করপোরেট চাকরি

মূল লেখার লিংক
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
আমেরিকা হচ্ছে প্রতিযোগিতা আর প্রাইভেটাইজেশনের দেশ। এখানে জীবন অতিমাত্রায় গতিশীল। থেমে থাকার কোনো উপায় নেই। থেমে থাকলে অথবা প্রতিযোগিতার দৌড়ে কেউ টিকে থাকতে না পারলে ঝরে পড়তে হবে। এখানে কাজ ছাড়া কেউ বসে থাকে না। মানুষের দিনের অর্ধেকের বেশি সময় ব্যয় হয় কাজে। এত শ্রম, এত সময়, জীবনের এতটা মুহূর্ত উৎসর্গ; তবু এখানে কোনো করপোরেট অথবা প্রতিষ্ঠানে চাকরির কোনো নিশ্চয়তা নেই। যে কোনো মুহূর্তে চাকরি চলে যেতে পারে।

আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করি সেখানে এখন কর্মী ছাঁটাই চলছে। কখন কার চাকরি চলে যায় বলা মুশকিল। সবার মধ্যে কেমন একটা ভয়াতুর ভাব। এখানে ওখানে যার সঙ্গেই দেখা হচ্ছে এক বিষয় নিয়েই আলাপ। এই কোম্পানিতে যখন আমি ঢুকি তখন শুনতাম এখানে খুব খারাপ না করলে চাকরি সাধারণত যায় না। এখন দেখছি বছর বছর ছাঁটাই চলছে। আমরা যারা এখানে ঘরসংসার, বাড়িগাড়ি করে গেঁড়ে বসেছি, হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া তাদের জন্য বিপজ্জনকই বটে।
আমার সঙ্গে বিভিন্ন প্রজেক্টে বেশ কয়েকজন প্রকৌশলী কাজ করেন। তাদের মধ্যে একজন ভারতীয়। ইলেকট্রিক্যালে পিএইচডি, খুবই মাইডিয়ার ধরনের ছেলে। বছর ছয়েক হলো সে এই কোম্পানিতে আছে। আমার সঙ্গে অনেকগুলো প্রজেক্টে কাজ করে সে। প্রকৌশলী হিসেবে তাকে আমার কাছে অনেকের থেকে ভালো মনে হয়েছে। কোনো কাজ দিলে বেশি অথবা কম সময় লাগিয়েই হোক, কাজটা করে এনে দেবে। তাকে শুধু কাজটা একটু ধরিয়ে দিতে হয়, আর টুকটাক তার দু–একটা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলে, সে কাজটা ঠিকই নামিয়ে দেবে। চাকরি থেকে খুব বেশি চাওয়া–পাওয়া তার নেই, সর্বদা হাসিখুশি।
সেদিন সকালবেলা অফিসে গিয়ে মাত্র কম্পিউটারের সামনে বসেছি। হন্তদন্ত হয়ে সে আমার কিউবে এসেছে। আমি ভাবলাম বুঝি কোনো বিষয়ে তার কোনো প্রশ্ন আছে অন্য অনেক দিনের মতো। কিন্তু না, তার মুখ চোখ শুকনো। গলা নিচু করে আমাকে বলল, তোমার সঙ্গে হয়তো আর দেখা হবে না। আমি চলে যাচ্ছি, আজকেই এখানে আমার শেষ দিন। কথা শেষ না করেই আবার হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে চলে গেল তার কিউবের উল্টো দিকে। এরপর আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি। সে ছাঁটাই হয়ে গেল!
প্রতীকী ছবি। সংগৃহীত
এ রকম আরেক দিন সকালবেলা একটি ইমেইলের নোটিশে অনেককে ছাঁটাই হয়ে যেতে দেখলাম!
শুধু আমি নিজে না, অন্য অনেককে দেখেছি, কর্মক্ষেত্র যেন আমাদের দ্বিতীয় বাসস্থান। দিনের বেশির ভাগ সময় অফিসেই থাকা হয়। কাজ আর কাজ। বাসায় ফিরে আসা শুধু ঘুমানোর জন্য। বাসায় এসে যেটুকু সময় থাকে ঘুমানোর আগে পর্যন্ত, সে সময়ও কাজ করা অনেকেরই নিত্যদিনের রুটিন। অলিখিত যদিও, প্রায় ২৪/৭ কাজ করা এখানকার কালচার। তারপর একদিন কারও কারওর কাছে চিঠি আসে, ‘আমরা যদিও তোমাকে চেলে যেতে দিতে দুঃখিত, তবু তোমাকে চলে যেতে হবে।’ এক মুহূর্তের নোটিশে ছাঁটাই!
ব্যবসা ভালো না হলে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রথম যে কাজ সেটি হচ্ছে কর্মী ছাঁটাই। বছরের লাভক্ষতির হিসাবনিকাশ করে যদি লাভ থেকে ক্ষতির পরিমাণ বেশি হয়, তাহলে প্রথমেই প্রতিষ্ঠান যে কাজটি করবে সেটা হচ্ছে কর্মচারী বাদ দিয়ে টাকা বাঁচানো। করপোরেট কালচারে সবকিছুই টাকার হিসাবে হয়। কর্মচারীর মেধা ওরা টাকা দিয়েই কেনে। অতএব টাকার স্রোতে যদি ভাটা পড়ে, তবে আর রক্ষা নেই, কর্মী ছাঁটাই হবেই।
টাকার সেই হিসাবে দশজন থেকে যদি দুজন কর্মী বাদ দিতে হয় তাহলে কাকে বাদ দেবে? বরইগাছের ডালে ঝাঁকি দিলে সবচেয়ে পাকা আর পোকায় খাওয়া বরইগুলোই আগে ঝরে পড়ে। কাঁচা সতেজগুলো সহজে পড়ে না। করপোরেটেও তাই। বয়স্ক আর যারা পারফরম্যান্সের হিসাবে নিচের দিকে তারাই ছাঁটাই হবে সবার আগে। যে কর্মক্ষেত্রের জন্য মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে কত কিছুই উৎসর্গ করে দেহের প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে কাজ করে, অথচ বয়স বেড়ে গেলে সেই কোম্পানি কর্মচারীকে বিদায় করে দিতে পিছপা হবে না। অথবা কোনো একটি বছর যদি কারওর পারফরম্যান্স কোনো কারণে গড়ের নিচে নেমে যায়, তখন যদি কোম্পানির ছাঁটাই শুরু হয়, তাহলে তাদেরও তল্পিতল্পা গুছাতে হবে। যেখানে সবকিছু টাকার হিসাবে হয়, সেখানে মানুষের আবেগের দাম শূন্যের নিচে।
এ দেশে করপোরেটগুলো সাধারণত বছরের শেষে কর্মচারীদের কাজের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে একটা কার্ভ তৈরি করে। এটা আমার কাছে একটা অদ্ভুত ব্যাপার মনে হয়। কার্ভের ধরনটা আগে থেকেই জানা থাকে। তার মানে হচ্ছে কোনো গ্রুপে মোট দশজন কর্মচারীর মধ্যে কাউকে না কাউকে গড়ের নিচে ফেলতে হবে। সেই গ্রুপে যদি সবাই কোনো বছরে সমানতালে কাজ করে, সমান ভালো করে, তাহলে? তাহলেও সবাইকে একই রেখায় ফেলা যাবে না! কোম্পানির যখন লাভক্ষতির হিসাবে গোলমাল লাগে, সেটা যে কারণেই হোক না কেন, তখন ওরা কর্মী ছাঁটাইয়ের জন্য পারফরম্যান্স কার্ভের শরণাপন্ন হয়। এই কার্ভের প্যাঁচে পড়ে অনেককে কোম্পানির ছাঁটাইকালে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিদায় নিতে হয়।
বিদায় নেওয়াটা যে খারাপ কিছু তা মনে হয় না। বরং কারও কারওর জন্য কখনো কখনো এটা মন্দের ভালো হয়েও দাঁড়াতে পারে। নিজ প্রতিষ্ঠানের বাইরে যে আরেকটা দুনিয়া আছে সেটা দেখা হয়। বিভিন্ন ঘাটের পানি ঘোলা করে অভিজ্ঞতার ঝুলিটাও ভরে। সবচেয়ে যেটা লাভ হয় বলে মনে হয় তা হলো চাকরি চলে গেলে কী হবে, এই ভয়টা অন্তত কেটে যায়। যারা এসব পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছেন তাদের কাছ থেকে শুনে এই কথাগুলো বলছি, নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নয়। আমি গ্র্যাজুয়েশন করে এসে সেই যে এখানে চাকরি শুরু করেছিলাম এখনো আছি, চাকরি বদল করবার দরকার পড়েনি, তাই করিনি।
এই দরকার পড়েনি তাই চাকরি বদল করিনি অভ্যাসটা আমাদের জন্য অনেক সময় কাল হয়ে দাঁড়ায়। আমরা যারা বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তাদের মাস্টার্স অথবা পিএইচডি শেষ করে একটা যুতসই কোনো জায়গায় চাকরি পেয়ে থিতু হতে হতে বয়স এত বেশি হয়ে যায় যে, এরপর জীবনের ঘোড়দৌড়ের গতিতে ভাটা পড়ে যায়। ক্ষান্তি দিয়ে বসে থাকতে হয়। ফলে যত দিন না কোম্পানি ছাঁটাই করে তত দিন চাকরি বদল করবার ইচ্ছে বা আকাঙ্ক্ষা কোনোটাই থাকে না।
আমাদের আরেকটা সমস্যার জায়গা হচ্ছে নিজেকে অন্যের কাছে তুলে ধরা। অন্যভাবে বললে নিজেকে অন্যদের কাছে উপস্থাপন করা। এই কাজটা খুব সহজ নয়। এটা নিজ থেকে হয় না। এটার জন্য চর্চা করতে হয়। নেটওয়ার্কিং করতে হয়। নিজের অফিসে বসে আমরা যে কোনো সায়েন্টিফিক অথবা টেকনিক্যাল সমস্যার সমাধান করে দিতে পারি অনায়াসে। কিন্তু সেটা কীভাবে অন্যদের কাছে উপস্থাপন করতে হয় সেটা আমরা জানি একেবারেই কম। অথচ অনেক ভারতীয় ও অন্যান্য দেশি লোকজনকে দেখেছি, কাজ করে কম কিন্তু কথা বলার অসম্ভব ক্ষমতা। কাজ কম করেও বিক্রি করতে পারে বেশি। চাপাবাজি যাকে বলে। এরাই দেখেছি ধাই ধাই করে করপোরেটের সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় সবার ওপরে। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ব্যতিক্রম আছেন তবে সেই সংখ্যাটা খুবই কম।
এ দেশে চাকরি চলে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা না, এটা স্বাভাবিক একটা ঘটনা। চাকরি চলে গেলে কিছুদিনের মধ্যে চাকরি পাওয়াও আরেকটা স্বাভাবিক ঘটনা। শুধু একটা সাময়িক ধাক্কা সামলে নিয়ে নতুন করে আরেকটি প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নেওয়াটাই যেটুকু কষ্টের। যারা দেয়ালে পিঠ ঠেকার আগে সেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি সর্বদা নিয়েই থাকেন, তারাই লাভবান হন বেশি। আমার ও আমাদের অনেকের জন্য সেই মানসিকতাটা গড়ে তোলাটাই কষ্টকর, এই যা।
নিজ নিজ ক্ষেত্রে আমাদের মতো সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী কেউ কখনো চাকরি না পেয়ে বেকার বসে থাকার নজির নেই এই দেশে!

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: