স্ট্যানলী কিউব্রিক

মূল লেখার লিংক

সিনেমায় যতোটা ইন্টালেকচুয়্যাল ছিলেন পড়াশোনায় ঠিক তার বিপরীত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে আর পড়াশোনা হয়নি যুদ্ধ ফেরত ছাত্রদের চাপে । ছাত্র হিসেবে সফল ছিলেন না তাই উচ্চশিক্ষা নেয়ার তাগিদও অনুভব করেননি । তেরো তম জন্মদিনে বাবার কিনে দেয়া ক্যামেরা পেয়ে যেনো আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন । ছোটবেলা থেকে-ই ফটোগ্রাফির প্রতি প্রবল ঝোক ছিলো । স্কুল পর্যায়ে বেশ কিছু পুরস্কারও পান এই ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে । পুরস্কার কাজের স্পৃহা বাড়িয়ে দেয় , কুব্রিকের ক্ষেত্রের ব্যতিক্রম হয়নি । পুরস্কার পেয়ে আরো বেশি ঝুকে পড়েন এই কাজে । ১৯৪৫-৫০, এই পাচ বছরের কয়েক হাজার ছবি তুলে দিয়েছেন লুক ম্যাগাজিনকে । ১৬বছর থেকে লুক ম্যাগাজিনের কাছে নিজের ছবি বিক্রি করতেন সেখান থেকে বেশ নামডাক হয় কিউব্রকের ।

জয় বাবা কিউব্রিকনাথ
ক্যারিয়ারের শুরু করেন দুটি শর্ট ফিল্ম দিয়ে, আর নিজের ফেইস ভ্যালুর কারণে বেশ অর্থ পান যা দিয়ে দুটি সিনেমা নির্মান করেন, যদিও ঐ সিনেমা দুটিকে নিজের সিনেমা মানতে নারাজ হন কিউব্রিক, কারণ কাজ দুটো তার মোটেও পছন্দ হয়নি । এই দুটি কাজের যতগুলো ডিভিডি আছে তা কিনে পুড়িয়ে ফেলেছেন । সিনেমা দুটির পেছনে অনেক শ্রম দিয়েছিলেন কিউব্রিক । প্রথম দিকের কাজ ছিলো তাই দায়িত্বও অনেক বেশি । কিন্তু কাজের ফলাফল তাকে হতাশ করে ।
হতাশ হয়েছেন বার কয়েক কিন্তু হাল ছাড়েন নি, সিনেমা ইতিহাসে সবচে দূরদর্শী ছিলেন স্ট্যানলী কিউব্রিক। তার দূরদর্শিতার প্রমাণও মিলেছে তার নির্মানশৈলীতে । ৯৪এর অন্যতম সেরা সিনেমা পাল্প ফিকশন এবং নোলানের সেরা সৃষ্টি মেমেন্টো স্ট্যানলী কিউব্রিকের দ্য কিলিং সিনেমার হাত ধরে নির্মিত হয়েছে । নির্মিত দুটি সিনেমার প্রধান আর্কষণ ছিলো এর নির্মান কৌশলে । ২০০১ আ স্পেস অডিসীর সেই চন্দ্রঅভিযান । কিউব্রিক কিভাবে এটি করেছেন তা এখনো রহস্যে আবৃত । এক্সট্রিম ক্লোজ শটের প্রবর্তক স্ট্যানলী কিউব্রিক। চরিত্রের পরিপূর্ণ অভিব্যক্তি ব্যক্ত করতে তিনি এই শট ব্যবহার করে থাকেন । এছাড়া আলোকসজ্জা আর ক্যামেরাওয়ার্কেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন । কোনো প্রকারের লাইটিং ছাড়া শুধুমাত্র মোম বাতির আলো দিয়ে পুরো সিনেমা নির্মান করেছেন , এক্ষেত্রে নাসারা চাঁদ দেখার জন্য যে লেন্স ব্যবহার করে তা তিনি সিনেমায় ব্যবহার করেছেন ।

(বাদশাহী হাড্ডি)
কেনো কিউব্রিককে অন্যদের থেকে এতো বেশি ব্যতিক্রম বলা হয় বা কোন ব্যাপারগুলো কিউব্রিককে এতো বেশি ব্যতিক্রম সিনেমা নির্মাতা বলে পরিচিত করেছে । কিউব্রিকের মোট সিনেমা সংখ্যা ১৩টি । এই তেরোটি সিনেমা-ই ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে নির্মিত । এক-ই ধাচের সিনেমা তিনি রিপিট করেননি । সাইকোলজি-হরর-ওয়্যার-কমেডি-সাই/ফাই-পিরিওডিক্যাল-স্যাটায়ার সব ক্ষেত্রে তিনি তার প্রতিভার ছাপ রেখে গিয়েছেন । নন লিনিয়ার প্যাটার্নের সিনেমা নির্মাণ করতে হলে অবশ্য-ই দ্য কিলিং দেখতে হবে , আ স্পেস অডিসী না দেখে স্পেস নিয়ে সিনেমা বানানোর কথা কেউ ভাবতে-ই পারবে না । আর ভায়োলেন্স কোন পর্যায়ের আর্ট তা শিখতে হলে দেখতে হবে আ ক্লর্কওয়ার্ক অরেঞ্জ, এভাবে সিনেমার প্রতিটি সেক্টরে অবদান আছে স্ট্যানলি কিউব্রিকের । ইলিশ মাছের বিজ্ঞাপন লাগে না ঠিক তেমনি জাত নির্মাতাদের অস্কারের প্রয়োজন পড়ে না, যদিও কিউব্রিক অস্কার পেয়েছেন কিন্তু যে শাখায় তিনি বৃহৎ অবদান রেখেছেন সে শাখায় পাননি ।
বিভিন্ন নেতিবাচক রিভিউ সমালোচকগণ বলছেন “সিনেমার নামে আমাদেরকে সেট কিভাবে নির্মাণ কিভাবে করতে হয় তা শিখিয়ে দিয়েছেন তিনি”(২০০১ আ স্পেস অডিসী নিয়ে লেখা রিভিউ)

স্ট্যানলী কিউব্রিকের ডায়েরী
সিনেমা নির্মান করে যতোটা প্রশংসা পেয়েছেন সেই তুলনায় সমালোচিতও হয়েছেন । যাদের গল্প অবলম্বন করে সিনেমা নির্মাণ করতেন তারাও তাকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতেন । যদিও তিনি সিনেমা নির্মাণ করতেন নিজের মতন করে । উপন্যাস অবলম্বনে যেসব সিনেমা নির্মাণ করেছেন সেগুলোর শুধু মূল বক্তব্যকে ঘিরে নিজের মতন করে সাজিয়ে নিতেন বাকি অংশ । যেমন- পিটার জর্জের সিরিয়াস প্লটের উপর ভিত্তি করে রচিত “রেড এলার্ট” অবলম্বনে নির্মান করেন ডক্টর স্ট্র্যেঞ্জলাভ , মূল গল্প ছিলো বেশ রাশভারী কিন্তু সিনেমা নির্মিত হয়েছে ডার্ক কমেডি প্যাটার্নে । এই রকম ছিলো কিউব্রিকের ভাবনা । স্পার্টাকাস সিনেমার গল্পও তার নিজের লেখা ছিলো, কো রাইটার হিসেবে ছিলেন স্টোরী বোর্ডে , কিন্তু মূল লেখক অস্বীকৃতি জানান ,এরপর থেকে কুব্রিক সিদ্ধান্ত নেন, মূল গল্পকে নিজের মতন করে সাজানোর স্বাধীনতা না দিলে ঐ গল্পে কাজ করবেন না ।
কিউব্রিকের প্রতিটি কাজে ভিন্ন ভিন্ন দর্শন কাজ করে । বর্বরতা-মানবসভ্যতা আর আর্টিফিসিয়াল-ন্যাচারাল এই চার বিষয় নিয়ে-ই মূলত কিউব্রিক । শুরুর দিকে তার ভাবনাকে বেশ জটিল মনে করতেন সিনেমা বিশ্লেষকগণ । অবশ্য তার কয়েকটি নির্মাণ ছিলো সত্য-ই জটিল কাঠামোতে আবৃত । বিশেষ করে তার সেরা সৃষ্টি ২০০১ আ স্পেস অডিসী । সিনেমায় তার নির্মাণশৈলী দেখে অনুমান করা যায় তিনি সময় থেকে কতোটা এগিয়ে ছিলেন । কিউব্রিকের সিনেমায় কাজ করেছেন এমন কেউ নেই যিনি কিউব্রিকে “পারফেকশনিস্ট” বলতেন না । ঠিক যে রকম চাচ্ছেন সেরকম শট না পাওয়া পর্যন্ত ক্ষান্ত হতেন না । এই সুবাদে গিনেস বুকে তার নামও লেখা আছে । দ্য শাইনিং এর সেই বিখ্যাত ডায়ালগ “‘Heere’s Johnny” এর জন্য তিন দিন সময় লেগেছে, সাথে ৬০টির মতন দরজা । এই সিনেমার-ই একটি দৃশ্য করতে ১২৭দিন লেগেছিলো । আর পুরো সিনেমা করতে পাচ বছর ।

গোলকধাম রহস্যভেদ করতে কিউব্রিক কিনেছেন পাজেরো হুন্ডা
হলিউডের ভিত্তি যারা গড়ে দিয়েছেন তাদের তালিকায় প্রথম কাতারে আছেন “স্ট্যানলী কিউব্রিক” । মাত্র ৪৩ বছর ছিলেন সিনেমা জগতের সাথে যেখানে ছিলো ১০ বছরের বিরতি । এই ৩৩ বছরে তার ঝুলিতে সিনেমার সংখ্যা ঈর্ষনীয় না হলেও যা নির্মান করেছেন তা ছিলো পরবর্তী সিনেমা নির্মাতাদের জন্য পুস্তকস্বরূপ । কুবরিকের প্রতিটি সিনেমায় তার নির্মান কৌশল ছিলো এক একটি দিক নির্দেশনার মতন । নিত্য নতুন পন্থা প্রয়োগ করতেন । নিজেকে নিজে এক্সপেরিমেন্ট করতেন । এক্ষেত্রে বরাবর-ই ছিলেন সফল । কিউব্রিকের অন্যতম সেরা নির্মান ছিলো স্প্যার্টাকাস,যে সিনেমা দেখে পরবর্তীতে অনুপ্রানিত হয়ে মেল গিবসন নির্মাণ করেন ব্রেভহার্ট আর রিডলী স্কট নির্মান করেন দ্য গ্ল্যাডিয়েটর । এই সিনেমা নির্মাণকালীন সময় কিউব্রিকের সাথে চিত্রগ্রাহকের বাকবিতন্ডার হয় বারকয়েক । চিত্রগ্রাহক প্রযোজকের কাছে অভিযোগ আনেন যে কিউব্রিক অহেতুক/অপ্রয়োজনীয় শট নিচ্ছেন । কিউব্রিক শুধু তাকে একটি কথা-ই বলেছেন “আমার কাজ আমি ভালো বুঝি,আর আমি আমার কাজ আমার মতন করে-ই করবো” । সিনেমার সিংহভাগ শট কুব্রিক নিজে-ই নিয়েছেন । সিনেমা মুক্তির পর যখন সেরা সিনেমেট্রোগ্রাফির জন্য অস্কার পায় তখন কিউব্রিক তা তুলে দেন “রাসেল মিট্টি”র(স্প্যার্টাকাসের সিনেমেট্রোগ্রাফার) হাতে ।

শুটিংপুরী
বর্তমান হলিউডের দিকে এখন চোখ মেলে তাকালে শুধু দেখা যায় সুপারহিরোদের নিয়ে কপচা-কপচি । ঘুরে-ফিরে এক-ই রেসিপি গেলানো হচ্ছে । যা শুধু চোখের বিনোদন মনের না । মন আর মস্তিষ্কের বিনোদন কালে ভদ্রে দেখা মেলে । খাদহীন সিনেমার স্বাদ ভুলতে বসেছে হলিউড , এখন আর কেউ দ্য পিয়ানিস্ট-লাইফ ইজ বিউটিফুল বা রোমান হলিডে নির্মাণ করেন না । ভালো সিনেমা হচ্ছে না তা একেবারে-ই কিন্তু না কিন্তু তার জন্য তীর্থের কাক হয়ে থাকতে হয় । ৯০থেকে ২০০০, এই দশ বছরে যে পরিমাণ ক্লাস সিনেমা হয়েছে তার অর্ধ সংখ্যক দেখার মতন চলচ্চিত্র বাকি ১৬ বছরে নির্মিত হয়নি ।

যত কান্ড ভিয়েতনামে
অফ টপিক ঃ
কিউব্রিকে নিয়ে যেহেতু পুরো লেখা তাহলে অফ টপিকে আরো কিছু কথা বলে ফেলি । ১৯৯৯সাল , যে বছর তিনি মারা যান, সেবছর এক ইন্টারভিউ দিয়ে তুমুল সমালোচিত হন কিউব্রিক । এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, চাদের পুরো ঘটনা-ই পূর্ব-পরিকল্পিত আর এর নির্মাণের অন্যতম সহযোগী তিনি নিজে-ই । পুরো অভিযানকে তিনি সিনেমার সাথে তুলনা করে বলেন, চন্দ্রাভিযান সিনেমার ক্যামেরার পুরো কাজ-ই তিনি করেছেন , আর এর স্ক্রিপ্টও তার । যদিও তার এই সাক্ষাৎকার ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন মিসেস কিউব্রিক । কিন্তু একদিক থেকে বিবেচনা করলে এটি স্রেফ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না । কারণ ২০০১ আ স্পেস অডিসী যে বছর নির্মিত হয় তার ঠিক পরের বছর-ই মানুষ চাদে পা রাখে । চাদের যেসব ফুটেজ আমরা দেখেছি সেখানকার সার্ফেস আর সিনেমায় যে সার্ফেস দেখা যায় তার শতভাগ মিল পাওয়া যায় । যে বছর তিনি ইন্টারভিউ দিয়েছেন ঠিক তার তিনদিন পর-ই কিউব্রিক মারা যান । এর আগেও চন্দ্রাভিযান নিয়ে গাস গ্রিসাম নামের এক নভোচারী বিশ্ববাসীকে জানাতে চেয়েছিলো , এরপর তার আর কোনো খোজ পাওয়া যায়নি ।

চন্দ্রজাল রহস্য

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: