‘শার্লক’ বনাম ‘শার্লক হোমস’

মূল লেখার লিংক

A Case of Identity- দীর্ঘ ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা অমর চরিত্র ‘শার্লক হোমস’, উপন্যাসের পাতায় যার অমর উপাখ্যানের শুরু। সেই ভিক্টোরিয়ান যুগে লেখা হলেও আজ অবধি বিশ্বের কোটি ভক্তের মনে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে আছেন হোমস। এখনও তাকে নিয়ে নির্মিত হচ্ছে মুভি, ড্রামা। সারা বিশ্বে হোমস একমাত্র ফিকশনাল চরিত্র যাকে নিয়ে মাতামাতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। যেমনটা আর কোন চরিত্র নিয়ে হতে দেখা যায়নি।

তবে সমস্যা অন্যদিকে। শতাব্দী পার করেও হোমস তার আপন গতিতে চলছে ঠিকই, কিন্তু সময় পরিবর্তন হয়েছে। সেই পরিবর্তনের হাওয়া ধীরে ধীরে সাহিত্য, সংস্কৃতি সবকিছুতেই বিস্তার লাভ করেছে। একবিংশ শতাব্দীর তরুন প্রজন্ম ‘বই বিমুখ’। তারা টেকনোলোজি আর মডার্নিজমের প্রতি আকৃষ্ট। ১৩০ বছর আগের সমাজ ব্যাবস্থায় নির্মিত গল্প, উপন্যাস, মুভি, সিরিজ, তাদের মধ্যে কতটুকু হাইপ তৈরি করতে পারছে বা পারলেও সেটা কতটুকু সফল হচ্ছে- এরকম কিছু ইন্টেলেকচুয়াল প্রশ্ন বিস্তার লাভ করলো অনেকের মনেই। ভিক্টোরিয়ান প্রেক্ষাপটের সেই চিরচেনা শার্লক হোমসের আবেদন অনেকটাই ফিকে হয়ে যেতে পারে- এরকম শঙ্কাও করলেন কেউ কেউ। তাহলে কি এভাবেই একসময় তরুন প্রজন্মের কাছে গ্রহনযোগ্যতা হারিয়ে বসবে বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র কনসালটিং ডিটেকটিভ? প্রযুক্তি আর মডার্নিজমের নিচে চাপা পড়ে যাবে ভিক্টোরিয়ান যুগের অমর সৃষ্টি ‘শার্লক হোমস’?
আর এরকমটা ঘটলে সেটা হবে তরুন প্রজন্মের জন্য বিশাল বড় এক ক্ষতি। যে ক্ষতি কোন কারেন্সি দিয়েই পূরণ করা সম্ভব হবে না। সাহিত্যের এক অমূল্য গুপ্তধন থেকে তারা হবে- বঞ্চিত।
তাহলে এমন কি করা যায়- যাতে করে তরুন প্রজন্ম নতুন করে চিনতে পারবে- শার্লক হোমসকে? আগ্রহী হবে তার সম্পর্কে আরও কিছু জানতে?

The Great Game (Begins)- ঠিক এই কথাগুলোই হয়তো সজোরে আঘাত করেছিল শার্লক হোমসের দুই অন্ধভক্ত ‘মার্ক গ্যাটিস ( Mark Gatiss) এবং স্টিভেন মোফাট (Steven Moffat) এর মনে। দুই ব্রিটিশ জিনিয়াস। ভিক্টোরিয়ান লিটারেচার নিয়ে যারা এর আগেও বেশ কিছু টেলিভিশন সিরিজ তৈরি করেছিলেন। মোফাট ব্যাস্ত ছিলেন ‘ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড” নিয়ে, ওদিকে গ্যাটিস ব্যাস্ত ছিলেন ‘ডক্টর হু’ সিরিজ নিয়ে যার বেশ কিছু এপিসোড মোফাটের লেখা ছিল। এই সুত্রেই দুজনের বন্ধুত্ব। কাজের সুবাদে যখনই তারা দুজন একসাথে কার্ডিফে যেতেন, কোনান ডয়েলের ‘শার্লক হোমস’ নিয়ে আলোচনা করতেন। তারা ভাবতেন ভিক্টোরিয়ান সময়কার এই কালজয়ী কাজ নিয়ে কোন প্রজেক্ট করা যায় কিনা।

একবার মন্টি কার্লোতে একটি পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মোফাট এবং গ্যাটিস দুজনেই উপস্থিত ছিলেন, সাথে ছিল মোফাটের স্ত্রি ‘সুসান ভারচু’ (মি. বিন, শার্লক এর প্রোডিউসার)। সুসান দুই বন্ধুকে বুদ্ধি দিলেন অন্য কোন জিনিয়াস টিম শার্লক কে নিয়ে কোন প্রজেক্ট শুরু করবার আগেই যত দ্রুত সম্ভব কাজ শুরু করে দিতে। কথাটা তাদের পছন্দ হলো। সেপ্টেম্বর ২০০৮ এ কাজ শুরু করে দিলেন তারা।

তাদের চিন্তা ছিল- তরুন প্রজন্মের কাছে ভিক্টোরিয়ান যুগের শার্লক’কে কিভাবে উপস্থাপন করলে তারা বেশি আকৃষ্ট হবে, উত্তেজনা তৈরি হবে তাদের মধ্যে, নতুন করে চিনবে হাই ফাংশনিং সোশিওপ্যাথ- শার্লক হোমসকে। তরুন প্রজন্ম যেহেতু ঝুঁকে পড়েছে মডার্ন টেকনোলজির দিকে, আধুনিকতার দিকে; অতএব শার্লক হোমসকে তাদের কাছে অমর করে রাখতে হলে তাকেও আধুনিক হতে হবে, টেকি (Techy) হতে হবে। অর্থাৎ- ভিক্টোরিয়ান যুগ থেকে তাকে এক লাফে নিয়ে আসতে হবে আধুনিক যুগে। আর এখানেই ঘটাতে হবে বিপ্লব…

কনটেম্পোরারি হোমস- ব্যাপারটা এর আগেও অবশ্য দুইবার ঘটেছিল। ১৯৪০ সালে ‘বেসিল র‍্যাথবন’ শার্লক হোমসকে সেই সময়কালে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। যেখানে হিটলার বাহিনীর বিপক্ষে তাদের যুদ্ধ করতে দেখা গিয়েছিল। এরপর ১৯৮৭ সালে একবার শার্লক হোমসকে নিয়ে আসা হল মডার্ন ওয়ার্ল্ডে। একটা টিভি মুভি ছিল সেটা। এতোটাই বাজে হয়েছিল যে কোন চ্যানেলই সেটা প্রচার করতে রাজী হয়নি। অনেকে দেশেই হোমসকে নিয়ে মুভি, ড্রামা, ষ্টেজ ড্রামা হয়েছে তবে এর কোনটাই দর্শকরা সেভাবে নিতে পারেনি।
সত্যি বলতে মার্ক গ্যাটিস এবং স্টিভেন মোফাট- এরাই প্রথম দুই ব্যাক্তি যারা ভিক্টোরিয়ান যুগের একটি চরিত্রকে আধুনিক যুগে এনে নতুন করে সাজানোর চেষ্টায় শতভাগ সফল হয়েছেন।
এটা নিঃসন্দেহে মারাত্মক একটা চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার ছিল। আজ থেকে প্রায় ১৩০ বছর আগে সমাজের প্রেক্ষাপট, মানুষের জীবনযাত্রা, অপরাধের ধরন, যোগাযোগ ব্যাবস্থা সবকিছুই ছিল অন্যরকম। যেগুলো একবিংশ শতাব্দীর প্রেক্ষাপটের সাথে খাপ খাওয়ানো- অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব। যে কারনে শার্লক হোমসকে নিয়ে অতীতে তৈরি করা বেশিরভাগ মুভি, ড্রামার প্রেক্ষাপট ছিল ভিক্টোরিয়ান era…..
স্টিভেন মোফাট নিজেও স্বীকার করেছিলেন ডয়েলের শার্লক হোমস- অনেক সম্মান এবং স্রদ্ধার ব্যাপার। এখানে কিছু পরিবর্তন করতে গিয়েও সে এক ধরনের মানসিক চাপ অনুভব করছিলেন। তবে বর্তমান সমাজে ‘শার্লক হোমস’ এর তীব্র প্রয়োজনীয়তার কথা অনুভব করেই তারা সাহস করে এগিয়েছেন এই প্রজেক্টে।

শুরুতেই তারা ঠিক করেছিলেন ৬০ মিনিটের সিঙ্গেল ড্রামা সিরিজ করবেন।
পাইলট এপিসোডের প্রথম ভার্শনটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল ৮ লক্ষ পাউন্ড। এরপর গুজব ছড়িয়ে পড়লো এতো টাকা খরচ করে তারা বাজে জিনিস তৈরি করেছে।
BBC সাফ জানিয়ে দিল তারা এটা প্রচার করবে না। শর্ত দেয়া হল- পুনরায় শুট করে ৯০ মিনিটের ৩টি এপিসোড বানাতে হবে। দ্বিতীয়বারে সাফল্যের দেখা মিললো। BBC শার্লকের পাইলট এপিসোড দেখে মহাখুশি হয়ে ঘোষণা দিল- ২০১০ এ ৯০ মিনিট করে তিনটি শার্লক সিরিজ প্রচার করা হবে।

* কাস্টিং- মোফাট এবং গ্যাটিস ‘শার্লক’ চরিত্রের জন্য প্রথমেই বেঁছে নিলেন যাকে তার নাম- বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ।
মূলত ২০০৭ এ রিলিজ পাওয়া রোম্যান্টিক ড্রামা ওয়ার ফিল্ম Atonement এ কাম্বারব্যাচের অভিনয় দেখেই তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন। বেনেডিক্টকে শার্লকের চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় সে বলেছিল- আমি নিজেও শার্লক হোমসের অন্ধভক্ত। আর এটা নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জিং এবং উত্তেজনায় ভরপুর একটা ব্যাপার, কারন এই শার্লক সম্পূর্ণই আধুনিক যুগের। সে কিছুটা কোল্ড, টেকি, এবং অসামাজিক প্রকৃতির। যাকে বলা হবে- আধুনিক বিশ্বের একমাত্র ‘ডায়নামিক সুপারহিরো’।

গ্যাটিস একবার এক সাংবাদিককে বলেছিলেন শার্লক চরিত্রের জন্য বেনেডিক্টকে খুজে বের করা যতটা সহজ হয়েছিল ঠিক ততোটাই কঠিন হয়েছিল ডক্টর ওয়াটসন এর চরিত্রের জন্য মার্টিন ফ্রিম্যান কে খুজে পাওয়া। সুসান বলেছিলেন- বেনেডিক্টই একমাত্র ব্যাক্তি যাকে শার্লক চরিত্রের জন্য ডাকা হয়েছিল, এবং এরপর আর কাউকে খুজতে হয়নি। ওয়াটসনের চরিত্রে এমন কাউকে খোঁজা হচ্ছিল যাকে দেখামাত্রই মনে হবে- বেনেডিক্টের সাথে তার কেমিস্ট্রি ১০০ ভাগ মিলবে। ওয়াটসন চরিত্রের জন্য বেশ কিছু ব্যাক্তির অডিশন নেয়া হলেও মনমতো কাউকেই পাওয়া যাচ্ছিলো না। অবশেষে মার্টিন ফ্রিম্যান সেই হতাশা দূরে করেছিলেন।

স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ইন্সপেক্টর ‘লেসট্রেড’ এর ভূমিকায় নেয়া হয় যাকে তার নাম রুপার্ট গ্রেভস। তাকে খুজে পেতেও তেমন বেগ পেতে হয়নি। ওদিকে ‘মরিয়ার্টি’ চরিত্রের জন্য খোজা হচ্ছিল এমন কাউকে যে কিনা বাস্তবিক জীবনেও কিছুটা সাইকো প্রকৃতির। অ্যান্ড্রু স্কট সে অভাব পুরন করে দিলেন। মরিয়ার্টি রুপি অ্যান্ড্রু স্কট- অনেকের মধ্যেই ভয়াবহ রকমের হাইপ তৈরি করেছে।

শার্লক হোমসের ল্যান্ডলেডি ‘মিসেস হাডসন’ এর চরিত্রকে মুল উপন্যাসের তুলনায় এই সিরিজে কিছুটা বেশি ফোকাস করা হয়েছে। হাডসন চরিত্রে অভিনয় করা ‘উনা স্ট্যাবস’ রিয়েল লাইফেও শার্লক অর্থাৎ বেনেডিক্ট এর বেশ কাছের মানুষ। তিনি বেনেডিক্ট এর মায়ের বান্ধবী। একসাথে কাজ করেছেন তারা বেশ কিছু ড্রামা সিরিয়ালে এবং বেনেডিক্টের বয়স যখন ৪ বছর তখন থেকেই তাকে কোলে- পিঠে করে ঘুরতেন।
ম্যারি ওয়াটসন- এর ভুমিকায় অভিনয়কারী ‘আমান্ডা অ্যাবিংটন’ এবং জন ওয়াটসন (মার্টিন ফ্রিম্যান) রিয়েল লাইফ স্বামী- স্ত্রী। হোমসের বড় ভাই মাইক্রফটের ভুমিকায় ছিলেন- মোফাট নিজেই। আর শার্লক হোমসের প্যারেন্টস- মিস্টার হোমস এবং মিসেস হোমস এর ভুমিকায় অভিনয় করেছেন ওয়ানডা এবং টিমথি – বেনেডিক্ট এর রিয়েল লাইফ প্যারেন্টস।

– সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রাখার জন্য চিরচেনা শার্লকের বেশ কিছু ব্যাপারে পরিবর্তন আনতে হয়েছে নির্মাতাদের। বেশ কিছু গল্পের প্লট প্রায় ৭০ ভাগ ঘুরিয়ে নিজেদের মতো করে উপস্থাপন করেছেন নির্মাতারা। গল্পগুলোর নামেও ছিল লক্ষণীয় পরিবর্তন। সর্বদা মুখে থাকা পাইপ এবং বিখ্যাত হ্যাট সরিয়ে ফেলা হল (The Abominable Bride- এ যদিও সেই চিরচেনা অবয়বটাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল) ভিক্টোরিয়ান যুগে নামের শেষ পদবীকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হতো যে কারনে ডয়েলের গল্পে ওয়াটসন সবসময় তার বন্ধুকে ‘হোমস’ বলেই সম্বোধন করতেন। বর্তমান বিশ্বে নামের প্রথম অংশকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় বলে ‘হোমস’ সম্বোধন পরিবর্তন হয়ে সেটা হয়ে গেল ‘শার্লক’ আর ওয়াটসন হয়ে গেল ‘জন’। তবে এসব কিছুই করা হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। মোট কথা- ডয়েলের হোমসের অপরিবর্তনীয় কিছু ব্যাপার ঠিক রেখে তাকে একবিংশ শতাব্দীতে এনে সম্পূর্ণ নিজস্ব স্টাইলে সাজানোর চেষ্টা করেছেন মোফাট এবং গ্যাটিস।
সিরিজটি নিয়ে শার্লক হোমস বিশেষজ্ঞরা বরাবরই পজিটিভ রিভিউ দিয়ে এসেছেন। তাদের মতে- গ্যাটিস এবং মোফাট দুজনেই কোনান ডয়েলের ‘হোমস’ সম্পর্কে অসাধারন জ্ঞান রাখেন।

প্রত্যেকটা ব্যাপার তারা যথাযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। গার্ডিয়ান ম্যাগাজিনে বলা হয়েছে- ডয়েলের কাজের প্রতি দুজনেই যে বেশ স্রদ্ধা এবং বিশ্বস্ততা রেখে কাজ করেছেন তার প্রমান পাওয়া গেছে। অসংখ্য BAFTA আর Emmy অ্যাওয়ার্ড এর সংগ্রহ রয়েছে ‘শার্লক’ সিরিজের এর ঝুলিতে, যে ব্যাপারে বিস্তারিত বলার কিছু নেই।
স্মার্ট দর্শকের কথা মাথায় রেখেই ‘শার্লক’ সিরিজটি তৈরি করা হয়েছে- এর প্রমান প্রায় প্রতি এপিসোডেই পাওয়া গেছে। শুধু শার্লক নয়, তার সাথে সাথে দর্শকদেরকেও মাথা খেলানোর সুযোগ দিয়েছেন নির্মাতারা। দিয়েছেন ডিডাকশনের সুযোগ। অসাধারন সব ব্রেইনস্টর্মিং- এর উপাদান ছড়িরে ছিটিয়ে রেখেছিলেন স্ক্রিনে। মোট কথা হল- তারা এমন কিছু তৈরি করতে চেয়েছেন যা একটা দীর্ঘ সময়কাল ধরে দর্শকদের মনে দাগ কেটে থাকতে বাধ্য হবে…
সম্প্রতি সিজন ৪ এর ‘দ্যা ফাইনাল প্রবলেম’ দিয়ে ইতি টানা হয়েছে ‘শার্লক’ সিরিজের। অদুর ভবিষ্যতে আরও সিজন আসবে কিনা এ ব্যাপারে নিশ্চিত কিছু বলা না গেলেও বেশ কিছু নির্ভরযোগ্য সাইটে নিউজ পাওয়া গেছে- সিজন ৫ এর জন্য কন্ট্রাক্ট সাইন করেছেন ‘বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ’।

Last Vow- যারা সত্যিকার অর্থে কোনান ডয়েলের ‘শার্লক হোমস’ ভক্ত, আমার মতো তারাও শুরুর দিকে বেশ মারাত্মক একটা ধাক্কা খেয়েছেন- এই ব্যাপারে আমি শতভাগ নিশ্চিত। সত্যি বলতে একধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছিল মনে মডার্ন শার্লক হোমসকে নিয়ে, যে কিনা আইফোন ব্যাবহার করে, টেক্সট করে, টুইটারে টুইটও করে… ধুর… মানতে পারছিলাম না।
আসল ব্যাপার হচ্ছে- মনের কল্পনার জগতে স্থায়ী আসন গেড়ে বসে আছে যেই ভিক্টোরিয়ান হোমস, তার জায়গায় বিকল্প কিছু ভাবতে সায় দিচ্ছিল না মন। আর এখানেই বেশিরভাগ ভক্তরা ‘কোথায় ডয়েলের উপন্যাস আর কোথায় মডার্ন শার্লক’- এই ধরনের সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় একটা ক্যাচালে লিপ্ত হয়। এরকম কিছু চিন্তা করাটা আসলে বোকামি। কোনান ডয়েলের ‘শার্লক হোমস’ একটি ক্ল্যাসিক মাস্টারপিস। এর সাথে কোন কিছুর তুলনা চলেনা। আর মডার্ন শার্লক সিরিজকে বলা যায় ‘সময়ের চাহিদা’।
তাই সিরিজটি দেখতে বসে ডয়েলের লেখা হোমসের সাথে মেলাতে গেলে হোঁচট খেতে হবে। দুইটা ভিন্ন জিনিষ, ভিন্ন স্বাদ। আইকনিক হিরোকে একটু ভিন্ন স্বাদে গ্রহন করার মানষিকতা নিয়েই দেখতে বসতে হবে ‘শার্লক’… হতাশ হবেন না- গ্যারান্টি।
রান্না যেভাবেই করা হোক- শেফ তো একজনই। একসময় আমিও ভাবতাম শার্লক হোমস যদি বর্তমান প্রেক্ষাপটে লেখা হতো- তাহলে কেমন হতো! নিঃসন্দেহে বেশ এক্সাইটিং কিছু। বিলিভ মি, শুধু আমি নয়; এই কথাগুলো সারা বিশ্বের অসংখ্য হোমস ভক্তদের মনে কোনও না কোনও সময় অবশ্যই উঁকি দিয়েছে। যাদের মধ্যে লাকিলি ‘মোফাট’ এবং ‘গ্যাটিস’ও ছিলেন। যার ফলশ্রুতিতেই আধুনিক বিশ্ব এক নতুন শার্লক হোমসের দেখা পেয়েছে।
শুরুতে আমিও একবার ভেবেছিলাম- দেখবো না। কিন্তু কথায় আছে- কৌতূহলের কাছে মানুষ সবসময় পরাজিত। আমিও এর ব্যাতিক্রম না।
শার্লক হোমস বলে কথা… দেখা শুরু করে দিলাম। ধীরে ধীরে আবিষ্কার করলাম সম্পূর্ণ নতুন এক ‘শার্লক’ কে। বলা উচিত- আরও একবার নতুন করে শার্লক হোমসের ভক্ত হলাম। আইকনিক চরিত্রটি যেন নতুন করে আবার আইকনে পরিনত হল… কল্পনার জগতের হোমস- একজন থেকে দুইজন হয়ে গেল। একজন ভিক্টোরিয়ান, অন্যজন মডার্ন।
শার্লক এবং শার্লক হোমস…

এটাই তো চেয়েছিলাম…
একবিংশ শতাব্দীতে এসে ঠিক এইসময়টাতে এরকম একজন মডার্ন শার্লকের আসলেই খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। আইকনিক উপস্থাপনার জন্য থ্যাংকস টু দ্যা ক্রিয়েটরস… মার্ক গ্যাটিস এবং স্টিভেন মোফাটের কাজ ব্যাপকভাবে প্রশংশিত হয়েছে এই কারনে যে- তারা নতুন করে বিশ্ববাসীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে এমন একজন সুপারহিউম্যানকে, বর্তমান সমাজে যার প্রয়োজন সবচাইতে বেশি। তবে হ্যা, শার্লক কোন সুপারহিরো নয়। অতিমানবিক কোন সুপারপাওয়ার বা অগাধ সম্পত্তি তার নেই। কোনান ডয়েল তাকে রুপ দান করেছিলেন
আজ ত্থেকে ১৩০ বছর আগে। অতিমানবীয় কোন ক্ষমতা দিয়ে নয় বরং- এমন এক মানবীয় ক্ষমতা দিয়ে যা কখনোই পুরনো হবে না। সময়ের সাথে সাথে যা হয়ে উঠবে আরও বেশি ক্ষুরধার, আরও বেশি তীক্ষ্ণ। অপরাধীর সাথে লড়াই করতে সে কোন সুপার পাওয়ার ব্যাবহার করেনা। বরং এইসব মানবীয় ক্ষমতাবলেই সে ঝাঁপিয়ে পরে সমাজের হিংস্র, ভয়ানক সব অপরাধীর বিরুদ্ধে। এ কারনেই ‘শার্লক হোমস’ সুপারহিরোর চেয়েও বেশি কিছু। ‘সুপারহিরো’ বিশেষণটা তার সামনে ফিকে। বরং ‘সুপারহিউম্যান’ বলাটাই বেশি যুক্তিযুক্ত।

The Final Problem- পারফেক্ট শার্লক হোমস কে?
প্রকৃত হোমস ভক্তদের কছে এই প্রশ্নের উত্তর নেই আমি জানি। তাদের কল্পনায় রাশভারী, তীক্ষ্ণ চেহারার যেই হোমসের কাল্পনিক অবয়ব তার সাথে কোন কিছুরই তুলনা চলেনা। সেই অবয়ব চিরকাল হয়তো পাঠকের কল্পনার জগতেই বিচরন করবে। গিনিজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের জরিপে ২০১২ পর্যন্ত প্রায় ২৫৪ জন শার্লক হোমস এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তবে এদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে মনে রাখার মতো আছেন হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন। টেলিগ্রাফ ম্যাগাজিনের দৃষ্টিতে সেরা ৫ শার্লক হোমসের লিস্টে রয়েছে ব্যাসিল র‍্যাথবন, জেরেমি ব্রেট, রবার্ট ডাউনি জুনিয়র, রবার্ট সসবার শীর্ষে যিনি রয়েছেন তাকে আমরা ‘বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ’ নামে চিনি। শুধু টেলিগ্রাফ নয়, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সব ম্যাগাজিন এবং ওয়েবসাইটে সর্বত্রই বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচকে রাখা হয়েছে শীর্ষ শার্লক হিসেবে। মডার্ন শার্লক হিসেবে ‘বেনেডিক্ট’ এতোটাই পারফেক্ট এবং চমৎকার ছিল যে এর বিকল্প চিন্তা করা দর্শকদের জন্য মারাত্মক কঠিন একটি ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।
এখন শার্লক হোমস- নামটা শোনার সাথে সাথে যার চেহারাটা বেশীরভাগ মানুষের মনের দৃশ্যপটে ভেসে উঠবে তার নাম নিঃসন্দেহে- বেনেডিক্ট কাম্বারব্যাচ। আর এখানেই একটি সফল চরিত্র চিত্রায়নের সার্থকতা…
শার্লক আসলে একটি মেটাফোর। অপরাধে জর্জরিত দুর্নীতিগ্রস্থ সমাজে যার প্রয়োজন সব যুগে সবসময়ই ছিল, আছে, এবং থাকবে। সুতরাং যেই যুগে যেই সময়ের জন্যই শার্লক হোমস তৈরি করা হোকনা কেন- সবসময়ই সে প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে সেই নির্দিষ্ট সময়কালের ওপর। আর এখানেই একটি কালজয়ী চরিত্র নির্মাণের সার্থকতা… So, i Believe in Sherlock Holmes…

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: