রসায়নে নোবেল: সূক্ষ্ম যন্ত্রের অবাক জগৎ

মূল লেখার লিংক

ছবি: নোবেলপ্রাইজ.অরগ
এবারের কেমিস্ট্রিতে নোবেল দেয়া হয়েছে তিনজন বিজ্ঞানীকে (ফ্রান্স এর Jean-Pierre Sauvage, আমেরিকার Sir J. Fraser Stoddart এবং নেদারল্যান্ড এর Bernard L. Feringa) পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র আণবিক যন্ত্র (Molecular Machine) উদ্ভাবন করার জন্য। তাদের তৈরী স্ব-নিয়ন্ত্রিত আণবিক যন্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে অতি ক্ষুদ্র আকৃতির লিফ্ট, কৃত্রিম পেশী এবং অতি ক্ষুদ্র মোটর যেগুলোকে শক্তি (Energy) প্রয়োগ করে কর্মক্ষম (active) এবং আন্দোলিত (movement) করানো যায়।

ঠিক কতটুকু ছোট যন্ত্র তৈরী সম্ভব? এ প্রশ্নটি মনে জেগেছিলো নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী Richard Feyman এর মনে সেই ১৯৫০ এর দিকে। তিনি তখনি অনুমান করেছিলেন ন্যানোটেকনোলজি ব্যবহার করে একদিন অতি সূক্ষ যন্ত্রাদি তৈরী সম্ভব। তিনি দুটি প্রস্তাবনা করেছিলেন।

প্রথম প্রস্তাবনা – “ধরা যাক ছোট হাত তৈরী করতে চাইলে প্রথমে নিজের হাতের চেয়ে ছোট আরেকটি একটি হাত তৈরী করা, এরপর সেই হাতটি দিয়ে আরো ছোট হাত তৈরী করা, এভাবে আরো ছোট হাত যতক্ষণ পর্যন্ত না একবারে আণুবীক্ষণিক হাত তৈরী করা যাচ্ছে।” যদিও এ পদ্ধতিতে সাফল্য আসেনি। দ্বিতীয় প্রস্তাবনা ছিল একটি পরমাণু স্তর তৈরি করে সেটির উপর আরেক পরমাণু স্তর তৈরি। যেমন ধরা যাক সিলিকন পরমাণুর একটি স্তর তৈরী করে এর উপর আরেকটি স্তর তৈরি হবে। এরপর এই স্তরগুলোকে আলাদা করা হলে সেটি মাত্র কয়েক এংস্ট্রম পুরু হবে। এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে খুব ক্ষুদ্র ক্যামেরার শাটার তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। তিনি অতঃপর ১৯৮৪ সালে একটি স্বপ্নদর্শী বক্তৃতা দিয়েছিলেন যেখানে তিনি আশা করেছিলেন যে ২০-৩০ বছরের মধ্যে আণবিক যন্ত্র তৈরি করা যাবে। আর এবারের নোবেল পুরস্কার যেন তার সেই ভবিষৎ বাণীরই ফসল।

এখন দেখা যাক কি কারণে আণবিক যন্ত্র (molecular machine) তৈরির কারণে তিনজন বিজ্ঞানী নোবেল পেলেন?

প্রফেসর Jean-Pierre Sauvage এর গবেষণার বিষয় ছিল ফটোকেমিস্ট্রি যেটার মাধ্যমে তিনি আলোক সক্রিয় একটি যৌগ তৈরী করেছিলেন। তিনি হঠাৎ একদিন খেয়াল করলেন যে একটি কপার (Cu) আয়ন কে ঘিরে দুটি অণু ঘুরপাক খেতে খেতে একসাথে বিজড়িত (intertwined) হচ্ছে আর কপার আয়নটি একধরণের সংযোজক শক্তি (cohesive energy) প্রয়োগ করে দুটো অণুকে সংযোজিত করছে। পরবর্তীতে তার গবেষক দল অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে একটি রিং আকৃতি এবং একটি ক্রিসেন্ট বা অর্ধচন্দ্র আকৃতির মৌলকে কপারের মাধ্যমে সংযোজিত করে একটি গিট্টু (Knot) তৈরি করেন। মৌল দুটি একে অপরের সাথে যান্ত্রিক বন্ধনের (mechanical bond) এর মাধ্যমে যুক্ত থাকে। পরবর্তীতে তিনি কপার এর বদলে মেটাল আয়ন ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরণের মৌলের আংটা তৈরি করেন যেগুলো দেখতে নিচের ছবির আংটার মতো. এখানে a) trefoil knot, b) Solomon’s knot, c) Borromean rings

সর্বশেষ তিনি Catenane নামের দুটো রিং আকৃতির একটি যৌগ তৈরি করেন। এই রিং টি অনেকটা দরজার তালার মতো দুটো মৌলকে একসাথে যান্ত্রিক বন্ধন এর মাধ্যমে আটকে রাখে। এই রিং এর যৌগটি আবার খুব সহজেই সামান্য শক্তি প্রয়োগে আটকানো অবস্থাতেই জায়গা পরিবর্তন করতে পারে। সাধারণত রাসায়নিক বন্ধন এর মাধ্যমে যদি কত মৌল সংযুক্ত থাকে তখন যৌগগুলোকে স্থানান্তরিত করাটা সহজ হয় না কারণ রাসায়নিক বন্ধন অনেক মজবুত হয় এবং রাসায়নিক বন্ধন ভেঙে গেলে যৌগগুলো তার স্বকীয়তা হারায়। আর এখানেই ‘Catenane’ এর বিশেষত্ব। এই ধারণা থেকেই পরবর্তীতে বিজ্ঞানী Bernard Feringa সর্বপ্রথম আণবিক মোটর (Molecular motor) তৈরিতে সক্ষম হয়েছেন যেটি প্রায় ১২ মিলিয়ন আরপিএস (revs per সেকেন্ড) এ ঘুরতে পারে। এই মোটর ব্যবহার করে তিনি মোটর এর চেয়ে ১০০০০ গুন্ বড় একটি গ্লাস সিলিন্ডারকে ঘোরাতে সক্ষম হয়েছেন। অতঃপর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার রিসার্চ গ্রুপ একটি ন্যানো কার এর নকশা করেন। নিচের ছবিতে সেই ন্যানো কার এর একটি ছবি দেয়া হলো।


ছবি: Johan Jarnestad/The Royal Swedish Academy of Sciences
প্রফেসর Sauvage এর ‘Catenane’ উদ্ভাবনের ৮ বছর পর ১৯৯১ সালে প্রফেসর Fraser Stoddart ‘Rotaxane’ নামের একটি রিং আকৃতির একটি অণু তৈরি করেন যেটি একটি ডাম্বল আকৃতির মৌলের মধ্যে প্রতিস্থাপন করেন। এই রিং এ একটি ইলেক্ট্রন কম রয়েছে। অন্যদিকে ডাম্বল টাইপ এর মৌলের মাঝে দুটি ইলেক্ট্রন বেশি রয়েছে এবং ইলেক্ট্রন দুটোকে দুটো ভিন্ন জায়গায় রয়েছে। রিংটি সহ এই মৌলটিকে যখন একটি দ্রবণে ডুবানো হয় তখন রিংটি একটি ইলেক্ট্রন কম থাকার কারণে ডাম্বল এর যেখানে ইলেক্ট্রন বেশি আছে সেখানে চলে আসে। এটিই রফেসর Fraser Stoddart উদ্ভাবিত ‘Rotaxane’। এখন এই যৌগটিতে তাপ প্রয়োগ করলে রিংটি দুই ইলেক্ট্রন এর মাধবর্তী জাগাতে চলাচল করতে পারে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে পরবর্তীতে তিনি আণবিক উত্তোলক (molecular lift), কৃত্রিম পেশী (molecular muscle), আণুবীক্ষণিক কম্পিউটার চিপস তৈরী করতে সক্ষম হয়েছেন। (নিচের ছবিতে একটি আণবিক উত্তোলক দেখা যাচ্ছে).

এই তিনজন বিজ্ঞানী তাদের আবিষ্কার এর মাধ্যমে সিনথেটিক কেমিস্ট্রিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। তাইতো Richard Feyman এর সেই স্বপ্নদর্শী বক্তৃতার ৩২ বছর পর আমরা নিশ্চিত ভৱেই বলতে পারি মানুষের পক্ষে চুলের চেয়েও ১০০০ গুন্ সরু যন্ত্র তৈরি সম্ভব।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: