প্রবাসী এক ছাত্রের জীবনকাহিনি

মূল লেখার লিংক
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
আজ ছয় বছর ধরে তুষার অস্ট্রেলিয়ায়। দেশে যেতে খুব ইচ্ছে করছে। বিভিন্ন কারণে তা আর হয়ে উঠছে না। প্রথম দুই বছরেই মাস্টার্স শেষ হয়। তারপর মাইগ্রেশন পাওয়ার যুদ্ধ শেষ হতে বেশ সময় লেগে যায়।
পারমানেন্ট রেসিডেন্সির আবেদন জমা করার আগে আইইএলটিএস (ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টেস্টিং সিস্টেম) দিতে দিতে শেষ পর্যন্ত কান্নাকাটি অবস্থা। স্কোর ওঠে না। টেস্ট শুরুর আগে শরীরটা কাঁপতে শুরু করত। চোখদুটোও অন্ধকার হয়ে আসত। ঠিক ওই সময়টায় তার মনে হতো ফাঁসির রজ্জু গলায় পড়ানোর আগে কয়েদির মনের অবস্থা বুঝি এমনই হয়। অবশেষে স্কোর এলেও ওই ইংলিশ টেস্ট সে কতবার দিয়েছিল আজ হিসাব করতেও তার ভয় করে। তারপরও মনে কোনো দুঃখ নেই। কারণ, তার বৈশিষ্ট্যই এমন। জীবনে তার কোনো সফলতাই সহজে আসেনি। আর মাইগ্রেশনের মতো এত বড় বিষয়টি সহজেই হয়ে যাবে, এমনটি সে ভাবত না কখনো। দুদিন আগে পাসপোর্ট পেয়ে অতি আগ্রহে সেটি খুলে দেখল, পাসপোর্টের প্রথম পাতাতেই লেখা আছে তুষার রহমান। ন্যাশনালিটি অস্ট্রেলিয়ান। মনে মনে কিছুক্ষণ হেসে বলল, ও আচ্ছা। আমি বাঙালি। আর তোমরা আমাকে বানিয়ে দিলে অস্ট্রেলিয়ান। যাক, মন্দ কী।

এ দেশের সব ধরনের ভিসা ফরমে একটা কথা লেখা থাকে ‘পিপল আওয়ার বিজনেস।’ তুষার বরাবরই এটা লক্ষ করে এসেছে। মনে মনে হিসাব করে দেখল, পাসপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত এ ছয় বছরের সংগ্রামে নিজের খরচ বাদ দিয়ে তার প্রায় আশি হাজার ডলার কেবল পে করতে হয়েছে। হাড়ভাঙা পরিশ্রমে উপার্জিত টাকাগুলো জোঁকের মতো চুষে নিয়ে তারপর আজ এই পাসপোর্ট। রীতিমতো যাকে বলে কইয়ের তেলে কই ভাজা।
রকডেল স্টেশনে নেমে ফেডরিক স্ট্রিট ধরে প্রায় দশ মিনিট হেঁটে গেলেই তুষারের বাসা। কাঠের তৈরি অনেক পুরোনো দোতলা একটা বাড়ির ওপরতলায় থাকে তুষার। দুই রুমের বাসা। এক রুমে থাকে সে নিজে। আরেকটা রুম ইন্দোনেশিয়া থেকে নৌকাযোগে আসা এক বাঙালি রিফিউজির কাছে সাবলেট দেওয়া।

প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত

একজন মাস্টার্স করা ছেলের সঙ্গে সমমানের কেউ একজন থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। এই অতি অল্পশিক্ষিত, নন-প্রাইমারি রিফিউজি কেন? কারণ আছে। এই রিফিউজি সবুজ মিয়া দুই বছর ইন্দোনেশিয়ায় গাধার খাটুনি খেটে যা কিছু আয় করেছিল, তার সবটুকু এক দালালের হাতে দিয়েই তাকে নৌকায় উঠতে হয়। তাদের ওই ছোট্ট নৌকাটি টানা বিশ দিন চলার পর অস্ট্রেলিয়ার পার্থে এসে লাগে। রাত-দিন উত্তাল মহাসমুদ্রের বড় বড় ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাদের নৌকাটি কী করে যে টিকে রইল, তার মুখে এ কাহিনি শুনলে তা যেন সিন্দাবাদের অ্যাডভেঞ্চারকেও হার মানায়। এত কষ্ট করে, জীবন বাজি রেখে এ দেশে এসেও সোনার হরিণটা তাদের প্রায় সময়ই থেকে যায় স্বপ্নেরও অতীত। ইংরেজি প্রায় না-জানা এ রিফিউজিরা মাসের পর মাস কোনো চাকরি পায় না। ভাগ্যগুণে পেলেও অতি অল্প ক্যাশ পেমেন্টের শর্তে মালিকেরা ওদের অমানুষিক পরিশ্রম করায়। অসুখ-বিসুখে কখনো মেডিকেয়ারের সুবিধাও থাকে না। ওই দিকে মহাকাল তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে। একটু সান্ত্বনার আশায় দেশে ফোন দিতেই স্ত্রী-সন্তানদের হাজার রকমের অভিযোগ আর লাগামহীন চাওয়া। শেষে বজ্রপাতে টাসকি খাওয়া আহত পাখির মতো রকডেল অথবা লাকাম্বার বাংলা দোকানের সামনে বসে থাকা।

হায় রে বাঙালি, হায় রে জীবন! এই তাদের সামনেই অজি ইংলিশ প্রেমিক-প্রেমিকারা অর্ধনগ্ন দেহে একে অপরে কোমল শান্তিতে জড়াজড়ি করে ঘুরছে। দুঃখ বলতে এ জগতে কিছু যে আছে, এই অজিরা তা যেন জানেই না। এদিকে বহুদিন পরিবার-পরিজনহারা অসহায় এ রিফিউজি টলমল চোখে কেবল চেয়ে থাকে সেদিকে।
তুষারের আজ ছুটির দিন। এখন সে সপ্তাহে ছয় দিন চাকরি করে। এই ছুটির দিনে বাসায় অনেক কাজ করতে হয়। ছয় দিনের জন্য রান্না করে তরকারিগুলো বক্সের পর বক্স সাজিয়ে ফ্রিজে রাখা। তারপর ওয়াশিং মেশিনের কাপড়গুলো যথাসম্ভব শুকোতে দিয়ে আবার ঘর গোছানো। একটু অবহেলা হলেই সর্বনাশ। সপ্তাহজুড়ে ভোগান্তি।
আজ সকালে সামান্য কিছু নাশতা করে তুষার ড্রয়ার থেকে পাসপোর্টটা বের করে দেখতে লাগল। বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ সেটা নেড়েচেড়ে খোলা জানালায় বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। এই জানালার একটা তাৎপর্য আছে। খোলা জানালা দিয়ে পরিষ্কার দেখা যায় সিডনি এয়ারপোর্ট। বিছানায় শুয়ে সে প্রতিটি প্লেনের অবতরণ-উড্ডয়ন মনভরে দেখে। বড় ভালো লাগে তার। তবে আজকের দেখা কেমন যেন অন্য রকম ঠেকছে। সকালের সোনালি রোদে প্লেনগুলোকেও কেমন হালকা সোনালি দেখায়। এরই মধ্যে মনটা তার কোথায় যেন উড়ে যায়। অনেক স্মৃতি-বিস্মৃতির ভেতর মনটা বিচরণ করতে করতে। একসময় সে নিজেই বলে, দূর! কী আর হবে দেশে গিয়ে…। অস্থির রাজনীতি, ঘুষ আর দুর্নীতি। তেলে ভেজাল, জলে ভেজাল, খাবারে ভেজাল, যানজটে নাকাল শহরবাসী। এমনকি দেশের বাতাসটা পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে। দেশের মানুষের ভেতর আর মায়া মমতা নেই। সবারই মাথার ভেতর জটিল হিসাব ঢুকে গেছে। কাড়াকাড়ি আর কামড়াকামড়ি। ছোটবেলার সেই আদরের পরিবেশ কি আর আছে? আদর যারা করত, ওই মুরব্বিরাও একে একে সবাই গেছে না ফেরার দেশে।

আর বিয়েশাদি? এ কথা মুখে আনাই বোকামি। আমার জন্য মেয়ে দেখবে কে? আর দেশের মেয়েরা এখন যে স্টাইলিশ হয়েছে। ওরে বাপ রে বাপ। এত কষ্টে উপার্জিত টাকাগুলো খরচ করে বিয়ে করা, অ্যাপ্লাই করা, ভিসা হওয়ার পর ভালো একটা বাসা রেডি করে এখানে আনা। কী যে সব বিড়ম্বনা। এত কিছুর পর একদিন দেখা যাবে, মাইগ্রেশন নিয়ে বিপদে পড়া কোনো ছাত্র বা রিফিউজি আমার বউ নিয়ে চম্পট দিয়েছে। শেষে আমার আম-ছালা দুটোই যাবে। থাক ওসব। ভালোই তো আছি। মাসে মাসে মাকে টাকা পাঠাই। আত্মীয়স্বজনকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করি। নিজের মতো রান্না করি, খাই, ঘুমাই। মেয়েমানুষের ক্যাটক্যাটানি নেই। কী দরকার ওই সব ঝামেলায় জড়ানো।

আনমনে নিজের সঙ্গে এভাবেই চলছিল তার বোঝাপড়া। কিন্তু আজ ওই প্লেনগুলোকে উড়তে দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করছে। এখন প্লেনের উড্ডয়ন দেখতেও ইচ্ছে করছে না। কেন যে মনটা তার বারবার খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে। খোলা পাসপোর্টটা চোখের ওপর রেখে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইল তুষার। প্রায় আধা ঘণ্টা কিছু একটা ভেবে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, না, এভাবে পড়ে থাকলে চলবে না। ঘরে সবজি টবজি কিছুই নেই।

সকাল প্রায় দশটা। স্টেশনের পাশের বাংলা দোকান থেকে তুষার বেশ কিছু শপিং করে আনে। এসেই তোড়জোড়ে রান্না শুরু করল। এ সময় তরকারিতে তেল–নুন আর বিভিন্ন মসলার মিল-অমিলের ভেতর তার কেবলই মনে পড়ে দেশের কথা। মায়া জড়ানো নানান স্মৃতি। মা, খালাম্মা, বোন, ফুফুর হাতের রান্না করা প্রিয় খাবারগুলোর কথা আজ বেশি বেশি মনে পড়ছে। তার নিজের রান্না তেমন মন্দ নয়, তারপরও ওই রকম স্বাদ স্বপ্নের মতোই অধরা। মনে মনে বলে, আহা, একটা দিনও খেয়াল করে দেখলাম না কীভাবে যে মা রান্না করে। যদি একটিবার দেখতাম, হয়তো এই প্রবাসে আমার রান্নাবান্নার এই দুর্দশা কিছুটা হলেও লাঘব হতো।

রান্নার প্রায় মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে হঠাৎ করে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায়। প্রয়োজনীয় মসলাগুলো বের করার পর ওপরের কেবিনেটের দরজাটা বন্ধ করতে তার খেয়াল ছিল না। ফ্রাইপ্যান থেকে এক টুকরা মাছ নিচে পড়ে গেলে ওটা তুলে আবার সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ওপরে কেবিনেটের দরজায় প্রচণ্ড আঘাত লাগে তার। এতে কপালের ডান দিকে চোখের ওপরে বেশ একটু অংশ কেটে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষতস্থান চেপে ধরলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতটা ভিজে কপাল বেয়ে রক্ত পড়তে থাকে।

ক্ষতস্থানের যত্ন না নিয়ে তুষার পাগলের মতো অর্ধেক রান্না করা মাছ-মাংস, পাশে কেটে রাখা সবজি আর মসলার পাত্রগুলো লন্ডভন্ড করে ফ্লোরে ছুড়ে ফেলে। তারপর এদিকে এক লাথি, আবার ওদিকে আরেক লাথি। সবকিছু এলোপাতাড়ি ছোড়াছুড়ি। মোটের ওপর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরটাকে কুরুক্ষেত্র বানিয়ে ফেলে। একপর্যায়ে ক্ষতস্থানের রক্ত মুছতে মুছতে দেয়ালে হেলান দিয়ে ফ্লোরে আছড়ে পড়ে তুষার। হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে সে। বার দুই ঢোক গিলে কণ্ঠ স্বাভাবিক করে বলল, যা শালার জীবন। এ দুনিয়ায় আমার কেউ কিচ্ছু লাগে না। আমার কেউ নাই…!

পাশের রুমে সবুজ মিয়া তখন গভীর ঘুমে। সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত তার চাকরি। তাই এ সময় একটু নীরবতা সে স্বাভাবিকভাবেই আশা করে। তুষারের এই চেঁচামেচি আর ধুড়ুমধাড়ুম আওয়াজে সদ্য ঘুম ভাঙা সবুজ মিয়া উঠে আসে। এসব দেখে তো তার হৃৎকম্পন বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা।
তুষার ভাই, ঘটনা কি? বাসায় কি ডাকাত ঢুকেছিল?
তুষার চোখ লাল করে ধমকিয়ে বলল, আরে মিয়া চুপ করেন তো। এই পচা বাসায় ঢুকবে ডাকাত! ডাকাতের আর কাম কাজ নাই তো।

অবস্থা বেগতিক দেখে সবুজ মিয়া তুষারের ক্ষতস্থানের যত্ন নিতে শুরু করে। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার জন্য অনেক অনুরোধ করেও শেষ পর্যন্ত কোনো ফল হয় না। ঘরে ফাস্ট এইডের সামান্য যা কিছু ছিল, তা দিয়েই ব্যান্ডেজ দিলে একপর্যায়ে রক্তক্ষরণ কিছুটা কমে আসে। অবশেষে দুটো পেনাডল খেয়ে ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে শুয়ে পড়লে একসময় নিজের অজান্তেই তুষার ঘুমিয়ে পড়ে।

বিকেলে প্রচণ্ড খিদেয় তার ঘুম ভাঙে। ততক্ষণে সবুজ মিয়া ডিউটিতে যাওয়ার উদ্দেশে বেরিয়ে পড়েছে। অবতরণরত প্লেনগুলোকে অনেক ক্লান্ত মনে হচ্ছে আজ। পাশাপাশি উড্ডয়নরত প্লেনগুলোকে মনে হচ্ছে অনেক হাস্যোজ্জ্বল। হাত দিয়ে তুষার দেখল, ক্ষতস্থানটা বেশ ফুলে উঠেছে। ব্যান্ডেজটাও রক্তে ভেজা। চিনচিনে ব্যথা করছে তখনো। সকালে তেমন কিছু খাওয়া হয়নি। আর এখন এলোমেলো। ঘরটা গুছিয়ে রান্না করে যে কিছু খাবে, এ কথা ভাবতেই তার কেমন যেন ভয় করতে লাগল। লন্ডভন্ড ঘরটার সর্বত্র একবার চোখ ঘুরিয়ে তুষার অচেতনের মতো শুয়েই রইল।

এবার যদিও দৃষ্টি তার বাইরের দিকে, তবুও এ দৃষ্টি যেন বৈকালিক আকাশে উড়ন্ত প্লেনগুলোকে আর দেখছে না। প্রায় এগারো-বারো বছর আগের একটা মায়া স্মৃতি। একেবারে বাস্তব দর্শনের মতো তার চোখের ওপর উদভ্রান্তের মতো খেলা শুরু করে। এত দিন নানান ঝামেলায় এই যেমন সুস্থ-সুন্দর পরিস্থিতির অভাব, নানান উৎকণ্ঠা আর দুশ্চিন্তায় জীবনে সোনালি বিকেল তো ছিলই না। আবার ‘কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই’ গানটির মর্মার্থ খুঁজতে যাওয়া? অন্য কারও বেলায় কেমন সত্য তা বলা না গেলেও তুষারের বেলায় সেটা একেবারেই বৃথা। তাই এই মায়াকে মায়া চোখ দিয়ে দেখা হয়নি কখনো। এ যেন বাধ্য হয়ে জীবনের প্রয়োজনেই সবকিছু মেনে নেওয়া। আজ আর এই মায়াকে অগ্রাহ্য করা যাচ্ছে না। কারণ, এই স্মৃতিকে ঘিরে আছে কতকগুলো অব্যক্ত কষ্ট।

তুষারের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হওয়ার কয়েক দিন পরের ঘটনা। তাদেরই পাড়ার মেয়ে। নাম তাসনিম আক্তার দিপা। তার এক ক্লাস নিচে পড়ত মেয়েটি। তুষারের পরীক্ষা শেষ, তাই তার নোটগুলোর জন্য দিপা আবদার করে বসে। বাড়ি ফেরার পথে দিপাদের বাড়ির সামনে এ নিয়ে চলছিল দুজনের কথাবার্তা। এদিক-ওদিক তাকিয়ে তুষার বলল, আচ্ছা, চলো আমার সঙ্গে। এখনই দিয়ে দেব। কারণ, কে না কে আবার নিয়ে যায়।

বাড়িতে এসে দিপা নোটগুলো নিয়ে তুষারের মায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে চলে যায়।
মা কিছু মনে না করলেও ঘটনাটা তার বড় ভাই কবিরের দৃষ্টি এড়াল না। তাই সন্ধ্যার পর বাড়িতে ঝামেলা না করে তুষারকে ডেকে নিয়ে গেল পুকুরের ঘাটলায়। চারদিকে আবছা অন্ধকার। দু-একটা ঝিঁঝির ডাক। খুব রাগন্ত গলায় সে তুষারকে জিজ্ঞেস করল, কি রে! চইক্কা বাড়ির দিপানিরে দেখলাম তোর লগে হেঁটে বাড়ি পর্যন্ত এল? আবার মায়ের সঙ্গেও প্যাচাল মেরে গেল! এসব আজেবাজে মেয়ের সঙ্গে তোর এত কীসের খাতির?
তুষারের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে হাত-পা কাঁপতে লাগল। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে তার এ বড় ভাই নানা রকম ভিত্তিহীন অভিযোগে তাকে খুব মারধর করত। অবস্থা বেগতিক দেখে তুষার একবার ভাবল, চিৎকার করে মাকে ডাক দেয়। আবার ভাবল, দৌড়ে পালায়। সহসা কোনোটাই হয়ে উঠল না। জড়ানো কণ্ঠে বলতে লাগল, না ভাই, ওসব কিছু না। ও আমার নোটগুলো চাইছিল…।

চুপ কর অসভ্য। আমাকে কচি খোকা ভাবিস! বলেই তুষারের মাথার মাঝ বরাবর একমুঠো চুল শক্ত করে ধরে মিনিটখানেক চলল চড়ের পর চড়, এলোমেলো লাথি। আর যদি কোনো দিন দেখি একেবারে জ্যান্ত পুতে ফেলব।
ভাইয়ের হাতে অকারণে মার খেয়ে আর যা হোক ওই দিন ঝাপসা অন্ধকারে ঘাটলার ওপর লুটিয়ে পড়ে তুষার অকালে পরলোকগত বাবার কথা স্মরণ করে অনেক কেঁদেছিল।

এ ঘটনার পর থেকে কোনো মেয়েকে দেখলেই তুষারের কেমন যেন ভয় করে। টিউশনিকে ভরসা করে ঢাকায় এসে ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা শুরু হয় তার। বন্ধুরা প্রেমের প্রসঙ্গ তুলতেই সে রাগী গলায় বলত, আরে রাখো ওসব। গরিবের আবার প্রেম!

এভাবে নানান ঝক্কিঝামেলার ভেতর দিয়ে অনার্স শেষ করে। এরপর এক শিক্ষকের সহযোগিতায় একদিন তার অস্ট্রেলিয়ার ভিসা হয়। বাড়িতে বিদায় আনতে গেলে মায়ের কান্না আর ভাবির লোকদেখানো মায়া চোখের ভেতর কুটকুটে হাসি আড়াল করে বড় ভাই কবির একসময় বলেই ফেলল, এত দিনে বেক্কলডার একটা গতি হইছে।

দেশে থাকতে তুষারের দিনগুলো এভাবেই কাটত। মায়ের বকা, বড় ভাইয়ের কড়া শাসন নামের অত্যাচার আর ভাবির কুটিল বক্র দৃষ্টি। এসবের ভেতর কপালে কখনো আদর জোটেনি তার। মাঝেমধ্যে খালাম্মা, বড় বোন আর ফুফুদের বাড়িতে যাওয়া। তাও নানা রকম ঝামেলায় বছরে একবার যাওয়ারও সুযোগ হতো না। এসব আর মনে করে কী হবে। আজ তারা কেউ নেই।

কিন্তু আজ…। কী হলো তার? কেন ওই স্মৃতি বারবার এত মনে পড়ছে। কেন মনে এত নাড়া দিচ্ছে অতীত। ওই দিপা আজ আর নেই। খুব মেধাবী ছিল সে। ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়ে ক্লাসমেট এক ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। পিএইচডি করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেই থেকে যায়। ভাবতে অবাক লাগে, জীর্ণ ঘরে জন্ম বলে আজ আর অনুমান করারও উপায় নেই যে ভাগ্যকে জয় করে কোথায় সে চলে গেল। অহংকারীদের চোখ তখনো মানতে চায় না। তাতে কার কী আসে যায়। তবে তুষারের হিসাবে আজ গরমিল ঠেকছে অন্যখানে। দিপা আজ অনেক দূরে চলে গেছে। যাক, তাতে আমার কী? আমি কী অন্যায় করেছিলাম…?
এসব কথা তাকে আজ কেন এভাবে কষ্ট দিচ্ছে সে নিজেও জানে না।

সেবার কলেজ থেকে ফেরার পথে আরেকটা ঘটনা ঘটেছিল। কবিরের শ্বশুরবাড়ির সামনে বড় একটা মাঠ আছে। এ পথেই তুষারকে কলেজে যাওয়া-আসা করতে হয়। কারণ, বর্ষার জোয়ারে সোজা রাস্তাটা গিয়েছিল ডুবে। প্রায় প্রতিদিনই ওই মাঠে ফুটবল, ক্রিকেট আরও অনেক রকমের খেলা চলত। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে ওই মাঠ ঘিরে অনেক লোকের ভিড়। ক্রিকেট খেলা চলছে পুরোদমে। কাছাকাছি এলে ভিড়ের ভেতর থেকে চার-পাঁচ বছরের ছোট্ট একটা ছেলে দৌড়ে এসে তুষারের হাত ধরে অস্ফুট ভাষায় আকুতি জানিয়ে বলল, আপনে আইবেননি আমরার বাইত? আমার আম্মু ট্যাংরা মাছ, আলু আর কামরাঙা দিয়া তক্কারি রানছে।

ছেলেটি তুষারের ভাবির চাচাতো ভাই। ঈদ উপলক্ষে ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি এসে তুষার তাকে নতুন টাকার নোট ঈদি দিয়েছিল। তাই হয়তো মনে রেখেছে সে।
কলেজ থেকে এত দূর হেঁটে বাড়িতে ফেরা। খিদা ছিল খুব। তবুও ভাবির চাচার বাড়িতে গিয়ে খাওয়া! কী করে সম্ভব। ভালো করতে গিয়েও যার দোষের সীমা নেই। সেখানে এই ছোট্ট ছেলেটির আদরমাখা ডাকে সে সাড়া দেবে কোন সাহসে?

প্লেন একটার পর একটা উড়েই চলেছে। ব্রাইটন বিচের ওপর দিয়ে ছোট হতে হতে সেগুলো একসময় অসীম দিগন্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। এমন করেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। কিছুটা দিশেহারার মতো তুষার বাসা থেকে বেরিয়ে এল। অদূরে একটা ছোট্ট পার্ক। সবুজ ঘাসে ছাওয়া। কয়েকটি ছোট ছেলেমেয়ে খেলা করছে সেখানে। তাদের অস্পষ্ট কথাবার্তা শোনা যায়। কলেজ থেকে ফেরার পথে ওই মাঠের মতো দল বেঁধে কোনো খেলা হয় না। বহু লোকের সমাহারে খেলাকে ঘিরে আমোদ-উল্লাসও কোনো দিন হয় না এখানে। ভিড়ের ভেতর থেকে ওই ছোট্ট ছেলেটিও মায়া মাখা হাসিতে কাছে এসে কখনো বলে না ওদের বাড়িতে গিয়ে তার মায়ের হাতে রান্না করা তরকারি দিয়ে ভাত খেতে। এই পরবাসে ফেলে আসা বাংলার ওই মায়া ঘর, শত সাধনায়ও তৈরি করা সম্ভব নয় আর-তুষার তা ভালো করেই জানে। তবে?

সহসা তুষারের বুকের ভেতর থেকে উষ্ণ বাষ্পের মতো এক অপ্রতিরোধ্য আকুতি বেরিয়ে আসে। এখন এই পার্কের এক প্রান্ত থেকে যদি ওই ছেলেটি ছুটে এসে আদরমাখা চোখে তার একটি হাত ধরে বলত, আপনে আইবেননি আমরার বাইত। আমার আম্মু ট্যাংরা মাছ, আলু আর কামরাঙা দিয়া তক্কারি রানছে।
আজ আর কিছুতেই সে ওই ছোট্ট শিশুর আবেদন উপেক্ষা করতে পারত না। ভাবির চাচার ঘরেই সে ওই তরকারি দিয়ে তৃপ্তিসহ খেয়ে আসত। কোনো ধরনের ভয় কিংবা চোখরাঙানি তাকে আটকাতে পারত না। কিছুতেই না।

এসব ভাবতে ভাবতেই একসময় তার চোখ দুটো অশ্রুতে ঝাপসা হয়ে আসে। কী তার কারণ? এখানে কে তাকাবে তার অশ্রুভেজা চোখের দিকে? খিদেয় মাথাটাও কেমন যেন করতে থাকে তখন। টলতে টলতে কয়েক কদম এগিয়ে চোখ মুছে আপন মনেই বলে, দেখি, স্টেশনের বাংলা দোকানে কোনো খাবার যদি পাই। ততক্ষণে ক্ষতস্থানের ব্যথা আরও তীব্র হয়ে দৃষ্টিও ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসে।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: