যে ম্যাচটি পালটে দিয়েছিলো অনেক কিছু

মূল লেখার লিংক

১৬ জুলাই, ১৯৫০।
মারাকানা , রিও ডি জেনিরো, ব্রাজিল।
৭৯ মিনিট।
উরুগুয়ের আলসিডেস ঘিগিয়ার পায়ে বল।
শট করলেন…..

শটের আগের গল্প না শুনেই পরের গল্প শোনাটা বড্ড বেরসিকের মত কাজ। তা পাঠককে বেরসিক হতে দেওয়া তো পাপই বলা চলে, গল্প শোনাই তবে আগের!

যেই ম্যাচটার কথা বলছিলাম সেটা ১৯৫০ বিশ্বকাপের ম্যাচ। অদ্ভুত এক বিশ্বকাপ। প্রথমে রাউন্ড পদ্ধতিতে খেললো দলগুলো, এরপর সেরা ৪ দল নিয়ে রাউন্ড রবিন। দল চারটে ব্রাজিল, উরুগুয়ে, স্পেন আর সুইডেন। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইতালি পৌছাতে পারেনি, ৪ দলের মধ্যে কেবল মাত্র উরুগুয়েই বিশ্বকাপ জয়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। সেই বিশ্বকাপে অসাধারণ ফর্মে ব্রাজিল, গোলবন্যায় সবাইকে ভাসিয়েই উঠে এসেছে। ফাইনাল রাউন্ডে ব্রাজিল সুইডেনকে ৬-১ আর স্পেনকে ৭-১ গোলে হারিয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে। আর সুইডেনকে ৩-২ আর স্পেনের সাথে ২-২ গোলে ড্র করা উরুগুয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে। এর মানে ছিলো, হার এড়ালেই শিরোপা ব্রাজিলের, অন্যদিকে উরুগুয়ের দরকার ছিলো জয়। অসাধারণ ফর্মে থাকা ব্রাজিলকেই বলা হচ্ছিলো ফেভারিট।

ম্যাচের আগে থেকেই ব্রাজিলের মিডিয়া এবং সাধারণ জনগণ ব্রাজিলকে নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে আখ্যায়িত করতে থাকে। কারণ ও ছিলো। ব্রাজিল আগের সব ম্যাচেই জিতেছিলো প্রতিপত্তির সাথে, অন্যদিকে উরুগুয়ের এতদূর আসার পথটা যথেষ্টই কষ্টার্জিত।

ফাইনালের আগেই তাই ২২টি স্বর্ণপদক বানানো হলো, প্রত্যেকটিতে ব্রাজিল স্কোয়াডের একজন করে খেলোয়াড়ের নাম। এমনকি সেদিন রিও এর মেয়র একটি ভাষণ এ বলেন, “”You, players, who in less than a few hours will be hailed as champions by millions of compatriots! You, who have no rivals in the entire hemisphere! You, who will overcome any other competitor! You, who I already salute as victors!”। এমনকি একটি গান ও বানানো হয় তাদের সম্মানার্থে, যার নাম ছিলো “Brazil the Victors” এবং ম্যাচের পর বাজানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়।

১৬ জুলাই সকালে রিও এর রাস্তায় শুরু হয় কার্নিভাল, যাতে স্লোগাম দেওয়া হচ্ছিলো, “বিশ্বজয়ী ব্রাজিল!” বলে। সেদিন মারাকানা তে টিকেট কেটে ঢুকেছিলেন ১৭৩,৩৮০ জন, যদিও ধারণা করা হয় মাঠে ২ লক্ষের বেশী মানুষ ছিলো, মারাকানায় তখন সিট না থাকায় এত মানুষ ঢুকতে পারাটা আশ্চর্যজনক না।

সেদিন ব্রাজিলের এক পত্রিকা “O Mundo” ব্রাজিল দলের একটি ছবি ছাপিয়ে ক্যাপশন দেয় ” এরাই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন “। উরুগুয়ে অধিনায়ক অবদুলিয়ো ভারেলা যতগুলো পারেন তত কপি কিনে আনেন এবং সতীর্থ দের ওই পত্রিকার উপর মূত্রত্যাগ করতে বলেন (বলা বাহুল্য তারা করেছিলো)।

খেলা শুরুর আগে উরুগুয়ে কোচ জুয়ান লোপেজ বলেন ব্রাজিলের আক্রমণ আটকাতে ডিফেন্সিভ খেলতে। কোচ যাওয়ার পর ভারেলা বলেন ” জুয়ান একজন ভালো মানুষ এবং ভালো কোচ। কিন্তু আজ তিনি ভুল। যদি আমরা ডিফেন্সিভ খেলি তাহলে আমাদের পরিণতি স্পেন কিংবা সুইডেনের মতই হবে।” এরপর তিনি একটি আবেগী এবং অনুপ্রেরণাদায়ক বক্তব্য দেন, যার শেষে নিজেদের আন্ডারডগ হওয়া নিয়ে তিনি বলেন, “Muchachos, los de afuera son de palo. Que empiece la función”. (“Boys, outsiders don’t play. Let’s start the show”)।

খেলার শুরু থেকেই ব্রাজিল আক্রমণের পর আক্রমণ করতে থাকে, কিন্তু স্পেন বা সুইডেনের মত ভেঙে না পড়ে, উরুগুয়ের ডিফেন্স গোল না খেয়েই প্রথমার্ধ শেষ করে। দ্বিতীয়ার্ধের দুই মিনিটের মাথায়ই গোল করে ব্রাজিলকে এগিয়ে নেন সাও পাওলো স্ট্রাইকার ফ্রিয়াকা। ভারেলা রেফারির সাথে তর্ক করেন যে ফ্রিয়াকা ছিলেন অফসাইড, কিন্তু তা শুনতে রাজি ছিলেন না রেফারি। এরপর ভারেলা বল নিয়ে সেন্টার সার্কেলে রাখেন এবং বলেন, “It’s time to win!”

এরপর উরুগুয়ে আক্রমণ শুরু করলে ব্রাজিলের ডিফেন্সেত দুর্বলতা প্রকাশ পায় এবং ৬৬ মিনিটে হুয়ান আলবার্তো স্কিয়াফফিনো গোল করে তাদের সমতায় ফেরান। এরপর আসে সেই ৭৯তম মিনিট…

শট করলেন ঘিঘিয়া, ফেরাতে পারলেন না বারবোসা, স্তব্ধ মারাকানা, গোওওওওওওল!

এরপর আর গোল দিতে পারেনি ব্রাজিল। ইংরেজ রেফারি জর্জ রিডার বাশি বাজালেন, শেষ, পরাজিত ব্রাজিল, দ্বিতীয় বারের মত শিরোপা যাচ্ছে মন্টেভিডওতে!

বলা হয়, ম্যাচের পর পুরো মারাকানায় ছিলো, “অস্বস্তিকর অসহ্য নীরবতা”, যেখানে ব্যাতিক্রম উরুগুইয়ানদেত শিরোপা উল্লাস। অনেকেই সেদিন মারাকানার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন, ব্রাজিলের অধিকাংশ সংবাদপত্র এই হার মেনে নিউজ করতে রাজি ছিলেন না। বিখ্যাত রেডিও সাংবাদিক এরি ব্যারোসো অবসর নেন। সেই ব্রাজিল দলের বেশীর ভাগই আর কখনও জাতীয় দলে খেলেননি, কয়েকজন অবসর নেন, আর কয়জন সুযোগ পাননি। শুধুমাত্র নিল্টন সান্তোস আর কার্লোস হোসে ক্যাস্টিলহো পরের বিশ্বকাপজয়ী ১৯৫৮ আর ১৯৬২ দলের সদস্য ছিলেন। সেই দলের গোলকিপার বারবোসাকে তার বাকি জীবন কাটাতে হয়েছিলো ব্রাজিলিয়ানদের পরম শত্রু হিসেবে, তাকেই দায়ী করা হচ্ছিলো হারের জন্য।

পূর্বপ্রস্তুতকৃত সেই ২২টি মেডেল আর খুজে পাওয়া যায়নি, “Brazil the victors” গানটাও আর গাওয়া হয়নি, হারিয়ে গেছে তারা কালের অন্তরালে।

রব ওঠে, তখনকার ব্রাজিল দলের নীল সাদা জার্সি অদেশপ্রেমিক, তা বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন ডিজাইন, যেটা ব্রাজিলিয়ান পতাকার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে, সেটার ডিজাইনের জন্য প্রতিযোগীতার আয়োজন করে ব্রাজিলিয়ান সংবাদপত্র, “Correio da Manhã”। এই প্রতিযোগীতা থেকে যে ডিজাইনটি বাছাই করা হয় তাই বর্তমানে ব্রাজিল দলের জার্সি, হলুদ জার্সি, সবুজ কলার, নীল শর্টস এবং সঙ্গে সাদা মোজা। এই ডিজাইনটি করেন সংবাদপত্রের একজন আকিয়ে, এলডির গার্সিয়া স্লি। এই জার্সি পড়ে ব্রাজিল প্রথমবার মাঠে নামে ১৯৫৪ সালে, চিলির বিপক্ষে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ব্রাজিল ১৯৫৮ বিশ্বকাপ জয় করে তাদের নীল সাদা এওয়ে জার্সি পড়ে, কারণ স্বাগতিক ফাইনালিস্ট সুইডেনের জার্সি ও ছিলো হলুদ!

অবশ্য ম্যাচটাকে ভালোভাবেও মনে রাখা যায়। সেদিন হারার পরই যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন পেলে যে বিশ্বকাপ জেতাবেন! সেদিন না হারলে হয়ত, হয়তবা ব্রাজিলিয়ানদের ঘরে আজ ৫টা বিশ্বকাপ না থেকে উরুগুয়ের মত ২টা অথবা একটা ই থাকতো! তবে এসব বলে সান্তনা দেওয়াটা দুষ্কর নয়, অসম্ভবই, বিশেষত আপনি যদি ব্রাজিল ফ্যান হন। আর ব্রাজিলিয়ানদের জন্য এ ম্যাচ যেন নরকের কোন শাস্তি, যা ভুলে এসে পড়েছে এই ধরণীতে।

ইতিহাসে বোধহয় আর কোন ম্যাচ নেই যা কোন জাতিকে এভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে। মারাকানায় উরুগুয়ে কে জীবন মরণ ম্যাচে হারানো হয়েছে, হয়ত আরও হারাবে সাম্বার ছন্দে বিশ্ব মাতানো দলটি, ঘরে ৫টা বিশ্বকাপ এসেছে, ভবিষ্যতে আরও আসবে, কিন্তু তবুও, আজও মারাকানায় উরুগুয়ের সাথে খেলা হলেই অজানা এক আতংকে আক্রান্ত হয় ব্রাজিলিয়ানরা, যেন সেই অভিশপ্ত অভিশাপ টা নেমে আসে আবার, যেন সর্বনাশা এক ঝড় নামে, যেন ব্রাজিলের আকাশকে ছেয়ে দেয় এক কালো মেঘ, যার নাম,

মারাকানাজো…

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: