আমাদের চর্যাপদ : একটি সরল আলোচনা

মূল লেখার লিংক
চর্যাপদ নিয়ে প্রথম এবং চরমতম কথা হলো, এটা বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম, এবং বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনযুগের একমাত্র নিদর্শন। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনযুগের এই একটাই নিদর্শন পাওয়া গেছে। তবে তার মানে এই নয়, সে যুগে বাংলায় আর কিছু লেখা হয়নি। হয়তো লেখা হয়েছিল, কিন্তু সংরক্ষিত হয়নি। কেন হয়নি, সেটা পরের আলোচনা।

Charyapada

আমাদের চর্যাপদ

চর্যাপদ রচিত হয় ৮ম থেকে ১২শ শতকের মধ্যে। এর মধ্যে ঠিক কোন সময়ে চর্যাপদ রচিত হয়, তা নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে। একেকজন একেক সময়কালের কথা বলেছেন। অনেক দাবি করেছেন, এর রচনাকাল আরও আগে। তবে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য মত এটাই।

চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া বা বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধকদের সাধন সঙ্গীত। বইটিতে মোট চর্যা বা পদ বা গান আছে ৫১টি। এর মধ্যে ১টি পদের টীকা বা ব্যাখ্যা দেয়া নেই। ৫১টি পদের মধ্যে পাওয়া গেছে সাড়ে ৪৬টি; একটি পদের অর্ধেক পাওয়া গেছে। বাকি ৪টি পাওয়া যায়নি।

চর্যাপদের মোট কবি ২৩ জন। এ নিয়েও বিতর্ক আছে; যেমন অনেকেই বলেন দারিক পা আর দাড়িম্ব পা আলাদা ব্যক্তি। কিন্তু অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো, এই দুইজন একই ব্যক্তি। এভাবে একেকজনের গণনায় কবির সংখ্যা একেকরকম। তবে অধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী ২৩ জন।

চর্যাপদের প্রাচীনতম কবি সরহ পা। অনেকে দাবি করেন, লুই পা সবচেয়ে পুরনো। তাদের এই ধারণার পক্ষে প্রমাণ, চর্যার প্রথম পদটি তার রচিত। এই প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে আদিকবি-ও বলা হয়। কিন্তু পরে এটা প্রমাণিত হয়েছে, চর্যাপদের কবিদের মধ্যে প্রাচীনতম কবি সরহ পা-ই। আর সবচেয়ে বেশি পদ লিখেছেন কাহ্নু পা, ১৩টি। সরহ পা লিখেছেন ৪টি পদ। ভুসুক পা লিখেছেন ৮টি আর কুক্কুরী পা ৩টি। লুই পা, শান্তি পা আর সবর পা লিখেছেন ২টি করে। বাকি সবাই ১টি করে পদ লিখেছেন।

চর্যাপদ কি বাংলায় লেখা?

চর্যাপদ নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিতর্ক হল, এটি কোন ভাষায় রচিত। ব্যাপারটা নিয়ে আসলেই বিতর্কের অবকাশ আছে। তবে এই বিতর্কের শেষ হবে বলে ভাবার অবকাশ নেই। আমরা বাংলাভাষীরা যেমন দাবি করি এর ভাষা বাংলা, তেমনি অসমিয়ারাও দাবি করে এর ভাষা অসমিয়া, মৈথিলিরাও দাবি করে এর ভাষা মৈথিলি, উড়িয়ারাও দাবি করে এর ভাষা উড়িয়া। এমনি দাবি করে মগহি, ভোজপুরিয়া আর নেওয়ারিরাও। কেবল হিন্দিভাষীদের দাবিই উড়িয়ে দেয়া যেতে পারে।

সমস্যাটা বুঝতে হলে এই অঞ্চলের ভাষার বিবর্তনের দিকে একটু দৃষ্টিপাত করা জরুরি। যে সময়ে চর্যাপদের পদ বা গানগুলো রচিত হচ্ছে, তখনো বাংলা ভাষা বিবর্তিত হয়ে, এখানকার অন্যান্য ভাষাগুলোর থেকে পুরোপুরি আলাদা হয়ে ওঠেনি। মানে তখনো বাংলা স্বতন্ত্র কোনো ভাষা হয়ে ওঠেনি, বরং স্বতন্ত্র একটি ভাষা হয়ে উঠছে। এর কেবলই কিছু আগে বাংলা ভাষা থেকে আলাদা হয়েছে উড়িয়া ভাষা। তখনো মৈথিলি আর অসমিয়া বাংলা থেকে পুরোপুরি আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র ভাষা হয়ে ওঠেনি; মৈথিলি পুরোপুরি আলাদা হয়েছে তের শতকে এসে। অসমিয়া আলাদা হয়েছে ষোল শতকে। এই অঞ্চলের অন্যান্য ভাষাগুলোও বাংলা থেকে পুরোপুরি পৃথক হয়েছে, তখনো খুব বেশিদিন হয়নি। ফলে চর্যার ভাষায় এই সব ভাষারই কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। আর উড়িয়া, মৈথিলি আর অসমিয়া, বিশেষ করে শেষ দুটি ভাষার বৈশিষ্ট্য তো চর্যাপদে বেশ ভালোভাবেই বিদ্যমান। ফলে চর্যাপদের উপর এই ভাষাগুলোর দাবি কোনো ভাবেই নস্যাৎ করে দেয়া যাবে না। তবে এ ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ নেই, চর্যাপদ বাংলা ভাষারই সম্পদ।

চর্যাপদের ভাষা সম্পর্কে বেশ ভাল একটা উপসংহার টেনেছেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি এর ভাষার নাম দিয়েছেন বঙ্গ-কামরূপী, বা প্রত্ন-বাংলা-আসামি-উড়িয়া-মৈথিলি ভাষা।

সন্ধ্যা ভাষা, সন্ধা ভাষা বা আলো-আঁধারির ভাষা

ভাষার প্রসঙ্গ গেল, এখন প্রশ্ন হলো, চর্যাপদ রচনার কারণ কী। এটা আগেই বলা হয়েছে, চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়াদের বা তান্ত্রিকদের সাধন সঙ্গীত। কিন্তু এই বৌদ্ধ সহজিয়া কারা? সেটা বোঝার জন্য এই অঞ্চলের মানুষের বিশ্বাসের বা ধর্মের ইতিহাসের প্রতি আলোকপাত করতে হবে।

এই অঞ্চলের প্রাচীন অধিবাসীদের নিজস্ব ধর্ম বা বিশ্বাস ছিল। সেই বিশ্বাসে প্রথম পরিবর্তন আসে আর্যদের আগমনের ফলে। কিন্তু তখনো বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়নি। বাংলা ভাষার উদ্ভবের অনেক আগেই বুদ্ধ এসেছেন, বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তন করেছেন। এই অঞ্চলের মানুষ তখন ছিল মূলত বৌদ্ধ। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের মোটমাট ১০টি শাখায় বিভক্ত করা হয়, এই শাখাগুলোকে বলা হয় যান। বৌদ্ধ ধর্মের মোট যান দশটি হলেও, মোটা দাগে ধরলে, যান বা শাখা দুটি- মহাযান ও হীনযান বা সহজযান। মহাযানীরা মূলত চীন, জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার অধিবাসী। আর ভারতীয় উপমহাদেশের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মূলত হীনযানী বা সহজযানী। এই হীনযান বা সহজযানের এক ধারার বৌদ্ধ সাধকরাই আলোচ্য সহজিয়া সাধক বা সহজিয়া তান্ত্রিক।

এই সহজিয়া তান্ত্রিকদের নিজস্ব সাধন সঙ্গীত ছিল, যেগুলোতে গুরুরা তাদের তন্ত্রসাধনার মন্ত্র গোপনে বেঁধে রাখতেন। কেবল যারা তান্ত্রিক সাধনা করে, তারাই সেই মন্ত্র বুঝতে পারবে, অন্যদের কাছে সেটা সাধারণ গানের মতোই অর্থবহ মনে হবে। এই রকম গানেরই উদাহরণ চর্যাপদের পদ বা গানগুলো। গানগুলোর দুটো অর্থ থাকে, একটি সবাই বুঝলেও আসল যে অর্থ, তান্ত্রিক সাধনার গোপন মন্ত্র, সেটা তান্ত্রিকরা ছাড়া অন্যদের পক্ষে বোঝা মুশকিল। অন্তত বুঝতে হলে তান্ত্রিক সাধনা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান থাকা দরকার। অর্থের এরকম দুর্বোধ্যতা, বোঝা গিয়েও বুঝতে না পারার এই বৈশিষ্ট্যের কারণে এর ভাষাকে বলা হয় সন্ধ্যা ভাষা বা সন্ধা ভাষা। অনেকে একে বলেছেন আলো-আঁধারির ভাষা।

বাংলার পুঁথি নেপালে কেন?

এই রকম আরো গানের দেখা পাওয়া যায় নেপালে-তিব্বতে। ওখানে এগুলো বজ্রা গান নামে পরিচিত। কেন বাংলায় এই গানগুলোর অস্তিত্ব আর নেই, অথচ নেপালে-তিব্বতে এখনো টিকে আছে, তারও একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

একাদশ শতকের শেষে বাংলায় পাল সাম্রাজ্যের পতন হয় সেনদের হাতে। মানে, বৌদ্ধরাজের পতন হয়, হিন্দুরাজ শুরু হয়। ফলে স্বভাবতই, দেশের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিধর্মী সম্রাটের প্রতি ভয় কাজ করতে শুরু করে। আর মধ্যযুগে (আধুনিক যুগেও নয় কী?) স্বভাবতই রাজধর্মের বেশ প্রভাব ছিল। ফলে অপেক্ষাকৃত ধনী বৌদ্ধরা চলে যায় উত্তরে, নেপাল-ভূটান-তিব্বতে। আর যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তাদের বড়ো অংশই হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে যায়। এদের একটা বড়ো অংশই আবার পরবর্তীতে মুসলিম শাসনামলে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। বর্তমান বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশেরই উত্তরসূরী এই ধর্মান্তরিত শ্রেণী। তো এই ধর্মান্তর ও দেশান্তরের ফলে বাংলায় এই গানগুলোর প্রয়োজনও ফুরোতে থাকে। আর দেশান্তরিত বৌদ্ধদের সাথে বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের গানগুলোও চলে যায় নেপালে তিব্বতে। সেখানে যে আগে এই গানগুলোর চর্চা ছিল না, তা নয়। তবে তখন বৌদ্ধদের মূল শিক্ষাকেন্দ্র ছিল বাংলা ও এর আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে, এখানকার বৌদ্ধবিহারগুলো। কিন্তু এই পালাবদলের ফলে এই ধারার গানগুলোর স্থানান্তর ঘটল। ফলে বাহন ভাষারও পরিবর্তন ঘটল। এই অঞ্চলের ভাষায় এ ধারার গান রচনা বা গীত হওয়াও বন্ধ হয়ে গেল। এ ধারার গানের বাহন হয়ে উঠল মূলত তিব্বতি ভাষা।

এই একই কারণে চর্যাপদের পুঁথিটি পাওয়া গেছে নেপালে, বাংলায় বা বাংলার আশেপাশে নয়। এবং একই কারণে বাংলায় এ ধরনের আর কোনো পুঁথিও পাওয়া যায়নি। এটা ধারণা করা অমূলক নয় যে, সেই সময়ে বাংলায় এই ধরনের আরও পদ বা গান রচিত হয়েছিল, সেগুলোর বই বা পুঁথিও ছিল। বিশেষ করে মনে রাখা জরুরি, চর্যাপদ কিন্তু একটা সংকলন গ্রন্থের মতো, বাছাই করা পদ বা গানের পুঁথি। মানে সেই সময়ে এই ধরনের আরো পদ বা গান এবং বই বা পুঁথি অবশ্যই ছিল। হয়তো দেশান্তর হওয়ার সময় বৌদ্ধরা সেগুলোও নেপালে-ভূটানে-তিব্বতে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে ব্যবহারের ভাষার পরিবর্তন হওয়ায়, বাংলা পুঁথিগুলোও তিব্বতিতে অনুবাদ করা হয়। এরপর আর বাংলা পুঁথি সংরক্ষণ করার প্রয়োজন পরেনি। অন্য দিকে বাংলা ও এই অঞ্চলে হিন্দুরাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায়, বৌদ্ধধর্মের আর তেমন চর্চাও হয়নি। ফলে এই অঞ্চলেও সে সব পুঁথি সংরক্ষণ করা হয়নি।

চর্যাপদের যে পুঁথিটি পাওয়া গিয়েছিল, তাতে পদ ছিল সাড়ে ৪৬টি, কিন্তু জানা গেছে চর্যাপদের মোট পদ ৫১টি। এমনকি একটি পদের টীকা করা হয়নি, সেটিও জানা গেছে। কিন্তু কীভাবে? চর্যাপদের তিব্বতি সংস্করণের মাধ্যমে। সেখান থেকেই জানা গেছে টীকাকারের নাম মুনিদত্ত। তিনি সম্ভবত প্রচলিত চর্যাগানগুলো থেকে এই ৫১টি গান বা পদ বাছাই করেছিলেন। এবং সেগুলোর টীকাও করেছিলেন। টীকা করার সময় একটি পদের টীকা করার প্রয়োজন বোধ করেননি।

চর্যাপদ আবিষ্কার

তো সুদূর নেপাল থেকে বাংলা ভাষার এই প্রাচীনতম নিদর্শনটি কীভাবে খুঁজে পাওয়া গেল? সেই আবিষ্কারের কাহিনি শোনার আগে আবিষ্কারের পটভূমি জানা দরকার।

প্রথম যখন স্কুলগুলোতে বাংলা পড়ানো শুরু হলো, পড়ানোর জন্য তখন সম্বল কেবল বিদ্যাসাগর। তার রচিত বর্ণ পরিচয়, বোধোদয়, চরিতাবলী, কথামালা এইসব। তখনো চর্যাপদ কিংবা অন্য কোনো প্রাচীন বাংলা সাহিত্যই আবিষ্কৃত হয়নি। কেবল বিদ্যাসাগর, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের অনুবাদ গ্রন্থ, কিছু ইংরেজি হতে অনুবাদ- বাংলা সাহিত্য বলতে তখন এগুলোই ভরসা। পরে রামগতি ন্যায়রত্ন প্রথম বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের উপর একটি বই লিখলেন। জানা গেল, বাংলা সাহিত্যে আরো উপাদান আছে- কাশীরাম দাস, কৃত্তিবাস, কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম, এমনি অনেক প্রাচীন সাহিত্যিক বাংলায় লিখেছেন। সেগুলো একেকটি এমনকি ৩শ বছরেরও বেশি পুরাতন। তবে সেগুলোরও বেশিরভাগই অনুবাদ। মূলত সংস্কৃতের অনুবাদ।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে কোলকাতার শিক্ষিত বাঙালি সমাজের এমন ধারণা ছিল উনিশ শতকের শেষার্ধ পর্যন্তও। সেই সময়টা আবার ছিল বাঙালির বিকাশের যুগ। বাঙালি তখন ইংরেজিতে শিক্ষিত হচ্ছে। ইংরেজির মাধ্যমে বিশ্বসাহিত্য ও জ্ঞানের নানা শাখায় বিচরণ করতে শুরু করছে। নানা কৌতূহল, জীবন-জিজ্ঞাসা তাকে পেয়ে বসেছে। সে তার অতীত ইতিহাসের ঐতিহ্য ও নানা উপকরণের অনুসন্ধান করতে শুরু করেছে। এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই শুরু হয় বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস ও সাহিত্য সম্পর্কে অনুসন্ধান।

বাংলার বৌদ্ধরা হিন্দুরাজার আবির্ভাবে বাংলা থেকে পালিয়ে মূলত নেপালে আর তিব্বতে গিয়েছিল। আর তাই বৌদ্ধধর্মের ইতিহাস ও সাহিত্যের অনুসন্ধানও শুরু হলো নেপাল থেকেই। এই উদ্দেশ্যে প্রথম নেপালে যান রাজা রাজেন্দ্র লাল মিত্র। তিনি নেপালে গিয়ে সংস্কৃত ভাষায় রচিত অনেকগুলি বৌদ্ধ ধর্ম ও সাহিত্যের পুঁথি খুঁজে পান। ১৮৮২ সালে তিনি Sanskrit Buddhist Literature in Nepal নামে তার আবিষ্কৃত পুঁথিগুলোর একটি তালিকা প্রকাশ করেন।

কিছুদিন পরেই রাজেন্দ্র লাল মিত্রের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তার ধারণা ছিল, ভারতেই জন্ম নেয়া ও বেড়ে ওঠা বৌদ্ধধর্ম কোনো না কোনো ভাবে এখনো হিন্দু ধর্মের ভেতর থেকে গেছে। বিশেষ করে, তার ধারণা ছিল হিন্দুদের ধর্মঠাকুর এসেছে বৌদ্ধধর্ম থেকেই। কারণ ধর্মঠাকুরের কোনো মূর্তি নেই, বদলে তার মন্দিরে একখণ্ড পাথর থাকে।

তার এই ধারণার সপক্ষে প্রমাণ জোগাড়ের উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৯৭-৯৮ সালে দুইবার, আর ১৯০৭ সালে একবার নেপালে যান। তার এই যাত্রাগুলোয় তার মূল উদ্দেশ্য সিদ্ধ হোক বা না হোক, তার শেষ নেপাল যাত্রায় বাংলা সাহিত্যের এক বিশাল উপকার হয়ে যায়। তিনি নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার বা লাইব্রেরি থেকে চারটি প্রাচীন পুঁথি আবিষ্কার করেন-

  • চর্যাপদ
  • সরোজবজের দোহাকোষ
  • কৃষ্ণাচার্যের দোহাকোষ
  • ডাকার্ণব

এইভাবে বাংলাভাষীদের থেকে বহু মাইল দূরের এক অঞ্চল থেকে আবিষ্কৃত হলো বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন। এই চর্যাপদ আবিষ্কার সম্পর্কে শাস্ত্রী মশাই লিখেছেন- ১৯০৭ সালে আবার নেপালে গিয়া আমি কয়েকখানি পুঁথি দেখিতে পাইলাম। একখানির নাম চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়, উহাতে কতকগুলি কীর্ত্তনের গান আছে ও তাহার সংস্কৃত টীকা আছে। গানগুলি বৈষ্ণবদের কীর্ত্তনের মত, গানের নাম চর্যাপদ।

১৯১৬ সালে তিনি এই চারটি পুঁথি বই আকারে প্রকাশ করেন, হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা নামে, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে।

নাম কি আসলেই চর্যাপদ?

বইটি প্রকাশের পর এর ভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। সেটার পাশাপাশি শুরু হয় আরেকটি বিতর্ক- বইটার নাম আসলে কী? বিভিন্ন পণ্ডিত বইটির বিভিন্ন নাম বলেছেন। একেকটি নামের জন্য একেকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সব মিলিয়ে বইটির রচনাকাল, ভাষা ইত্যাদির মতো নাম নিয়েও কোনো  স্থির সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। বইটির প্রস্তাবিত নামগুলোর মধ্যে আছে-

  • চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়
  • আশ্চর্য্যচর্য্যাচয়
  • চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়
  • চর্য্যাগীতিকোষ

এখন, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত পুঁথিটির নাম ছিল সম্ভবত চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়। কিন্তু সেটি মূল গ্রন্থ ছিল না। সম্ভবত, শাস্ত্রী আবিষ্কৃত পুঁথিটির লিপিকর মূল গ্রন্থ থেকে পদগুলো, আর টীকাকৃত গ্রন্থ থেকে টীকা নকল করেছিলেন। ফলে মূল গ্রন্থটির নাম এখানে রক্ষিত হয়েছিল, সে স্থির সিদ্ধান্তে আসা যায় না।

আবার অনেকে দাবি করেছেন, চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয় নয়, নামটি ছিল চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়। কিন্তু লিপিকরের প্রমাদে তা হয়ে গেছে চর্য্যাচর্য্যবিনিশ্চয়। কিন্তু চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয় নামের পক্ষেও কোনো সুনির্দিষ্ট যুক্তি দেখানো যায়নি, যার প্রেক্ষিতে নিশ্চিত করে বলা যায়, বইটির নাম চর্য্যাশ্চর্য্যবিনিশ্চয়-ই ছিল।

আশ্চর্য্যচর্য্যাচয় শব্দটি পুঁথিতে পাওয়া গেলেও, সেটিকে ঠিক নাম হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। চর্যাচয় মানে চর্যাসমূহ; এর আগে আশ্চর্য বিশেষণ হিসেবে যোগ করে আশ্চর্য্যচর্য্যাচয় শব্দটি গঠন করা হয়েছে। মানে এটি মূলত একটি বিশেষ্য পদ, যেখানে বইটিতে সংকলিত পদ বা গানগুলোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এটি ঠিক বইয়ের নাম নয়। এটিকে বইয়ের নাম হিসেবে বিবেচনা করলে, পুঁথিটির আরো অনেক শব্দকেই এর নাম হিসেবে বিবেচনা করতে হয়।

অন্যদিকে, চর্যাপদের যেই তিব্বতি অনুবাদ পাওয়া গেছে, এবং তিব্বতি ভাষার অন্যান্য যে সব গ্রন্থে এই বইটির উল্লেখ পাওয়া গেছে, সেগুলোতে গ্রন্থটির নাম বলা হয়েছে চর্যাগীতিকোষ। কাজেই এই নামটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

তবে বাঙালির কাছে এই খটোমটো নামগুলোর কোনোটিই নয়, বইটি চর্যাপদ নামেই পরিচিত। এই নামেই বইটি বাঙালির হৃদয়ে স্থান পেয়েছে।

নামটি যে কারণেই প্রচলিত হয়ে থাকুক না কেন, এখন মনে হয় বইটির জন্য এই নামটিও কম যথার্থ নয়। কী সহজ একটি নাম, অথচ সে নামে কেমন একটা প্রাচীনত্বের গন্ধও আছে। কেমন আপন মনে হয়, কিন্তু নামটির যে কী অর্থ তা পরিস্কার বোঝা যায় না। ঠিক যেমন চর্যাপদের পদ বা গানগুলো, পড়লে বা শুনলে ভীষণ আপন মনে হয়, মনে হয় আমাদেরই ভাষায় লেখা। কিন্তু ভাষায় কেমন একটা প্রাচীনত্বের আবরণ পড়ানো, বুঝি বুঝি ঠেকলেও মানেটা পরিস্কার বোঝা যায় না।

* প্রবন্ধটিতে চর্যাপদ বিষয়ে অত্যন্ত সহজ ভাষায় একটি সরলীকৃত আলোচনা করা হয়েছে। প্রাচীন এই সাহিত্যকর্ম নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক আছে। সে সব বিষয়ের ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব অধিক গ্রহণযোগ্য মতটিই উল্লেখ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে মনে রাখা জরুরি, এটি কোনো গবেষণা প্রবন্ধ বা চর্যাপদের উপরে কোনো গভীর আলোচনার প্রয়াসে লিখিত প্রবন্ধ নয়। নিতান্তই সাধারণ পাঠকদের উদ্দেশ্যে লিখিত একটি সরলীকৃত আলোচনা। প্রবন্ধটি পাঠ করার সময় বিষয়টি বিবেচনায় রাখার জন্য পাঠকদের প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ করা হলো।
** ব্যবহৃত ছবি তিনটি wikipedia.org হতে গৃহীত। ছবি সংক্রান্ত সকল কৃতিত্ব ও দায় যুগপৎভাবে এই অনলাইন এনসাইক্লোপিডিয়াটির। তবে যেহেতু ওয়েবসাইটটি যে কেউ এডিট করতে পারে, তাই উৎস হিসেবে ওয়েবসাইটটি নির্ভরযোগ্য নয়। সে কারণেই ছবি তিনটির উৎস পৃথকভাবে উল্লেখ করা হলো।
Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: