ক্ষনজন্মা এক পাখি কিংবা প্রজাপতির গল্প

মূল লেখার লিংক

বাবা পাড় মাতাল, সারাদিন আকন্ঠ মদে নিমজ্জিত থাকতেন, কে জানে সেই কারনেই কিনা জন্মেই সমস্যা ছিল পায়ে। এক পা অন্য পায়ের চেয়ে ছয় সেন্টিমিটার ছোট! সাথে বা পায়ের পাতা বাকানো। কিন্তু বিধাতা যার পায়ে যাদু ঢেলে দিবেন বলে ঠিক করেছেন তাকে আটকানোর সাধ্য আছে কি এসব বাধার? না তাকে পায়ের প্রতিবন্ধকতা আটকাতে পারেনি, আটকে গিয়েছিলেন নিজের স্বেচ্ছাচারিতার কাছেই। সে গল্প পরে হবে। আসুন এখন তার যাদুর শুরুটা কোথায় তা দেখি।

বাবা নাম রেখেছিলেন ম্যানুয়েল ফ্রান্সিসকো দস সান্তোস। কিন্তু তার বোন তাকে আদর করে ডাকতেন অন্য একটি নামে। যে নামে লেখা হয়েছে হাজারো শিল্প, গারিঞ্চা! একটি পাখির নামে তাকে গারিঞ্চা বলেই ডাকতেন বোন। সেই নামেই পরিচিতি।

ফুটবল বিশ্বকে যিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তার শরীরের মোহনীয় সব মুভমেন্টে। ড্রিবলিং এর  সর্বকালের সেরা যাকে বলা হয় কোনো দ্বিধা ছাড়াই। উইংগার পজিশনকে চিনিয়েছিলেন নতুন চেহারায়। সেই ম্যানুয়েল ফ্রান্সিসকো দস সান্তোস। পেলের মত একজন খেলোয়াড়ের সময় জন্মেও যিনি বড় একটা ভাগ বসাতে পেরেছিলেন তার জনপ্রিয়তায়, সে নিশ্চয় সাধারন কেউ ছিলেন না। স্বয়ং পেলে নিজেই তার প্রশংসায় ছিলেন পঞ্চমুখ।

খেলতে পারতেন ১৯৫৪এর বিশ্বকাপেই… ততদিনে নিজেকে চিনিয়ে ফেলেছেন ফুটবল অংগনে। কিন্তু দেশটা যে ব্রাজিল। তার পজিশনেই খেলেন বিশ্বসেরা জুলিনহো। সেরা সময়ের জুলিনহোকে সরিয়ে দলে ঢোকার সাধ্য কার। তাই অপেক্ষা বাড়লো। কিন্তু বিশ্বকাপে না খেললেও কি হবে, ক্লাব বেটাফেগোর হয়ে মাঠে জাদুর পরশ ঠিকই বুলাচ্ছিলেন।

ক্লাবের শুরুটাও অবাক করাই ছিল, স্বাভাবিক চোখে যে ছেলের ঠিকমত হাটতেও পারার কথা না সেই ছেলে গিয়ে হাজির হলো বেটাফেগোর ট্রায়ালে। পায়ের এই অবস্থা দেখে প্রথমে নাক ছিটকালেও দেখতে চাইলেন তার দক্ষতা কতটুকু। ট্রায়ালে তাকে মার্ক করতে গেলেন ক্লাবের সেরা ডিফেন্ডার নিল্টন সান্তোস। সবাই ভেবেছিল পুচকে এই ছেলে সহজেই বল হারাবে নিল্টনের কাছে। কিন্তু কোথায় কি! বল পায়ে দারুন এক বডি ডজে বোকা বানিয়ে তাকে পেরিয়ে যায় গারিঞ্চা! এভাবে হিউমিলিয়েট হয়ে নিল্টন সান্তোস কোথায় রেগে যাবেন, তা না সরাসরি কোচের কাছে গিয়ে বললেন এই ছেলেকে এক্ষুনি সাইন করান যেন এর বিপক্ষে আমাকে খেলতে না হয়!

যাইহোক আমাদের এই ছোট্ট পাখিটির ১৯৫৪ এর বিশ্বকাপের অপেক্ষার পর এলো ১৯৫৮ এর বিশ্বকাপ। নাহ, এবার আর তাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। আগের বিশ্বকাপের অপেক্ষার জবাব যেন তিনি দিলেন দারুন ভাবেই। দলের হয়ে জিতলেন বিশ্বকাপ। সেবারেই ক্ষান্ত দিলেন না, জিতলেন পরের বিশ্বকাপও।

পাগলাটে চরিত্রের ছিলেন সারাটা জীবন। কেমন পাগলাটে তা একটা গল্প শুনলেই টের পাবেন। ইতালির ক্লাব ফিওরেন্তিনার বিপক্ষে চার চারটা ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে এসে গোলকিপারকেও পরাস্ত করে ফাকা বারের সামনে বল নিয়ে গারিঞ্চা। কিন্তু না! গোলে শট করলেন না! বল পায়ে রেখে অপেক্ষা করলেন আরেকজন খেলোয়াড় আসার। আরেক ডিফেন্ডার আসার পর তাকে কাটিয়েই গোল করেন!

বিশ্বকাপে একই সাথে সেই সময় অন্যতম পরাশক্তি রাশিয়ার বিপক্ষে অভিষেক হয় পেলে ও তার। রাশিয়া ম্যাচের প্রথম মিনিটেই রাইট উইং এ বল আসে গারিঞ্চার পায়ে। চারজনকে কাটিয়ে শট করেন তিনি যেটা বারে লেগে ফিরে আসে। পরক্ষনেই তিনি পেলের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেন। পেলের শটটাও ক্রসবার থেকে ফিরে আসে। এই দুই অতিমানবের জাদুতে ব্রাজিলের শুরুটা এমন হয়েছিল যে এই ম্যাচের প্রথম তিন মিনিটকে বলা হয় ফুটবল ইতিহাসের সেরা তিন মিনিট! ম্যাচটি ব্রাজিল ২-০ তে জিতে নেয়।

নানান পাগলামিতে মাতিয়ে রাখতেন ড্রেসিং রুম। ১৯৬২ এর বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচেই পেলের ইনজুরির কারনে সবসময় মজা করা, সব কিছুকেই হালকাভাবে নেওয়া এই খেলোয়াড়ের কাধে চেপে যায় দলের “লীড রোল”। কিন্তু এবার আর কোনো কিছুকে হালকা ভাবে নেওয়া নয়। যোগ্য নেতা রূপেই দলকে জিতিয়ে আনেন বিশ্বকাপ। পুরো আসরে গোল করার পাশাপাশি ভাভা, আমারিলদোদের দিয়ে করান অসাধারন সব গোল। ফাইনালে গায়ে প্রচন্ড জ্বর নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন চেকস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে।

সবার চোখে পেলেই সর্বকালের সেরা হলেও অনেকের চোখেই তিনি ছিলেন পেলের চাইতেও ক্যারিশমাটিক কিছু। অসাধারন ড্রিবলিং, দুর্দান্ত গতি, দুপায়েই জোরালো শট। সর্বকালের সেরার যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী তিনিই। পেলেও তিনি যেদিন একসাথে মাঠে নেমেছেন সেদিন কেউ হারাতে পারেনি ব্রাজিলকে।

মাঠে নামার আগে কখনোই প্রতিপক্ষকে নিয়ে ভাবতেন না, এমনও হয়েছে তিনি জানতেনই না কার বিপক্ষে মাঠে নামছেন। আগের সব হিসাবনিকাশ মুছে তাকে নিয়ে নিয়ে নতুন করে হিসাব কষতে হয়েছে বিপক্ষ দলের কোচদের। ছোট পায়েই করেছেন বিখ্যাত সেই বানানো শটের গোল। বাকানো পায়ের জাদুর কারনে লোকে যাকে বলতো “অ্যাঞ্জেল উইথ দ্য বেন্ট লেগস”।

ফাইনালে ১-০ গোলে পিছিয়ে গিয়েও সুইডেনকে উড়িয়ে দেন ৫-২ গোলে। ভাভাকে দিয়ে করান দুই গোল, সতীর্থ পেলেও করেছিলেন দুই গোল। বলতে গেলে শেষ হবে না। কিন্তু সেই যে বলেছিলাম, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে আটকাতে না পারলেও আটকে গিয়েছিলেন নিজের কাজেই। হাটুর চোট ছিল, কিন্তু সেই সাথে ছিল নিজের বেপরোয়া জীবন। যেন বাবার জীবনেরই ফটোকপি… অ্যালকোহল এর নেশা কখনোই ছাড়তে পারেননি। ফুটবল মাঠে যিনি ছিলেন “joy of people” সেই তারই joy ছিল যেন শুধুই মদ্যপানে। নিজের বেপরোয়া জীবনযাপনের কারনে বেশিদিন থাকতে পারেননি জাতীয় দলে। শুধুমাত্র ৫০টি ম্যাচে খেলার সুযোগ হয়েছিল। অবাক করা কথা হলো এই পঞ্চাশ ম্যাচের মাত্র একটিতে পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন। নিজের শেষ ম্যাচে। এরপর ফুটবল ছেড়ে সেই আকন্ঠ মদে ডুবে থাকা। বেশ কয়েকবার দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়ে মরতে মরতে বেচে গেলেও মদের ছোবলে লিভার নষ্ট হয়ে যাওয়ায় জীবন প্রদীপ নিভে যায় মাত্র ৪৯ বছর বয়সেই।

সংখ্যায় এই কিংবদন্তীকে ধরার চেষ্টা করাটা নিতান্তই বোকামি, তাই সেপথে আর পা বাড়ালাম না। কথায় আছে, মিথ্যা তিন প্রকার, মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা আর পরিসংখ্যান। কথাটি গারিঞ্চার বেলায় যেন এক অমোঘ সত্যি। নইলে ৫০ ম্যাচে ১২ গোল করেছেন এই হিসাব কি প্রকাশ করতে পারবে কেমন জাদুকর ছিলেন সে মাঠে?

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: