র‍্যাডক্লিফের মুখে বিষাদের ছায়া ছিল

মূল লেখার লিংক
ব্রিটিশরা যখন বাধ্য হয়ে উপনিবেশ ছেড়ে গেছে, তখন তারা সেখানে নানা রকম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত। এর একটি তরিকা ছিল শাসনাধীন দেশটিকে টুকরো করে ফেলা। আয়ারল্যান্ড, ফিলিস্তিন/ইসরায়েল এবং অবশ্যই ভারতের ক্ষেত্রে তারা এই তরিকা প্রয়োগ করেছে।
আজ ২০১৬ সালের মধ্য আগস্টে লর্ড র‍্যাডক্লিফের সঙ্গে এক আলাপচারিতার কথা মনে পড়ছে, যিনি ভারতকে দুই টুকরো করেছিলেন।
লর্ড মাউন্টব্যাটেন ব্রিটিশ বার থেকে র‍্যাডক্লিফকে পাকড়াও করে ভারত নিয়ে আসেন। এর আগে র‍্যাডক্লিফ কখনো ভারতে আসেননি, এমনকি দেশটি সম্পর্কে তিনি তেমন কিছু জানতেনও না। তিনি আমাকে বলেছিলেন, যখন মাউন্টব্যাটেন তাঁকে নিজ অভিপ্রায়ের কথা বলেন, তখন তিনি তাঁকে বলেছিলেন, কাজটা বেশ কঠিন। এর জন্য মাউন্টব্যাটেন তাঁকে ৪০ হাজার রুপি দিতে চেয়েছিলেন, যেটা তখনকার দিনে অনেক টাকা। কিন্তু যেটা তাঁকে সবচেয়ে বেশি প্রলুব্ধ করেছিল সেটা হলো—এই গুরুদায়িত্ব, যেটা তাঁর কাঁধে চাপানো হয়েছিল—দুটি নতুন দেশ তৈরি করা।
তাঁর মতো একজন পরিচিত লন্ডনি আইনজীবীর পক্ষে রাতারাতি আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করার হাতছানি উপেক্ষা করা কঠিন ছিল। তো র‍্যাডক্লিফ জেলা মানচিত্র চেয়ে পাঠান, কিন্তু সে রকম কিছুই তখন ছিল না। সব সরকারি দপ্তর ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে সাধারণ মানচিত্র টাঙানো থাকত, তাঁকে সেটাই দেওয়া হয়েছিল। তিনি আমাকে বলেছিলেন, এই প্রেক্ষাপটে তিনি যে রেখা টেনেছিলেন, তাতে লাহোরকে প্রথমে ভারতের ভাগে রাখা হয়েছিল। তখন তাঁর বোধোদয় হয়, এটা করা হলে পাকিস্তানের ভাগে গুরুত্বপূর্ণ শহর পড়বে না। এই বিবেচনায় তিনি লাহোরকে পাকিস্তানের অংশে আনেন। ফলে এখন পর্যন্ত পূর্ব পাঞ্জাবের লোকেরা এই উপহার হারানোর কারণে তাঁকে ক্ষমা করেননি।
তবে র‍্যা ডক্লিফ কখনোই সেই ৪০ হাজার রুপি নেননি। কারণ, তিনি মনে করেছিলেন, দেশভাগের কারণে যে এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, সেটার দায়ভার তাঁর নিজের। দেশভাগের পর তিনি আর কখনোই ভারতে আসেননি। তিনি লন্ডনে মারা গিয়েছিলেন। আর ভারতীয় সংবাদপত্রগুলো লন্ডন টাইমস পত্রিকা থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর সংগ্রহ করেছিল। এই ব্যক্তি দুটি দেশ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তিনি কখনোই স্বীকৃতি পাননি। তিনি শেষমেশ আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাননি। বহু বছর পরে এক তরুণ কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে যখন জিজ্ঞাসা করেন, ‘পাকিস্তান করে কি ভালো হলো?’ জবাবে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, ‘আমি জানি না, স্রেফ উত্তর-প্রজন্মই এটা বলতে পারে।’
সম্ভবত, এর উত্তর দেওয়ার সময় এখনো আসেনি, এত তাড়াতাড়ি এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না। ইতিহাসের পরিহাস হলো, জিন্নাহ ব্যক্তিজীবনে কোনো কিছু বাছবিচার না করেই খেতেন আর পান করতেন। যদিও তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের মাতৃভাষা করেছিলেন, তিনি নিজে খুব ঘৃণাভরে এই ভাষায় কথা বলতেন।
যখন পাকিস্তান সৃষ্টির ব্যাপারটা অনিবার্য হয়ে গেল, তখন গান্ধী নেহরু ও প্যাটেলকে বলেছিলেন, জিন্নাহকে যেন অবিভক্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ প্রস্তাব করা হয়। এতে দুজনেই ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। কারণ, তাঁরা দুজনেই বহুকাল ধরে এই পদটিতে বসার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। এতে বোঝা যায়, তাঁরা স্বাধীনতাসংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষা দিলেও পদের লোভ ছাড়তে পারেননি।

বস্তুত, নেহরু ও প্যাটেল দেশভাগের প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন, গান্ধী নন। মাউন্টব্যাটেন যখন দেশভাগের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলেন, তখন তিনি প্রথমে গান্ধীকে ডাকেন। গান্ধী ‘ভাগ’ শব্দটা শুনতে চাননি। ফলে মাউন্টব্যাটেন যখন শব্দটা উচ্চারণ করেন, তখন তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান। নেহরু ও প্যাটেল দেশভাগের প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন এ কারণে যে তাঁরা বুঝতে পারছিলেন, জীবনের খুব বেশি সময় বাকি নেই। অর্থাৎ দেশ গড়ার জন্য তাঁদের হাতে বেশি সময় নেই। সে ক্ষেত্রে মাউন্টব্যাটেনের প্রস্তাব মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।

জিন্নাহকে দানব বানানো হলেও তিনি এই তথাকথিত ‘পোকায় কাটা’ পাকিস্তান নিয়ে খুশি ছিলেন না। তাঁর কল্পনার পাকিস্তানের বিস্তৃতি ছিল পেশোয়ার থেকে দিল্লি পর্যন্ত। কিন্তু তাঁর সামনেও আর বিকল্প ছিল না। ব্রিটিশরা এটুকুই তাঁকে দিতে চেয়েছিল। তাঁর মনে এতটাই তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছিল যে মাউন্টব্যাটেন যখন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বরাতে তাঁকে বলেন, তিনি ভারতের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চান কি না। উত্তরে জিন্নাহ বলেন, ‘আমি ভারতীয়দের বিশ্বাস করি না’।
কিছু মানুষ বলেন, জিন্নাহ একজন ভালো প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন, আর ভারতও এভাবে অবিভক্ত থাকতে পারত। তখন পর্যন্ত কেউ জানত না, তিনি মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত। সন্দেহ করা হয়, ব্রিটিশরা এ খবর জানত। ফলে তারা স্রেফ অপেক্ষা করছিল, কখন জিন্নাহ দৃশ্যপট থেকে বিদায় নেন। পাকিস্তান যেহেতু এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক দেশ, ফলে তাঁর মৃত্যুর পর পাকিস্তানও মরে যাবে।
তবে নেহরু এ কারণে মনে করেননি যে পাকিস্তান বেশি দিন টিকবে না। পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে ভালো করবে না, এই পূব৴ ধারণা থেকেই তিনি এমন মত পোষণ করতেন। নেহরু বা অন্য কোনো কংগ্রেস নেতা এটা জানতেন না যে উইনস্টন চার্চিল জিন্নাহকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি নিজে এটা দেখবেন, যাতে জিন্নাহ সফল হন এবং পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়। হিন্দু ধর্মের ব্যাপার চার্চিলের প্রচণ্ড অনীহা ছিল। তিনি বলেছিলেন, এই বহুত্ববাদী ধর্ম তিনি বুঝতে পারেন না। তাঁর মনের ভেতরে কৌশলগত পরিকল্পনাও ঘুরপাক খাচ্ছিল, পাকিস্তান ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। তার একদিকে তেলসমৃদ্ধ ইসলামি বিশ্ব, আর অন্যদিকে বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য দেশ। ফলে পাকিস্তানের মতো কৃতজ্ঞ খদ্দের রাষ্ট্র পাওয়ার লোভ সংবরণ করা সহজ ছিল না।
বহু বছর পর র‍্যাডক্লিফের সঙ্গে লন্ডনে দেখা হলে তাঁর মুখে বিষাদের কালো ছায়া দেখেছিলাম। তিনি দেশভাগের ব্যাপারে কথা বলতে অনীহ ছিলেন। কিন্তু মুখোমুখি বসার পর তিনি আমার প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি তখনো বিশ্বাস করতেন, এত মানুষের প্রাণহানির দায় তাঁর নিজের।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: