দ্যা ব্লাক তাজমহল, মসলিয়াম এবং ভালোবাসা

মূল লেখার লিংক

তাজমহলের পেছনে গিয়েছেন কখনো? তাজমহলের পেছনে দাঁড়িয়ে যমুনার দিকে তাকালে মনে হবে তাজমহল নির্মান অসম্পূর্ন। কোথায় যেন কি নেই। তাজমহলের পেছনে দাড়ালে যমুনা কিংবা আগ্রা ফোর্ট কে অসাধারন দেখায়। পানি, পাথর, সবুজের সন্মিলনে অসাধারন। আগ্রা ফোর্টের যে জায়গায় বসে শাজাহান নির্মিশেষে মমতাজের সমাধির দিকে তাকিয়ে থাকত তাজমহলের পেছন থেকে সে জায়গা পরিস্কার দেখা যায়।

ভরন্ত পূর্নিমা রাতে শাজাহান আগ্রা ফোর্টের জানালায় বসে তাজমহলের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলত আর শায়রী রচনা করত।

তাজমহলের পেছনে দাড়ালে আপনার একটা অবর্জাভেশান টাওয়ার চোখে পড়বে ওটিই আসলে কালো তাজমহলের বেইস। শাজাহানের ইচ্ছে ছিল সাদা তাজমহলের মত যমুনার অপর পারে আর একটা কালো পাথরের তাজমহল বানাবে যেখানে সে চির নিদ্রায় শায়িত হবে। এই দুই তাজমহলের মাঝে একটা সেতু থাকবে যেটা দুই তাজমহল কে এক করে রাখবে।

ঐতিহাসিকরা বলেন “Black Taj Mahal exist as soul without body”। কালো তাজমহলের আত্মা আছে কিন্তু দেহ নাই। সত্যিই তাই কালো তাজমহল ইতিহাসে আছে কিন্তু বাস্তবে নাই। যে জায়গায় সম্রাট কালো তাজমহল তৈরী করতে চেয়েছিল সে জায়গায় এখনো স্তুপীকৃত কালো পাথর পড়ে আছে অরক্ষিত অবস্থায় অনাদরে অবহেলায়।

এই কালো তাজমহলের ব্যাপারটা অনেক ঐতিহাসিক মিথ হিসাবে দেখেন। কেউ কেউ স্বীকার করেন কেউ করেন না। জিন ব্যাপ্টিষ্ট ট্যাভারিয়ান নামক একজন ইউরোপিয়ান সর্বপ্রথম তাজমহল দেখতে যান ১৬৬৫ সালে তার বর্ননায় কিন্তু ব্ল্যাক তাজমহল এর বর্ননা আছে। তিনি তাজমহলের অপরদিকে যমুনার পাড়ে কালো মার্বেল পাথরের স্তুপ দেখেছেন।

কিন্তু কালো তাজমহল গড়ার স্বপ্ন শাজাহানের আর বাস্তবে রূপ নেই নি কারন তার ছেলে আওরঙ্গজেব। শাজাহান আওরঙ্গজেব কর্তৃক বন্দী হবার পর পুত্র আওরঙ্গজেবের কাছে পিতা শাজাহানের এই ইচ্ছা বাড়াবাড়ি মনে হওয়ায় কালো তাজমহল আর কোন দিন বস্তবতার মুখ দেখেনি। সম্রট শাজাহান কে সাদা তাজমহলে কবর দেয়া হয়েছে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে খেয়াল করে দেখুন মমতাজের কবর কেন্দ্রে আর শাজাহানের সমাধিটি এক পাশে। এটাই প্রমান করে শাজাহান চান নি তার কবর এখানে দেয়া হোক।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি অনেকেই বলেন পৃথিবীর শ্রেষ্টতম ভালোবাসার নিদর্শন তাজমহল। কথাটা ভীষন রোমান্টিক। শুনতেও ভালো লাগে। পুরুষদের নাকি শেখ উচিত কিভাবে স্ত্রীকে ভালোবাসা যায় তা তাজমহলে অন্তত একবার এসে দেখে যেতে। বাস্তবতা কিন্তু সম্পূর্ন ভিন্ন।

শাজাহান মমতাজ কে ভালোবাসত কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু শাজাহান এর মমতাজের মত বউ থাকার পরো সুন্দরী নারী দেখলেই তাকে বিয়ে করে অথবা রক্ষিতা হিসাবে ঘরে নিতেন। মমতাজ আবার এ ব্যাপারে ছিলেন ভীষন উদার। শাজাহানের শেষ জীবনের রাষ্ট্রনীতি উনি পরিচালনা করলেও অনেক বিধি নিষেধ আরোপ করলেও শাজাহানের এই পর নারী গমন কে উনি কখনো বাধা দেন নি।

মমতাজের আসল নাম ছিল আর্জুমান্দ বানু বেগম। সব থেকে আজব করা ব্যাপার হল এই তাজমহলের পূর্ব পাশে সম্রাট শাজাহানের আর এক স্ত্রীর কবর আছে। শিরহিনডি বেগম নামে পরিচিত এই রানীর সমাধিতে শুধু একটি গম্বুজ আছে।

মমতাজের সমাধিতে শাজাহান তাজমহল বানিয়ে প্রেমের অমর স্মৃতিসৌধ রচনা করেছেন এটাই সর্বজন স্বীকৃত, কিন্তু ইতিহাসের যে ব্যাপারটা আলোচনা হয় না সেটা হল শাজাহান সব সময় পর নারীতে আসক্ত ছিলেন। Nicocolao Mouncci (১৬৩৭-১৭১৭) তার ভ্রমন কাহিনীতে লিখেছেন “It would seems as if the only thing Shajahan cared for was the search for women to serve his pleasure”।

আমাকে যদি জিজ্ঞাস করেন আমি বলব শেষ জীবনে এসে শাজাহান উপলদ্ধি করে গেছেন সারা জীবন পরনারী আসক্ত থাকলেও মমতাজ কোন দিন এ নিয়ে অভিযোগ না করে ভালোবাসার চুড়ান্ত দিখিয়ে গেছেন। তার প্রতিদান দেবার জন্য এই সামান্য ইট পাথরের তাজমহল। তাই তাজমহল শাজাহানের ভালোবাসার নিদর্শন না মমতাজের অমর ভালোবাসার সামান্য প্রতিদান তার স্বামী কর্তৃক সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে, আমি সেদিকে গেলাম না।

ভালোবাসার নিদর্শন কিভাবে দিতে হয় তার প্রমান রেখে গেছেন আর্টিমিসিয়া। তাজমহল মুলত একটি সমাধি স্তম্ভ। ইংরেজীতে “সমাধিস্তম্ভ” কে বলা হয় “Mausoleum”। এই মসলিয়াম কথাটিও এসেছে আর একটি ভালোবাসার নিদর্শন থেকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৭৭ সালে এশিয়া মাইনরে “হালিকারনাসাস” নামে একটা ছোট্ট রাজ্য ছিল।

এই রাজ্যর রাজার নাম ছিল হেকটামেনাস। হেকটামেনাসের ছেলের নাম ছিল মসুলাস (Mausolus) আর মেয়ের নাম ছিল আর্টিমিসিয়া। রাজা হেকটামেনাস তার ছেলে মেয়েকে বিয়ে দেন মানে ভাই বোন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সে যুগে ভাই বোনের মাঝে বিয়ে প্রথা সিদ্ধ ছিল। মিশরের ফারাওদের মাঝে এটা দেখা যায়। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫৩ সালে মসুলাস নিহত হন। প্রিয় ভাই স্বামীর মৃত্যুতে আর্টিমিসিয়া মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন।

স্বামীর স্মৃতিকে চির জাগরুক রাখতে দিকে দিকে লোক পাঠান ভালো স্থপতি খুজে আনতে যে একটি সমাধি সৌধ বানাবে। সে কালের বিখ্যাত গ্রীক স্থপতি স্কোপাস কে আনা হয় সমাধির ডিজাইনার হিসাবে। রানী আর্টিমিসিয়ার তত্ত্বাবাধানে স্কোপাস পাহাড়ের চুড়ায় নির্মান করেন মসুলাসের সমাধিস্তম্ভ। যেহেতু সম্রাট মসুলাসের দেহভস্ম এখানে সমাধিস্থ করা হয় তাই এর নাম হয়ে যায় “মসলিয়াম” (Mausoleum)। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর যে কোন স্থানে সমাধিস্তম্ভ তৈরী হলে তাকে মসলিয়াম বলে। “লেলিন মসলিয়াম” “মাও মসলিয়াম”। ১৪০৪ সালে এক ভুমিকম্পে প্রেমের এই অমর সৌধ ধ্বংস হয়ে যায়।

কথিত আছে প্রেমিক মসলিয়ামের দেহভস্ম র অর্ধেক আর্টিমিসিয়া মসলিয়ামে সমাধিস্থ করেছেন বাকী অর্ধেক নিজের কাছে রেখে দেন আর প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে স্বামীর দেহভস্মের এক চামচ পানিতে মিশেয়ে পান করে রাজ দরবারে যেতেন।

১৬৩৪ সালে ডাচ মাষ্টার রেমব্রান্ট Artemisia শিরোনামে একটা মাষ্টার পিস আকেন যেটা এখনো বিশ্ব চিত্রকর্মের এক অমূল্য সম্পদ।

ভালোবাসা কাকে বলে? বুকের কোন গহীনে এই ভালোবাসা বাস করে?

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: