বিদেশ ভালো

মূল লেখার লিংক

বিদেশ ভালো। বিদেশের ম্যালা গুণ। বিদেশ নিয়ে মোটামুটি সবারই কম বেশি আগ্রহ। কারণ ইহা বিদেশ।

যেমন, আমি বিদেশে থাকি বলেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর প্রবাস পেইজ পরিচালনাকারিরা বিনা পয়সায় লেখা পাবার আব্দার করেছেন (তিনি জার্মানিকে নিজের মামা বাড়ি ভাবেন কিনা আমারা জানা নাই) এবং বিদেশ থাকি বলেই আপনারা আমার চোখে জর্মন দেশসহ আরো কিছু দেশ পড়বেন।

আজকের লেখায় থাকছে ডিমের ল্যাড়পা অংশ কুসুম আসবে আরো পরে কুসুম কুসুম করে।

এই  লেখা পড়লে আপনি জানতে পারবেন জর্মনসহ ইউরোপের আরো কিছু দেশে মূল্যে এবং বিনামূল্যে আমার পাওয়া অভিজ্ঞতা। আর এই লেখার একটা স্পেশাল শর্ত আছে তা হইলো আপনি চাহিলেই লেখাটি পড়া বন্ধ করতে পারবেন না। পড়া বন্ধ করলে আমি রাগ হবো। আমি রাগ নিয়ে লিখতে পারি না।

আমি না লিখলে এরা আর আমার লেখা ছাপাবে না। তখন আপনি কী পড়বেন? ছাইপাশ? তাই বলছি, যেহেতু বিদেশ ভালো সেহেতু বিদেশ নিয়ে আজাইড়া লেখাপড়াও ভালো। পড়তে থাকুন।

আজকে যেহেতু ল্যাড়পাবাজি চলবে তাই কিছু খুচরা গল্প বলবো।

প্রথমে বার্লিন। বার্লিন বিষয়ে দুইটা প্রাথমিক জিনিস আপনাকে জানতে হবে। এক. বাংলাদেশ থেকে বার্লিনের কোন বাস ছাড়ে না। সুতরাং ভ্রমণে ভরসা বিমান আর পা’এ হেঁটে ট্রাই করতে পারেন। দুই. বার্লিন এয়ারপোর্টের উচ্চারণ হলো ‘টেগেল’, ‘টেজেল’ নয়।

আমি যেদিন প্রথম বার্লিনে পা রাখি কেমন একটা ঢাকা ঢাকা গন্ধ আমার নাকে লেগেছিলো। মনে হচ্ছিলো প্রচণ্ড শীতের মধ্যে শাড়ি পরে সাবিনা ইয়াসমীন ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘সন্ধ্যার ছায়া নামে এলোমেলো হাওয়া’ গান গাইছেন আর বার্লিন শহর আমাকে ওয়েলকাম করছে।আমি বার্লিন থেকে এবার একটু দুই ঘণ্টার দূরত্বে যাচ্ছি। ইস্তানবুল। ইস্তানবুলে আমার ট্রানজিট ছিলো চার থেকে সাড়ে চার ঘন্টা। ইস্তানবুল এয়ারপোর্টে বিশ্ব সুন্দরীরা সবাই পার্ট-টাইম জব করে বলে আমার মনে হয়েছে। আপনি গিয়ে তাদের কাউকে না পেলে আপনার দূর্ভাগ্য।

যা হোক সেই এয়ারপোর্টেও সব ভালোর মধ্যে খারাপ হলো দোকানদাররা। একটু খেয়াল না করলেই আপনারে ধরায়ে দিবে টার্কিশ কয়েন যতোই আপনি ডলার আর ইউরো দেন। অতএব শয়তান সাবধান। টার্কিশদের ব্যবহার দেখে ক্ষণে ক্ষণে আপনার যদি ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’ এই প্রবাদ মনে পরে, তবে আমার ইমেইল অ্যাডড্রেসখানা ব্যবহার করে আমাকে মনে করতে পারেন।

চলেন আবার ফেরত বার্লিন যাই। আমার প্রথমদিন বার্লিনে স্থায়িত্ব ছিলো মাত্র ঘন্টা দেড়েক। বার্লিনে গিয়ে আপনি নগর পরিকল্পনা কী- তা দেখবেন। দেখবেন ব্যস্ত রাস্তায় শেয়ালের পারাপার। শহুরে বন। দেখবেন আর দয়া করে ভাববেন কেন আমাদের সুন্দরবন বাঁচানো দরকার।

অবাক নয়নে বার্লিন দেখতে দেখতে আপনি রাস্তা পার হবেন তবে তার জন্য আপনাকে সিগনাল মানতে হবে। জার্মানির রাস্তায় গাড়ি যে নিয়মে চলে একই নিয়মে মানুষজন হাঁটে ফুটপাথে। আপনি আউসল্যান্ডার মানে বৈদেশি হয়ে নিয়ম ভাঙার চেষ্টা করলে বা না জানলে কেউ একজন আপনাকে এসে নিয়ম শিখিয়ে দিয়ে যাবে। আমাকেও দিয়েছিলো।যেহেতু আপনারে জর্মন দেশে নিয়াই আসছি এবার একটু সিরিয়াস হই। এই দেশ একটু সিরিয়াস। মানে একটু না ভালোই সিরিয়াস। এদের সবকিছুর জন্য আইন আছে। সেসব আইন আবার পার্লামেন্টে পাশ করা। যেমন স্ট্রাসে (স্ট্রিট) বানান করতে ‘ডাবল এস’ ব্যবহার না করে ‘এসসেট’ ব্যবহার করা বাঞ্চনীয়- এটাও আইনে আছে।

জর্মনরা সময়ের ব্যাপারে ‘পুয়ংকটলিশ’। এই  শব্দের মানে সময়মতো জেনে নিলে ভালো করবেন। আর যদি না জানেন তবে বলে দেই কী হতে পারে। একটু শক্ত হউন। ‘পুয়ংকটলিশ’ শব্দের মানে না জানাতে আমার কী হয়েছিলো তার একটা উদাহরণ দিচ্ছি: একবার এক রমণীর (ভাবুন কদাচিত প্রেমিকা) জন্য অনলাইনে গিফট কিনেছিলাম (কী গিফট কিনেছিলাম জানতে চাইলে ইনবক্স করুন)। তো কম্পেয়ার সি মিয়ারক্যাত ডটকম সেই গিফট সোর্স করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেশ থেকে। আমার গিফটের জন্য আমার ডিউটি দেবার কথা ছিলো। ডিউটি পে করার জন্য ওরা আমাকে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে যেতে বলেছিলো।

যেহেতু আমার পিতামহের জন্ম বাংলাদেশ আমি সেখানে গিয়ে পৌঁছেছিলাম অফিস বন্ধ হয়ে যাবার মিনিট পনের পর। তারা আমাকে আরও একটা সুযোগ দিয়েছিলো আমি নেইনি। কারণ আমাদের রক্তে বয়ে চলা বহুকণিকার এক কণিকার নাম ডিউটি ফ্রি। কর-ফর আমরা ভালা পাই না।

যা হোক তারা আমাকে রেজিস্টার্ড পোস্ট পাঠালো। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিন অফিস আমার অ্যাপার্টমেন্ট ডর্ম থেকে পায়ে হেঁটে প্রায় ১০ মিনিট সাইকেলে দুই মিনিট কিন্তু আমি পৌঁছলাম প্রায় একমাস পর। এর পরেরটা ইতিহাস.. সেই ইতিহাস গুণতে আমার ফেঁটেছে.. (শূন্যস্থান আগামী পর্বে পূরণ হবে) তবে তা শুনে আপনার হৃদয় ফেঁটে যেতে পারে, আমাকে জড়িয়ে ধরে একটু কাঁদতে ইচ্ছা হতে পারে.. লেখার প্রথম পর্বেই এতোটা ইমোশন আমি নিতে পারবো না।

২.

ওহ হো!! ভালো কথা। জর্মনদেশে আসার সময় সাথে করে অবশ্যই একটা এক ইউরো’র কয়েন আনতে হবে।

তা না হলে এয়ারপোর্টময় নিজের মালামাল নিজেরই বহন করতে হবে, কোন ট্রলি পাওয়া যাবে না। কারণ একটা এক ইউরোর কয়েন দিয়ে গোত্তা দেওয়ার পর একটা ট্রলি অনেকগুলি ট্রলি থেকে আলাদা হবে। আর যেহেতু মানুষ মাত্র পয়সা ভালবাসে তাই সে ইউরোর লোভে নির্দিষ্ট স্থানে ট্রলিটা রেখে আরেকখানা ট্রলির কি বা চাবি দিয়ে গোত্তা দিয়ে ইউরোটা উদ্ধার করবে।

এটাই চমৎকারী নিয়ম। গোটা জার্মানির কোথাও যত্রতত্র ট্রলি ঘোরাফেরা করে না। এদের ট্রলিরাও ‘মানুষ’। আই মিন জর্মন মানুষ।

তো যা হলো আর কি.. জিনিসের দাম ৩৪ ইউরো, ট্যাক্স আসছে ৮ ইউরো। যেহেতু আগেই বলেছি  ‘আমি ট্যাক্স কেন দিবো’ দেশের মানুষ, তাই সময়মতো ট্যাক্স দেই নাই। ট্যাক্সের চিঠি পাত্তা না দিয়ে সামারে চলে গিয়েছিলাম ক্রোয়েশিয়াতে রিসার্চ করে দুটো বাড়তি পয়সা কামাবার আশায় (সেই গল্প আসিতেছে)।তারপর যখন চিঠি খাওয়ার পরও ট্যাক্স দেই নাই এবং বিপদ বুঝে যখন ট্যাক্স দিতে গেছি ততদিনে ‘সল’ মানে কাস্টমস আমার ট্যাক্স না দেওয়ার কেইসটি বিক্রি করে দিয়েছে একটা প্রাইভেট  কোম্পানির কাছে। যাদের ধ্যান এবং জ্ঞান পয়সা উসুল করা ।

এরা আবার আমার বকেয়ার উপর জরিমানা হিসাবে প্রতিদিন যোগ করেছে প্রায় ৫৪ সেন্টস’র মতো। এসব দেখে আমার তখন ত্রাহি মধুসূদন টু মাইকেল জ্যাকসন অবস্থা। আমিও কম যাইনা, ভাবলাম দোষ চাপাই ফেডেক্স কোম্পানি’র ঘাড়ে। কারণ তারা তো জিনিসটা ডেলিভারির সময় আমার কাছে ট্যাক্সের ব্যাপারটা বলতে পারতো, তাই না!

গেলাম ‘কাস্টমস বাবা’র দরবারে। মাথা ঠুকে, পা ঠুকে, নানা রকম কসরত এবং খানিকটা ভরতনাট্যম করে কাস্টমসকে সশরীরে গিয়ে অনেক বোঝালাম…।

সেখানে দায়িত্বরত ভদ্রলোক আমার কথা বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম, যাহ্ এই বুঝি বুঝে গেলো বাছাধন!

সবশেষে হাতের ঘড়ির দিকে  তাকিয়ে তিনি আমাকে বললেন- “সবই তো শুনলাম। তোমার সমস্যাটাও বুঝলাম। কিন্তু যদি আর কিছুক্ষণ আগে ট্যাক্সটা পে করে দিতে তাহলেও অন্তত কিছু সেন্টস কম জরিমানা হতো।”

ইহা আমি কি শুনিলাম?  আমি আমার কানে হাত দিয়ে দেখলাম কান কানের জায়গায়, হাত হাতের। আমার পেট আর পকেট একসাথে মোচড় দিয়ে উঠলো। একবার ভাবলাম টেবিলের তল দিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলি।কিন্তু সেখানেও সমস্যা। ব্যাটার টেবিল আছে ঠিকই কিন্তু টেবিলের সামনে ফাঁকা নাই।যাই হোক সেদিন ৩৪ ইউেরো দামের জিনিসের জন্য ৬৪ দশমিক ৮৪ ইউরো ট্যাক্স, প্রসেসিং ফি এবং জরিমানা শোধ করে যেই জ্ঞান অর্জন করলাম তাহা হলো- জর্মন দেশের  অফিসের টেবিলের যেহেতু সামনে কোন ফাঁকা নাই তাই টেবিলের তল দিয়ে কিছু  হয় না।

মনকে সান্তনা দিলাম-পয়সা হাতের ময়লা কিন্তু জ্ঞান তো চায়নিজ চিজ। হোক না আক্কেল সেলামি তবু জ্ঞান তো অর্জন করলাম।

নিজের বেয়াক্কেলির গল্প বাদ। একটু রোমান্টিক হই। আসেন জর্মন দেশের রমণীদের নিয়ে একটু গল্প করি। ইউরোপে প্রবেশের পূর্বে আমার বহুবছর ধরে জর্মনবাসিনী এক বান্ধবীর কাছ থেকে আমি খানিকটা কৌশলে খানিকটা লজ্জায় জর্মন মেয়েদের এশিয়ান ছেলেদের বিষয়ে.. আই মিন বুঝতেই পারছেন.. জেনে নিয়েছিলাম।

তো আমার বান্ধবী বলেছিল- শোন তুমি হলা টিডিএইচ। মানে টল, ডার্ক অ্যান্ড হ্যান্ডসাম। তোমার হবে।

আমার এই ‘হবে’ শুনেই মনে হয়েছিলো আমি জর্মন দেশে হেলেদুলে প্লেন থেকে নামবো আর দুপাশ থেকে জর্মন ব্লন্ড রমণীরা আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে। আবার কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে ছুটে আসবে আমার দিকে।

তো জর্মনে সবসময়ই আমি আমার সাথে ‘আমার হবে‘ ফিলিংস নিয়ে চলাফেরা করতাম। প্রথম সপ্তাহের ঘটনা। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মেনসা’ মানে ক্যান্টিনে খাচ্ছি। এক জর্মন তরুণী ব্লন্ড কিন্তু ড্রেডলক। আয়তনয়না। আমার টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে ঠিক আমার সামনের চেয়ারে বসে পরলো ।

আমি তো আগেই জানি ‘আমার হবে’.. সো, আমিও বেশ নড়চড়ে.. উঠার আগেই তরুণীর মা-বাবা আমার পাশের চেয়ারে বসে পরলেন। তরুণী আমার নাম জানতে চাইলো। নাম নিয়ে পরলাম মহা মসিবতে । আমাদের অনেকেরই ডাক নাম পাসপোর্টে সারনেইম বা বংশগত নামের জায়গা দখল করে আছে। আমারও তাই।

সুতরাং তাদের কিছুতেই রাজি করানো গেলো না আমার ডাক নাম তুষার ধরে ডাকতে। একটা নাম আমার ঠিক হলো। যেহেতু আমি জানি ‘আমার হবে’ই হবে, আমি নামে কোন  আপত্তি করলাম না। তরুণীর নাম জেনে নিলাম। তার সারনেইমটা আমার বেশ পছন্দ হলো।’সুম্যান’ মানে তার দাদা-পরদাদা জুতার কারবারি ছিলো। আমি তারে ‘হবে হবে ফিলিংস’ নিয়ে বললাম – তোমায় আমি নাম দিলাম ‘সুমন’। এটা শুনে মোটামুটি সে খেঁকিয়ে উঠলো ।

জর্মন আর ইংলিশে সে যা বললো তার মোটমুটি মানে দাঁড়ালো- ‘খ্যাতা পুড়ি ব্যাটা তোর সুমনের। আমারে এই নামে ডাকবা না। আমার বাপ-দাদার পেশা ধরে আমারে ডাকবা কেন?’ ঝাড়ি খেয়ে আমার ‘টি’ এবং ‘এইচ’ গেল উড়ে। আমি ডি মানে ডার্ক হয়ে পরে রইলাম। সে যাত্রায় আমার আর হলো না।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: