সেই ‘টাই’ টেস্ট শেষ করে দিয়েছিল যাঁর ক্যারিয়ার

মূল লেখার লিংক
আঙুল তুলে দিয়েছেন ভি বিক্রমরাজু, গ্রেগ ম্যাথুস যাঁকে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে সাহসী আম্পায়ার’—ছবি: ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া।
বল হাতে গ্রেগ ম্যাথুস। ব্যাটসম্যান মনিন্দর সিং, নন-স্ট্রাইকিং প্রান্তে রবি শাস্ত্রী। চতুর্থ ইনিংসে জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার দেওয়া ৩৪৮ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে ভারত তখন ৯ উইকেটে ৩৪৭। ম্যাচের আর মাত্র দুটি বলই বাকি।

ম্যাথুস বল করলেন। মনিন্দর সিংকে ঘিরে থাকা অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ডাররাও এলবিডব্লিউর আবেদন করলেন জোরেশোরে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আঙুল তুলে দিলেন আম্পায়ার ভি বিক্রমরাজু। মনিন্দর সিং হতাশায় মাথা নাড়ছেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান ফিল্ডারদের সেটি দেখার সময় কোথায়, ওরা মেতে উঠলেন উচ্ছ্বাসে!

টেস্ট ‘টাই’ হলো। ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় এবং এখন পর্যন্ত শেষ ‘টাই’। শুধু এ কারণেই এই টেস্টটা ক্রিকেট ইতিহাসে আলাদা জায়গা পাওয়ার দাবি রাখে। তবে চেন্নাইয়ে ১৯৮৬ সালের ওই টেস্টটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে আরও অনেক কারণে। ওই টেস্টেই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ডিন জোন্সের ডাবল সেঞ্চুরিটাকে এখনো টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সাহসী ইনিংস বলে মানা হয়। প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতার মধ্যে যেটি তাঁর ক্যারিয়ারেরও মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেঞ্চুরি করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক অ্যালান বোর্ডার, ওপেনার ডেভিড বুন ও ভারতীয় অধিনায়ক কপিল দেবও। দুই ইনিংস মিলিয়ে গ্রেগ ম্যাথুস পেয়েছিলেন ২৪৯ রানে ১০ উইকেট। ক্যারিয়ারে ওই প্রথম ও শেষবার টেস্টে ১০ উইকেট এই অফ স্পিনারের।

চেন্নাই টেস্ট তাই অনেকেরই ক্যারিয়ার গড়ে দিয়েছিল। আবার দুর্ভাগ্যজনকভাবে ওই টেস্ট দিয়েই শেষ হয়ে গিয়েছিল একজনের ক্যারিয়ার। না, কোনো খেলোয়াড় নন। মনিন্দর সিংকে এলবিডব্লিউ দেওয়া আম্পায়ার ভি বিক্রমরাজু! চেন্নাই টেস্টের পরে আর কোনো দিন টেস্টে আম্পায়ার হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগই পাননি! অথচ আম্পায়ার হিসেবে ক্যারিয়ারে ওটা ছিল তাঁর মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট।

ওই সময় টেস্টে নিরপেক্ষ আম্পায়ারের নিয়ম ছিল না। স্বাগতিক দেশের আম্পায়াররাই দায়িত্ব পালন করতেন। ভারত-পাকিস্তানের আম্পায়ারদের ‘নিজ দলপ্রীতি’ নিয়ে তো নানা রকম গল্পও ছিল। ওই জায়গা থেকে ভারতীয় একজন আম্পায়ারের এমন সিদ্ধান্ত বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তবে ভি বিক্রমরাজু সমালোচিতই হয়েছেন বেশি, সেটিও তাঁর নিজের দেশেই। বলা হচ্ছিল, নিজেকে বেশি নিরপেক্ষ প্রমাণ করতে গিয়েই এমন ‘বাজে’ একটা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। ম্যাচ শেষের পর থেকে আজ পর্যন্ত মনিন্দর সিং দাবি করে আসছেন, বল তাঁর প্যাডে লাগার আগে ব্যাটে লেগেছিল। আবার ভি বিক্রমরাজুও সব সময় দাবি করে এসেছেন, তিনি সঠিক সিদ্ধান্তই দিয়েছিলেন। এবিসি রেডিওর সঙ্গে ২০০৭ সালে এক সাক্ষাৎকারেও বলেছেন, ‘ওর (মনিন্দর সিং) ব্যাট প্যাডের ধারে-কাছেও ছিল না, ব্যাট বলের কাছেই যায়নি। সুতরাং আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, আর সে-ও উইকেটের সোজাসুজিই ছিল।’

ভারত জিততে পারেনি বলেই তাঁকে মিথ্যা দায় দেওয়া হয়েছে বলেই মনে করেন ভি বিক্রমরাজু, ‘টেস্ট টাই হয়েছিল। কিন্তু ভারত জিততে চেয়েছিল। সেটি পারেনি বলেই আমাকে বলির পাঁঠা বানানো হলো।’
বোলার গ্রেগ ম্যাথুস অবশ্য পরে ভি বিক্রমরাজু সম্পর্কে বলেছেন, ‘এ পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে সাহসী আম্পায়ার।’ ম্যাথুসের ওই ওভারে ক্লোজ ইনে ফিল্ডিং করছিলেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক অ্যালান বোর্ডার। তিনি অবশ্য পরে স্বীকার করেছেন, সিদ্ধান্তটা তাঁর কাছেও বিতর্কিত মনে হয়েছিল।
ব্যাট তুলে মনিন্দর সিং বোঝাতে চাইছেন, বল প্যাডে লাগার আগে তাঁর ব্যাটে লেগেছিল—ছবি: ইএসপিএন-ক্রিকইনফো
ভি বিক্রমরাজুর ওপর রাগ পুষে রাখেননি মনিন্দর সিং কিংবা রবি শাস্ত্রী কেউই। তবে বল যে মনিন্দর সিংয়ের ব্যাটে লেগেছিল, এই দাবি থেকেও কখনো সরেননি তাঁরা। ২০০১ সালে এক সাক্ষাৎকারে মনিন্দর সিং যেমন বলেছেন, ‘আমি নিশ্চিত, আম্পায়ার নার্ভাস ছিলেন। আমি খুব বিস্মিত হয়েছিলাম, কারণ আমি বলটা খেলার আগেই তিনি আঙুল তুলে দিয়েছিলেন। মানে প্রায় খেলার আগেই আর কী! এতেই বোঝা যায়, তিনি নার্ভাস ছিলেন, তবে এটাও খেলারই অংশ।’

আর খেলার অংশ বলেই এ নিয়ে আর আক্ষেপ নেই মনিন্দরের, ‘ওই সময় আমার মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল। রবিও (শাস্ত্রী) মাথা গরম করেছিল। কিন্তু যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এখন আমি বুঝতে পারি, আম্পায়ার কতটা চাপে ছিলেন।’

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: