মগের মুল্লুকে এক হপ্তাহ

মূল লেখার লিংক
img_1198
বার্মা যাচ্ছি শুনে গোত্রবর্ণ (ও স্বভাব) নির্বিশেষে সকল শুভানুধ্যায়ী ভুরু কুঁচকে তাকালেন। কেউ কেউ আলটপকা বলেও ফেললেন, ওহে, নৌকায় চড়ে যাচ্ছ নাকি সাঁতরে যাচ্ছ? এসব কথা গায়ে না মেখে মার্চ মাসের এক সকালে চেপে বসলুম উড়োজাহাজে।

ঘন্টা দুয়েক পর পৌঁছে গেলাম ইয়াঙ্গন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ইমিগ্রেশনের গেরো পেরিয়েই পড়লাম অভাবনীয় চক্করে। বনবন করে মাথা ঘুরতে লাগল। যারা মায়ানমার যাবেন, তাদের জন্যে বলছি। এবেলা কানখাড়া করে শুনে নিন।

মার্কিন ডলারের যে নোটখানা মানি এক্সচেঞ্জে ভাঙাবেন, তা কেবল কড়কড়ে হলেই চলবে না। হতে হবে একদম নিখুঁত। কোনোধরনের কলমের দাগ, স্ট্যাপলারের পিনজনিত ফুটো কিংবা সিলছাপ্পড় থাকলে সে নোটখানা আর নেবে না বার্মিজরা। অনেক দৌড়াদৌড়ির পর চলনসই নোটগুলো ভাঙিয়ে রওনা দিলাম ডাউনটাউনের দিকে।

দেখলাম শহরের রাস্তাগুলো বেশ প্রশস্ত। মোড়ে মোড়ে সার্জেন্ট দাঁড়িয়ে নেই। তবু সবাই দিব্যি সিগনাল মেনে চলছে। হোটেলে পৌঁছলাম সন্ধ্যার পরে। ইয়াঙ্গন মায়ানমারের ব্যস্ততম নগরী হলেও রাত আটটার পর অধিকাংশ পথঘাট শুনশান হয়ে পড়ে।

পরদিন কাকডাকা ভোরে হাঁটতে বেরিয়ে ঢুঁ দিলাম কাঁচাবাজারে। মাছ মাংস আর শাকসব্জির পাশাপাশি দেদারসে বিক্রি হচ্ছে রংবেরংয়ের ফুল। অফিস আদালত দোকানপাট সবখানেই ওদেশের মানুষ ফুল সাজিয়ে রাখে। ইয়াঙ্গনের আরেকটা বিশেষত্ব হলো, মানুষের চেয়ে কবুতরের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আগলে রেখে নগরায়নের যে চেষ্টা তা করছে তা দেখে ভারি ভালো লাগল।
img_1026-1
এরপর হাজির হলাম মহাবনডুলা পার্কে। পার্কের পাশেই ব্রিটিশদের বানানো আদালত ভবন। আরেকপাশে সিটি হল। যার চারদিকে রয়েছে সুলে প্যাগোডা, বাঙালি সুন্নী জামে মসজিদ, ইমানুয়েল ব্যাপ্টিস্ট চার্চ ও হিন্দু মন্দির। সময় নিয়ে এসব ঘুরে দেখছি। এদিকে সূর্যও চলে গেছে মধ্যগগনে। তাপমাত্রা প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস! অগত্যা ঠাণ্ডা ফলের শরবত খেয়ে গলা ভেজালাম। ওদেশে গিয়ে সস্তা এবং ভেজালবিহীন ফল না খাওয়া বোকামিই বটে। কিছুক্ষণ জিরোনোর পর বিকেলনাগাদ হাজির হলাম শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের মাজারে।
img_1109
img_6194-1
ওখানকার পরিবেশটাই এমন যে কল্পনার ট্রেন একরাশ ধোঁয়া উড়িয়ে অবশ্যই আপনার মনকে উদাস করে ফেলবে। বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি বাহাদুর শাহ ব্রিটিশদের কাছে পরাজিত হলেন। তার জীবনের শেষ দিনগুলো গৃহবন্দী হয়ে কাটল অজানা বার্মা মুলুকের ছোট্ট এক কুটিরে। মৃত্যুর পরও রেহাই পেলেন না। দায়িত্বরত ব্রিটিশ অফিসার লুকিয়ে ফেলল রাজ্যহারা সম্রাটের আসল কবর। মুঘল সম্রাটের মতোই করুণ পরিণতি হয়েছিল শেষ বার্মিজ রাজা থিবো মিন-এর। রাজপ্রাসাদ দখলের পর ব্রিটিশরা রাজাকে প্রাণভিক্ষা দিয়ে নির্বাসন দেয় ভারতের রত্নাগিরিতে। ঔপনিবেশিক শাসনের গ্লানিময় কাহিনীগুলো ভাবতে ভাবতে বেরিয়ে এলাম মাজার থেকে। চললাম নিকটস্থ হ্যাপি অ্যামিউজমেন্ট পার্কে।

ইয়াঙ্গন শহরে বিশাল কয়েকটা লেক ও পার্ক রয়েছে। প্রত্যেকটিই পরিচ্ছন্ন। মানুষজন সেগুলোতে সপরিবারে বেড়াতে যায়। সবুজ ঘাসের ওপরে বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করার সুযোগ পায়। পার্কে চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকলেও তরতাজা অনুভূতি হয়। আর এই পার্ক থেকে যেহেতু বিশ্ববিখ্যাত শোয়েডাগন প্যাগোডা দেখা যায়, এর আকর্ষণ অন্যরকম। শেষ বিকেলের আলোয় প্যাগোডার সোনালি চূড়া বেশ দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে।
img_1198
img_1217
পরদিন গেলাম রাজধানীর খুব কাছের ডালা দ্বীপে। ফেরিতে মাত্র ২০ মিনিটের পথ। সুনামিতে বিধ্বস্ত এই দ্বীপের মানুষ দারিদ্র্যের চাবুকে দিশেহারা। সুপেয় পানির সংকট। পরিবেশ রুক্ষ, অস্বাস্থ্যকর। এখানে গিয়ে আরেকবার উপলব্ধি করলাম পরিপাটি সাজানো নগরেরও থাকে একটা কালিমাখা চেহারা। যা সে সবার কাছ থেকে সযত্নে লুকিয়ে রাখে।

রাতের বাসে রওনা হলাম মান্দালয়ের উদ্দেশ্যে। আন্তঃনগর বাসগুলোর সার্ভিস বেশ ভালো। তবে, সাথে ইয়ারফোন রাখা উচিত। কারণ, কোনো কোনো বাসে সারারাত গান বাজায়। ১০ ঘন্টার জার্নি শেষে ভোরে পৌঁছলাম। রাজপ্রাসাদ জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান হলেও আমরা আগ্রহী ছিলাম মান্দালয় পাহাড়ের ওপর থেকে সূর্যাস্ত দেখার ব্যাপারে। বিধি বাম! আকাশে ঘন মেঘের ভিড়। সূর্য দু-একবার উঁকি দিলেও আশ মিটল না। তবে আল্লাহ এই লোকসান কড়ায় গণ্ডায় পুষিয়ে দিলেন পরদিন।
img_1364
ট্যাক্সিতে চড়ে দিনভর শহরের আশপাশ চষে বিকেলে দেখতে গেলাম প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ উ-বেন ব্রিজ। পুরোটাই কাঠের সেতু। বৌদ্ধ ভিক্ষু, নানান দেশের পর্যটক আর স্থানীয় মানুষের জমায়েতে প্রাণবন্ত পরিবেশ। সূর্যাস্তের ঠিক আগে নেমে এলো অদ্ভুত এক নীরবতা। প্রকৃতির সাথে কেউ যদি সেই মূহুর্তে একাত্ম হয়ে যেতে পারে, প্রাপ্তির খাতা ভরে উঠবে দ্রুতই।
img_1410
ব্রিজ থেকেই সোজা বাস স্টেশনে। গন্তব্য শান প্রদেশের নয়নাভিরাম ইনলে লেক। এখানে যেতেও লেগে গেল সারারাত।
img_6938
সকালের নাশতার পর নৌকা ভাড়া করে বেরিয়ে পড়লাম। দুর্লভ প্রজাতির শামুক ও মাছের নিবাস ইনলে লেকের বুকে গড়ে উঠেছে ভাসমান বাড়িঘর, ফুলের বাগান ও বাজার।

ছোটবেলায় সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে পড়েছিলাম বার্মিজ নারীরা গলা লম্বা করার জন্যে বিশেষ একধরনের শেকল পরিধান করে। চাক্ষুষ দেখার সুযোগ হলো এবার। ঐতিহ্যবাহী বার্মিজ কুটির শিল্পের পসরা সাজানো রয়েছে একেকটি গ্রামে। পশ্চিমা পর্যটকরা চড়াদাম দিয়ে মহানন্দে কেনে ছাতা, সিল্কের পোশাক ও কাঠের মূর্তি। সন্ধ্যানাগাদ ফিরে এলাম নিকটবর্তী পাহাড়ি শহর নিয়ং শোয়েতে।
img_1632
পরদিন ভোরে ইয়াঙ্গনের উদ্দেশ্যে ফেরতযাত্রা। আগেই শুনেছিলাম যে, নিয়ং শোয়ে থেকে ফেরার সময় অপূর্ব সব দৃশ্যের সন্ধান মেলে। আসলেই তাই। আঁকাবাঁকা সর্পিল পথের দুধারে লম্বা লম্বা গাছের দীর্ঘ সবুজায়ন। প্রায় ১১ ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে রাতে পৌঁছলাম ইয়াঙ্গন। এবার দেশে ফেরার পালা।

বিকেলে ফ্লাইট। তাই সকালে ভাবলাম ঘন্টাদুয়েকের জন্যে বোজিয়ক অং সান মার্কেট ঘুরে কিছু স্যুভেনির সংগ্রহ করা যাক। ব্রিটিশদের বানানো এই মার্কেট বিদেশি ট্যুরিস্টদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে দরদাম করার ক্ষেত্রে সাবধান। কোনোপ্রকার সংকোচ করলে একদম ঠকে যাবেন। খেযাল করলাম, বার্মিজ বিক্রেতাদের সবচেয়ে বড় গুণ তাদের ধৈর্য আর হাসিমুখে কথা বলতে পারা।

অবশ্য পুরো ভ্রমণেই মুগ্ধ হয়েছি সেদেশের মানুষের সাথে পরিচিত হয়ে। পর্যটকদের প্রতি তারা অত্যন্ত সহযোগিতাপরায়ণ ও আন্তরিক। প্রতিবেশি দেশ অথচ কত অপরিচিত তার জীবনযাত্রার ধরন ও সংস্কৃতি! দূর ভবিষ্যতে হয়তো আরো গভীরভাবে জানার সুযোগ ঘটবে- এই প্রত্যাশা নিয়েই হাওয়াই জাহাজে উঠে রওনা হলাম দেশের পথে।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: