একটি হত্যাকাণ্ডে পণ্ড হয়েছিল একটি ক্রিকেট ম্যাচ

মূল লেখার লিংক
১৯৮৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর ভারতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ। ছবি: সংগৃহীত।
১৯৮৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিহত হওয়ার পর ভারতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ। ছবি: সংগৃহীত।

১৯৮৪ সাল। সুনীল গাভাস্কারের নেতৃত্বে তখন পাকিস্তান সফর করছিল ভারতীয় ক্রিকেট দল। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের সিরিজ উত্তেজনা আর রোমাঞ্চের পসরাই সাজিয়ে বসেছিল। কিন্তু সেই সিরিজের অপমৃত্যু হয়েছিল অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায়। সেটি শোকাবহ এক ঘটনা। ৩১ অক্টোবর ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কারণে মাঝপথেই বন্ধ করে দেওয়া হয় শিয়ালকোটের একটি ওয়ানডে ম্যাচ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরে দেশেই ফিরে যায় ভারতীয় দল।

সফরটা মোটেও ভালো কাটছিল না ভারতীয় দলের। সুনীল গাভাস্কার বেশ কয়েকবারই পাকিস্তানি আম্পায়ারদের বিপক্ষে ‘দেশপ্রেমে’র অভিযোগ তুলেছিলেন। গাভাস্কারের অভিযোগ, পাকিস্তানি আম্পায়াররা ওই সিরিজের দুটি টেস্টে ‘দেশপ্রেমে’ এতটাই উদ্দীপ্ত ছিলেন যে ভারতীয় দলের পক্ষে মাঠের খেলাটাই হয়ে উঠেছিল দারুণ কঠিন।

সিরিজের দুটি টেস্ট হয়েছিল লাহোর ও ফয়সালাবাদে। দুটি টেস্টই ড্র হয়েছিল। লাহোরের প্রথম টেস্টের পর সুনীল গাভাস্কার বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানি আম্পায়ারদের নিজেদের দলের পক্ষে সিদ্ধান্ত দেওয়ার আপ্রাণ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমরা টেস্টটা ড্র করতে পেরেছি। এটিকে আমি অভাবনীয়ই বলব।’

সিরিজের সূচিটা ছিল বেশ অদ্ভুত। টেস্ট সিরিজ শুরু হওয়ার আগে হয়েছিল প্রথম ওয়ানডে ম্যাচটি। ১৯৮৪ সালের ১২ অক্টোবর কোয়েটায় হওয়া সেই ম্যাচে ভারতকে ৪৬ রানে হারিয়েছিল পাকিস্তান।

লাহোরের প্রথম টেস্টটি শুরু হয় ১৭ অক্টোবর, ৮৪। ফয়সালাবাদের দ্বিতীয় টেস্ট ২৪ অক্টোবর। টেস্ট সিরিজ শেষ হওয়ার পর ৩১ অক্টোবর সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে ম্যাচটি ছিল শিয়ালকোটে।

শিয়ালকোটের সেই সকালটি পুরোপুরিই ছিল ভারতের। সুনীল গাভাস্কার চোটের কারণে ম্যাচটি খেলেননি। মহিন্দর অমরনাথ সেদিন জহির আব্বাসের সঙ্গে নেমেছিলেন টস করতে।

শিয়ালকোটের অক্টোবরের ছোট দৈর্ঘ্যের দিনের কথা মাথায় রেখে ম্যাচটি ছিল ৪০ ওভারের। টসে জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে সূচনাটা দারুণ করেছিল ভারত। দারুণ ব্যাট করছিলেন দিলীপ ভেংসরকার ও সন্দ্বীপ পাতিল। শিয়ালকোটের জিন্নাহ স্টেডিয়ামের দর্শকপূর্ণ গ্যালারি তখনো জানে না, কী ভয়ংকর এক দুঃসংবাদ অপেক্ষা করছে! শিয়ালকোটের জিন্নাহ স্টেডিয়ামে সাধারণ দর্শকদের পাশাপাশি সেদিন ভিআইপি গ্যালারিতে ছিলেন পাকিস্তানে ভারতীয় দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা। স্বাভাবিকভাবেই প্রধানমন্ত্রীর সংবাদটা তাঁদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল আগেই।

প্রথমে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজের বাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না, ম্যাচটি কীভাবে তাঁরা পরিত্যক্ত ঘোষণা করাবেন। খবরটি অন্য দিক দিয়ে এসেছিল শিয়ালকোটের সে সময়ের ডেপুটি কমিশনার ইসমাইল কোরেশির কাছে। পাঞ্জাব প্রাদেশিক সরকারের এই কর্মকর্তার কাছে এসেছিল খোদ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হকের বার্তা—ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, খেলা বন্ধ করতে হবে। পাকিস্তানে সে সময় চলছিল জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসন।

কোরেশি প্রমাদ গুনলেন। কীভাবে তিনি খেলা বন্ধ করবেন! খেলা বন্ধ করলে হাজার পঁচিশেক দর্শককে টিকিটের টাকা ফেরত দিতে হবে। সেটি পরের ব্যাপার, কিন্তু হঠাৎ জমজমাট একটি খেলা বন্ধ করে দেওয়া কী সোজা কথা! দর্শকেরা সেটি কীভাবে নেবেন। তাঁর শঙ্কা ছিল দর্শক হাঙ্গামার।

ভারতীয় ক্রিকেটারদের প্রথমে সংবাদটি জানানো হয়নি। সংগত কারণেই। কিন্তু ড্রেসিংরুম থেকে তাঁরা কর্মকর্তাদের দৌড়ঝাঁপে ঠিকই আন্দাজ করে ফেলেছিলেন, কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু সেই কিছু একটা কী, সেটিই বুঝতে পারছিলেন না তাঁরা।

খেলা বন্ধ করেননি অভিজ্ঞ ডেপুটি কমিশনার কোরেশি। তিনি অপেক্ষা করলেন ৪০ ওভার শেষ হওয়া পর্যন্ত। সকাল সোয়া দশটায় খবরটা পাওয়ার পর দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করলেন।

মধ্যাহ্নবিরতির কেবলই আগে পুরো সংবাদটি জানাজানি হলো। খেলোয়াড়দের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। খেলার চিন্তা বাদ। অজানা আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন সবাই। দর্শকদের লাউড স্পিকারে জানানো হলো পরিস্থিতি। দর্শকদের বলা হলো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী গুলিবিদ্ধ হওয়ায় এ অবস্থায় ক্রিকেট খেলাটা অনুচিত। তাই খেলাটা বন্ধ করতে হচ্ছে। স্টেডিয়ামের কাউন্টার থেকে তাদের টিকিটের টাকা ফেরত নিয়ে নিতে বলা হলো।

১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর একটি রক্তক্ষয়ী দিন। এদিন দিল্লিতে নিজের বাড়ির আঙিনাতেই দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ইন্দিরা গান্ধী। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে নেওয়া হয় হাসপাতালে। কিন্তু তাঁকে বাঁচানো যায়নি। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দিল্লিতে শুরু হয়েছিল শিখবিরোধী দাঙ্গা। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই দুঃখজনক অধ্যায়ের সঙ্গে ক্রিকেট মিলে গিয়েছিল কাকতালীয়ভাবে।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: