একটি সিম কার্ডের কাহিনি

মূল লেখার লিংক
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
আমেরিকা আসার পর দিনই যে কাজটি করলাম, তা হলো একটি নতুন সিম কার্ড কিনলাম। তিন দিন বেশ ভালোই কেটে গেল। কিন্তু চতুর্থ দিন সকালবেলাই শুরু হলো ঝামেলা। দুই-তিনজন মানুষ কল করে বলল, অ্যাশলি আছে? ওকে ফোন দাও, আমি অমুক বলছি। ভদ্রভাবে সবাইকে জানালাম, এই নামে এখানে কেউ নেই। এই নম্বর বর্তমানে আমি ব্যবহার করছি।
এখানে বেশ কিছুদিন পর পর অনেকেই তাদের ফোনের ক্যারিয়ার বদলে নতুন অপারেটরের কাছে চলে যায় এবং নম্বর বদলে ফেলে। সে কারণে পুরোনো কোনো নম্বর যখন নতুন কেউ ব্যবহার করতে থাকে তখন তাকে মোটামুটি পাহাড়সম স্প্যাম কল ও ঘোস্ট কলের শিকার হতে হয়। এ ছাড়া অন্যান্য মানুষের কল করা তো বোনাস হিসেবে আছেই।

পরের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কোনো এক অ্যাশলির জন্য আমার জীবন মোটামুটি দুর্বিষহ হয়ে গেল। সাত সকালে ফোনের রিং শুনে লাফ দিয়ে উঠে ফোন ধরে শুনতাম কেউ একজন হেঁড়ে গলায় বলছে, শুভ সকাল অ্যাশলি। আগামীকাল তোমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। তোমার কি মনে আছে? আমি ঘুম ঘুম স্বরে বলতাম, দুঃখিত আমি অ্যাশলি না। এ ছাড়া শুক্রবার মাঝরাতে আমার কাছে কল আসত। আমি ফোন ধরা মাত্রই বিকট গানবাজনার শব্দের মধ্যে এক ছেলে রীতিমতো চেঁচাতে চেঁচাতে বলতে থাকত, হেই অ্যাশলি, তুমি কোথায়? ক্লাবে কখন আসবে? আমি মাথা খুবই ঠান্ডা রেখে শান্ত স্বরে বলতাম, দেখো, এটা রং নম্বর। অ্যাশলি এখন আর এই নম্বর ব্যবহার করে না। ওপাশের ছেলেটা আবার চেঁচাতে চেঁচাতে হড়বড় কী কী যেন বলত। আমি শুধু শেষে এটাই বুঝতে পারলাম, আমার কথা সে ঠিকমতো শুনতে পারছে না। আমাকেও তখন বেশ উচ্চ স্বরে বলতে হতো, এটা রং নম্বর।
এ ছাড়া ঘনঘন মেসেজ তো আছেই। বিভিন্ন গাড়ির ইনস্যুরেন্স কোম্পানির মেসেজ, লাইব্রেরির বই ফিরিয়ে দেওয়ার মেসেজ, ধার করা টাকা ফেরত চাওয়ার মেসেজ, শপিংয়ের নানা রকম অফারের মেসেজ, হেলথ ইনস্যুরেন্সের মেসেজ ইত্যাদি, ইত্যাদি। প্রথম প্রথম যারাই মেসেজ দিত আমি তাদের ফিরতি মেসেজ দিয়ে জানিয়ে দিতাম যে, তারা ভুল নম্বরে মেসেজ দিচ্ছে। অ্যাশলি এই নম্বর ব্যবহার করে না। কিন্তু কিছুদিন পর নিজেই মহাবিরক্ত হয়ে মেসেজের উত্তর দেওয়া বা কোনো অচেনা নম্বর থেকে আসা কল ধরা বন্ধ করে দিলাম। কল না ধরায় একজন একবার প্রায় ত্রিশ বারের মতো কল করে ফেলল। আমি বাধ্য হয়ে কল ধরে তাকে বললাম, ভাই রে, এটা অ্যাশলির নম্বর না। কেমন ফ্রেন্ড তোমার! নতুন নম্বর নিয়ে সে কাউকে নম্বর দিচ্ছে না?
লেখিকা
তবে এভাবে আরও কিছুদিন পার হওয়ার পর ক্রমশ ফোন আসা কমে এল। আমি ধীরে ধীরে অ্যাশলির কথা ভুলে গেলাম। এক বিকেলে কফি খাওয়ার জন্য বের হয়েছি। কফি খেতে খেতে কোনো একটা বই পড়ছিলাম। যখন বইয়ের মাঝে রীতিমতো ডুবে আছি এমন সময় মোবাইলে মেসেজ এল।
—‘অ্যাশলি, কেমন আছ? দীর্ঘদিন আমার মোবাইলটা নষ্ট ছিল বলে আমি তোমার কোনো খবর নিতে পারিনি। তোমার মা এখনো রাগ করে আমার কল ধরে না। তুমি কি সময় করে আমাকে একদিন একটু দেখতে আসবে? অনেক দিন তোমাকে দেখি না। ইতি তোমার দাদিমা।’
মেসেজ পড়ে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। হঠাৎ করেই মনে হলো আমার জন্য অ্যাশলি একটা বিরক্তিকর নাম হলে সত্যিকারভাবে সে তো একজন মানুষ। যার নিজেরও একটা স্বকীয় গল্প আছে। পরিবার আছে। বন্ধু-বান্ধব আছে। দুঃখ আছে। বিষাদ আছে। সুখ আছে। একজন নিঃসঙ্গ দাদিমা আছে। হয়তো সেই গল্পের কাউকেই আমি চিনি না, জানি না। কিন্তু তাও তাদের অনেকে ভুল করে আমাকে কল করে। অচেনা একজনকে কল করে চেনা কাউকে খোঁজে। হয়তো ওর দাদিমা বৃদ্ধাশ্রমে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ফোন নষ্ট থাকলেও কেউ তার খবর নেয় না। কোনো না কোনো জটিলতার কারণে পরিবারের কেউ কল ধরে না। হয়তো মেয়েটির নিজের কোনো সমস্যা আছে বলে অনেককেই সে নম্বর দেয়নি। কত কিছুই তো হতে পারে। অ্যাশলিকে নিয়ে নানা কিছু ভাবতে ভাবতে সেদিন আমার দিন পার হয়ে গেল। একবার ভাবলাম সেই বৃদ্ধাকে মেসেজ দিয়ে বলি অ্যাশলি নম্বর বদলে ফেলেছে। আবার মনে হলো একদিন তাকে কল করে তার সঙ্গে কথা বলি। হয়তো তিনি অপ্রত্যাশিতভাবে একজনের ফোন পেয়ে, কথা বলার মানুষ পেলে খুশি হয়ে যাবেন। এই সব ভাবতে ভাবতে আমি আবার আমার দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। ভুলে যাই এ সবকিছু। আরও বেশ কিছুদিন পর আবার আমার মোবাইলে মেসেজ আসে।
—‘অ্যাশলি, তুমি কি খুব ব্যস্ত? কবে আসবে দেখা করতে? অনেক ভালোবাসা। দাদিমা।’
এবার রীতিমতো আমি পণ করি এই বৃদ্ধাকে কল করে আমি জানাব অ্যাশলির কথা। কী কী কথা বলব তার সঙ্গে তাও ভেবে ঠিক করে ফেলি। ঘণ্টাখানেক পর ভাবি, থাক, কল দেওয়ার দরকার নেই। হয়তো আমরা বাঙালিরা অতিরিক্ত কল্পনা ও আবেগপ্রবণ। তার মানে তো এই নয় যে, পৃথিবীর সব দেশের সব মানুষই এমন হবে। এমনও তো হতে পারে আমার কল পেয়ে বৃদ্ধা বিরক্ত হবেন। বিরক্ত হয়ে কিছু বলেই বসবেন। তখন আমাকে পস্তাতে হবে, কেন বোকার মতো কল করে বসলাম! সাতপাঁচ ভেবে আমি তাকে বেশ পোশাকি একটা মেসেজ দিলাম।
—‘আমি খুবই দুঃখিত হয়ে তোমাকে জানাচ্ছি, অ্যাশলি বেশ কয়েক মাস থেকেই এই নম্বরটি আর ব্যবহার করছে না। এটি এখন আমার নম্বর। আশা করি তুমি ওর নতুন নম্বর পেয়ে যাবে শিগগিরই। শুভকামনা।’
আমার মেসেজের কোনো উত্তর এল না। একটা শুকনো ধন্যবাদ লেখা মেসেজও না। আমি ধরেই নিলাম, আমি আবেগপ্রবণ হয়ে কল না করে খুব বুদ্ধিমত্তার কাজ করেছি। এর প্রায় দিন চারেক পরে কী মনে করে আবার চেক করে দেখি, আমার মেসেজটি ডেলিভারই হয়নি। একটু বিস্মিত হই। কী মনে করে সঙ্গে সঙ্গেই বৃদ্ধার নম্বরে কল করি। শুনতে পাই নম্বরটি বন্ধ আছে। নিমেষেই কেন যেন খুব মুষড়ে পড়ি আমি। কেমন যেন বিষণ্ন লাগতে থাকে আমার।
বাংলাদেশে থাকার সময় বছরের প্রথম দিন আমি কাটিয়েছিলাম আমার নানুর সঙ্গে। তার ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া সাদা চুল, শতকোটি বলিরেখা, ভাঙা ভাঙা কণ্ঠ, বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর আর শিশুর মতো আচরণ আমাকে যেন আচমকাই খুব বড় কোনো মানুষ বানিয়ে ফেলেছিল। তিনি আমাকে কাছে পেয়ে শুধু একটা কথাই বারবার বলছিলেন, মিষ্টি খা, মিষ্টি খা, টেবিলে মিষ্টি আছে। মিষ্টি খা। আরে কে আছিস, আমার নাতনিকে কেউ মিষ্টি দে। যেন বা এক প্লেট মিষ্টির মাধ্যমে তিনি তার সব স্নেহ, ভালোবাসা, আদর আমাকে গভীরভাবে বুঝিয়ে দিতে পারবেন। সেদিন বাড়ি ফেরার আগে আমি খুব মন দিয়ে নানুর চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম। আমার নানুর ঘষা কাচের মতো চোখের তারায় সেদিন যেন আমি শতাব্দী দেখে এসেছিলাম। সেই চোখে কোনো রাগ ছিল না। ছিল না কোনো ক্ষোভ, অভিযোগ, প্রেম, কিংবা দ্বন্দ্ব। ছিল স্মৃতি। শুধুই স্মৃতি। আমি আমেরিকা আসার কয়েক মাস পরেই তিনি মারা যান।
এই আমেরিকান বৃদ্ধার ফোন বন্ধ পেয়ে আমার যেন ফ্ল্যাশব্যাকের মতো নিজের নানুর কথা মনে পড়ে যায়। আমার মনে হয় হয়তো সেই বৃদ্ধার ফোনখানা আবারও নষ্ট হয়ে গিয়েছে। হয়তো তিনি প্রতি সপ্তাহের শেষে ভাবছেন আজই বুঝি তার নাতনি তার কাছে আসবে। কারণ তিনি তো জানেন তার মেসেজ অ্যাশলি পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু উত্তর দেয়নি।
খুব অনুতপ্ত বোধ করি আমি। মনে হয় যদি কোনোভাবে অ্যাশলিকে অন্তত এই বৃদ্ধার খবর জানাতে পারতাম, তাহলে হয়ত ভালো বোধ করতাম। কিন্তু ওকে চেনে এমন কারও নম্বর আমার কাছে ছিল না। ওর পরিচিতদের কাছ থেকে আসা মেসেজগুলো বাতিলের খাতায় পড়েছে অনেক আগেই। আমার জানা নেই সে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়ে কিনা? পড়লে সেটার নাম কি? আর ফোনের অপারেটরকে ফোন করলে তারা কারও ব্যক্তিগত তথ্য দেবে এমনটা ভাবার কোনোই কারণ নেই। আমি তবু লোকেশন ও নম্বর দিয়ে অনলাইনে অ্যাশলির তথ্য খুঁজতে থাকলাম। এখানে এই নামটি খুব সম্ভবত খুব কমন। কারণ শত শত অ্যাশলির তথ্য চলে এল। এর মাঝে যে কে সেই অ্যাশলি তা আর বের করতে পারলাম না। কিছুদিন পর সেই বৃদ্ধার নম্বরে আবার কল করলাম। ফোনটি তখনো বন্ধই পেলাম।
এরপর থেকে মনে মনে আশা করছি, দীর্ঘদিন সেই বৃদ্ধার ফোন বন্ধ পেয়ে অ্যাশলি বা তার মা নিশ্চয় বৃদ্ধার খোঁজ খবর নিতে চলে যাবে। বৃদ্ধা তার কাঙ্ক্ষিত নাতনির সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন। নাতনিটি সেদিন সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে একটা ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুক ফটো আপলোড করে দেবে হৃদয় ছোঁয়া কোনো ক্যাপশন দিয়ে। সে দিনটায় বৃদ্ধাটি খুব খুশি থাকবেন। নষ্ট ফোন কিংবা নিঃসঙ্গতার দুঃখ ভুলে যাবেন সাময়িকভাবে। এই লেখাটা এই আশাতেই লেখা। আর হয়তো এরপর কেউ যদি আমাকে হঠাৎ ফোন করে বলে, হ্যালো, অ্যাশলি আছে? আমি বিরক্ত না হয়ে খুব আন্তরিকভাবে তাকে সঙ্গে সঙ্গেই জানাব এটা রং নম্বর।
হয়তো…।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: