The Lunchbox (2013) – ভালোবাসার বাক্স

মূল লেখার লিংক
_the_lunchbox_2
ডাব্বাওয়ালা, খুব অদ্ভুদ না নামটি? ভাবছেন ডাব বিক্রেতা কি? নাহ ডাব্বাওয়ালা ইন্ডিয়াতে বেশ প্রচলিত একটি শব্দ। মূলত এরা বাসা বাড়িতে বা হোটেল থেকে খাবার নিয়ে অফিসে কর্মব্যস্ত মানুষের কাছে খাবারের বাটি বা টিফিন ক্যারিয়ার নামে আমরা যাকে জানি তা দিয়ে আসে। মূলত বাসা থেকে যারা খাবার এনে খেতে চায় তারা ডাব্বাওয়ালাদের মাধ্যমে খাবার নিয়ে আসে বাড়ি থেকে। এদের খাবার বিলি করার সিস্টেম টাও বেশ অদ্ভুত এবং মজার। ডাব্বাওয়ালাদের নিয়ে না হয় আর একদিন বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে।

ডাব্বাওয়ালাদের দাবী অনুযায়ী এই সার্ভিসে কোন ভুল হয় না, তবুও একটি ভুল একবার করে ফেলে। ইলার স্বামীর জন্য বানানো খাবারের বাটি ভুল করে চলে যায় ফার্নান্দেস নামক এক সরকারী চাকুরীজীবির কাছে। আর এখন থেকে শুরু হয় আর্ট ফিল্ম ঘরনার রোমান্টিক মুভি “The Lunchbox” এর কাহিনী।

_R6H1954

The Lunchbox এর কাহিনী নিয়ে কিছু না বলে প্রধান দুই চরিত্র এবং তাদের মনের অবস্থা নিয়ে আলোচনা করা যায়। মূলত এই আলোচনার মাধ্যমে পুরো সিনেমাটি ফুটে উঠবে আপনার কাছে। এ অংশটি অনেকাংশে স্পয়লার হিসাবে ধরা যেতে পারে। সিনেমাটি কেউ না দেখে থাকলে নিজ দায়িত্বে এ অংশটি না পড়ার জন্য অনুরোধ করা হল।

The Lunchbox সিনেমাতে দুটি ভিন্ন বয়সী, ভিন্ন লিংগের দুটি মানুষের পরিচয় হয়। কেউ কাউকে দেখেনি। শুধু খাবারের বাটি আদান ও তার মাঝে চিরকুট দিয়ে নিজেদের ভাবের বিনিময় করে চলেছে দিনের পর দিন। স্বামীর জন্য বানানো খাবার অন্য কেউ দুপুরের খাবার হিসাবে খাবার পরও, খাবার বানিয়ে তার জন্য প্রতিনিয়ত পাঠিয়েছে ইলা। সে খাবারের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে ফার্নান্দেস।

_the_lunchbox_2

দুটি ভিন্ন বয়সী মানুষের মনের এ আবেগ যদি বিশ্লেষণ করা যায় তবে, আমরা দেখতে পাব যে, বয়স ও সময়ের পরিক্রমায় কখন যে ফার্নান্দেস জীবনের ৩৫ টি বছর হারিয়ে ফেলেছে, তা হয়তো খেয়াল করেনি সে। ট্যাক্সের হিসাব করতে করতে জীবনের থেকে হারিয়ে ফেলেছে নিজের স্ত্রী, আবেগ ও ভালোবাসা। ইলার বানানো রোজকার খাবার ও চিঠির মধ্যে দিয়ে ফার্নান্দেস হঠাৎ করে খুঁজে পেয়েছে নিজেকে। নিজের মনের মধ্যে একাকীত্বের দুঃখ শেয়ার করেছে ইলার চিঠির উত্তর দিয়ে। তার ছোটবেলার কথা, মায়ের দেখা সিরিয়াল কিংবা সিগারেট ছেড়ে দেওয়া। চিঠি আদানা প্রদানের সময় ভুলে গেছে সে এখন বৃদ্ধদের কাতারে। নিজের মনে বসন্তের ফুলের গন্ধের যে সুবাস ফার্নান্দেস পেয়েছে, তার ঘ্রানে আত্নহারা হয়ে মনের অজান্তে নওয়াজ উদ্দীনকে বলে দিয়েছিল “I have a girl friend.” মনের অজান্তে ইলার চিঠির উত্তরে বলেছে “আমি কি আপনার সাথে ভুটান যেতে পারি?”

images (1)

বাস্তবতার কষাঘাতে হয়তো ফার্নান্দেস বয়সীদের কাতারে, কিন্তু মনের দিক থেকে সে চির সবুজ, চির যৌবন। কিন্তু বাস্তবতাকে তো অস্বীকার করার উপায় নেই। নিজের শরীরের বৃদ্ধ গন্ধ অথবা মেট্রোতে যুবকের আংকেল বলে সম্মোধন তার চেতনাকে ফিরিয়ে আনে। ইলা ও তার মাঝে সামাজিক বাধার কথা সামনে চলে আসে। নিজের সম্পর্কে তার ভাবনা ফুটে ওঠে যখন দেখতে পায়, তার সামনের টেবিলে একজন সুন্দর অল্প বয়সী নারী বসে তার অপেক্ষা করে চলেছে। নিজের মনের মত হয়তো কাউকে খুঁজেছে সে নারী। তার চিন্তায় যেন কোন বৃদ্ধের ছায়া না পড়ে তাই ফার্নান্দেস প্রিয় ইলার সাথে দেখা না করে চলে আসে। মনের, যৌবনের চাহিদা তখন ওই সুন্দর মনের কাছে হার মেনে যায়। সামাজিক দিক থেকে ফার্নান্দেস ও ইলা কোনদিন মিলতে পারে না।

অন্যদিকে, ইলা আমদের সমাজের আর পাঁচটা সাধারন মেয়ের মতই। স্বামী, মেয়ে ও উপরের আন্টির সাথে কথা বলে দিন কাটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু স্বামীর পরকীয়া যখন তার সামনে আসে তখন, নিজের মনের কথা বলার জন্য ফার্নান্দেস এর মত কাউকে আকড়ে ধরে নিজের জীবন বাঁচাতে চেয়েছিল। ইলা কোনদিন চায়নি তার পরিনতি সেই মেয়ের মত হোক, যে নিজের সব গয়না রাতের আধারে খুলে রেখে, নিজে মেয়েকে নিয়ে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্নহত্যা করেছে স্বামীর অবহেলা সহ্য না করতে পেরে। ফার্নান্দেস এর জন্য অপেক্ষা করে বার বার পানি পান করা তার সেই বেঁচে থাকার প্রয়াসকে ইংগিত করেছে। খালি খাবারের বাটি প্রেরনে, অফিসে গিয়ে ফার্নান্দেস এর খোঁজ করার মধ্য দিয়ে ফার্নান্দেস এর প্রতি ইলার ভালোবাসা ফুটে উঠেছে, যখন সে জানেও ফার্নান্দেস যৌবন অতিক্রম করে বার্ধ্যকে পদার্পন করেছে।screen-shot-20140627-at-35140-pm1

Ritesh Batra এর স্টোরি ও পরিচালনাতে আব্বাস কিয়ারোস্তামি ছাপ দেখা গিয়েছে। মাঝে মাঝে মনে হয়েছে একটা সুন্দর ইরানী সিনেমা দেখে চলেছি। যেখানে কোন দুঃখ নেই, কস্ট নেই। আছে কিছু আবেগ, সহানুভূতি ও ভালো থাকার প্রয়াস। Ritesh Batra একই সাথে দুইটি ভালোবাসার গল্প বলেছেন সিনেমাতে। একটি হল ১৫ বছর ধরে কোমায় থাকা স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা, যে চলন্ত অবস্থায় ফ্যান পরিস্কার করে কারন সে জানে ফ্যানের চলা শেষ হলে হয়তো তার ভালোবাসার মানুষটিও শেষ হয়ে যাবে।

অন্যদিকে ইরা ও ফার্নান্দেস এর ভালোবাসার গল্প। যার বুনন হয়েছে খুব ধীরে ধীরে কিন্তু সে বুনন খুব শক্ত। যেখানে বয়সের বাধা কোন বাধা না। দুটি মানুষ একত্রে থেকে ভালো থাকার কিছুটা প্রয়াস। ভালোবাসার চির যৌবন, চির অম্লান। ভালোবাসার কোন বয়স নেই, সময় কাল নেই। ভালোবাসা মানে শুধুই ভালোবাসা। এই উপলব্ধি হওয়া মাত্রই নির্বাস জীবন থেকে বের হয়ে ভালোবাসার মানুষের খোঁজে বের হয়ে পরে ফার্নান্দেস, কারন সে জানে-

“মাঝে মাঝে ভুল ট্রেনও সঠিক স্থানে পৌছে দেয়।”

ফার্নান্দেস চরিত্রে ইরফান খান ও ইলা চরিত্রে নিমরাত কৌর তাদের সেরা থেকেও বেশি দিয়েছেন। এমন কনসেপ্টের মুভি বলিউডে আসলেই কল্পনা করা যায় না। মাস্ট ওয়াচ একটি সিনেমার নাম The Lunchbox (2013).

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: