক্তিশালী অশ্বারোহীরা হিমুর হস্তিবাহিনীর আঘাতে বিপর্যস্ত। মোঘলবাহিনী প্রমাদ গুণতে থাকে। অপরদিকে অপ্রতিরুদ্ধ হিমু মোঘলদের ঘিরে ফেলতে থাকেন।

কিন্তু মোঘলদের নেতা বৈরাম খান হাল ছেড়ে দিতে রাজি নন। অভিজ্ঞ বৈরাম খান তার প্রতিপক্ষের দুর্বলতা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তিনি মোঘল তীরন্দাজদের ডেকে পাঠালেন। তিনি তাদেরকে সরাসরি হিমুকে আঘাত করার আদেশ প্রদান করেন। কিন্তু কাজটা মোটেও সহজ ছিল না। কারণ হিমুর সর্বাঙ্গ ছিল বর্ম দ্বারা আবৃত।


হিমুর হস্তিবাহিনী মোঘলদের বিধ্বস্ত করে দেয়

মোঘল তীরন্দাজরা চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। কিন্তু হিমুর চোখ ছিল উন্মুক্ত। তবে এতদূর থেকে চোখে তীর লাগানো অসম্ভব। বৈরাম খান তখন হিমুর হস্তিবাহিনীর দিকে আক্রমণ করার আদেশ দেন। আলী কুলি খান আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে অগ্রসর হন। আক্রমণের আকস্মিকতায় খেই হারিয়ে ফেলে হাতিগুলো। হস্তিবাহিনী সামান্য পিছু হটতে বাধ্য হয়।

এমন অবস্থা দেখে হিমু তার হাতি নিয়ে সামনে অগ্রসর হন। বৈরাম খানের কৌশল কাজে লেগে যায়। হিমু মোঘল তীরন্দাজদের সীমানার ভেতর ঢুকে পড়লে তারা পুরোদমে হিমুকে আক্রমণ করেন। হঠাৎ করে একটি তীর এসে সম্রাট হিমুর চোখে বিঁধে যায়। তিনি হাতির উপর থেকে নিচে পড়ে যান।

শক্তিশালী হিমু বাহিনী তাদের সম্রাটের পতন দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। তারা কখনোই সম্রাটের পতনের জন্য প্রস্তুত ছিল না। তার চেয়ে বড় কথা হলো হিমু বাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য কেউ এগিয়ে আসেননি। ফলে তাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। জয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে পিছু হটতে থাকেন সৈনিকরা।

মুহূর্তের মধ্যে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। মোঘলরা নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ে পলায়নরত সৈনিকদের উপর। তীরে এসে তরী ডুবলো সম্রাট হিমুর। একতাবদ্ধ মোঘল আক্রমণের কাছে ধরাশায়ী হলেন তিনি। পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধেও জয়ী হলো মোঘলরা।

যুদ্ধে উভয়পক্ষের প্রায় পাঁচ হাজার প্রাণহানি হয়। হিমুর বেশিরভাগ সেনা পলায়নরত অবস্থায় প্রাণ হারান। সম্রাট হিমু মোঘলদের হাতে বন্দী হন। পরবর্তীতে হিমুকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়। বৈরাম খান কিশোর আকবরকে তার শিরোচ্ছেদ করার অনুরোধ করেন। কিন্তু সম্রাট অপারগতা প্রকাশ করলে তিনি নিজেই হিমুর শিরোচ্ছেদ করেন। বৈরাম খান যুদ্ধ জয়ের নিদর্শনস্বরূপ হিমুর মস্তক কাবুলে ফেরত পাঠান।

যুদ্ধের তাৎপর্য

পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হিমুর পতনের কিছুদিন পর আদিল শাহের পতন ঘটে। ফলে মোঘলরা ভারতের শক্তিশালী প্রদেশগুলো নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়। পানিপথের প্রথম যুদ্ধের মাধ্যমে যে মোঘল শাসনের সূচনা হয়েছিল, তা দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। কয়েক বছরের মধ্যে ভারতবর্ষে  আফগানদের সম্পূর্ণ পতন ঘটে।

পানিপথের যুদ্ধে হিমুর পরাজয়ের কারণ হিসেবে সম্পূর্ণ হিমুনির্ভর ফৌজ এবং সৈনিকদের মাঝে আত্মবিশ্বাসহীনতাকে দায়ী করেছেন ইতিহাসবিদগণ। অপরদিকে মোঘলদের অসাধারণ আত্মবিশ্বাস এবং ঐক্যবল তাদেরকে পর পর দু’বার পানিপথ প্রান্তরে বিজয়ীর আসনে বসিয়েছে। দু’বারই তাদের লড়তে হয়েছিলো সংখ্যা এবং শক্তিতে উৎকৃষ্ট ফৌজের বিপক্ষে। পানিপথের ময়দানে মোঘলরা প্রমাণ করে দিলো, আত্মবিশ্বাসের দ্বারা অসম্ভবকেও অর্জন করা সম্ভব।


পানিপথে জয়লাভের মাধ্যমে দিল্লীর মসনদের অধিকার লাভ করেন সম্রাট আকবর

এর মাধ্যমে নিভু নিভু করতে থাকা মোঘল সাম্রাজ্য নতুন করে জেগে উঠলো। আর উজ্জ্বল শিখায় জ্বলতে থাকা হিমুর সাম্রাজ্য মোঘলদের এক ঝটকায় সম্পূর্ণ নিভে গেল। দিল্লীর মসনদে বসলেন মোঘল সম্রাট আকবর। আর এরপরই শুরু হয় মহামতি আকবরের নেতৃত্বে ভারত জুড়ে মোঘল শাসন।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: