হোওরানিদের কোচ্ছা

মূল লেখার লিংক

horan-1

হোওরান, আরবি حوران নামে প্রাচীনকালে একটি বিশাল অঞ্চল ছিল। বর্তমান সিরিয়ার দেরাআ জেলা, ১৮০০ স্কয়ার কিলোমিটার গোলান মালভূমি, (ইসরাইল কর্তৃক দখল করা ১২০০ কিলোমিটারসহ), বর্তমান জর্দানের বেশিরভাগ অংশ নিয়ে, মৃত সাগরের পূর্ব পারের এলাকাসহ, কারো মতে ইসরাইলের দখল করা ফিলিস্তিনের নাবলুস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

হোওরান শব্দটি প্রাচীন আরামায়িক ভাষার। অর্থ গুহাভূমি।

দেরাআ বা দারাআ সিরিয়ার সর্বদক্ষিণের মোহাফেজা, মানে গভর্নরেট, মানে জেলা। দেরাআর সাথে লাগোয়া গোলান মালভূমি। গোলানের উত্তর প্রান্ত থেকে মাত্র চল্লিশ মাইল উত্তরে সিরিয়ার রাজধানী দামেশ্ক।

দেরাআর স্থানীয় পরিচয় হোওরান। বাসিন্দাদের বলা হয় হোওরানি।

horan-4
দেরাআর হোওরানি নারী পুরুষ।

বর্তমানের হোওরানিরা অধিকাংশ সুন্নি মুসলিম। তবে গোলানের বাসিন্দারা সুফি মতাদর্শে বিশ্বাসী বেশি। ফ্যাসাদের ধারে-কাছে যেতে চায় না। জীবনের চলমান ধারাতে যা কিছু আসে, সবই খোদায়ী নিজামের অংশ হিসাবে মানে।

হোওরানিদের শরীর মন বেশ শক্তপোক্ত। তারা ব্যবসা করতে পছন্দ করে বেশি। স্বভাবে অনেকটা একরোখা ও আবেগপ্রবণ। খুব রেগে গেলে বলে বসে খোদাকেও পরোয়া করে না। রাগের চোটে মা তার ছেলেকে বলেন, “তুই একটা ইহুদি।”

আবার তাদের দায়িত্ববোধও প্রশংসনীয়। বনেদী অধিবাসীদের বিয়ের অনুষ্ঠানে জোয়ানরা মুরুব্বিদেরকে কাঁধে বসিয়ে নেচে নেচে সম্মান দেখায়। কাউকে চেয়ারে বসিয়ে চার জনে মিলে চেয়ার মাথার উপর তুলে ধরে গান গেয়ে নেচে জানায় মুরুব্বিরা আমাদের লালন পালন করেছেন, পথ দেখিয়েছেন, তারা শ্রদ্ধাভাজন, তারা মাথার উপরে থাকবার।

আগের হোওরান অঞ্চলের ভেতর থাকা, বর্তমানে ইসরাইলের দখলে শেখ পাহাড় বা জবল শেখ বা হিব্রু ভাষায় হেরমন পাহাড় একটি মনোহর ভূভাগ।  পাহাড়টির শীর্ষভাগে সারা বছর তুষার থাকে। দেখতে যেন সাদা টুপি পরা। তাই এর নাম শেখ পাহাড়। সমুদ্র লেবেল থেকে ২৮১৪ মিটার উপরে পাহাড়টির চূড়া।

এই পাহাড়ের আশপাশেও বহু আগে থেকে হোওরানিদের বসতি। তারা একটি নৃগোষ্ঠী। খৃষ্টপূর্ব ১২ হাজার বছর পূর্বেও বৃহত্তর হোওরান অঞ্চলের একটি ছোট এলাকায় বাস করত তারা।

হোওরানিদেরও অনেক লোককথা বা কিচ্ছা আছে। তারা আড্ডায় বসলেই কিচ্ছা বলে। তাদের ভাষায়, মানে আরবিতে কোচ্ছা। ওসব মূলত ফেবল। তিনটি কোচ্ছা নিম্নরূপ:

১. নিজে আঘাত পেতে বাধ্য হওয়ার কারণ

এক লোক এসে গাঁয়ের মুরুব্বিকে বলল, সে তার ছোট ভাইকে খুব বকা দেয়াতে ভাই রাগ করে কোথায় চলে গেছে পাত্তা মিলছে না। এখন তার নিজের কাছে খারাপ লাগছে—কেন বকঝকা দিল, মানে দরদ লাগছে।

sarwar-chy-12
সিরিয়া সংকটের কারণে ইতালিতে আশ্রয় নেয়া হোওরানি পরিবার।

মুরুব্বি জানতে চাইলেন, “তুমি কি অযথা বকা দিছিলা?”

লোকটি বলল, “জ্বি না, সে এমন একটা কাজ করতে লেগেছিল, যার কারণে পুরো পরিবারকে মসিবতে পড়তে হতো।”

হোওরানি মুরুব্বি বললেন, “ঠিক আছে আর খুলে বলতে হবে না। শোনো, জীবন চলার পথে কখনও নিজের কষ্ট হবে বুঝে নিয়েও নিজেকে কষ্ট দেয়ার কারণ তোমাকে হতে হয়। যেমন ধরো, বিষাক্ত সাপ ছোবল মেরেছে পায়ে বা হাতে। তুমি তাড়াতাড়ি ছোবল দেয়া জায়গার আশপাশে ধারালো কিছু দিয়ে ঘা দিয়ে বিষাক্ত রক্ত বের করে দিতে হবে। বড় ক্ষতি থেকে বাঁচতে এটা করতে বাধ্য তুমি। তার মানে, নিজেকে রক্ষা করতেই কখনও অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজেকে ঘা পেতে দিতে হয়।

অন্যকে আঘাত করলে সে আঘাত নিজেকে কষ্ট দিবে বুঝেও আঘাত করা জরুরী হয়ে পড়ে। বুঝলা?”

লোকটি বলল, “বুঝেছি শেখ”। (আরবিরা মুরুব্বিরেও শেখ বলে সম্মান করে।)

২. ক্ষমতাবান যেভাবে অধীনস্থের উপর দোষ চাপায়, নাচায়

মোক্তার, মানে সরকারের এটর্নি এক মজলিশে অতিথি হয়ে এসেছেন। সাথে তার ব্যক্তিগত সহকারী। মোক্তারের একটু পেছনে সহকারী বসা। বাকিরা সবাই দূরে বসেছেন মান্যবরের কথা শুনতে।

মোক্তার সাবের বক্তব্য শুরুর আগেই ঘটনা একটা ঘটলো।

মোক্তার পাদ দিছেন। সহকারী টের পেয়েছেন। কিন্তু দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার জন্যে নাকে হাত দিতেও পারছেন না এবং চুপচাপ স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে বেচারা।

এমনিতেই ভয় লাগছে তার। ভরা মজলিশে যদি একটু ত্রুটি পেলে ধমক দিয়ে বসে মোক্তার।

সবদিকে একবার চোখ বুলিয়ে মোক্তার তার সহকারীকে বললেন, “হেই বেটা খবিস পাদ দিলি ক্যান?

কাচমাচু হয়ে শরমিন্দা ভাব জাহির করে সহকারী বললেন, ” না না কী যে বলেন আমি কই দিলাম!”

ভয়ে বলতেও পারছে না মোক্তারকে “আপনি দিছেন।”

মোক্তার বললেন, “পাদ দিছছ আবার বলতেছছ দেছ নাই, খাড়া দেখাইতেছি মজা। জলদি তোর টাকা দিয়া এক ট্রে চকলেট আইন্না সবাইরে দে। নইলে বলে দেব সবাইকে তুই মজলিস গান্ধা করচস।”

নিরুপায় সহকারী দৌড়ে গিয়ে চকলেট এনে সবাইকে দিতে থাকে। সবাই চকলেট নিতে নিতে জানতে চায়, “কী ব্যাপার? সুসংবাদটা কী বলেন? চকলেটের উপলক্ষ কী?”

সহকারী মুচকি হেসে চকলেট দেয়া শেষ করেন, কিছু বলেন না। শেষ করে মোক্তারের কাছে ফিরে আসতেই, মোক্তার সকলের উদ্দেশে বললেন, “চকলেট দিয়েছে কারণ একটু আগে সে পাদ দিছে (আরবীতে দ্বারাত মানে পাদ), এই কারণে জরিমানা করছি।”

সহকারী শরমে লাল হয়, কিন্তু কোনো আওয়াজ করে না। জরিমানাও করল, দোষও চাপাল।

sheikh-pahar
সারা বছর তুষারাবৃত শেখ পাহাড়

৩. এক বেশি না পঁচিশ বেশি

এক লোক প্রতিদিন একটি বালককে এক হাতে পঁচিশ লিরা (টাকার নাম) আরেক হাতে এক লিরা নিয়ে বালকের দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে জানতে চায় বালকটি কোন হাতের লিরা নিবে।

বালক প্রতিদিন এক লিরা নেয়। পঁচিশ লিরা নিতে চায় না। লোকটি ভাবে বালকটা খুব বেক্কল, পঁচিশ নেয় না, এক নেয়।

একদিন বেশ কিছু মানুষ ডেকে এনে তাদের সামনে বালকটির দিকে প্রতিদিনের মতো দুই হাত বাড়িয়ে দেয়। বালক প্রতিদিনের মতো এক লিরা নেয়।

উপস্থিত লোকেরা বালককে বলে, “এই ছেলে তুমি এত বেক্কল কেন? পঁচিশ না নিয়ে এক লিরা নেও কেন?

বালকটি বলল, “পঁচিশ নিলে ত এই লোক প্রতিদিন এইভাবে আমাকে দিতে আসবেন না, পঁচিশেই থেমে যাবে কাহিনী। উনি আমাকে বেকুব ভেবে মজা নিতে প্রতিদিন দিতে থাকাতে এরই মধ্যে আমি ষাট লিরা পাইছি। পঁচিশ নিতাম যদি উনি মজা পেতেন না, একবারেই থেমে যেতেন। সুতরাং আপনারাই বলেন কে বেকুব?”

উপস্থিত সবাই থ।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: