স্মৃতির জিমখানায় প্রাণের জোয়ার বাংলাদেশকে দিয়ে

মূল লেখার লিংক

ওই যে বিল্ডিংটা দেখছেন…”, মাঠের পাশ ঘিরে থাকা গাছের সারির ওপর দিয়ে আঙুল উঁচিয়ে দূরে দেখাচ্ছিলেন নয়াপতি জগন্নাথ দাস, “একটা ছক্কায় সিকে নাইডু বল ফেলেছিলেন ওই বিল্ডিংয়ের কাছে।” স্থানীয় অভিজ্ঞ এই সংবাদকর্মী হাসতে হাসতে বলছিলেন, “অনেক ঘটনার সাক্ষী এই জিমখানা মাঠ, ভারতীয় ক্রিকেটের অনেক অনেক স্মৃতি এখানে।”

দূরত্ব যা বোঝা গেল, তাতে দেড়শ’ মিটারের মতো হতে পারে। ওই যুগে অত বড় ছক্কা? নাইডু বলেই বিশ্বাস করা যায়। ১৯৩২ সালে ভারতের ইংল্যান্ড সফরেও তার একটি ছক্কা ইতিহাসে জায়গা পেয়ে গেছে। ৯১ রানে ৭ উইকেট হারানো ভারতের হয়ে মাত্র তিন ঘণ্টায় করেছিলেন ১৬২ রান। একটি ছক্কায় বল পাঠিয়েছিলেন মাঠ ঘেঁষে থাকা রিয়া নদীর ওপারে! ওয়ারউইকশায়ার থেকে বল উড়েছিল উস্টারশয়ারে। বলা হয়, ইংলিশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এক কাউন্টি থেকে আরেক কাউন্টিতে বল পাঠানোর একমাত্র ঘটনা সেটিই।

এই জিমখানা ক্রিকেট মাঠও তাহলে ধন্য হয়েছে নাইডুর আরেকটি বিশাল ছক্কায়!

হায়দরাবাদ ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট সবারই দেখা গেল গল্পটি জানা এবং বেশ গর্ব সেটি নিয়ে। ক্রিকেট মাঠের পাশেই সামরিক বাহিনীর প্যারেড গ্রাউন্ড। এক পাশে নেট। একসময় ছিল চারটি নেট, আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন সেখানে নেটের সংখ্যা গোটা পনের। আগে এটি পরিচিত ছিল প্যারেড গ্রাউন্ড নামে।

১৯৮৯ সালের জানুয়ারির এক সকালে এখানেই এমন একটি দৃশ্যের মঞ্চায়ন হয়েছিল, যেটি ভারতীয় ক্রিকেটের গল্পগাথায় চিরস্থায়ী জায়গা পেয়ে গেছে। অনুশীলন করে ফিরছিলেন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন। ভারতের সেই সময়ের প্রধান নির্বাচক রাজ সিং দুঙ্গাপুর গিয়ে বলেছিলেন, “মিয়া, ক্যাপ্টেন বানোগে…?” ভারতীয় ক্রিকেটে আজহারউদ্দিন যুগের সেটি সূচনার প্রহর।

এই প্যারেড গ্রাউন্ডের ধুলো ওড়া মাঠেই একসময় দিনমান পড়ে থাকতেন আব্বাস আলি বেগ, এমএল জয়সিমহা, সৈয়দ আবিদ আলিরা। দিনের পর দিন নিজেদের ঘামে এই মাঠকে সিক্ত করেই ভারতীয় দলে ঢোকার পথ তৈরি করেছেন আজহারউদ্দিন, ভিভিএস লক্ষ্ণণরা। হায়দরাবাদের ক্রিকেটার তৈরির আতুরঘর এই জিমখানা ক্রিকেট মাঠ।

১৯২৮ সালে গড়া হয় এই মাঠ। প্রথম শ্রেণির ম্যাচ তো নিয়মিত হতোই, একসময় বিদেশি দলগুলিরও নিয়মিত পদচারণা ছিল এই মাঠে। বিভিন্ন দলের ভারত সফরে প্রস্তুতি ম্যাচ হতো এখানে। তবে ক্রিকেট যতোই এগিয়েছে আধুনিকতার পথ ধরে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের জন্য এই মাঠ পড়ে গেছে পেছনে। দুই যুগেরও পর বাংলাদেশকে দিয়েই এই মাঠে লেগেছে আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া।

বিদেশি কোনো দল এখানে সবশেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছে সেই ১৯৮৫ সালের জানুয়ারিতে। দক্ষিণাঞ্চলের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচ খেলেছিল ডেভিড গাওয়ারের ইংল্যান্ড। ইংলিশ ওপেনার মার্টিন মক্সন করেছিলেন ১৫৩, মাইক গ্যাটিং অর্ধশতক। জোনাথন অ্যাগনিউ নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। বাংলাদেশের আগে সবশেষ কোনো সিনিয়র বিদেশি দল খেলেছে ১৯৮৯ সালে। নেহেরু কাপ ওয়ার্ল্ড সিরিজে খেলতে আসা অ্যালান বোর্ডারের অস্ট্রেলিয়া খেলেছিল প্রস্তুতি ম্যাচ। এরপর দু-একবার বয়সভিত্তিক বিদেশি দল খেলেছে, মেয়েদের দল খেলেছে।

বিদেশি দলগুলির মূল খেলা হতো লাল বাহাদুর শাস্ত্রী স্টেডিয়ামে, যে মাঠে কেনিয়াকে হারিয়ে প্রথম ওয়ানডে জয়ের স্বাদ পেয়েছিল বাংলাদেশ। প্রথম শ্রেণির ম্যাচ অবশ্য তখনও হয়েছে জিমখানায়। তবে উপলে রাজীব গান্ধী স্টেডিয়াম হওয়ার পর আরও কমে যায় এই মাঠে খেলা। ২০১০ সালের পর রঞ্জি ট্রফির ম্যাচও হয়নি। বাংলাদেশকে দিয়েই তাই অনেক দিন পর বড় ম্যাচ এই মাঠে।হায়দরাবাদের ক্রিকেটে এই মাঠ অবশ্য এখনও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ক্রিকেটই নয়, বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে চলে অন্যান্য খেলাও। ক্রিকেট মাঠের পাশ ঘেঁষেই ফুটবল মাঠ। আছে হকি মাঠ। তার পাশে টেনিস কোর্ট বেশ কয়েকটি, বাস্কেটবল গ্রাউন্ড। তবে মূল পরিচয় ক্রিকেট দিয়েই। হায়দরাবাদ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (এইচসিএ) একাডেমি এখানেই। রঞ্জি দল হয়ে জাতীয় দলে ঢোকার স্বপ্ন দেখা শিশু-কিশোর-যুবাদের লড়াই চলে এখানেই।

তবে সেসবই দৈনন্দিন রুটিন। প্রতিদিনের ক্রিকেট প্রবাহে নতুন প্রাণের জোয়ার এনেছে বাংলাদেশের ম্যাচ। ভারত সফরের সূচিতে শুরুতে প্রস্তুতি ম্যাচই ছিল না। বিসিবি একটি ম্যাচ চাওয়ার পর এইচসিএর আগ্রহেই ম্যাচ দেওয়া হয়েছে। স্মৃতির জিমখানাকে আবার একটু জাগিয়ে তোলার সুযোগ হিসেবেই ম্যাচটিকে নিয়েছে এইচসিএ।

আজহার, পরে ভেঙ্কটাপাথি রাজু, লক্ষ্মণদের সময়েও এই মাঠে নামা মানেই ছিল ধুলোয় মাথামাখি হওয়া। এখন সেটি প্রায় সবুজ গালিচা। এই ম্যাচের জন্য আরও পরিচর্যা করা হয়েছে মাঠ। ড্রেসিং রুম আধুনিক ক্রিকেটের অনুপযোগী অবশ্যই। তার পরও চেষ্টা করা হয়েছে কাজ চালানোর মত করে তোলার। অস্থায়ী প্যান্ডেলে গড়া হয়েছে মিডিয়া বক্স। অস্থায়ী ডিজিটাল স্কোরবোর্ডও আনা হয়েছে।

তবে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে এইচসিএ কর্তাদের তৎপরতা। এত বছর পর জিমখানায় একটি বড় ম্যাচ আয়োজন করতে পেরে তারা দারুণ রোমাঞ্চিত। ছুটোছুটি করছেন দারুণ উৎসাহে, কাজ করছেন আন্তরিকতায়। অনেক দিন পর জিমখানাকে ঘিরে অনেক তোড়জোড়। মাঠ ঘিরে থাকা কাঁটাতার ঘেঁষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে দুই দিনই খেলা দেখেছে দুই-তিনশ দর্শক।

সব মিলিয়ে অনেক দিন পর আলোচনায় জিমখানা। বরাবরই এটি হায়দরাবাদ ক্রিকেটের প্রাণ। তবে ভারতীয় ক্রিকেটে নিজের অস্তিত্ব মাঠটি জানান দিল অনেক বছর পর।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: