পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ানসঃ মিথ এণ্ড ফ্যাক্ট

মূল লেখার লিংক
পাইরেট বা জলদস্যু শব্দটি শুনলেই এক ধরণের রোমাঞ্চকর শিহরণ বয়ে যায় কিশোর ,যুবা, বৃদ্ধ সবার শরীরে।বিশেষ করে হলিউডি ব্লকব্লাস্টার “পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ানে” ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো চরিত্রে জনি ডেপের অনবদ্য অভিনয়ের কল্যাণে পাইরেটসরা এখন সারা পৃথিবীতেই অসম্ভব জনপ্রিয় চরিত্র। কিন্তু কেমন ছিলেন সত্যিকারের এই জলদস্যুরা? সিনেমার রূপালী ফিতেয় আবদ্ধ রোমান্টিক কমেডি চরিত্রের মতো? নাকি ভিন্ন কিছু? সেই জলদস্যুদের সুলুক সন্ধানের জন্যই এই সামান্য প্রচেষ্টা।
সাধারণতঃ দস্যু আর জলদস্যুর মধ্যে মূল পার্থক্য একটাই। দস্যুরা দস্যুতা করতো ভূমিতে, আর পাইরেটরা করতো নৌপথে, জাহাজে চড়ে। তাদের আক্রমণের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলো বিভিন্ন রাস্ট্রের পণ্য বা যাত্রীবাহী জাহাজগুলো। মাঝসাগরে রীতিমতো ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল এরা। ঘুম কেড়ে নিয়েছিল সমুদ্রগামী জাহাজের নাবিক আর বণিকদের। কারণ এরা ছিলো মারাত্মক নির্দয় প্রকৃতির। এদের আক্রমণ থেকে জীবিত রক্ষা পাওয়া সৌভাগ্যবানের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য বলা চলে।

জলদস্যুতার ইতিহাস কিন্তু অনেক প্রাচীন। সেই ভাইকিংদের থেকে শুরু করে হাজার হাজার বছর ধরে জলদস্যুরা তটস্থ করে রেখেছিল সমুদ্রগামী মানুষদের। রোমান ইতিহাস থেকে জানা যায় ১০০০ সালে তারা এক বছর ব্যাপি জলদস্যুদের বিরুধ্বে যুব্ধ করেছে। ঐ সময় পশ্চিম ইউরপে জলদস্যুরা ব্যাপক আক্রমণ করত।এছাড়া মিশরীয়,পারসিক এবং চৈনিক জলদুস্যুদের দস্যুতার অনেক কাহিনীই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। তবে সবচেয়ে বেশী ভয়ঙ্কর ছিলো ক্যারিবীয় জলদস্যুরাই “পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ানস”, আর তাই তাঁদের নিয়ে মিথও রচিত হয়েছে অনেক বেশী। আজো পাইরেটস শব্দটি বলতেই মূলতঃ চোখে বেসে ওঠে এদের ছবিই।
স্পেনের জন্য কলম্বাসের নতুন বিশ্ব আবিষ্কারের পর ক্যারেবীয় দ্বীপপুঞ্জ ইউরোপীয় বাণিজ্য ও উপনিবেশ স্থাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। আটলান্টিকে ওঁত পেতে থাকা জলদস্যুদের হাত থেকে রক্ষার জন্য স্পেনীয়রা একধরণের বহর ব্যবস্থা চালু করে যাকে ফ্লোটা বা গুপ্তধনের বহর বলা হতো। এরা স্পেনের সেভিল থেকে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করা নতুন বিশ্ব অর্থাৎ ক্যারেবীয় অঞ্চলে যাতায়াত করত। তারা মুলত যাত্রী, সৈনিক ইউরোপে তৈরি পণ্যসামগ্রী বহন করত। এইসব মালামাল লাভজনক হলেও এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ঐ বছরের সঞ্চিত সকল রূপা ইউরোপে পাঠানো। এর প্রথম ধাপে সকল রূপা রূপার ট্রেন নামের একটি খচ্চরের বহরে করে পেরু এবং নতুন স্পেনে পাঠানো হত। এই ফ্লোটা অর্থাৎ গুপ্তধনের বহর তখন রূপার ট্রেনের সাথে দেখা করত। এটি তখন তার বহনকারী সামাগ্রী, যাত্রীকে গন্তব্যস্থানে নামিয়ে দিত এবং উপনিবেশে বসবাসরত বণিকদের জন্য অপেক্ষা করত যারা এর কাছে সোনা ও রূপোর তৈরি মূল্যবান মালামাল পাঠাবে। এইসব মালামাল ফ্লোটাকে স্পেনে ফিরে যাওয়ার সময় জলদস্যুদের কাছে অত্যন্ত লোভনীয় লক্ষে পরিণত করে।

ক্যারেবীয় দ্বীপপুঞ্জে জলদস্যুতার যুগ শুরু হয় ষষ্টদশ শতাব্দীতে এবং এর সমাপ্তি ঘটে আঠারশো তিরিশের দশকে যখন পশ্চিম ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার নৌবাহিনী তাদের ক্যারেবীয় উপনিবেশকে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধাচারণ করে।ইতিহাসের ১৬৯০ সাল থেকে ১৭২০ সালের এই ৩০ বছরকে ক্যারিবিয়ান জলদস্যুর জন্য স্বর্ণ সময় বা সোনালী ৩০ বছর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। কারণ জানা যায় এই সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রে জলদস্যুরা আক্রমণে সফলতা অর্জন করেছে। জলদস্যুদের সমুদ্র বন্দরের সংখ্যা বাড়ায় ক্যারেবীয় অঞ্চলে জলদস্যুতার অবস্থা উন্নত হয়। এদের মধ্যে রয়েছে জামাইকার পোর্ট রয়েল , হাইতির তোরতুগা এবং বাহামা দ্বীপপুঞ্জের নাসাউ উল্লেখযোগ্য।এই বিশেষ সময়ে নাসাও দ্বীপটিও যেন দস্যুদ্বীপ হিসেবে পরিচিত পায়, কেননা দস্যুবৃত্তিতে এই দ্বীপটি অত্যন্ত কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের মেয়ামির থেকে ৩ শ’ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত। তার ওপর দ্বীপটি ঘিরে থাকা সমুদ্রের গভীরতা খুব বেশি না থাকায়, বড় বড় জাহাজ সেখানে ঢুকতে পারতো না। তাই এমন সুবিধাজনক একটি দ্বীপ রাতারাতি জলদস্যুদের জন্য বিশেষ আরাধ্য আর আদর্শ আশ্রয় স্থল হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। জলদস্যুদের লুন্ঠন করা অগাদ সম্পদের জৌলুসে দ্রুতই ব্যবসায়ী, যৌনকর্মী এবং দুষ্কৃতীকারীদের মনযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়।
পাইরেটসদের মূলতঃ চার ভাগে ভাগ করা যায়ঃ
বুকানিয়ার

বুকানিয়ার একটি ফ্রান্সের শব্দ । যার অর্থ হল পোড়া মাংস। ১৫০০সাল থেকে ১৬০০সাল পর্যন্ত একদল জলদস্যু স্পেনের কলোনি এবং আমেরিকার জাহাজ এবং উপকূলীয় শহর গুলো আক্রমণ করত। এরা গবাদি পশু জবাই করে মাংস পোড়াত এবং ঐ পোড়া মাংসের বিনিময়ে গোলা বারূদ, ছুরি, এবং জামাকাপড় নিত। সেই থেকে ওদের নাম হয়ে যায় বুকিনিয়ার। অধিকাংশ বুকিনিয়ার ছিল ইংরেজি, ডাচ, অথবা ফরাসি নাগরিক। মূলত পালিয়া যাওয়া দাগী আসামী , কৃতদাস এবং এডভেঞ্চার প্রিয় লোকদের নিয়ে এই জলদস্যু দল তৈরি হত। বুকিনিয়ারদের সদর দফতর এবং পালানর জন্য বেছে নিয়ে ছিল হাইতির কাছে “তরতুগা” নামক অতি ক্ষুদ্র ক্যারিবিয়ান দ্বীপ ।

বারবারি জলদস্যু

বারবারি জলদস্যুতার সময় কাল ছিল ১৬০০ সাল থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত। তারা মূলত উত্তর আফ্রিকার “বারবারি” কোস্টে জলদস্যুতা করত। আলজেরিয়া, টিউনিস, এবং ত্রিপোলি উপকূলীয় শহর থেকে এরা আক্রমন পরিচালনা করত। এইজলদস্যুর দল ভঁয় দেখিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারের কাছ থেকে মুক্তিপন আদায় করত। ঐ দেশের জাহাজ আক্রমণ না করার জন্য মুক্তিপণ না দিয়ে উপায় ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এদেরকে মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হত। অবশেষে প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন ১৮১৫ সালে ঐ অঞ্চলে মার্কিন নৌ জাহাজ পাঠিয়ে বারবারি জলদস্যুদের দমন করে।

প্রাইভেটিয়ার

প্রাচীন কালে যখন বিভিন্ন দেশে নৌবাহিনী শক্তিশালী ছিল না যুদ্ধের সময় জলদস্যুদের ভাড়া করা হত আক্রমণের জন্য। অনেকটা প্রাইভেট নৌবাহিনীর মত। এরা প্রথম দিকে বিভিন্ন দেশের হয়ে ভাড়ায় কাজ করলেও পরবর্তীতে জলদস্যুদের মত কাজ করা শুরু করে। এরা প্রাভেটিয়ার নামে পরিচিত ছিল। সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাভেটিয়ার ছিল স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক।এই লোক নৌপথে সারা পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছিলেন।পৃথিবীতে এই কৃতিত্ব তিনি ছাড়া আর দেখাতে পেরেছিলেন দুইজন মাত্র। ক্যাপটেন জেমস কুক আর এডমিরাল ম্যাগেলান।জলদস্যুতাকে মাঝে মাঝে “বৈধতা” দেয়া হয় বিশেষ করে ফ্রান্স যতদিন রাজা ফ্রান্সিসের অধীনে ছিল। জলদস্যুতার এই বৈধ অবস্থানকে বলা হতো প্রাইভেটেরিং। ১৫২০ থেকে ১৫৬০ পর্যন্ত বিশাল স্পেনীয় সাম্রাজ্যের বিপক্ষে ফরাসি প্রাইভেটীয়াররা একাই লড়াই করে। পরবর্তীতে তাদের সাথে ডাচ ও ইংরেজ জলদস্যুরা যোগ দেয়।

সবচেয়ে কুখ্যাত জলদস্যুদের কয়েকজন ছিলেনঃ

ব্ল্যাকবিয়ার্ডঃ

এডওয়ার্ড টীচ বা ড্রুমন্ড নাম নিয়ে তার জন্ম ১৬৮০-এর দিকে ইংল্যান্ডে। তিনি ব্ল্যাকবিয়ার্ড নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি মূলত উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূল ও বিশেষ করে ক্যারেবীয় দ্বীপপুঞ্জের বাহামা দ্বীপপুঞ্জে অবস্থান করতেন এবং দক্ষিণ ক্যারোলিনার কার্লিস্টোন বন্দরকে কেন্দ্র করে একটি জলদস্যু জোট গঠন করেন।[তার জলদস্যু জীবনের অধিকাংশ সময় ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন হর্নিগোল্ড তার সহকর্মী ছিলেন। বেঞ্জামিনও ছিলেন আরেক জলদস্যু সর্দার। ব্ল্যাকবিয়ার্ডের জাহাজের নাম ছিল কুইন অ্যানি’স রিভেঞ্জ যার ওজন ছিল ২০০ টনেরও বেশী।ভার্জিনিয়ার শাসক স্পাউড্‌স তার সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর নাবিক ও সৈন্যদের সমন্বয়ে একটি বাহিনী গঠন করে ব্ল্যাকবিয়ার্ডকে ধরতে অভিযান চালান। যার নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেনান্ট রবার্ট ম্যানার্ড। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে টীচ হার মানতে বাধ্য হন। রবার্ট ম্যানার্ড তাকে তার তার নাবিকদের সাহায্যে হত্যা করেন। কথিত রয়েছে যে ব্ল্যাকবিয়ার্ডকে হত্যা করার জন্য পাঁচবার গুলি করতে হয় এবং বিশবার কাটারি দিয়ে আঘাত করতে হয়।এডওয়ার্ড টীচকে ব্ল্যাকবিয়ার্ড নামটি দেওয়া হয়েছিল তার লম্বা কালো দাড়ি ও ভীতিকর চেহারার জন্য। এই কথা প্রচলিত রয়েছে যে, তিনি তার বিখ্যাত কালো দাড়িতে ঘষে আগুন ধরাতে পারতেন।

বার্থোলুমিউ রবার্টসঃ

বার্থোলুমিউ রবার্টস বা ব্ল্যাক বার্ট ছিলেন ওয়েলসের একজন জলদস্যু। যিনি জলদস্যুতায় খুব সফল ও অভিজ্ঞ ছিলেন। এও জানা যায় তিনি ৪০০-এর মত জাহাজ লুণ্ঠন করেছিলেন এবং অন্যান্য জলদস্যু ক্যাপ্টেনের মত তিনি এতে খুশিই ছিলেন। তিনি ১৭১৯-এর ফেব্রুয়ারিতে গিনি উপসাগরে স্বাধীনভাবে জাহাজ চালানো শুরু করেন এবং সেই সময়ই ক্যাপ্টেন হুওয়েল ডেভিসের নেতৃত্বে একদল জলদস্যু তাদের জাহাজ আক্রমণ করে এবং তাকে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান। ক্যাপ্টেন পদে উন্নতি লাভ করা পর ক্যারেবীয় অঞ্চলে চলে আসেন। ১৭২২ এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে থেকে তিনি আফ্রিকায় ফিরে আসেন। যেখানে তার নাবিকদের আটক করা হয় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

চার্লস ভেনঃ

চার্লস ভেন ছিলেন অন্যান্য আরও অনেক জলদস্যুদের মতই যিনি বাহামা দ্বীপপুঞ্জের নাসাউকে কেন্দ্র করে অবস্থান করতেন। ভেনই একমাত্র জলদস্যু ক্যাপ্টেন ছিলেন যে কিনা ক্যাপ্টেন উড রোজার্সকে প্রতিহত করতে সক্ষম হন। ভেনের কুয়ার্টার মাস্টার ক্যালিকো জ্যাক রেকহাম যে কিনা তাকে পদচ্যুত করে। পরে ভেন নতুন নাবিকদের নিয়ে শুরু করেন, কিন্তু তাকে ধরে ফেলা হয় ১৭২০ সালে জামাইকায় ফাঁসি দেয়া হয়।
চেং ই সাও

চীনের এক যৌনপল্লী থেকে যাত্রা শুরু হয় এই কুখ্যাত জলদস্যুর। ১৮০১ সালের দিকে চেং নামের এক জলদস্যুর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর এই দলটি রাতারাতি চীনের অভ্যন্তরে এক শক্তিশালী জলদস্যু বাহিনী গঠন করে। তাদের এই বাহিনীতে কমপক্ষে পঞ্চাশ হাজার জলদস্যু এবং শতাধিক জাহাজ ছিল। বিশেষ করে মাছধরা নৌকা, রসদ সরবরাহকারী জাহাজ এবং দক্ষিণ চীনের উপকূলবর্তী গ্রামগুলোতে নারকীয় অভিযান চালাতো তারা। ১৮০৭ সালে স্বামী মারা গেলে চেং ই সাও তার জাহাজের এক লেফট্যানেন্ট প্রেমিকের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে তারা দস্যুবৃত্তি চালায়। এই জলদস্যু নারীর আমলে গোটা এশিয়ার মানচিত্রে বিপুল রক্তপাত হয়, যে কারণে চীন সরকার তাদের প্রথম এবং একমাত্র শত্রু হিসেবে এই দলটির নাম তালিকাভূক্ত করে। শুধু তাই নয় পর্তুগিজ এবং ব্রিটিশ নৌবাহিনীও এই জলদস্যু বাহিনীর আক্রমনে তটস্থ থাকতো। তবে শেষমেষ তাকে গ্রেপ্তার বা হত্যা কোনোটাই করতে পারেনি চীন সরকার। ৬৯ বছর বয়সে মারা যান চেং ই সাও।

অ্যানি বনি

এক ধনী আইরিশ আইনজীবির মেয়ে ছিলেন অ্যানি বনি। বয়সের তুলনায় শারীরিক বাড়বাড়ন্ত হওয়ায় বাবা মেয়েকে ছেলেদের পোশাক পরিয়ে নিয়ে গেলেন আদালতে ক্লার্ক হিসেবে কাজ করানোর জন্য। সেখান থেকে বনি পরবর্তী সময়ে আমেরিকা যান এবং সেখানে ১৭১৮ সালে এক নাবিককে বিয়ে করে জলদস্যু অধ্যুষিত অঞ্চল বাহামায় চলে যান। বাহামায় যাওয়ার পর কিছুদিনের মধ্যেই নিজের স্বামীকে ত্যাগ করে জ্যাক র্যা কামের দলে নাম লেখান তিনি। ইতিহাসে বনিকে খুবই হিংস্র এবং বুদ্ধিদীপ্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে। বনি কোনো মানুষকে আহত করার জন্য প্রহার করতেন না, তিনি প্রহার করতেন নিশ্চিত হত্যার জন্য। এভাবেই একদিন তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় অপর এক জলদস্যু নারী মারি রীডের সঙ্গে। এই দুই জলদস্যুর মিলিত অভিযানে ১৭২০ সাল পর্যন্ত আশেপাশের অঞ্চলের মানুষ বেশ তটস্থ ছিল। ক্যালিকো জ্যাকের জাহাজ জলদুস্য শিকারীদের হাতে আটক হলে জাহাজের সবাইকে হত্যা করা হলেও, সকলের চোখের সামনে থেকে ফসকে যান এই দুই নারী। কারণ ততদিনে এই দুই নারী অন্তঃস্বত্ত্বা ছিলেন।

ম্যারি রীড
ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহনকারী এই নারী তার যৌবনের অধিকাংশ সময়ই কাটিয়েছেন সৎ ভাই ও অভাবী মায়ের সঙ্গে। পরবর্তীতে পুরুষের সাজে একটি জাহাজে খালাসির কাজ নেন তিনি এবং একটা সময়ে মার্চেন্ট নাবিক পর্যন্ত হয়ে যান তিনি। ১৭১০ সালের দিকে তাদের জাহাজে জলদস্যুরা আক্রমন করলে বন্দী হিসেবে তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই জাহাজটি ছিল ক্যালিকো জ্যাক রাকামের। আর সেখানেই তিনি মিলিত হন অ্যানি বনি নামের আরেক জলদস্যু নারীর সঙ্গে। রীড অবশ্য খুব বেশি একটা অভিযানে অংশগ্রহন করেননি। তবে ক্যালিকো জ্যাকের সঙ্গে যে কয়বার তিনি বের হয়েছিলেন, সেই সময়ের মধ্যেই তার সাহসিকতার নিদর্শন পাওয়া যায়। যদিও জলদস্যু শিকারীদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ার পর দীর্ঘমেয়াদী জ্বরের কবলে মারা যান রীড।

গ্রেস ও মেলি
সেই সময়কার কথা বলছি, যখন নারীদের ঘরের বাইরে কল্পনাই করা যেত না। নারীরা যে শিক্ষা গ্রহন করবে সেই আমলে এই ধারনা সমাজের চোখে ছিল রীতিমতো ভয়ংকর। কিন্তু সেই আমলেই গ্রেস ও মেলি ২০টি জলদস্যু জাহাজের নেতৃত্ব দিয়ে রীতিমতো ব্রিটিশ রাজবংশের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। চুল ছোট করে ছাটা মেলির জন্ম হয়েছিল পশ্চিম আয়ারল্যান্ডের এক শক্তিশালী গোত্রে। বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক পেশা জলদস্যুবৃত্তিতে নাম লেখান তিনি এবং ক্ষমতা গ্রহনের পর স্প্যানিশ এবং ব্রিটিশ আধিপত্যবাদিতার বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেন। তার সম্পর্কে এমনও শোনা যায় যে, সন্তান জন্ম দেয়ার পরদিনই অস্ত্র হাতে নেমেছিলেন যুদ্ধে। তবে ১৫৭৪ সালে তাকে রকফ্লিট ক্যাসেলে বন্দী করে রাখা হয় ১৮ মাসের জন্য। কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর সেই আগের পেশাতেই ফিরে যান তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজের সন্তানদের নিয়ে দস্যুবৃত্তি করে গেছেন তিনি।

র্যা চেল ওয়াল
র্যা চেল ওয়াল সম্পর্কে অনেক গল্পই চালু আছে আমেরিকায়। যদিও ধারণা করা হয় র্যানচেলের অপকর্ম ঢাকার জন্যই অনেক গল্প চালু করা হয়েছিল। তিনিই প্রথম আমেরিকান নারী যিনি দস্যুবৃত্তিতে নাম লেখান। শৈশবেই বাড়ি থেকে পালিয়ে যান র্যাতচেল এবং একটু বয়স হলে এক মৎসজীবিকে বিয়ে করে নাম ধারন করেন জর্জ ওয়াল। কিন্তু অর্থাভাবে সংসার জীবন অতটা ভালোভাবে চলছিল না, তাই একদিন কয়েকজনকে নিয়ে এই দম্পতি একটি নৌকা নিয়ে সাগরে ডাকাতি করতে শুরু করেন। সদস্য সংখ্যা কম এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকায় বিভিন্ন কৌশলে তাদের এই কাজ চালাতে হতো। ১৭৮২ সালের দিকে এক শক্তিশালী ঝড়ে তাদের নৌকা ধ্বংস হয়ে যায় এবং স্বামী জর্জ মারা যায়। এরপর ১৭৮৯ সালে এক নারীকে লুটপাট করার দায়ে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। পরবর্তী সময়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

১৭শ শতকের শেষের দিকে ক্যারেবীয় দ্বীপপুঞ্জের স্পেনীয় শহরগুলো উন্নতি লাভ করা শুরু করে এবং স্পেনেও ধীরে, অনিয়মিতভাবে পুনরুদ্ধার শুরু করে কিন্তু স্পেনের সমস্যার কারণে সামরিক বাহিনী নীচু মানের প্রতিরক্ষা উপযোগীই থেকে যার ফলে অনেকে সময়ই তারা জলদস্যু ও প্রাভেটিয়ারদের সহজ শিকারে পরিণত হয়। ইংল্যান্ডের ইউরোপে উদীয়মান শক্তি হিসেবে অবস্থান পাওয়ার ফলে ক্যারেবীয় দ্বীপপুঞ্জে ইংরেজদের উপস্থিতি দিন দিন বিস্তৃত হতেই থাকে। ১৬৫৫ সালে ইংরেজরা জামাইকা দ্বীপপুঞ্জ স্পেন থেকে নিজেদের অধীনে আনে এবং এর কেন্দ্রস্থল পোর্ট রয়েল স্পেনীয় সাম্রাজ্যের মধ্যস্থলে ইংরেজ বুকেনিয়ারদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়।
অর্থনৈতিকভাবে সপ্তদশ শতকের শেষ থেকে অষ্টদশ শতাব্দীর শুরু ক্যারেবীয় দ্বীপপুঞ্জের সকল রাষ্ট্রেরই সম্পদ ও বাণিজ্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। অস্টদশ শতকের দিকেই বাহামা দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটিশ উপনিবেশের জন্য নতুন ঠিকানা হয়ে দ্বারায়। নাসাউ বন্দর জলদস্যুদের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়।এভাবেই শেষ হয়ে যায় সাগরের ত্রাস জলদস্যুদের রূপকথার অধ্যায়ের। বহু বছর পরে সোমালিয়ার জলদস্যুরা আবার সেই ইতিহাসের পাইরেটসদেরই হয়তো পুনরজীবন ঘটাতে চলেছে। সে আরেক কাহিনী। অন্যদিন বলা যাবে।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: