প্রকৃতি যখন ক্রিকেটারদের নানান সুরে ডাকে

মূল লেখার লিংক
অ্যালান বোর্ডার বেজায় চটেছেন। সামান্য পেটের পীড়ায় একজন সেট ব্যাটসম্যান দলকে বিপদে ফেলে উইকেট ছেড়ে চলে যাবেন!

বোর্ডার নিজে ছিলেন দারুণ লড়াকু। উত্তরসূরি একজনের এহেন পলায়নপর আচরণে ভদ্রলোক ভীষণ ক্ষুব্ধ। সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক স্পষ্ট বলে দিলেন, ‘আশা করি সে অর্ধমৃত অবস্থায় টেবিলে শুয়ে আছে। নইলে অধিনায়ক হিসেবে আমি অন্তত খুব খুশি হব না।’

বোর্ডারকে কে বোঝাবে, অবস্থা ছিল আরও শোচনীয়! মাঠে ছিলেন বলেই বরং তখন অর্ধমৃত ম্যাট রেনশ। টেবিলে শুয়ে নয়, ড্রেসিং রুমে ফিরে ছোট ঘরে গিয়েই বরং ফিরে পেয়েছেন জীবন!
1
ঘটনা ভারত-অস্ট্রেলিয়া পুনে টেস্টের প্রথম দিনের। ডেভিড ওয়ার্নার তখন সবে আউট হয়েছেন। কিন্তু অস্থির হয়ে উঠেছেন আরেক ব্যাটসম্যান রেনশ। একবার আম্পায়ারের কাছে যান, আবার ছোটেন নতুন ক্রিজে আসা অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথের কাছে। উদভ্রান্তের মত একটু এদিক-সেদিক ঘোরেন। তার পর ড্রেসিং রুমের দিকে ছুট!

ধারাভাষ্য কক্ষে তখন হাসির হুল্লোড়। টিভি পর্দার সামনে কোটি দর্শকও যা বোঝার বুঝে নিয়েছে। যখন আসে প্রকৃতির ডাক, থাকে না কোনো রাখঢাক!

এই সব ক্ষেত্রে ভদ্র গোছের একটা কেতাবি ব্যখ্যা তৈরিই থাকে। চালিয়ে দেওয়া হয় পেটের পীড়া বা ‘স্টমাক আপসেট’ হিসেবে। এবারও সেটিই হয়েছে। পরে জানা গেছে বিস্তারিত। বোর্ডার তো বিবৃতি দিয়েই সার। কিন্তু রেনশর অবস্থা ছিল বেগতিক।

ওয়ার্নার আউট হওয়ার মিনিট ১৫-২০ আগেই রেনশর পেটের ভেতর মোচড়। আম্পায়ারকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, লাঞ্চ ব্রেকের কত বাকি। আধ ঘন্টা সময় আছে জেনে চেষ্টা করেছিলেন চেপে রাখতে। কিন্তু ভুক্তভোগি মাত্রই জানেন, এসব ক্ষেত্রে সমস্যা পেট থেকে ক্রমেই মাথায় চলে আসে এবং শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বারবার মনে পড়তে থাকে, শরীর ঘামতে থাকে। চেপে রাখতে চাইলে আরও জোরে চাপে! রেনশকেও এক পর্যায়ে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে।

দিন শেষে অবশ্য মন খুলে হেসেছেন রেনশ। ক্রিকেট ইতিহাসে সম্ভব প্রথমবার, সংবাদ সম্মেলনে ক্রিকেটের চেয়ে বেশি ছিল ‘টয়লেট।’ রেনশ হাসতে হাসতে বললেন, ‘হুট করেই চলে এসেছে (প্রকতির ডাক)…অধিনায়ককে বলার পর সে খুব খুশি হয়নি। তবে এটুকু বুঝেছে যে, যখন টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তখন যেতেই হয়!’

প্রকৃতির ডাক রেশনকে বেশ দার্শনিকও করে তুলল, ‘পরিস্থিতিটা খুব আদর্শ ছিল না। তবে জীবনটাও তো মোটামুটি এরকমই!’

রাজা ও গোপাল ভাঁড়ের সেই সেই কৌতুকটির মতো, এই যন্ত্রণার যে না পড়েছে, সে হয়ত বুঝবে না তীব্রতা। বোর্ডারও তাই বুঝতে পারছেন না রেনশর কষ্ট। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই হয়ত, ব্যাপারটির আরও ভালো ব্যখ্যা দিয়েছেন ভারতের ব্যাটিং কোচ সঞ্জয় বাঙ্গার, ‘প্রকৃতির ডাক যখন আসে, প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি ও মানসিক শক্তি থাকলেও সেটা কন্ট্রোল করা যায় না…!’

ছোট্ট ক্যারিয়ারে ব্যাটিং দিয়ে যত নাম কুড়িয়েছেন, রেনশ তার চেয়ে অনেক বেশি খ্যাতি পেয়ে গেছেন মাঠ ছেড়ে গিয়ে প্রাকৃতিক কর্ম সারার এই এক ঘটনায়। তবে তার চেয়ে অনেক বেশি খ্যাতিম্যান একজনকেও একবার এভাবেই ছুটতে হয়েছিল। আমাদের এই মিরপুরে শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামেই!

২০১৫ সালে বাংলাদেশ-ভারত সিরিজের সেটি প্রথম ওয়ানডে। সেই যে অভিষেকেই ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের কাটারে কাটলেন মুস্তাফিজ!

আগে ব্যাট করেছিল বাংলাদেশ। স্বাভাবিক ভাবেই উইকেট কিপিং করছিলেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। ৪৪তম ওভারের শুরুতে হঠাৎই গ্লাভস ছেড়ে ড্রেসিং রুমের দিকে ছুটলেন ধোনি। কিপিং প্যাড ছাড়াই তড়িঘড়ি করে কিপিং করলেন বিরাট কোহলি।

ধোনি ফিরলেন খানিক পরই। দলের অবস্থা ভালো নয়, তবু ভারত অধিনায়কের চোখে মুখে তৃপ্তির ছায়া। ত্যাগেই যে প্রকুত সুখ!

পরে ভারতের ম্যানেজার বিশ্বরূপ দে জানালেন, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেই গিয়েছিলেন ধোনি। ব্যাপারটি এরকমই। ‘ক্যাপ্টেন কুল’ পর্যন্ত ‘হট’ হয় যান!
2
হরভজন সিংয়ের ছিল আরও জরুরী অবস্থা। বলে-কয়ে যাওয়ার সময়ও পাননি! রঞ্জি ট্রফির এক ম্যাচে বল করছিলেন, হুট করে বল রেখেই দৌড়! সবাই অবাক। খেলা বন্ধ। হরভজন ‘কাজ’ সেরে ফেরার পর আবার শুরু হলো খেলা।

প্রকৃতি কেন জানি ভারতের ম্যাচেই ডাকাডাকি করে বেশি। ভারতের বিপক্ষে একটি টেস্টে হরভজনের মতোই বোলিং করার সময় ডাক এসেছিল মারভিন ডিলনের। ক্যারিবিয়ান পেসার বলটা আরেকজনের দিকে ছুড়ে দিয়েই ছুট! এদিনের রেনশর মতোই সেদিন ধারাভাষ্যকার বলেছিলেন, ‘যখন ডাক আসে, যেতেই হয়!’

মাঠ থেকে সৌরভ গাঙ্গুলিকেও ড্রেসিং রুমে ডেকে নিয়েছিল প্রকৃতি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে সিডনিতে। তবে ফিল্ডিংয়ের সময় ছিল বলেই ততটা আলোচিত হয় দাদার কীর্তি।

আম্পায়ারা এদিক থেকে একটু নিরাপদ। যদিও তারাও মানুষ এবং ডাক তাদেরও আসে। তবে কসরত কম করতে হয় বলেই হয়ত চেপে-টেপে বাধ দিয়ে রাখতে পারেন তারা। কিন্তু একবার ভেঙে গিয়েছিল ডিকি বার্ডের সেই বাধ!

ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে একটি টেস্ট ম্যাচে আম্পায়ারিং করছিলেন। বোলিং করছিলেন ইয়ান বোথাম। এক পর্যায়ে হঠাৎ বোলারকে থামিয়ে তাকে বলেই ছাড়লেন মাঠ। কিছুক্ষণ থমকে রইল খেলা। কিংবদন্তী এই আম্পায়ার বিব্রত হয়ে নিজেই এই ঘটনা শুনিয়েছেন পরে।
3
একবার অবশ্য হাতি-তামাশা ছাড়িয়ে বেশ গুরুতর পর্যায়ে চলে গিয়েছিল ব্যাপারটি। যথারীতি সেই ভারত। ১৯৮৮ সালে টেস্ট ম্যাচ, ব্যাঙ্গালোরে। রান আপে বল হাতে ছুটছিলেন এউয়েন চ্যাটফিল্ড। একসময় ক্রিজ পেরিয়ে গেলেন। কিন্তু বলও করেন না, দৌড়ও থামে না। ছুটতেই আছেন! ঢুকলেন সোজা ড্রেসিং রুমে!

খাবারের কারণেই কিনা, সেই টেস্টে চ্যাটফিল্ডের মত পেটে সমস্যা হয়েছিল রিচার্ড হ্যাডলিসহ নিউ জিল্যান্ড দলের বেশ কজনেরই। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ফিল্ডিং করার মত অতিরিক্ত ফিল্ডারও ছিল না। শেষমেষ আগের বছরই অবসরে যাওয়া জেরেমি কনি সহ আরও একজনকে ধারাভাষ্য কক্ষ থেকে আনা হয়েছিল কিছুক্ষণ ফিল্ডিং করার জন্য!

প্রকৃতির ডাক এমনই। এখানে অসহায় সবাই। যখন ডাক দেয় প্রকৃতি, থাকে না আর কোনো গতি!

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: