আফ্রিকা ও ইসলাম

মূল লেখার লিংক
ছোটবেলায় ক্লাস সেভেনের বইতে আমরা আফ্রিকার পরিচয় পাই,আফ্রিকা অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ।
আফ্রিকাতে বাস করে কালো কালো মানূষের দল,আর ঝাকে ঝাকে পশু,বিচিত্র সব পশুপাখির জন্য আফ্রিকাকে ডাকা হয় বৃহদাকার চিড়িয়াখানা।
আফ্রিকা ছিল মানবজাতির অগম্য,স্ট্যানলি,লিভিংস্টোনের মত পর্যটকদের অভিযানের ফলে আফ্রিকা সভ্যজগতের কাছে পরিচিত হয়।
এই সভ্য জগতের মানুষ কারা???
উত্তর সহজ,সাদা ইউরোপ।
আফ্রিকা অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল না।এখানেও ছিল সভ্যতা,এখানেও ছিল সুরম্য শহর বন্দর,ব্যবসা বাণিজ্য আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে ঐশ্বর্যশালী মানুষটা থাকতেন আফ্রিকাতে,মানসা মুসা কেইতা,তার মালি সাম্রাজ্যের সম্পদের পরিমান ছিল ১৪শ শতাব্দীর সমগ্র ইউরোপের একত্রিত সম্পদের পরিমানের চাইতেও কয়েকগুন বেশি।
মুসার সম্পদ আসলে কত বেশি ছিল তার একটা উদাহরন দেয়া যাক।
১৩২৪-১৩২৫ সালে তিনি হজ্ব করতে মাল থেকে মক্কার দিকে রওনা দেন।তার সাথে ছিল ষাট হাজার মানুষের কাফেলা,যার মধ্যে ছিল বারো হাজার দাস-দাসী,এই বারো হাজার দাসের প্রত্যেকে বহন করছিল চার পাউন্ড ওজনের সোনার বার।আশিটি উট বোঝাই করা ছিল স্বর্ণ দিয়ে,আরও একশো হাতীর পিঠ বোঝাই করা ছিল স্বর্ণ দিয়ে।
এই বিপুল পরিমান স্বর্ণ তিনি হজ্বে যাবার পথে মানুষকে দান করে দেন।
প্রতি সপ্তাহে তিনি যেখানে থামতেন সেখানেই তৈরি করতেন একটা করে নতুন মসজিদ।
এত বেশি দান করার কারনে তার সব সম্পদ শেষ হয়ে যায় হজ্ব থেকে ফেরার পথে।তখন তিনি বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ধার নিয়ে রাজ্যে ফেরেন,ফিরেই মাস খানেকের মধ্যে আবার সব ধার শোধ করে দেন।
তার এই দানশীলতার কারনে গোটা ভুমধ্যসাগরের উপকূল ও মধ্যপ্রাচ্যে সোনার দাম কমে যায়,এই দাম স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে পুরো বারো বছর লেগে গেছিল।
মুসা বড়লোকের আয়েশী সন্তানের মত শুধু সম্পদ ওড়ান নি।
তার বিপুল সম্পদ দিয়ে তিনি শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন তার সাম্রাজ্য জুড়ে,সেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াতেন তার সময়ের সেরা স্কলাররা।
আজকে আমরা যে গরীব মালির ছবি দেখি,সেই মালির রাজধানী টিম্বাকতু ছিল অকল্পনীয় ঐশ্বর্যময় এক শহর।
মুসার গড়া সাংখোরাই মাদ্রাসা বা ইউনিভার্সিটি অফ সাংখোরাইতে ছিল পচিশ হাজার ছাত্রের আবাসিক সুবিধা,তাদের থাকা খাওয়ার খরচ মাদ্রাসা বহন করতো,আর এই মাদ্রাসার সব খরচ বহন করতেন মুসা নিজে।
সাংখোরাইয়ের লাইব্রেরীতে ছিল দশ লাখ বই,আমি ১৩২৫ সালের কথা বলছি,যখন প্রেস বলে কিছু ছিল না।
এমনকি,১৫৫০ সাল পর্যন্ত গ্রানাডা-করদোবা ছাড়া ইউরোপের সবচাইতে বড় লাইব্রেরীতেও এত বেশি বই ছিল না।
শুধু যে মালির মানুষই ধনী ছিল,আফ্রিকার বাকী মানুষের ভেতর সভ্যতা ছিল না,বিষয়টা তেমন না।
অষ্টম-নবম শতকে মুসলিম সুফী আর ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে সারা দুনিয়াতে ছড়িয়ে পড়েন ইসলামের তাবলীগের কাজে(এই তাবলীগ উপমহাদেশের তাবলীগ জামাত না),তারা ইসলামকে বয়ে নিয়ে গেছিলেন সেনেগাল,ঘানা,শাদ,ক্যামেরুন,সোমালিয়া,ইরিত্রিয়া পর্যন্ত।
মক্কা-মদীনা আর জেরুসালেমের পর পৃথিবীর যে শহরে সবচাইতে বেশি সুফী-দরবেশ বাস করতেন,সেটি ছিল আফ্রিকার গহীনে,সুসভ্য এক নগর,নাম হারার,আজ থেকে পাচশো বছর আগে হারারে ছিল ১০০টির বেশি মাদ্রাসা,এবং তার চাইতেও বেশি মসজিদ।মাদ্রাসা মানে আজকের পিছিয়ে পড়া মাদ্রাসা না,প্রি কলোনিয়াল যুগে একেকটা মাদ্রাসার গরীমা ছিল এখনকার হাই র‍্যাঙ্কিং ইউনিভার্সিটির মত।
মালি সাম্রাজ্য ছাড়াও আফ্রিকার একদম বুকের ভেতরে মুসলিমরা গড়ে তুলেছিল হারার আর ডাকারের মত শহর,আদাল সালতানাত,আজুরান সালরানাতের নাম এখনও সেখানকার মানুষের মুখে শোনা যায়।
মোম্বাসা,মেকার,নেইনা,বারাওয়া সহ অসংখ্য সমৃদ্ধ শহরের নাম ইতিহাসের পাতায় লিখে গেছে আফ্রিকার মানুষের সভ্যতার কথা,হ্যা,প্রাচীন যুগে তারা হয়তো কোন মিশর গড়তে পারে নি,কিন্তু ইসলামের আগমনের পরে আফ্রিকাতেই জন্ম হয়েছিল অসাধারন সব সভ্য সাম্রাজ্যের।
এমন না যে এগুলোর সব আরবরা গড়েছে।এগুলোর বেশিরভাগই তৈরি হয়েছে অনারব কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিমদের হাতে।
ফরসা আরবদের সাথে কালো আফ্রিকানদের বিয়ে ছিল সাধারন ঘটনা,এ নিয়ে বিবাদে খুন খারাবীর কথা কোথাও পাওয়া যায় না।
১৫০০ সালের আগ পর্যন্ত নিজেদের মত আরামেই ছিল আফ্রিকার মানুষ।হ্যা,মারামারি,যুদ্ধ আর সব জায়গার মত এখানেও হত,কিন্তু দূর্ভিক্ষ আর গণহত্যা ছিল বিরল,কিন্তু বহাল ছিল দাস প্রথা।এমনকি আফ্রিকানদের নিজেদের ভেতরেই দাস প্রথা চালু ছিল।
তবু,সম্পদ আর প্রাচুর্যেই দিন কাটছিল আফ্রিকান সাম্রাজ্যগুলোর।
আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথমবারের মত সমস্যা ঘনিয়ে ওঠে পঞ্চদশ শতকের শেষদিকে,যখন পর্তুগীজরা তাদের কামান বন্দুকে সাজানো জাহাজের বহর নিয়ে কেপ অফ গুড হোপ পেরিয়ে পুর্ব আফ্রিকার উপকূলে নামে।
ইউরোপের দারিদ্রের ভেতর বড় হওয়া জলদস্যুদের ঝাক একের পর এক লুট করতে থাকে মুসলিম সাম্রাজ্যগুলোর সম্পদ।
১৫০০ থেকে ১৫৩০ এর মধ্যে গোটা পুর্ব আফ্রিকার সবচাইতে ধনী সালতানাত আজুরান সালতানাতের উপকূলবর্তী বেশির ভাগ শহর লুটে নেয় তারা।
ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি কলোনিয়াল পাওয়ার গুলোর জন্য সবসময়েই সুবিধা ডেকে এনেছে।
ইথিওপিয়া আর সোমালিয়াতে চলছিল সেখানকার খ্রিস্টান ইথিওপিয়ান সাম্রাজ্যের সাথে মুসলিম আদাল সালতানাতের সংঘর্ষ।
ইমাম আহমাদ ইবন ইব্রাহীম আল গাজী জয় করে নিয়েছিলেন ইথিওপিয়ার বেশিরভাগ এলাকা,কিন্তু তার খ্রিস্টানদের প্রতি সহিংস আচরনের কারনে তিনি অত্যন্ত সমালোচিত একজন ব্যক্তিত্ব।
ভারতে যেমন হিন্দু মুসলিম সংঘাতের আগুনে ঘি ঢেলেছে পর্তুগীজরা,আফ্রিকাতেও একই কাজ করলো তারা।
ইথিওপিয়ার সাথে আদাল সালতানাতের লড়াইয়ে তারা ইথিওপিয়ার হয়ে লড়াইয়ে নামলো,এই লড়াইয়ের শুধু ধর্মীয় দিকই যে ছিল তা নয়,বরঞ্চ এর পেছনে লুকিয়ে ছিল আদাল সালতানাতের রাজধানী সহ সমৃদ্ধ শহরগুলো লুট করার বাসনা।
আজুরান আর আদালরা বাধ্য হয়ে পর্তুগীজদের বিরুদ্ধে সাহায্য চাইলেন অটোমানদের কাছে।
আফ্রিকার গহীন থেকে কোন ট্যাক্স পাওয়া যাবে না জেনেও সাহায্যের হাত বাড়ালো অটোমানরা।
লড়াই ঘনিয়ে উঠছিল তখন সারা দুনিয়ায়।
শুধু ভারত,ইন্দোনেশিয়া বা উত্তর আফ্রিকার মুসলিমদের ওপরেই নয়,মধ্য আর পুর্ব আফ্রিকান মুসলিমদের গড়া সভ্যতাগুলোকেও কলোনী বানানোর ইদুর দৌড়ে শামিল হল ইউরোপিয়ান শক্তিগুলো।
আজকে আফ্রিকাকে যে অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ বলা হয়,তা হল আফ্রিকার মাটিতে গড়ে ওঠা এক হাজার বছরের সভ্যতাকে অস্বীকার করার এক প্রোপাগাণ্ডা।
এই অন্ধকার আফ্রিকার অন্ধকার না।
ইউরোপের নিজের অন্ধকার।যে অন্ধকার আফ্রিকার কালো মানুষদের হৃদয়ে জ্বলা আলোর সন্ধান পায় নি।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: