মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষ যে দশটি কাজ অবশ্যই করবে না

মূল লেখার লিংক
আমরা প্রতিনিয়তই শক্তিশালী এবং সুস্থ দেহ প্রত্যাশা করি। কর্মক্ষম থাকার জন্য শারীরিক কসরত করি। শরীরের পর্যাপ্ত পুষ্টির প্রয়োজনে ভালো খাবার খাই এবং শরীরের প্রয়োজনেই আবার অনেক কিছু এড়িয়েও চলি। কিন্তু শারীরিক শক্তিমত্তার সাথে সাথে মানসিক সুস্থতা, মানসিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার জন্য করণীয় কাজগুলো আমাদের করা হয়ে ওঠে না। আমাদের সফলতা, সুখী থাকা, জীবনটাকে স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে নিয়ে চলার পুরো ব্যাপারটি যে মানসিক শক্তিমত্তার উপর নির্ভর করে, সে ব্যাপারে আমদের কোনো ধারণাই নেই।

মানসিক সুস্থতার প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উল্লেখ করে আমেরিকান পদার্থবিদ এবং জনস্বাস্থ্য প্রশাসক David Satcher বলেছিলেন, There is no health without mental health। কিন্তু এ ব্যাপারে আমরা তেমন ওয়াকিবহাল না। মানসিক সুস্থতার জন্য কী ধরনের অভ্যাস তৈরি করতে হবে, কী ধরনের কাজগুলো এড়িয়ে চলা উচিত, তা আমরা জানি না। পুরো বিষয়টির উপর গুরুত্বারোপ করে আজ এই লেখায় আমরা জানবো মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষেরা কোন কাজগুলো এড়িয়ে চলেন।

১) তারা কখনো অতীতের ভুলগুলোতে বাস করেন না

মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষগুলো জানে,যেখানে আপনি আপনার মনোযোগ নিবন্ধন করবেন, সেখানেই আপনার মানসিক অবস্থা নির্ধারিত হবে। আপনি যখন অতীতে করা ভুলগুলো নিয়ে চিন্তা করেন, তখন সেগুলো নেতিবাচক আবেগের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে, যা আপনার কার্যক্ষমতায় বাধা প্রদান করতে থাকে। কিন্তু আপনি যদি সে সময়টা পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে ভালো কিছুর জন্য, প্রয়োজনীয় কিছুর জন্য তৈরি করার চেষ্টা করেন, তাহলে আপনার মাঝে ইতিবাচক কার্যক্ষমতা সৃষ্টি হবে। এটি আপনার কর্মক্ষমতাকে উন্নতির দিকে নিয়ে যাবে।

তবে হ্যাঁ, অতীতের ভুলগুলোকে হয়তো পুরোপুরি ভুলে থাকা সম্ভব না। কিন্তু আপনি চাইলেই সেগুলো থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে পারেন। একটি নির্দিষ্ট সময় পর সেগুলো আপনার সফলতা এবং ইতিবাচকতার সাথে সমন্বিত হয়ে যাবে।

২) মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষরা কখনো নিজেদের উপর বিশ্বাস হারায় না

মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষেরা অধ্যবসায়ী হয়ে থাকে। তারা কখনো ব্যর্থতার মুখোমুখি এসেও হাল ছেড়ে দেয় না। তারা ক্ষণস্থায়ী অনুভূতির উপর নয়, বরং সবসময় নিজেদের লক্ষ্যের উপর দৃষ্টি নিবন্ধন করে। এমনকি মানুষগুলো কখনো ক্লান্তি, অস্বস্তিকর এবং কঠিন অবস্থার মধ্যেও হাল ছেড়ে দেয় না। তারা ব্যর্থ হয়, কিন্তু সে ব্যর্থতাকে ক্ষণস্থায়ী হিসেবে ধরে নিয়ে আবার কাজ শুরু করে। মানসিকভাবে শক্তিশালীরা নিজের উপর কখনো বিশ্বাস হারায় না। যখন কেউ বলে, “তুমি কখনো সফল হতে পারবে না“, তারা তখন সেটিকে একজন মানুষের অভিমত হিসেবেই গ্রহণ করে এবং কখনোই নিজেদের প্রচেষ্টায় অব্যাহতি দেয় না।

৩)  তারা কখনো অন্য কারো দ্বারা পরিচালিত হয় না

নিজের সত্ত্বাকে, কোনো কিছুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাকে, ভালো-মন্দ বোঝার সক্ষমতাকে অন্য কারো কাছে সঁপে দেওয়া হচ্ছে সবচাইতে অনুত্তম কাজগুলোর মধ্যে একটি। এতে করে আপনি আপনার স্বকীয়তাকে হারাচ্ছেন। পরবর্তীতে ফলাফলস্বরূপ আপনি পুরোপুরি পরনির্ভর হয়ে যাবেন! জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার ব্যাপারে অন্যরা কী বলে তার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া শুরু করবেন, যদি তারা ভুল সিদ্ধান্তও নিয়ে থাকে!

মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষগুলো কখনো অন্য কারো দ্বারা পরিচালিত হয় না। তারা নিজেরাই নিজেদের কার্যক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিজের সক্ষমতার উপর নির্ভর করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়। হয়তো প্রয়োজনে অভিজ্ঞদের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে থাকে। কিন্তু কখনোই শুধুমাত্র ঐ সকল পরামর্শদাতার পরামর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে না!

‘কুইন অফ অল মিডিয়া’ খ্যাত অপরাহ উইনফ্রের কথাই ধরুন না। শৈশবের পুরোটাই দরিদ্রতার মধ্যে কাটিয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি। পুরোপুরি বুঝ হওয়ার আগেই ধর্ষণের শিকার হন তিনি! এরপরেও নিজেকে অন্য কারো কাছে সঁপে দেননি। নিজের সঠিক সিদ্ধান্ত এবং উপযুক্ত পদক্ষেপের মাধ্যমে এগিয়ে গিয়েছেন নিজের লক্ষ্যের প্রতি এবং হয়ে উঠেছেন পৃথিবীর সেরা একশ ক্ষমতাসীন নারীর মধ্যে অন্যতম।

৪) তারা কখনো পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে ভয় পায় না

আমরা সব সময় নিজেদের সুবিধাজনক স্থানে বাস করতে ভালোবাসি। আমরা চাই আমাদের আশপাশের পরিবেশ সবসময় একই থাকুক। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজের পরিবর্তন আসে। পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তন হয়। আপনি যে দক্ষতার জন্য আপনার  কোম্পানিতে সবচাইতে পছন্দের ব্যক্তি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে সে জায়গাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। তাই সব রকমের পরিস্থিতি, পরিবেশের সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে চেষ্টা করতে হবে।  কিন্তু আপনি যদি এই পরিবর্তনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে ভয় পান, যদি নতুন চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবেলা না করেন, তাহলে নিজেকে তুলে ধরার পূর্ণ সম্ভাবনাময় জায়গাগুলোতে আপনি পৌঁছুতে পারবেন না!

৫) তারা নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা থেকে দূরে থাকে

এটি সত্য যে, জীবনের প্রত্যেকটি বাঁকে আপনি বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হবেন। নিজের প্রত্যাশা অনুযায়ী ফলাফল না পাওয়া, কোনো কাজে বারবার চেষ্টা করার পরেও হেরে যাওয়ার মতো অপ্রত্যাশিত অসংখ্য জিনিস ঘটতেই থাকবে। কিন্তু এজন্য “আমাকে দিয়ে হবে না, আমি পারবো না” ধরনের নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনাগুলো যেন নিজের মধ্যে প্রভাব বিস্তার না করে। নিজের লক্ষ্যের দিকের অগ্রসর হওয়ার জন্য অবশ্যই নিজেকে ইতিবাচকতাগুলোর দিকে ধাবিত করতে হবে, যদি তা অল্প পরিমাণেরও হয়।

৬) তারা কখনো তাৎক্ষণিক ফলাফল প্রত্যাশা করে না

মানসিকভাবে শক্তিশালী একজন ব্যক্তি জানে কোনোকিছুই তাৎক্ষণিকভাবে ঘটে না এবং তারা এই চিরন্তন সত্যটা মেনে নেয়। তারা জানে প্রত্যেকটা উন্নতির পেছনে রয়েছে ধীর গতি, কিন্তু তা অটল এবং অবিচল। পরীক্ষা দেওয়ার পরপরেই যেমন আপনি আপনার একাডেমিক ফলাফল পাবেন না, এক কদম হাঁটার পরেই যেমন আপনি গন্তব্যে পৌঁছুতে পারবেন না, তেমনি শুরুর পরপরই আপনি আপনার লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবেন না। এজন্য প্রয়োজন সুধীর প্রত্যয়, অবিচল পদক্ষেপ এবং ধৈর্য।

৭) মানসিকভাবে শক্তিশালীরা কখনো একাকীত্বকে ভয় পায় না

কিছু মানুষ নীরবতার মধ্য দিয়েই উন্নতি সাধন করে। অপরদিকে কিছু মানুষ একাকীত্বকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আপনি আত্মকেন্দ্রিক হোন আর বহির্মুখী, কখনোই আপনার একা হয়ে যাওয়ার ভয় পাওয়া উচিত নয়। একাকীত্ব আপনাকে নিজের লক্ষ্যের প্রতি কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগ দেয়, সফল হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কৌশল তৈরির পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করে, নিজের সাথে নিজের অন্তরঙ্গতা বৃদ্ধি করে, আধ্যাত্মিক দিকে মনোনিবেশে সাহায্য করে।

৮) তারা কখনো প্রয়োজনীয় ঝুঁকি গ্রহণ করতে পিছপা হয় না।

একজন মানসিকভাবে শক্তিশালী মানুষকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য তার নেয়া ঝুঁকিগুলোর কথা উল্লেখ করাই যথেষ্ট। জীবনের প্রয়োজনে, লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হওয়ার খাতিরে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে প্রত্যেককেই। প্রয়োজনে পুরো সিস্টেমের বাইরে গিয়ে নিজের পছন্দের জিনিসগুলোর জন্য লড়তে হবে। কিন্তু আপনি যদি ক্ষণিকের সুখের জন্য, সুবিধাজনক স্থানে অবস্থানের জন্য ঐ সকল ঝুঁকি নেওয়া থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন, তাহলে কখনোই আপনি সফল হতে পারবেন না। এ ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ বলেন, The biggest risk is not taking any risk… In a world that changing really quickly, the only strategy that is guaranteed to fail is not taking risks.

কিন্তু অবশ্যই আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে, ঝুঁকিগুলো যেন প্রয়োজনে নেয়া হয়। অতিরিক্ত আবেগ যেন কোনো অযৌক্তিক ঝুঁকি নিতে বাধ্য না করে।

৯) তারা কখনো অন্যকে তাদের আনন্দ-অনুভূতিকে সীমাবদ্ধ করতে দেয় না।

নিজের আনন্দ-অনুভূতি এবং আত্মতৃপ্তিগুলোকে অন্যদের সাথে তুলনা করার মাধ্যমে নিষ্পন্ন করা কখনোই উচিত নয়। এমনকি অন্যদের মতামতের উপর ভিত্তি করে আপনি সুখী কি সুখী না তা সংজ্ঞায়িত করা থেকেও দূরে থাকুন। মানসিকভাবে শক্তিশালীরা তা-ই করে থাকে।

১০) তারা কখনো অন্যদের আনন্দ অনুভূতিকে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করে না।

মানসিকভাবে শক্তিশালীরা জানে প্রত্যেকের নিজস্ব কিছু আনন্দের অনুভূতি আছে, আত্মতৃপ্তির  জায়গা আছে এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে নিজের মতো করে সফল। তাই অন্যের সফলতা, আত্মতৃপ্তি, আনন্দ দেখে মানসিকভাবে সবলরা কখনো অসন্তুষ্ট হয় না, ঈর্ষাপরায়ণ হয় না। এমনি তারা কখনো নিজের মতামতের মাধ্যমে অন্য কাউকে নিরুৎসাহ করে না। তারা সবসময় ‘সবার সুখে সুখী’ থাকার চেষ্টা করে। আনন্দগুলোকে ভাগাভাগি করে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সফলতা খুঁজে পায়।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: