দিনাজপুর – দিনাজপুর রাজবাড়ি

মূল লেখার লিংক
দিনাজপুরের প্রাচীনতম নাগরিক এলাকায় ৪০০ বছরের অধিক কাল ধরে বাংলাদেশের অন্যতম একটি রাজবাড়ি সকল প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ঘাত-প্রতিঘাত উপেক্ষা করে অত্যন্ত জীর্ণাবস্থায় কালের স্বাক্ষী হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। জায়গাটির নামই আজ রাজবাড়ি। রাজবাড়িকে ঘিরেই দিনাজপুর শহরের গোড়া পত্তন। সেই কবে প্রাচীন অখন্ড বাংলার উত্তর রাঢ়ীয় এক কায়স্থ বংশের রায় উপাধিধারী পরিবার দ্বারা সূচিত হয়েছিল এ রাজবংশ তা আজ কিংবদন্তী। কে ছিল এ রাজবংশের আদি পুরুষ? তা নিয়ে আছে বিস্তর মতভেদ। দিনাজপুর নামকরণের সাথে যে সব ব্যাক্তির নাম বিভিন্নভাবে যুক্ত আছে ধারনা করা হয় তাদের কেউ হয়ত এ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, মুঘলামলে বাংলায় যে কয়টি বড় জমিদারি যেমনঃ যশোরের নলডাঙ্গা, রাজশাহী, বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া ও বর্ধমান এবং সে সবের পাশাপাশি যে সব প্রতাপশালী রাজবংশের উত্থান হয়েছিল দিনাজপুর রাজবংশ তাদের অন্যতম। মুঘল সম্রাট আকবরের মৃত্যূর তিন বছর পর এ রাজবংশের সূচনা হয়।

img_2808

img_2809

img_2800

20150605_aayina-mohal-05

মৌর্য্য সাম্রাজ্যের পুন্ড্রবর্ধন ভূক্তির বরেন্দ্র মন্ডলের দিনাজপুর মধ্যযুগে এসে বাংলার আর দশটি গ্রামের মতই ছিল সাদা-মাটা এক গ্রাম। ততদিনে বাংলার উত্তরাঞ্চল মুঘল পতাকাতলে সামিল হয়েছে। এ সময় বর্তমান ভারতের উত্তর রাঢ় থেকে জনৈক বিষ্ণু দত্ত মুঘল প্রশাসনের রাজ কর্মচারী হিসাবে বাংলার ততকালীন নায়েব/কানুনগো নিযুক্ত হয়। স্ব-পরিবারে কায়স্থ পরিবারটি সে থেকে দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করে। বিষ্ণু দত্তের পুত্র শ্রীমন্ত দত্ত একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি এবং মোহন্ত কাশীনাথ ঠাকুরের শিষ্য। কাশীনাথ ঠাকুর যাকে অনেকে মনে করেন রাজা গনেশের বংশধর তিনি মূলতঃ একজন কালী উপাসক। ব্রম্মচারী কাশীনাথ ঠাকুরও বাস করতেন বাংলার উত্তর প্রান্তের বরেন্দ্র মন্ডলের দিনাজপুরে। তার ছিল অঢেল ভূ-সম্পত্তি আর তিনি তা পেয়েছিলেন কালীদেবীর নামে উতসর্গীকৃত দেবোত্তর সম্পত্তি থেকে।

১৬০৮ খ্রীঃ মুঘল সুবাহদার ইসলাম খাঁ চিশতী যখন মুঘল ঝান্ডা উড়িয়ে বাংলাদেশের ঢাকা কুক্ষিগত করার অভিপ্রায়ে লিপ্ত ঠিক সে সময় ব্রম্মচারী কাশীনাথ ঠাকুর জীবণ সায়াহ্নে এসে তার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি শিষ্য শ্রীমন্ত দত্ত’কে দেবদত্ত সম্পত্তি হিসাবে দান করেন। রাতারাতি শ্রীমন্ত দত্তের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ। শ্রীমন্ত দত্ত চৌধুরী‘র ছিল হরিশচন্দ্র ঘোষ নামের এক পুত্র ও লীলাবতী নামের এক সুন্দরী কণ্যা।

ওদিকে রংপুর-গাইবান্ধার বিখ্যাত বর্ধনকোটির জমিদারের দেওয়ান হল জনৈক ভগবান ঘোষ। ভগবান ঘোষ ষড়যন্ত্র করে বর্ধনকোটির জমিদারের ক্ষেতলাল জমিদারির ৭ আনা সুকৌশলে কুক্ষিগত করে। ‘দেওয়ান’ ভগবান রাতারাতি হলেন, ‘জমিদার’ ভগবান। তার ছিল হরিরাম ঘোষ নামের এক পুত্র। সুতরাং গল্পের মত সব মিলে গেলে এক শুভ দিনে দিনাজপুরের শ্রীমন্ত দত্তের কণ্যা লীলাবতীর সাথে ক্ষেতলাল জমিদার ভগবান ঘোষের পুত্র হরিরাম ঘোষের ঘটা করে শুভ বিবাহ হয়ে গেল। যথাসময়ে তাদের কোল জুড়ে এল এক পুত্র সন্তান। নাম রাখা হল শুকদেব ঘোষ।

শুকদেবের পিতা হরিরাম ঘোষের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার সূত্রে শুকদেব পিতার জমিদারি লাভ করে। অল্পদিন পর শুকদেবের নানা শ্রীমন্ত ঘোষ দেহ ত্যাগ করলে তার মামা হরিশচন্দ্র ঘোষ তার নানার  সমুদয় সম্পত্তির মালিক হন। কিন্তু মামা, ভাগিনা শুকদেব ঘোষকে জমিদারি পরিচালনার ভার অর্পন করেন। পুত্রহীন অবস্থায় হরিশচন্দ্র ঘোষ দেহ রাখলে মহা ভাগ্যবান শুকদেব বিনা যুদ্ধে বৃহত্তর রংপুর-দিনাজপুর-রাজশাহী-মালদহ(বর্তমান ভারতের অংশ) অঞ্চলের একচ্ছত্র জমিদার বনে যান। প্রজাকুল সম্মান জানিয়ে তাকে রাজা সম্মোধন করলে তিনি রাজা শুকদেব রায় হিসাবে সকলের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

দিনাজপুর রাজবংশের উত্থান ও উতপত্তি নিয়ে প্রায় সাদৃশ্যপূর্ণ অন্য আরেকটি আখ্যান চালু আছে। অযোধ্যা নগরীতে ছিল রাজা শুকদেবের পূর্ব-পুরুষের বাস। সেখান থেকে তার ২০তম পুরুষ সোমেশ্বর ঘোষ মুঘল সুবা-বাঙলার দেওয়ান মুর্শদকুলী খানের নামে প্রবর্তিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার যজান গ্রামে ভাগ্নান্ষনে কিংবা অন্য যে কোন কারনে এসে বসতি গড়েন। সোমেশ্বর ঘোষের বংশজাত দেবকী নন্দন ঘোষের পুত্র হরিরাম ঘোষের সাথে কানুনগো/মোহন্ত শ্রীমন্ত দত্তের কণ্যা লীলাবতীর বিবাহ হয়। হরিরাম-লীলাবতী দম্পতি শুকদেব রায় ও বিশ্বনাথ রায় নামের দু’পুত্র রেথে গত হন। জ্যেষ্ঠ পুত্র শুকদেব রায় জমিদারি লাভ করে।

রাজবংশ

শুকদেব রায় (১৬৪৪-১৬৮১ খ্রীঃ) থেকে দিনাজপুর রাজবংশের গোড়া পত্তন শুরু হয়। শুকদেবের ২ স্ত্রীর ছিল ৩ পুত্র, যথাক্রমেঃ রামদেব রায়, জয়দেব রায় ও প্রাণনাথ রায়। জ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী রামদেব ও জয়দেব উভয়ই ক্রমান্নয়ে জমিদারি পরিচালনার সুযোগ পান। কিন্তু তাদের অকালমৃত্যূতে অনধিক ৬ বছরের মাথায় শুকদেবের ২য় স্ত্রীর পুত্র রাজা প্রাণনাথ রায় (১৬৮৭-১৭১৮ খ্রীঃ) পিতার উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হন। প্রাণনাথের কোন পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি তার এক আত্মীয় বালক রামনাথ রায়কে দত্তক পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন এবং রামনাথ রায় (১৭১৯-১৭৬০ খ্রীঃ) পরবর্তী জমিদার হন। মুঘল সালতানাত তাকে মহারাজ উপাধিতে ভূষিত করে। দিনাজপুর রাজবংশ ‘রাজা’ থেকে ‘মহারাজ’ খেতাব গ্রহন করে। রামনাথের ছিল ৪ পুত্র, যথাক্রমেঃ মহারাজ কৃষ্ণনাথ রায়, রূপনাথ রায়, মহারাজ বৈদ্যনাথ রায় ও কুমার কান্তনাথ রায়।

বৈদ্যনাথ (১৭৬০-১৭৭৯ খ্রীঃ) উত্তরাধিকারী ‍নিযুক্ত হয়ে পরবর্তী মহারাজ হন। বৈদ্যনাথের কোন পুত্র না থাকায় তিনি ১৭৭৬ খ্রীঃ আত্মীয় এক বালককে দত্তক নেন এবং নাম রাখেন রাধানাথ। অতপরঃ মহারাজ রাধানাথ (১৭৭৯-১৮০১ খ্রীঃ) জমিদারি লাভ করেন। মহারাজ রাধানাথ নাবালক থাকায় রাণী স্বরসতিকে তার পক্ষে উত্তরাধিকার এবং ১৭৮১ খ্রীঃ হতে দেবী সিংহকে বৃটিশ গভর্ণর জেনারেল হেস্টিংস কর্তৃক তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করা হয়। অতপরঃ ১৭৮৩ খ্রীঃ ও ১৭৯০ খ্রীঃ যথাক্রমে জানকীরাম ও রামকান্ত এ জমিদারির দেওয়ান হিসাবে দ্বায়িত্ব পালন করে। ১৭৯২ খ্রীঃ থেকে রাধানাথ নিজে জমিদারি পরিচালনার সুযোগ পায়। রাধানাথের মাত্র ২৪ বছর বয়সে অকালমৃত্যূ হলে তার স্ত্রী রাণী ত্রিপুরা সুন্দরী গোবিন্দনাথকে দত্তক নেয়।

মহারাজ গোবিন্দনাথ রায় (১৮১৭-১৮৪১ খ্রীঃ) পরবর্তী মহারাজ হন। গোবিন্দনাথের ২ পুত্র, যথাক্রমেঃ ত্রৈলোক্যনাথ রায় ও তারকানাথ রায়। তারকানাথ রায় (১৮৪১-১৮৬৫ খ্রীঃ) মহারাজ নিযুক্ত হন। তারকানাথের কোন পুত্র না থাকায় তিনিও অন্যদের মত গিরিজানাথকে দত্তক নেন। তারকানাথের স্ত্রী মহারাণী (বৃটিশ কর্তৃক প্রদত্ত উপাধি) শ্যামমোহিনী রাণী ১৮৮৩ খ্রীঃ অবধি তাদের দত্তক পুত্র, অর্থাত মহারাজ গিরিজানাথ রায় বাহাদুর (১৮৬৫-১৯১৯ খ্রীঃ) সাবালক না হওয়া পর্যন্ত যোগ্যতার সাথে রাজ্য পরিচালনা করেন। গিরিজানাথেরও কোন পুত্র না থাকায় তিনি জগদীশনাথকে দত্তক নেন। মহারাজ কুমার (বৃটিশ কর্তৃক প্রদত্ত উপাধি) জগদীশনাথ রায় (১৯১৯-১৯৬২ খ্রীঃ) মহারাজ হিসাবে শাসন দন্ড হাতে নেয়। জগদীশনাথের পুত্র জলধিনাথ (জম্ম – মৃত্যুঃ ১৯২৫-৪১ খ্রীঃ) রাজ দন্ড হাতে পাবার পূর্বেই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই অকালে জীবণ দেন এবং সে সাথে চিরতরে নিভে যায় এ বংশের শেষ প্রদীপটি। যবনিকা ঘটে রাজবংশের ১১ জন নৃপতির তিনশ বছরের রাজ্য শাসনের।

img_3468 img_3467

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: