পল এরডস – গণিতের পিছে ছোটা এক খেয়ালী পথিক

মূল লেখার লিংক
untitledas

পল এরডস (১৯১৩-১৯৯৬)
পল এরডসের জন্ম হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে এক ইহুদি পরিবারে।
জন্মতারিখ ২৬শে মার্চ , ১৯১৩।
বাবা ল্যাজস এরডস, মা আন্না এরডস।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন শৈশব কাটানো পলের জন্মের ঠিক আগের দিন তার দুই বোনের মৃত্যু হয়। সে কারণে পল তার মা বাবার খুব আগলে রাখা আদরের ধনই ছিলেন। এরডসও সেইমতো তার বাবা মার প্রতি যথেষ্ট কাতর ছিলেন।
পলের বাবা-মা দুজনই ছিলেন শিক্ষক এবং আশ্চর্যক্রমে দুজনই গণিতের। অতএব, এটা খুব সাধারণ ব্যাপার – তিনি খুব ছোটবেলায়ই গণিতের সাথে পরিচিত হতে পেরেছিলেন। শৈশবের পরিচয় সম্বলটুকু পরিণত বয়সে বাড়তে বাড়তে তার জীবন হয়ে উঠেছিল।
একেবারে শৈশবের হাতেখড়িটা অবশ্য মায়ের কাছে। তাঁর বাবাকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়ান আর্মিরা ধরে নিয়ে যায়। আটক রাখে ৬ বছর!
পল তাঁর শৈশব স্মৃতিচারণে বলেছেন, তাঁর মা তাঁকে বলেছিলেন একটা ট্রেন পৃথিবী থেকে সূর্যে যেতে কত সময় লাগবে, আর তিনি মনে মনে অংক কষে বের করে ফেলেছিলেন সূর্যের দূরত্ব।
ঘটনাটা হয়ত তেমন কিছু না, কিন্তু মানসাংক করে মোটামুটি একটা বড় হিসেব করে ফেলা একটা বাচ্চা ছেলের গভীর ভালোবাসার ইংগিত দেয়।
একটু মায়া নিয়ে ভাবুন তো, ভালোবাসাটা কিসের জন্য?
– কোনো খেলনা নয়, দামী পোষাক কিংবা খাবার নয়!
নিছক গণিতের জন্য! আশ্চর্য না? এরকম অবাক হওয়ার অনুভূতিটার মাঝে সৌন্দর্যের শেষ নেই।

খুব অল্প বয়সেই সংখ্যার প্রতি তাঁর ভালোবাসা পরিলক্ষিত হয়। মাত্র তিন বছর বয়সে তিন অংকের সংখ্যা গুণ করে ফেলতে পারতেন। চারে, এরডস ধরে ফেললেন হিসাবের মান ঋণাত্মক হবার ব্যাপারটাও!
একবার তাঁর মায়ের সাথে মার্কেটে গিয়ে আচমকা কান্না করে উঠলেন। মা আন্না জানতে চাইলে বললেন, তিনি নাকি বুঝে ফেলেছেন তাঁকে একদিন মরে যেতে হবে!
বুঝেন কাহিনীটা, কি পরিমাণ সিরিয়াস চিন্তা বাচ্চাটার!

কৈশোরে বাবার কাছ থেকে অসীম ধারা আর সেটতত্ত্বের সাথে পরিচিত হন, তাঁর প্রিয় বিষয়ের দুটি। আরো পছন্দের ছিল কম্বিনেট্রিক্স, গ্রাফ থিওরি, নাম্বার থিওরি, সম্ভাব্যতা আর গাণিতিক বিশ্লেষণ। এই সবগুলো ক্ষেত্রেই এরডসের অসামান্য অবদান আছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ডিসক্রিট ম্যাথমেটিক্স আজকের কম্পিউটার প্রকৌশলের ভিত্তি!

পুরষ্কার আর অর্জনের দিকে বেশি এগুবো না… তাঁর সাধনার মোহের কথা বলব।
তিনি মাত্র ২১ বছর বয়সে গণিতে ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করে ফেলেন।
তার লাইফস্টাইলটা ছিল বেশ খেয়ালী ব্যক্তিত্বপূর্ণ। অনেকটা ভ্যাগাবন্ড টাইপের জীবনযাপন।তাঁর ভালবাসার কোন প্রকারভেদ ছিল না। যা ছিল তার পুরোটাই গণিতে বিসর্জিত!
করেন নাই সংসারধর্মও!
বউ নাই, সন্তান নাই; ছিল শুধু গণিতের জন্য অদম্য আকর্ষণ আর স্পৃহা …
আর তাই কোথাও গেড়ে বসবাস করাও তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

একটা স্যুটকেস ছিল, যেটা নিয়ে যেকোনো সময় তিনি বেড়িয়ে পড়তে পারতেন।জীবনের বছর পঞ্চাশেক এভাবেই কাটিয়েছেন।
তাঁর অধিকাংশ গবেষণাপত্রগুলোও তৈরি হয়েছে তাঁর সহযোগী গবেষকদের ঘরে গিয়ে।
তাই তাঁর থিমটা যেন ছিল এরকম – “Another roof , another proof”!

তাঁর প্রায় ১৫০০ গবেষণাপত্র আর ৫০০ গবেষকের সাথে যুগ্মভাবে গণিতের পেপারস তৈরির কাজ রয়েছে। উল্লেখ্য, গবেষণাপত্রের সংখ্যাটা কেবলমাত্র অয়লার ছাড়া যে কারো সাথে তুলনায় সর্বোচ্চ।

এরডসের জীবনব্যয় খুব কমই ছিল। কারণ ঐ যে! একা মানুষ, ভবঘুরে প্রবৃত্তি। কিন্তু তার বিভিন্ন গণিতের সভায় দেয়া লেকচার, গবেষণাপত্রের বৃত্তি ইত্যাদি খরচ করে ফেলতেন দান করে! বিশেষত বিভিন্ন প্রবলেম সলভের জন্য পুরস্কার ঘোষণা দিয়ে। এক্ষেত্রে তাঁর ভেতর তেমন কার্পণ্যও ছিল না।

এরডস বলতেন, “My head is open” অর্থাৎ সমস্যা সমাধানে তিনি সদা প্রস্তুত! তাঁর কাছে জীবনের মূলমন্ত্র – “The purpose of life is to prove and conjecture .” ভালোবাসার জায়গাটা একেবারে স্পষ্ট!
গণিতের সৌম্য প্রবলেমগুলোর প্রতি তাঁর নজর ছিল তা অখ্যাত হয়ে থাকলেও!

খেয়ালী এরডসের আরেকটা বৈশিষ্ট্য ছিল কাউকে তার বয়স জিজ্ঞেস করা এবং তখনই হিসেব করে সেকেন্ড এককে মান বলে দেয়া। খুবই অংকপটু লোক!
তাঁর গভীর কৌতুকবোধও ছিল। ১৯৭০ সালে লস এঞ্জেলসে এক গণিত বিষয়ক লেকচারে তিনি বলেন, যখন আমি শিশু ছিলাম; বলা হত পৃথিবীর বয়স দুই বিলিয়ন বছর । আর এখন বিজ্ঞানীরা বলেন , সাড়ে চার বিলিয়ন বছর!
“অর্থাত্‍ আমার বয়স প্রায় আড়াই বিলিয়ন বছর!” – তাঁর সকৌতুক সিদ্ধান্ত!

গণিতশাস্ত্রের ধাঁচের দিক থেকে দেখলে এরডস ছিলেন মূলত একজন প্রবলেম সলভার যতটা না তিনি তত্ত্ব গঠনে মন দিয়েছেন!

তাঁর বন্ধুরা তাঁর গবেষণাপত্র তৈরির যজ্ঞ দেখে অবতারণা করে ফেলেন ‘এরডস নাম্বার’ এর । আজ তা খুবই জনপ্রিয় একটা টার্ম। প্রতিষ্ঠিত তো বটেই।
বোঝা খুব সহজ। এরডসের নিজের এরডস নাম্বার ০। যারা এরডসের সাথে যুগ্মভাবে গবেষণাপত্র তৈরি করেছেন তাদের এরডস নাম্বার ১। আবার কেউ যদি এরডস নাম্বার ১ এমন কারো সাথে গবেষণাপত্র তৈরি করেন তবে তার এরডস নাম্বার হবে ২। ব্যাপারটা এভাবে চলতে থাকবে।

একটা গণনায় দেখা যায় প্রায় দু’লক্ষ ব্যক্তির এরডস নাম্বার আছে এবং ৯০শতাংশ গণিতবিদের এরডস নাম্বার ৮ এর নিচে! আবার একই ব্যক্তির একাধিক এরডস নাম্বারও আছে। লোকটা এমন কাজ করে গেছেন যে, নাম্বার গবেষকদের ছাড়বে না যেন।
ব্যাপারটা শুধু কিন্তু গণিতেই বসে নেই। পদার্থবিদ্যা , রসায়নশাস্ত্র , জীববিজ্ঞান , প্রকৌশল এমনকি অর্থনীতির উপর করা থিসিস পেপারেও অনেকের এরডস নাম্বার আছে!
আইনস্টাইনেরও এরডস নাম্বার আছে: ২।
এরডস নাম্বার হচ্ছে প্রবলেম সলভিং ও গবেষণায় গবেষকদের মধ্যকার মহাজালকের মত কিছু!

এই হল মহামানবদের কীর্তি! তারা মর্ত্যে আসে, অল্প সময়ের জন্য বেঁচে থাকে, চলে যায়… কিন্তু রেখে যায় ছাপ…
সে ছাপ বয়ে চলে… অনবরত…
স্যালুট! হে গণিতের প্রেমিক পুরুষ,
It was said that giving a lecture on mathematics was like preaching to him.
এই চিরকুমারের জীবনাবসান ঘটে ২০শে সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ , পোল্যান্ডের ওয়ারশতে । তাঁর বাবা মার কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে ।

তথ্যসূত্র:
PAUL ERDOS – N IS A NUMBER – THE MAN MADE OF MATHS – A BBC DOCUMENTARY
http://www.nytimes.com/books/first/h/hoffman-man.html
http://www-history.mcs.st-and.ac.uk/Biographies/Erdos.html
http://en.m.wikipedia.org/wiki/Paul_Erd%C5%91s

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: