বই পড়া ও আমার মেজ আপা

মূল লেখার লিংক
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
ফেব্রুয়ারি, ভাষা দিবস, বইমেলা এসব এলেই ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ে। আমার মেজো আপার কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। মেজো আপা আমার চেয়ে বয়সে বেশ বড়। আমাদের আট ভাইবোনের মধ্যে মেজো আপা তৃতীয় আর আমি পঞ্চম। কেন জানি না মেজ আপা হয়তো আমাকে অন্যান্য ভাইবোনদের চেয়ে বেশি আদর করতেন। আমি বেশ নাদুসনুদুস টাইপ ছিলাম। আপা ছিলেন অনেক শুকনা টাইপের। ওই শরীর নিয়েই আপা আমাকে কোলে নিয়ে সারা পাড়া ঘুরে বেড়াতেন।

মেজো আপার যখন হাইস্কুল শেষের দিকে আমি তখন স্কুলে যাওয়া শুরু করি। আমি পড়তে শিখি স্কুলে যাওয়ার আগে থেকেই। আর সেটার পেছনে মেজো আপার অবদান অনেক বেশি। আপার প্রচণ্ড রকম বই পড়ার নেশা আমার মধ্যেও বই পড়ার নেশা জাগিয়ে তোলে। আমাদের গ্রামের হাইস্কুলে ছোট্ট একটা আলমারি ভর্তি বই ছিল। ওটাই ছিল স্কুলের লাইব্রেরি।
তখন ভালো করে পড়তে পারি না কিন্তু মেজো আপা যখন স্কুল থেকে পড়ার জন্য বই নিয়ে আসতেন আমি ওই বইগুলো নেড়ে চেড়ে দেখতাম। বই নাকের কাছে নিয়ে গন্ধ নিতাম। কেন জানি পুরোনো বইয়ের গন্ধ খুব ভালো লাগত। আস্তে আস্তে পড়া শিখলাম। আমাকে বই পড়ার নেশায় পেয়ে বসল। আমাদের স্কুলের লাইব্রেরিতে শিশুদের জন্য তেমন আলাদা কোনো বই ছিল না। আপা নিজেই বেছে বেছে আমার উপযোগী বইগুলো নিয়ে আসতেন। আমি আগাগোড়া পড়ে আপার হাতে ফেরত দিতাম। আপাও খুব অবাক হতেন আমার তাড়াতাড়ি বই পড়া দেখে।
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
আপার অতিরিক্ত বই পড়ার নেশা নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করতেন। শুনতাম এত বই পড়া ভালো না। কেউ কেউ এটাও বলতেন, আহারে মেয়েটা বই পড়ে পড়ে গোল্লায় গেল। মেজো আপার সংস্পর্শে থাকতে থাকতে বই পড়ার নেশা আমাকেও পেয়ে বসল। আমাকে আপা যে বইগুলো দিতেন সেগুলো একদমে পড়ে ফেলতাম। যেখানে না বুঝতাম আপাকে জিজ্ঞেস করতাম। নিজের বই শেষ করে আপা যে বইগুলো পড়তেন সেগুলোও পড়া শুরু করলাম।
খুব পরিষ্কার মনে আছে শরৎচন্দ্র, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, নীহার রঞ্জন গুপ্তসহ আরও অনেক লেখকের যতগুলো উপন্যাস আমাদের স্কুলের ক্ষুদ্র লাইব্রেরিতে ছিল তার বেশির ভাগই আমার পড়া শেষ আর এসব সম্ভব হয়েছে মেজো আপার কল্যাণেই। ওই বয়সে যখন হয়তো প্রেম বুঝিনি, জীবনের জটিলতার কিছুই অনুধাবন করিনি তখন উপন্যাসের কাহিনির চেয়ে একটা বই পড়ছি এটাই আমাকে বেশি টানত।
ফাল্গুনীর শাপমোচন পড়ে পুরো গল্প কতটা বুঝেছিলাম জানি না। কিন্তু শেষ পৃষ্ঠায় ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে মোহনের বড় ভাইয়ের ছেলের হু হু করে কান্নার শব্দটি আমি অনুভব করেছিলাম, কেঁদেছিলাম। যেমনটি হয়েছিল উল্কা উপন্যাসের নায়কের জন্য। ম্যাক্সিম গোর্কির দ্য মাদারের অনুবাদ ‘মা’ পড়েও অনেক কষ্ট পেয়েছি। আমার অত্যধিক বই পড়ার নেশা দেখে বাবা আমাকে সর্বপ্রথম যে বইটি কিনে দিয়েছিলেন তা হলো সম্ভবত বিজ্ঞানী আবদুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দিনের লেখা ‘আরেক জগৎ সাগর মালা’।
আমি যখন হাইস্কুলে গেলাম আপা তখন পড়ালেখার পাট চুকিয়ে সংসার আর জীবন জীবিকায় ব্যস্ত। তখন আমি লিগ্যালি বই ধার করার সুযোগ পেলাম। অবাক হয়ে খেয়াল করলাম আমাদের তিননান্দিনা স্কুলের ওই ক্ষুদ্র লাইব্রেরির চারটি শেলফে রাখা বইগুলোর অনেকগুলোই আমার পড়া। লাইব্রেরির দায়িত্বে থাকা আমার বিজ্ঞান শিক্ষক আবদুল খালিক স্যার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন এখানকার সব বই তোমার শেষ?
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
এরপর কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরির সুবাদে দেশ বিদেশ। অনেক বই পড়া হয়েছে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, আমার ক্লাসের পড়ার বই, গবেষণার বই। কখনো লাইব্রেরি থেকে ধার করে কখনো কিনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পাবলিক লাইব্রেরিতে যাওয়াও একটা নেশার মতো ছিল। লাইব্রেরির বইয়ের আলমারির আড়ালে ফাঁকে ফাঁকে রাখা চেয়ার টেবিলে বসে অফুরন্ত বইয়ের ভান্ডার থেকে ইচ্ছেমতো দেশি বিদেশি বই পড়ে কত ঘণ্টা ক্লান্তিহীন কাটিয়েছি তার হিসাব নাই। পড়তে গিয়েছি ক্লাসের পড়া, কোথায় কী। আমার ক্লাসের পড়া বাদ দিয়ে খুঁজতাম নানা রকম উপন্যাস, বিদেশি গল্প কবিতার বাংলা অনুবাদ গ্রন্থ।
এই নেশা বেশি দিন থাকেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়ে কর্মজীবন। সেখানেও পড়তে হয়েছে, তবে গবেষণার বইপত্র। কখনো বইমেলায় গিয়ে কিনে দু-একটা বই পড়া অথবা কারও কাছ থেকে ধার করে বই পড়া। তখনো হ‌ুমায়ূন আহমেদের অনেক উপন্যাস একদম পড়ে শেষ করেছি। সেটা অবশ্য বইয়ের কলেবর ছোট হওয়ার কারণে। পেশাগত কারণে এখনো পড়ছি, পড়তে হচ্ছে। কিন্তু উপন্যাস, গল্প কবিতা পড়ার সুযোগ কমে এসেছে। প্রথমত হাতের কাছে বই নাই দ্বিতীয়ত সময় কোথায়?
মেজো আপার কাছ থেকেই জেনেছি, বই পড়াতে কখনো ক্লান্তি নেই যদি একবার পড়ার নেশায় ধরে। আসলেই তাই। সেটা যে বই পড়াই হোক। বই পড়ে কেউ দেউলিয়া হয় না এটা যেমন ঠিক, তেমনি একটা বই অনন্তযৌবনা, যার নির্যাস কখনোই ফুরায় না। আসে পাশের সবাই যদি প্রতারণা করে, ছেড়ে চলে যায়, বই কাউকে কখনো প্রতারণা করে না।
যারা বই পড়েন তারাই বুঝবেন বইয়ের ঘ্রাণ কতটা আকর্ষণীয় কতটা তীব্র। সে পুরোনো হোক আর নতুন হোক। বইমেলাকে খুব মিস করি। অনেক দিন বইমেলায় যাওয়া হয় না। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ নেওয়া হয় না। কিন্তু শৈশব কৈশোরের সেই পুরোনো বইগুলোর ঘ্রাণ এখনো নাকে লেগে আছে। খুব অসময়ে স্বামীকে হারিয়েছেন আমার মেজো আপা। তিন সন্তানের জননী, সম্প্রতি নানিও হয়েছেন। শিক্ষকতা করেন। আমি অবাক হই, এত ব্যস্ততার মধ্যেও এখনো তিনি নিয়মিত বই পড়েন। আর এত বই পড়ার কারণেই মেজো আপা আমাদের মধ্যে জানতেনও অনেক বেশি। সত্যি বলতে কী জীবন সম্পর্কে ওনার জ্ঞান আমাদের সবার চেয়ে একটু আলাদা।
হয়তো সময় পাল্টেছে। প্রযুক্তি আমাদের নিয়ে গেছে অনেক দূরে। আমাদের এখন ছাপানো বই না হলেও চলে। এক সময় হয়তো বইয়ের ছাপাখানা উঠেও যাবে। কিন্তু তাতে কী। বইতো থাকবে। হয়তো বইয়ের কাগজের গন্ধ থাকবে না, বইয়ের পাতার কোনায় সিল মারা থাকবে না—পাতা মুড়িবেন না, ক্ষতি করিবেন না। কিন্তু অনন্তযৌবনা বইগুলো চিরদিন পাঠককে বই পড়ার অমৃত স্বাদ বিলিয়ে যাবে।
কানাডায় প্রতিটি শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটা করে বড় লাইব্রেরি আছে। যেখানে যে কেউ বিনা পয়সায় সদস্য হতে পারেন। যত ইচ্ছে বই ধার নিতে পারেন। তিন সপ্তাহের মধ্যে ফেরত না দিলে জরিমানা দিতে হয়। তবে শিশু-কিশোরদের কোনো জরিমানা নাই। যত দিন ইচ্ছে বই রাখতে পারে, ফেরত দিলেই হলো। তবে হারিয়ে ফেললে বই কিনে দিতে হয় অথবা দামের সমপরিমাণ জরিমানা। কোনো বই লাইব্রেরির ক্যাটালগে আছে কিন্তু যদি শেলফে না থাকে তাহলে লাইব্রেরির লোকজন আপনাকে জানাবে বইটা কোথায় আছে। কখন পাওয়া যাবে। আপনি চাইলে বইটি ফেরত আসামাত্র তারা আপনাকে ফোন করে অথবা ইমেইলে জানাবে। এমনকি বইটি যদি আপনার শহরেও না থাকে কাছাকাছি অন্য শহরে থাকলে তারা আপনাকে বইটি এনে দেবে। সব বিদ্যালয়েই বিশাল বইয়ের ভান্ডার আছে। শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে বই ধার নিয়ে আবার সময়মতো ফেরত দিতে হয়।
আমাদের দেশেও গ্রাম কিংবা শহরে প্রতিটা স্কুলে ছোট হলেও একটা করে লাইব্রেরি থাকা উচিত। বই পড়ার আলাদা একটু জায়গা থাকা উচিত। যেখানে ছেলেমেয়েরা মধ্যাহ্ন বিরতির সময় ইচ্ছে মতো বসে বই পড়তে পারবে। বই ধার নিতে পারবে। আবার ফেরত দেবে। তা না হলে ওদের বই পড়ার নেশা জাগবে কীভাবে। ওরা কি করে বুঝবে বই পড়েও নেশা হয়? সেই নেশা কোনোভাবেই ইন্টারনেটের নেশার চেয়েও কম নয়। বই হোক সঙ্গী, শুধু নিঃসঙ্গের না সব সময়ের সঙ্গী। হোক সেটা সুন্দর মলাটের ভেতরে গোটা গোটা অক্ষরে ছাপানো অথবা ল্যাপটপ, আইপ্যাড, আইপড অথবা মুঠোফোনে পিডিএফ আকারে

Advertisements
%d bloggers like this: