শব্দগল্পদ্রুম

মূল লেখার লিংক
উপনিবেশের মানুষ হিসেবে আমরা জগদ্দর্শনের জন্যে প্রকাণ্ড কিছু চশমা না চাইতেই পেয়েছি, স্বশাসনের ঝাপটা চশমাগুলো আমাদের চোখ থেকে সরাতে পারে নি। সব ক্ষেত্রে সে চশমা খোলার প্রয়োজনও হয়তো পড়ে নি। মোগলাই-বৃটিশ-পাকি চশমার ভেতর দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে গিয়ে আমাদের দেখার চোখও এখন এমন যে খালি চোখে দেখতে গেলে হোঁচট খেতে হয়। ভাষাও এমনই একটা চশমা।

বাংলা ভাষার যে রূপটাকে আমরা প্রমিত মেনে নিয়ে ব্যবহার করছি, তা যাঁদের হাতে গড়ে উঠেছে, তাঁরা ইংরেজদের ভিক্টোরিয়ান আমলের চশমা অনেকদিন চোখে রেখেছিলেন। প্রমিত বাংলা ভাষায় সে সময় রক্তমাংস যোগ করেছেন সাংবাদিক, কবি, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকেরা, আদালত ও দাপ্তরিক কাজ তখন ইংরেজিতে চলতো (যেমন এখনও অনেকাংশে চলে) বলে এখনও আইন-প্রশাসনের ক্ষেত্রে পরিভাষা খুঁজতে গিয়ে আমাদের হাতড়াতে হয়। আমরা ২০১৬ সালে এসেও বহুলাংশে সে আমলের গোলা ভেঙেই ফসল খাচ্ছি। যাঁদের হাতে আমাদের প্রমিত বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হলো, তাঁরা ইংরেজি চশমার বাইরে হাতড়ে হাতড়ে যে যাঁর শাস্ত্রে খানিকটা আশ্রয় খুঁজেছেন, কিন্তু তাঁদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ আর উপলব্ধিগুলো ইংরেজের উপনিবেশকাণ্ডের প্রত্যক্ষ ফল। আমরা সুযোগ পাওয়ার পরও তাঁদের চেয়ে বেশি কিছু করতে পারি নি, এমনকি সমকক্ষও হতে পারি নি, ইংরেজের ধরিয়ে দেওয়া টিনের চশমা চোখে দিয়ে প্রথমে আমরা নিজেকে দেখেছি, তারপর দেখেছি ভারতবর্ষকে, তারপর দেখেছি বিশ্ব। তাই আমাদের দেখা পৃথিবীর আলো মূলত কয়েক দফা ইংরেজের পরিত্যক্ত নানা চশমা পেরিয়ে চোখে ঢোকে।

হয়তো এ কারণেই হীনমন্যতা আমাদের শিক্ষিত সমাজের মাঝে প্রবল। উদয়াস্ত খেটে ইংরেজি শেখার পর আমরা টের পাই, আমরা বাংলায় নিজেকে ভালোমতো প্রকাশ করতে পারি না। পৃথিবীর খাড়া পাহাড়ে চড়তে গেলে ইংরেজি একাধারে আমাদের লাঠি, মশাল, গাঁইতি, তাঁবু আর মশক। বিদ্যাশিক্ষার মাঝারি স্তর এই ভাষাটি ছাড়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনও দুর্লঙ্ঘ্য। পৃথিবীকে নিজের মতো করে জানতে গেলে আমাদের ভরসা আগে ছিলো বই, এখন গুগল, সেখানেও ইংরেজি ছাড়া গণ্ডি ছেড়ে খুব বেশিদূর এগোনো যায় না। প্রতিদিন নতুন সব প্রপঞ্চ এসে গ্রাস করে নিচ্ছে আমাদের জীবনকে, সেগুলোও ইংরেজিবাহিত (যেমন সেলফি)। জীবিত কবিনামযশোপ্রার্থী যুবক মৃত কবির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বিশেষণ খুঁজে না পেয়ে বলেন, “তাঁর ভাষা ছিলো টোটালিটিময়”।

পাঁজরে প্রথমে ইংরেজ, পরে জাটকা-ইংরেজ পাকিস্তানীদের হাঁটুর চাপ সহ্য করে মাতৃভাষা নিয়ে কাজ করে গেছেন কীর্তিমান কবি-সাহিত্যিকেরা, পরিভাষা নির্মাণের মূল ঝাপটাটা তাঁদের ওপর দিয়েই গেছে। তাঁদের তুলনায় আমরা অনেক, অনেক ফুরফুরে। আমাদের চাপ যেমন নেই, তেমনই দায়টুকুও আমরা কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলেছি (কারণ আমরা টোটালিটিময়)। কিন্তু আমার ভাষায় রক্তমাংস যোগ করে চলার কাজটা তো মঙ্গলগ্রহ থেকে কেউ এসে করে দেবেন না। আমাদের প্রতি জনের নিষ্ক্রিয়তার ফল বা কুফল, সেটা কি কোনো একসময় সবাইকে বহন করতে হবে না?

উদাহরণে আসি। ধরা যাক, আপনি গল্প লিখতে বসেছেন। যাপিত জীবনের গল্প নয়, কোনো জমজমাট রূপকথা। সেখানে সমুদ্রযাত্রার প্রসঙ্গ আছে। জাহাজের বর্ণনা শুরু করতে গেলেই আপনাকে থমকে যেতে হবে। কারণ বাঙালির সমুদ্রযাত্রার সাথে তার ভাষায় সাহিত্য-কাব্য-সাংবাদিকতার যোগসূত্র ক্ষীণ। জাহাজের মাস্তুল পর্যন্ত আপনি লিখতে পারবেন, কিন্তু মাস্তুলের সাথে বাঁধা যে কাঠ থেকে পাল ঝুলে থাকে, তার বাংলা প্রতিশব্দ আপনি জানেন না। ইংরেজিতে একে বলে Yard, কিন্তু বাংলায়? ‌ইংরেজের জীবনে জাহাজের গুরুত্ব এতো প্রবল-প্রকাণ্ড-প্রচণ্ড, যে জাহাজের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রতিটি অংশ, প্রতিটি কর্মী, প্রতিটি কাজের বর্ণনা তার দলিল, সংবাদ ও সাহিত্যে সুলভ। বাংলায় তেমনটা ঘটে নি। বাঙালি নাবিকের জীবন ও কাজ বাংলা ভাষার নির্মাণকর্তাদের বৈঠকখানা পর্যন্ত পৌঁছায় নি, তাই আঞ্চলিক শব্দগুলোও প্রমিত হয়ে ওঠার সুযোগ পায় নি। ইয়ার্ডকে বরিশালের জাহাজি যা বলে (যদি আদৌ কিছু বলে থাকে), চট্টগ্রামের জাহাজি হয়তো তা বলে না (যদি আদৌ কিছু বলে থাকে)। তাহলে আমাদের রূপকথার চাঁদ সওদাগর পাল ঝোলাবে কী থেকে?

ইয়ার্ডের বাংলা প্রতিশব্দের অভাবে কি আমরা সমুদ্রযাত্রা নিয়ে বাংলায় একটা রূপকথা লিখতে পারবো না? জাহাজের অঙ্গে অঙ্গে, প্রত্যঙ্গে প্রত্যঙ্গে আমাকে ইংরেজের ফেলে যাওয়া টিনের চশমা পরে হাতড়ে বেড়াতে হবে?

ইংরেজি ভাষার প্রতি আমার কোনো বিরাগ নেই। আমি এর রূপে ও গুণে মুগ্ধ। যাঁরা ল্যাটিন আর গ্রিক থেকে মূল ধার করে এ ভাষায় নতুন সব শব্দ যোগ করে গেছেন শত শত বছর ধরে, তাঁদের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কিন্তু আমি আগাগোড়া মসৃণ বাংলায় সমুদ্রযাত্রা নিয়ে রূপকথা লিখতে চাই, একটিবারও ইংরেজির কাছে আত্মসমর্পণ না করে। প্রয়োজনে আমি ইংরেজিসহ আরো অনেক ভাষার আঁটি ভেঙে শাঁস খাবো, কিন্তু আস্ত ছেড়ে দেবো না। পথ না থাকলে আমি একটি একটি করে ইঁট ফেলে পথ গড়ে তারপর চলবো।

কারণ আমি বাংলায় সমুদ্রযাত্রা নিয়ে একটি রূপকথা লিখেই থামতে চাই না। আমি দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ লেখাটি যেমন লিখতে চাই, তেমনি দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ লেখকের কলমে ঝরঝরে বাংলায় সমুদ্রযাত্রা নিয়ে আরো রূপকথা পড়তে চাই, যেখানে পূর্বসূরীর অবহেলার হাওয়ার তোড়ে ইংরেজি ডুবোশব্দে গুঁতো খেয়ে গল্পডুবি হয় না। সৈনিকের প্রশিক্ষণের সময় বলা হয়, “ঘাম রক্ত বাঁচায়”। লেখকের প্রশিক্ষণের সময় কি আমরা বলতে পারি না, “লেখকের ঘাম ভাষার রক্তশূন্যতা দূর করে”?

গল্প লিখতে বসে মাতৃভাষায় শব্দের অভাবে থেমে যাকে অন্যের ভাষা হাতড়াতে হয়, পৃথিবীতে সে-ই সবচেয়ে বড় অভাগা। শব্দগল্পদ্রুমের পরবর্তী পর্বগুলো পদে পদে এমন অভাগা হওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখবো।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: