গান নিয়ে কিছু কথা–

মূল লেখার লিংক
সব জিনিস সবার জন্য না।

একজন মানুষকে সব জিনিস বুঝতে হবে, উপভোগ করতে পারতে হবে–এমন মাথার দিব্যি কেউ কাউকে দেয়নি। কেউ কেউ জন্মসূত্রে কিছু পারঙ্গমতা নিয়ে আসে– কিছু বিশেষ জিনিস ভাল করে বুঝতে পারার ক্ষমতা থাকে তাদের। এইজন্যে হয়ত কারো কাছে অংক বিভীষিকা হয়ে ধরা দেয়–কারো কাছে আবার এইটেই নেশার মতন। আমি নিজে অঙ্ক নিয়ে এক সময় আতঙ্কে ভুগতাম। এই শেষ বয়েসে এসে সেটা অনেকটুকু কাটিয়ে উঠেছি হয়ত। কিন্তু ছোটবেলায় আমার অনেক বন্ধুকেই দেখতাম অনেক জিনিস চটপট ধরে ফেলতে –যেটা আমার ধরতে সময় লাগত।

ঠিক তেমনি ব্যাপার হচ্ছে শিল্পকলা নিয়েও। কারো কারো ধমনীতে বইছে সঙ্গীতের সুরা—আর কেউ কেউ হয়ত আমার মত–সাধনা করে উপলব্ধিতে পৌঁছায়। আমার যেমন ক্লাসিকাল মিউজিক ( যেটা প্রাচ্য হোক বা পাশ্চাত্য হোক) খুব ভাল লাগে। সেটার জন্যে আমার কান ছোটবেলা তৈরী হয়ে গেছে। একটা ভাল লাগা, বুঁদ হয়ে থাকার ব্যাপার—আমাকে কষ্ট করে অর্জন করতে হয় নি। আমি স্বীকার করি–ক্ল্যাসিকাল মিউজিকের মাঝেও যে চটকদার বিষয় আছে– যেমন গানের মাঝের সাপাট তান, পঞ্জাবী ঘরানার ওস্তাদদের সরগমের কাজ (বিশেষ করে সালামাত ও নজাকত আলীর গান শুনলে বুঝতে পারবেন কী ভীষন সুর আর ছন্দের খেলা সেখানে—এক একেক্টা সরগম করছেন অবিশ্বাস্য দ্রুত লয়ে–শুনলে আপনার মনে হবে আসরে যেন অলৌকিক কোন বজ্রপাত হচ্ছে!!), লয়কারি ও মীড়ের কাজ আপনার কানকে প্রথমেই টানবে। কিছুদিন পরে যখন এসব একটু থিতিয়ে আসে –তখন মনের মাঝে আসল অনুভবের সুর্যোদয় হয়। তখন আমির খানের দীর্ঘ আলাপও আপনার কাছে । আপনি তখন শুধু বসে থাকবেন না কখন ওস্তাদজি আলাপ শেষ করে দ্রুত লয়ের অংশে আসবেন।

আমার ক্লাসিকাল গান ভালো লাগলেও আমি চিত্রকলার বোদ্ধা নই। আমি যেমন গান শুনলে বলে দিতে পারব কোনটা ভীমসেন যোশী আর কোনটা বাল মুরলি কৃষ্ণ। কিন্তু আমি ছবি দেখে বলতে পারব না (কিছু উজ্জ্বল ব্যতিক্রম বাদে) কোনটা ক্লদ মনে আর কোনটা ভ্যান গগ, স্থাপত্য দেখে বলতে পারব না কোনটা ডোনাতেল্লো আর কোনটা রঁদ্যা।
বুঝতে পারিনা দেখে আমি কিন্তু এইটে বলতে যাই না –ও আল্লা, এ কী সব হাবিজাবি এঁকে রেখেছে? কিংবা যেকোন এবস্ট্রাক্ট আর্ট দেখেই বলে ফেলিনা সেই সৃষ্টির আদিকাল থেকে বলে আসা ক্লিশেক্লিন্ন জোক–তেলাপোকার হেটে যাওয়া থেকে তৈরী হয় এসব চিত্রকলা।

আমাদের দেশে যে গান গুলোকে কালোয়াতি গান বলে, বা শুদ্ধতর ভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বলে—সেটা সকল সময়েই উপেক্ষিত এবং বহুল ক্ষেত্রে উপহাসিত একটি ধারা। আমার সত্যি সত্যি মায়া হয় সেইসব লোকদের জন্য যারা আমাদের দেশে এই প্রায় ফসিলত্ব পেয়ে যাওয়া সঙ্গীতের ধারাটি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। মায়া হয় তাদের চেষ্টা দেখে, উৎসাহ দেখে। আমরা অত্যন্ত সুচারুরূপে এক বিশাল জনগোষ্ঠী তৈরি করতে পেরেছি যাদের ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে জ্ঞান শূন্যের কোঠায়! আমার নিজের জ্ঞান খুব অল্প–তাই এই নিয়ে বেশি বাগাড়ম্বর করা ঠিক হবে না। কিন্তু জ্ঞান কম হলেও আমার মনে এই ধারাটির জন্যে শ্রদ্ধার কোন কমতি নেই।

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেসে থেকে পড়াশোনা করছি, তখন মাঝে মাঝে রাতে বিটিভির রাগ-রং অনুষ্ঠান দেখতে যেতাম। আমার মনে হয় সেই সময়ে সুইসাইডাল কোন টেন্ডেন্সি ছিল–নাহলে কেউ ছাত্রদের টিভি রুমে রাতের বেলা রাগ-রং দেখতে যাবার কথা না—একেবারে ঠান্ডা মাথায় আত্মহত্যা করার মত ঘটনা!
বলতেই হবে আমার সাহস ছিল ‘সেইরাম’। আমি রাগ-রং দেখতে যেতাম–আর আমাকে দেখতে যেত আরো অনেক ছাত্র! একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কী করে এইসব শুনে —এইটা নিজ চক্ষে দেখতে পাবার সুযোগ কেউ মিস করতে চাইত না। আমি প্রথম ব্যাচের ছাত্র বিধায় সিনিয়র মোষ্ট। তাই জুনিয়র পোলাপান আড়ালে আবডালে হাসলেও সামনে কিছু বলত না। সে খামতি পুষিয়ে দিত আমার সমসাময়িক ইয়ারবক্সিরা। আমি কোনভাবেই বুঝতে পারতাম না যে –শাস্ত্রীয় সঙ্গীত অপছন্দের হতে পারে–কিন্তু এইটা নিয়ে হাসাহাসি করার কী আছে?! ওরা যখন ফিডব্যাক, মাইলস, এলারবি ও অন্যান্য ব্যান্ডের বেসুরো গান, বিকৃত উচ্চারনে শুনে উন্মাতাল হয়–আমার তো হাসি পায় না! বরং কিছু কিছু জিনিস উপেক্ষা করতে পারলে তাদের গানের ভাবনা এবং আবেগটা প্রশংসনীয় মনে হয়েছে।

পরে বুঝতে পেরেছিলাম—মানুষ যখন এমন কোন জিনিসের মুখোমুখি হয় যা তাদের প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বসে–মানুষ সেগুলোকে সহজ ভাবে নিতে পারে না। একটা জিনিস দুরূহ, সহজবোধ্য নয় এবং বুঝতে হলে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনার ব্যাপার আছে—এমন জিনিস দেখলেই মানুষ সাধারনত পিছু হটে—এবং যেহেতু তার এক ধরনের পরাজয় ঘটেছে (বুঝতে না পারা, আত্মস্থ করতে না পারা) তাই এই বিষয়গুলোকে সে ‘হাস্যকর’ ভাবে। ভাবে, হেসে তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিতে পারলেই বোধকরি তার পরাজয় ঢাকা পড়বে। এইজন্যে লোকজন বিমূর্ত চিত্রকলা দেখে তেলাপোকার কারিকুরি ভাবে, ক্লাসিকাল গান নিয়ে হাসাহাসি করে।

আমার এবং আমার বোনের গানের শিক্ষক পন্ডিত রামকানাই দাস একবার তার ছোটবেলার গল্প বলতে গিয়ে বলেছিলেন যে তার সময়ে মাত্র গ্রামোফোন শহরের ধন্যাঢ্য পরিবারের পরিসরে আসতে শুরু করেছে। তখন লোকজন কলকাতা থেকে এক সাথে বেশ কিছু লং প্লে রেকর্ড নিয়ে আসত। তেমনি একটা রেকর্ডে চলে এল রাগ মিয়া কি টোড়ির পরিবেশনা—গেয়েছিলেন বিখ্যাত আফতাব-এ-মৌসিকি ফৈয়াজ খাঁ সাহেব। আমার ওস্তাদজি তখন ছোট মানুষ নিজে। এক বাড়িতে ঐ গান শুনে অভিভূত হয়ে গেলেন! বারবার শুনে গানটা গলায় তোলার চেষ্টা করলেন। সেই সময়ে বাড়ির লোকজন তাদের এই ক্ষুদ্র মানবকটির কর্মকান্ডে খুব আমোদিত—বাইরে থেকে কেউ বেড়াতে এলে তার ডাক পড়ত, ঐ রামকানাই, তোর ঐ ‘কমিক’ গান খানা শুনিয়ে দিয়ে যা তো—ঐ যে ‘আল্লা জানে মওলা জানে–’

আমরা এর পর বহু বছর পাড়ি দিয়েছি—সিলেটের তথা সারা বাংলার সকল নদী দিয়ে কোটি কোটি গ্যালন পানি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে বিলীন হয়ে গেছে–কিন্তু শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে মানুষের ধারণা এখনো আগের জায়গাতেই রয়ে গেল—’কমিক’ গান!

ইদানিং শুনি বেঙ্গলের এই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বার্ষিক সম্মিলনের কথা। শুনি আর মনে এক ধরনের পুলক অনুভব করি—যাক শেষ পর্যন্ত বোধহয় আমরা একটু হলেও এই বিরলপ্রজ সঙ্গীতের ধারাটির জন্য বোদ্ধা জনগন তৈরী করতে পারছি!!

হাহ্‌, কিসের কি!

শুনতে পেলাম, এই সম্মিলন হয়ে দাঁড়িয়েছে সদ্য কাঁচা পয়সা হাতে আসা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বড় বড় এক্সিকিউটিভদের বিশ্রম্ভালাপের জায়গা। মুর্গির ঠ্যাং চিবুতে চিবুতে, পাশে বসে থাকা প্রেমিকার গা থেকে ভেসে আসা দামী সুগন্ধীর সুবাস নিতে নিতে মাতোয়ারা হওয়া—আর চাই কী?! ট্যাকে অনেক টাকা—কিন্তু তাতে করে জাতে ওঠা যাচ্ছে না। যাই, একটু রাতের বেলা দামী চাদরে গা ঢেকে বেশ একটু বোদ্ধা বোদ্ধা ভাব নিয়ে ঘুরে আসি। সেতার শুনে বলি, বাহ সরোদটা কী বাজালো দেখলি? হাত দেখাই যাচ্ছিল না –এমন স্পীড লোকটার! কী বললি ঐটা সেতার–ধুর! তুই শিওর?! আর দোতারার মত জিনিসটা? ঘ্যাং ঘ্যাং করে আওয়াজ হয় যে–ঐটা সরোদ?! কে বলেছে তোকে। ভাল কথা ‘ডিলটা’ কালকেই ফাইন্যাল করে ফেলিস কিন্তু!

নাহ্‌, আমাদের কোন উন্নতি হয় নি। কিছু লোক জাতে ওঠার জন্যে, কিছু লোক গভীর রাতে প্রেমিকার বাহুলগ্ন হবার জন্যে, কারো কারো গাঁজার কল্কিতে টান দেবার জন্যে, কারো কারো হয়ত আরো অন্য কোন সাধ মেটানোর সুযোগ করে দেবার জন্যে অনেক রাতে চৌরাশিয়া বাঁশীতে সুর তোলেন। চারপাশের বাতাস, আকাশের চাঁদ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায় ষড়জে সুর লাগানো শুনে–রাস্তায় ফুটপাতের পাশে স্থির হয়ে দাঁড়ায় এক লোক বুকে বানভাসী আনন্দ নিয়ে যখন দরবারী কানাড়ার সুরে বিশুদ্ধ বিষাদ প্রপাত হয় আমাদের এই জনারন্যে —-

চারপাশের সহজে চেনা জায়গাটা হঠাৎ করেই অচেনা অপার্থিব মনে হয়!
সকল কিছু তুচ্ছ, তুচ্ছ মনে হয়—

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: