খালিদের ইয়ারমুখের যুদ্ধ – দিগ্বিজয়ী এক ক্যাভুলারি জেনারেলের গল্প

পর্ব ০১ _________________________________________________________

খলিফা আবু বকর খেলাফতের দায়িত্ব নেবার পর পরই কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পরেছিলেন; মহানবী (সাঃ) এর মৃত্যুর পর আরব গোত্র গুলোর ঐক্যে দ্রুত ফাটল ধরল, আর জায়গায় জায়গায় নতুন নতুন সব ভন্ড নবী-রাসুল উদয় হতে লাগল। এদের থামাতে আর দমাতে গিয়ে শুরু হল রিদ্দা ওয়ারস। নব নিযুক্ত সেনাপ্রধান খালিদ বিন ওয়ালিদ ইয়ামামার যুদ্ধে ভন্ড নবী মুসাইলিমাহকে পরাস্ত করে মধ্য আরব জুড়ে খেলাফতের কর্তৃত্ব সমুন্নত রাখলেন। এরপর আবু বকর খালিদকে পাঠালেন ইরাক ফ্রন্টে পার্সিয়ানদের দমাতে।

পার্সিয়ান ইনভেশনের শেষ দিকে ফিরাজের যুদ্ধে বাইজান্টাইন রোমান, সাসানিদ পার্সিয়ান আর খ্রিস্টান আরবদের যৌথবাহিনীকে পরাস্ত করে খালিদ যখন কাদিশিয়াহ অভিযানের পথে তখন তিনি খলিফা আবু বকরের আদেশ পেলেন সিরিয়ান ইনভেশনের কমান্ডার আবু উবায়দাকে রিইনফোর্স করার। সিরিয়ান ফ্রন্টে প্যালেস্টাইনের আজনাদাইনে আবু উবায়দার ছোট্ট সেনাবাহিনীকে বাইজাইন্টাইন রোমানরা প্রায় ঘিরে ফেলেছিল। যুদ্ধের এই ক্রিটিক্যাল জাঙ্কচারে খালিদের বিকল্প ছিলনা, তাই আজনাদাই ক্রাইসিস সলভের পর সাবসিকোয়েন্ট সিরিয়ান ইনভেশন কন্টিনিউ করার জন্য আবু বকর তখনো ইরাক ফ্রন্টে থাকা খালিদকে সিরিয়ান ফ্রন্টের নতুন কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে রি ইনফোর্সমেন্ট সমেত ইরাক ছেড়ে সিরিয়া আসতে নির্দেশ দিলেন।

নির্দেশ পেয়েই খালিদ তার বাহিনীর কিছু উটকে দুইদিন পর্যন্ত পানি না খাইয়ে রাখার নির্দেশ দিলেন। ইরাক থেকে সিরিয়া যাবার পথ ছিল দুইটা আর সংগত কারনেই সেই দুই পথে বাইজান্টাইন এম্বুশ থাকার কথা। তাই খালিদ সিরিয়ান ডেজার্ট হয়ে ইরাক থেকে সিরিয়া যাবার প্ল্যান করলেন। আর্মি নিয়ে কেউ এই মরুভুমি পারি দেবার কথা চিন্তাও করতে পারেনি কখনও। কিন্তু খালিদ তো খালিদই! যাত্রা শুরুর আগে খালিদ দুই দিনের তৃষ্ণার্ত উট গুলোকে গলা অবধি পানি খাইয়ে নিলেন। তারপর টানা দুই দিন হেটে সিরিয়ান ডেজার্ট অতিক্রম করলেন। পথে তার সৈন্যদের পানির চাহিদা পূরন করলেন সেই গলা পর্যন্ত পানি গেলা উট জবাই করে পানি বের করে নিয়ে।

খালিদ রওয়ানা দিয়েছে শুনেই আবু উবায়দা বসরা নগর আক্রমনের জন্য সুরাবিলকে আদেশ দিলেন কিন্তু সুরাবিল যখন তার মাত্র চার হাজার সৈন্য নিয়ে বসরা নগরীর উপকন্ঠে পৌছালেন তখন বাইজান্টাইন আর খ্রিস্টান আরবদের বিশাল যৌথবাহিনী তাকে ঘিরে ফেলল। সুরাবিলের মুসলিম বাহিনীর পরাজয় আর এনিহিলেশন যখন কনফার্ম, ঠিক তখনি সিরিয়ান ডেজার্ট ফুঁড়ে প্রায় আশরীরী এক বাহিনীর মত খালিদের মোবাইল গার্ড যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করল এবং পেছন দিক দিয়ে বাইজান্টাইন রোমান আর্মির উপর আছড়ে পরল। বাইজান্টাইন এলাইড ফোর্স রনেভংগ দিয়ে বসরা নগরীর ভেতরে পালিয়ে গিয়ে নগরীর প্রধান দরজার খিল এঁটে দিল, আর আবু উবায়দা ছুটে এসে খালিদকে জড়িয়ে ধরে তার হাতে সিরিয়ান ফ্রন্টের কমান্ড তুলে দিল।

৬৩৪ সালের মধ্য জুলাইয়ের ভেতর বসরা নগরীর পতনের মধ্যদিয়ে ঘসানিদ ডাইন্যাস্টির পরিসমাপ্তি ঘটল আর খালিদ ৩০ জুলাই ৬৩৪ তারিখে আজনাদাইনের যুদ্ধে বাইজান্টাইনদের পরাজিত করে সিরিয়ার বুকে বাইজান্টাইন রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘন্টা বাজিয়ে দিলেন।

বাইজান্টাইন রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াস এমেসায় বসে আজনাদাইনের ফলাফল জানলেন এবং প্রায় একই সাথে পরবর্তী বাইজান্টাইন শক্ত ঘাঁটি দামেস্ক নগরী থেকে রি ইনফোর্সমেন্টের তাগদা পেলেন। হিরাক্লিয়াসের মেয়ের জামাই টমাস ছিলেন তখন দামেস্কের দায়িত্বে। খালিদের বাহিনী এগিয়ে আসছে জেনে হিরাক্লিয়াসের কাছে রিইনফোর্সমেন্ট চেয়ে পাঠানোর পাশাপাশি তিনি দামেস্কের ডিফেন্স আরো শক্তিশালী করার নির্দেশ দিলেন। খালিদের অগ্রাভিযানের গতি কমিয়ে দিতে তিনি দুটো সেনাদল সামনে পাঠিয়ে দিলেন, কিন্তু তারা খালিদের ঝড়ো গতির অগ্রাভিযানের সামনে পাত্তাও পেলনা। হিরাক্লিয়াসের প্রথম দফা রিইনফোর্স্মেন্ট দামেস্ক পৌছাল ঠিকই কিন্তু ২০ আগস্ট ৬৩৪ তারিখে খালিদ দামেস্ক অবরোধ করে ফেললেন, আর ফার্দার রিইনফোর্সমেন্টের সব রুট বন্ধ করে দিলেন।

দামেস্ক অবরোধ চলাকালেই খলিফা আবু বকর ইন্তেকাল করলেন আর উমর বিন খাত্তাব খিলাফতের নতুন কর্নধার নির্বাচিত হলেন।

খলিফা উমর প্রথম সুযোগেই খালিদ বিন ওয়ালিদকে মুসলিম আর্মির কমান্ড থেকে সরিয়ে দিয়ে আবু উবায়দাকে নতুন সেনাপ্রধান ঘোষনা করলেন এবং খালিদকে আবু উবায়দার আন্ডারকমান্ড করে দিলেন। আবু উবায়দা নিঃসন্দেহে সেনাপ্রধান হবার যোগ্যই ছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি সিরিয়ান ফ্রন্ট কমান্ড করছেন, কিন্তু তিনি নিজেও খুব ভাল করেই জানতেন যে অন্তত যুদ্ধক্ষেত্রের সেনাপতিত্বে মুসলিম আর্মিতে খালিদের সমকক্ষ কেউ নেই। তাই দামেস্ক অবরোধের পুরোটা সময় খলিফা উমরের এই পয়গাম তিনি গোপন রাখলেন। ১৮ই সেপ্টেম্বর ৬৩৪ তারিখে দামেস্কের পতন হলে আবু উবায়দা খলিফা উমরের ইচ্ছের কথা খালিদকে জানালেন এবং নিজে কমান্ড গ্রহনের পরপরই সেনাপ্রধানের ক্ষমতাবলে খালিদকে তার চিফ অব স্টাফ করে ফেললেন এবং মুসলিম আর্মির কাভ্যুল্রি (অশ্বারোহী বাহিনী) কমান্ডার ঘোষনা করলেন।

মুতার যুদ্ধে বাইজান্টাইন রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে পরপর নয়টা তরবারি ভাঙ্গা খালিদ ইতোমধ্যে মহানবী (সাঃ) এর দেয়া উপাধি “সাইফুল্লাহ” বা “আল্লাহর তরবারি” নামের সার্থক প্রতিভূ। কোন যুদ্ধেই হার না মানার রেকর্ডধারী খালিদের যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিতি মানেই এক লক্ষ সৈনিকের রিইনফোর্সমেন্ট আর আসন্ন বিজয়ের গ্যারান্টি। তাই উমরের এমন সিদ্ধান্ত স্বভাবতই খালিদকে হতভম্ব করে দিল, কিন্তু তিনি তা সামলে নিয়ে বললেন, “যদি আবু বকর ইন্তেকাল করে থাকেন আর উমর নতুন খলিফা নির্বাচিত হয়ে থাকেন, তো আমাদের সবারই উচিত খলিফা উমরের প্রতি অনুগত থাকা এবং তার নির্দেশ মেনে চলা।“

ফিল্ড কমান্ডার হিসেবে আবু উবায়দা ছিলেন অনেক বেশি সাবধানী, তাই খালিদ পাশে থাকার পরও স্বভাবতই মুসলিম আর্মির অগ্রাভিযানের গতি অনেকটাই কমে গেল। আমর আর সুরাবিলকে তার অর্ধেক আর্মি সহ প্যালেস্টাইন দখলের মিশনে পাঠিয়ে দিয়ে উবায়দা খালিদকে সাথে নিয়ে সিরিয়ার আরো উত্তরে তার অগ্রাভিযান অব্যহত রাখলেন এবং মার্চ ৬৩৬ নাগাদ এমেসা পর্যন্ত দখল করে ফেললেন।
উপায়ান্তর না পেয়ে বাইজান্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস অগত্যা তার রাজধানী এন্টিওখে দুই লাখ সৈন্যের এক বিশাল সেনাবাহিনী কনসেনট্রেট করলেন। তার পরিকল্পনা ছিল এই বিশাল বাইজান্টাইন বাহিনী দিয়ে প্যালেস্টাইন, মধ্য সিরিয়া আর উত্তর সিরিয়াজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অভিযানরত মুসলিম সেনাদলগুলোকে একের পর এক ধ্বংস করা।

৬৩৬ সালে জুন মাসের মাঝামাঝি একযোগে পাঁচ পাঁচটা বাইজান্টাইন আর্মি যখন তিন দিক দিয়ে এমেসার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করল, বিভ্রান্ত আবু উবায়দা তখন ফের খালিদের শরনাপন্ন হলেন। শাহী ফরমানের তোয়াক্কা না করেই তিনি খালিদের হাতে কমান্ড তুলে দিয়ে বাহিনীর প্রশাসনিক কার্যক্রম দেখাতে মনোযোগ দিলেন। বাইজান্টাইন আর্মির এগিয়ে আসার খবর পাবার পর থেকেই খালিদ মনে মনে এই কঠিন অবস্থা থেকে পরিত্রানের উপায় নিয়ে ভাবছিলেন এবং হঠাতই তার মাথায় আইডিয়াটা খেলে গেল। আইডিয়াটা এতোটাই যুগান্তকারী ছিল যে স্রেফ এই একটা আইডিয়ার কারনে পরে ইতিহাসের মোড় ঘুরে গিয়েছিল আর বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের মধ্যদিয়ে ইসলামের ইউরোপ যাত্রার পথ খুলে গিয়েছিল। তাই কমান্ড ফিরে পাবার সাথে সাথে খালিদ একটা কনফারেন্স ডাকলেন এবং এভেইলেবেল সব অফিসারদের সেই কনফারেন্সে হাজির থাকার নির্দেশ দিলেন।

পর্ব ০২_________________________________________________________

কনফারেন্স রুম জুড়ে পিন পতন নিস্তব্ধতা; অবশেষে আবু উবায়দা সেই নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খালিদের পরামর্শ চাইলেন। প্রথমেই খালিদ গোয়ান্দা প্রধানদের কাছ থেকে সর্বশেষ ইন্টেলিজেন্স আপডেট জানতে চাইলেন। বাইজান্টাইন রোমান যুদ্ধবন্দী আর এমেসায় সদ্য রিক্রুটেড ডাবল এজেন্টদের মাধ্যমে পাওয়া ইন্টেলিজেন্সের ভিত্তিতে ওয়ার গেমিং টেবিল জুড়ে সম্রাট হিরাক্লিয়াসের রণ পরিকল্পনার যে চিত্রটা ক্রমশ স্পষ্টতর হয়ে উঠছে তা নিঃসন্দেহে ভয়াবহ।

৬২৯ সালে সম্রাট হিরাক্লিয়াস গ্রিক টাইটেল ‘ব্যসিলিও’ গ্রহনের পর থেকেই তার প্রপাগান্ডিস্টরা যেকোন বাইজান্টাইন এফোর্টকেই যীশুর নামে চালিয়ে দিচ্ছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে রেলিক হিসেবে যীশুর ক্রুশের কাঠ বহন করা হত সৈন্যদের মোরাল আপ রাখতে। এবারও এর কোন ব্যতিক্রম হলনা। ৬৩৫ সালের শেষ দিকে সম্রাট হিরাক্লিয়াস প্রায় অপ্রতিরোধ্য ইসলামিক ইনভেনশনস ঠেকাতে এই আদি ক্রুসেডের ডাক দিলেন। যদিও সিরিয়ান ফ্রন্টে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কিছুতেই কোন কাজ হচ্ছিল না, আর মুসলিমদের হাতে এমেসা নগরী তখনও পর্যন্ত অবরুদ্ধ।

মে ৬৩৬ নাগাদ এমেসাবাসী যখন জিজিয়া কর দিয়ে মুসলিম আর্মির বশ্যতা মেনে নিতে রাজি হয়েছে, তখন উত্তর সিরিয়া আর আরো উত্তরে এন্টিওখ জুড়ে রাশান, স্লাভ, ফ্রাঙ্ক, গ্রীক, রোমান, জর্জিয়ান, আর্মেনিয়ান আর খ্রিস্টান আরবদের নিয়ে গড়ে ওঠা বাইজান্টাইন বহুজাতিক বাহিনী রণপোম নিতে শুরু করেছে।

৩০,০০০ সেনা নিয়ে একেকটা বাইজান্টাইন আর্মি গড়ে উঠল, আর এমন ৫টা আর্মি একযোগে এগুতে লাগল সিরিয়ান ফ্রন্টের দিকে। আর্মেনীয়দের কমান্ড করছিল জেনারেল ভাহান, মতান্তরে রাজা মাহান। এমেসার সাবেক এই গভর্নর নিজের হাতের তালুর মতই ভাল করে চিনতেন সিরিয়ান ফ্রন্টের আনাচে কানাচে। খ্রিস্টান আরবদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন প্রিন্স জাবালাহ। রাশান আর স্লাভদের কমান্ডে ছিলেন জেনারেল কানাতীর। আর অল ইউরোপিয়ান ফোর্স কমান্ড করছিলেন জেনারেল গ্রেগরি আর জেনারেল দাইরজান।

ভাহানকে ফিল্ড কমান্ড দেয়া হল আর থিওডোর টিথোরিয়াস কে বাইজান্টাইন বহুজাতিক বাহিনীর প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা হল। টিথোরিয়াস আদতে ছিলেন বাইজান্টাইন কোষাধ্যক্ষ। সিরিয়ান ফ্রন্টে তাকে পাঠানর কারন ছিল দ্বিবিধ। প্রথমত আর্মেনিয় জেনারেল ভাহানের সাথে ইউরোপিয় কমান্ডার আর জেনারেলদের পার্সোনালিটি কনফ্লিক্ট রিডাকশন। আর দ্বিতীয়ত বিশাল এই বহুজাতিক বাহিনীতে যেন বেতন পাওয়া নিয়ে কোন রিউমার না ছড়ায়।

তখন খেলাফতের মুসলিম আর্মি চার ভাগে বিভক্ত হয়ে তিন ফ্রন্ট জুড়ে অভিযানে ব্যস্ত। আমর বিন আল আস প্যালেস্টাইনে, সুরাবিল জর্ডানে, কাসেরিতে ইয়াজিদ আর আবু উবায়দা ও খালিদ এমেসার উত্তরে লড়ছিল তখন। হিরাক্লিয়াস মুসলিম আর্মির এই স্প্লিট কন্ডিশনের ফায়দা লুটবার ফন্দি আটলেন। তিনি চাইলেন তার বিশাল এই বহুজাতিক বাহিনী দিয়ে একের পর এক মুসলিম আর্মিকে আউটনাম্বার করে গুড়িয়ে দিতে। প্রায় অবিশ্বাস্য বেলিজারেন্ট রেশিওর জন্যও ইয়ারমুখের যুদ্ধের নাম ইতিহাসের পাতায় লিখা হতে চলেছে।

ওদিকে উমর বনাম খালিদের বিরোধ নিয়ে কানাঘুষা তখন তুঙ্গে। অনেকেরই ধারনা ব্যাপারটা ঈর্ষাজনিত। তুতো ভাই খালিদের কাছে শৈশবে অসংখ্যবার মল্লযুদ্ধে পরাজিত উমর ক্ষমতায় এসে তার শোধ নিয়েছেন। দুজনই সাহাবী ছিলেন, ইসলামের বিস্তারে দুজনই মহানবী (সাঃ) এর কাছে প্রায় অপরিহার্য ছিলেন। তাই একটা ঈর্ষার অস্তিত্ব একেবারে উড়িয়ে দেবার জো ছিল না। কিন্তু একটা জায়গায় এসে দুই জন দুই ভাবে অনন্য, খালিদ ছিলেন ফাইনেস্ট ট্যাকটিক্যাল কমান্ডার আর উমর ছিলেন স্ট্রেটেজিক্যালি সাউন্ড অনবদ্য এক স্টেটসম্যান।

উমরের দাবী লিভিং লিজেন্ড খালিদের ব্যাপারে মুসলিমদের মনে ক্রমেই দৃঢ় হতে থাকা কুসংস্কার থেকে ইসলামকে বাঁচাতেই খালিদকে কমান্ড থেকে অপসারনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। লোকে ভাবতে শুরু করেছিল খালিদ যুদ্ধক্ষেত্রে পা রাখা মানেই সুনিশ্চিত বিজয়!

কিন্ত আসন্ন ইয়ারমুখের যুদ্ধে দুজনেই স্ট্রেটেজিক আর ট্যাকটিক্যাল পারভিউ থেকে দারুনভাবে লড়েছিলেন, আর হিরাক্লিয়াস – ভাহানের বহুজাতিক বাইজান্টাইন বাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করে বেলিজারেন্ট রেশিওর ঐতিহাসিক হিসেব নিকেশ আগাগোড়াই উল্টে পাল্টে দিয়ে ছিলেন।

 

পর্ব ০৩_________________________________________________________

ম্যানিয়াহ কি হেরাক্লিয়াসের মেয়ে ছিলেন নাকি নাতি, তা নিয়ে ঐতিহাসিক ডাউট আছে। মুসলিম আর্মি তখন একই সময়ে সিরিয়ান ফ্রন্টে হেরাক্লিয়াসের বাইজান্টাইন আর্মির বিরুদ্ধে আর পার্সিয়ান ফ্রন্টে ইয়াজদেগার্ডের পার্সিয়ান আর্মির রিরুদ্ধে লড়ছিল। তাই মুসলিম আর্মির বিরুদ্ধে অল আউট কাউন্টার এটাকটা লঞ্চ করার আগে হেরাক্লিয়াস একটা ইন্টারেস্টিং স্ট্রেটেজিক চাল চাললেন; তিনি পার্সিয়ান সম্রাট ৩য় ইয়াজদেগার্ডের সাথে ম্যানিয়াহর বিয়ে দিয়ে দিলেন। রাজনৈতিক এই বিয়ের উদ্দেশ্যই ছিল মুসলিমদের বিরুদ্ধে বাইজান্টাইন কাউন্টার এটাকের সময় পার্সিয়ান এলায়েন্স শতভাগ নিশ্চিত করা।

হেরাক্লিয়াসের স্ট্রেটেজিক প্ল্যান ছিল সিরিয়ান ফ্রন্টে যখন বাইজান্টাইনরা হামলে পরবে তখন একই সময়ে পার্সিয়ান ফ্রন্টেও ইয়াজদেগার্ড আক্রমন চালাবে যেন মুসলিম আর্মি একইসাথে দুই ফ্রন্টে লড়তে বাধ্য হয়; আর সিরিয়ান ফ্রন্টকে রি ইনফোর্স করার জন্য পার্সিয়ান ফ্রন্ট থেকে কোন ফোর্স যেন পুল করতে না পারে। স্ট্রেটেজিক এই ডেভেলপমেন্টটা খলিফা উমরের গোচরে আনার পরামর্শ দিয়ে খালিদ ট্যাক্টিক্যাল ব্যাটেলফিল্ডের ডেভেলপমেন্টের দিকে নজর দিলেন। গোয়েন্দা প্রধানদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাজানো ওয়ারগেম টেবিলের দিকে তাকিয়ে খালিদ-উবায়দা সহ সব মুসলিম কমান্ডারদের কপালের দুশ্চিন্তার রেখা গভীরতর হয়ে উঠল।

৬৩৬ সালের জুনের মাঝামাঝি বাইজান্টাইন আর্মি এন্টিওখ আর উত্তর সিরিয়ার ছাউনি ছেড়ে বেরিয়ে এল। প্রথম টার্গেট সম্প্রতি আবু উবায়দা আর খালিদের মুসলিম আর্মির কব্জায় চলে যাওয়া এমেসা উদ্ধার করা। প্রথমেই হেরাক্লিয়াসের ছেলে প্রিন্স কন্সট্যানটাইন-৩ ক্যাসারির পথে রওয়ানা দিলেন ক্যাসারির বাইজান্টাইন গ্যারিসনকে রিইনফোর্স করতে, যেন ক্যাসারি অবরোধ করে রাখা ইয়াজিদের মুসলিম আর্মিকে এমেসা অভিযানের সময় পর্যন্ত এনগেজ করে রাখা যায়।

জেনারেল কানাতীরের মিশন ছিল এমেসা বাইপাস করে উপকূল ধরে দ্রুত বৈরুত হয়ে দামেস্ক দখল করে দামেস্ক থেকে এমেসা যাবার লাইন অব কমুনিকেশন কাট অফ করা; আর এমেসায় ঘাঁটি গেঁড়ে বসা উবাইদা-খালিদের মুসলিম আর্মিটাকে আইসোলেট করে ফেলা, যেন পেছন থেকে কোন রসদ বা রিইনফোর্সমেন্ট মুসলিম আর্মির কাছে পৌছাতে না পারে, আর আক্রান্ত হবার পর একজন মুসলিম সেনাও পিছু হটে কিংবা জীবিত পালিয়ে যেতে না পারে।

প্রিন্স জাবালাহর মিশন ছিল এলেপ্পো থেকে সোজা এমেসার দিকে এগিয়ে গিয়ে উত্তর দিক থেকে মুসলিম আর্মিকে ফ্রন্ট থেকে এনগেজ করা। আর জেনারেল দাইরজানের মিশন ছিল জাবালাহ যখন মুসলিমদের সামনে থেকে এনগেজড রাখবে তখন পশ্চিম দিক থেকে ফ্ল্যাঙ্কিং মুভ করে এগিয়ে এসে মুসলিমদের বাম ফ্ল্যাঙ্কে আক্রমন করা। জেনারেল গ্রেগরির মিশন ছিল মেসোপটেমিয়া হয়ে উত্তর পূর্ব দিক থেকে এগিয়ে এসে মুসলিম আর্মির ডান ফ্ল্যাঙ্কে হামলে পরা। ফিল্ড কমান্ডার জেনারেল ভাহান তার অপারেশনাল রিজার্ভের সাথে জাবালাহর আর্মির পেছনেই থাকবেন।

প্রথমেই খালিদ মুসলিম আর্মির ডেপ্লয়মেন্টের দিকে সবার দৃস্টি আকর্ষন করলেন। আমর বিন আসের আর্মি প্যালেস্টাইনে, সুরাবিলের আর্মি জর্ডানে আর ইয়াজিদ ক্যাসারি অবরোধ করে আছে। এমেসা পেছন দিয়ে কাট অফ হবার পর তিন দিক থেকে আক্রান্ত হলে বেলিজারেন্ট রেশিওতে এতোবেশি ফারাক তৈরি হবে যে কোনভাবেই পরাজয় এড়ান সম্ভব না। খালিদ সানজুর নাম শুনেছিলেন কিনা সে ব্যাপারে কোন ঐতিহাসিক বক্তব্য পাওয়া যায় না। তবে তিনি কাকতালীয়ভাবে ঠিক সানজুর মত করেই ভাবলেন; অভিজ্ঞ যোদ্ধা খালিদ ভাল করেই জানতেন কোন যুদ্ধ লড়তে হয় আর কোন যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে হয়।

এমেসার ওয়ারগেমিং কনফারেন্সের সব অফিসার আর এমেসা থেকে বহুদূর এলেপ্পোতে বসা হেরাক্লিয়াসকে অবাক করে দিয়ে খালিদ বিন ওয়ালিদ, দ্য সাইফুল্লাহ সব মুসলিম আর্মিকে অনতিবিলম্বে এমেসা থেকে পিছিয়ে দামেস্ক পেরিয়ে আরো দক্ষিনে গোলান হাইটের কাছাকাছি জাবিয়াতে কনসেন্ট্রেট করার যুগান্তকারী নির্দেশ দিলেন। এতে প্রায় একই সময়ে চার স্থানে বিচ্ছিন্ন মুসলিম আর্মিগুলো একত্র হবার সুযোগ পাবে আর খলিফা উমরের জন্যও রিইনফোর্স পাঠানো আরো সহজ হবে। তাছাড়া জাবিয়ার প্রান্তর খালিদের দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী বাহিনীর কাভ্যুলরি চার্জের জন্য আদর্শ টেরেইন।

নতুন সিদ্ধান্তটি নিয়ে দ্রুততম অশ্বে সওয়ার হয়ে রাজদূতেরা ছুটে চলল খলিফা উমর, আমর, সুরাবিল আর ইয়াজিদের উদ্দেশ্যে। যেহেতু মুসলিম আর্মি এমেসা ছেড়ে পিছু হটছে তাই আবু উবায়দা এমেসার জনগনের কাছ থেকে নেয়া সমুদয় জিজিয়া কর ফেরত প্রদানের নির্দেশ দিলেন। যুদ্ধের এই অবস্থায় খলিফা উমর তার প্রথম স্ট্রেটেজিক চালটা চাললেন। পার্সিয়ান ফ্রন্ট ঠান্ডা রাখতে তিনি পার্সিয়ান সম্রাট ইয়াজদেগার্ডের দরবারে নেগোশিয়েটর পাঠালেন যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব দিয়ে।

এমেসা থেকে মুসলিম ফোর্সের জাবিয়াতে ট্যাক্টিক্যাল রিডেপ্লয়মেন্টের সিদ্ধান্তের কারনে হেরাক্লিয়াসের গোটা ক্যাম্পেইন প্ল্যান বেশ বড়সড় একটা ধাক্কা খেল। (শত্রুর প্রেশারে পিছিয়ে আসাকে আমরা বলব রিট্রিট। আর নিজের সুবিধার জন্য পিছিয়ে আসাকে বলব ট্যাক্টিক্যাল রিডেপ্লয়মেন্ট।) ইয়ারমুখ যুদ্ধক্ষেত্রে খালিদের মেনুভার আর কভ্যুলরি ট্যাক্টিক্স বাদেই, স্রেফ এই ট্যাক্টিক্যাল রিডেপ্লয়মেন্টের ট্রাম্পকার্ড ডিসিশনের কারনেই খালিদকে সমর ইতিহাসে আলাদা করে স্মরন করা হয়।

ব্যাটেলফিল্ড এমেসা থেকে জাবিয়া শিফট করায় বিচ্ছিন্নভাবে মুসলিম আর্মিকে ধ্বংস করার হেরাক্লিয়াসের বড় সাধের প্ল্যানটাই ভেস্তে গেল। যাহোক, অনিচ্ছা সত্বেও হেরাক্লিয়াস তার কন্টিজেন্সি ভাবতে শুরু করলেন।

এমেসা থেকে জাবিয়া মানে হেরাক্লিয়াসের ৫টা আর্মিকে এবার দ্বিগুন দূরত্ব মার্চ করতে হবে। অথচ যাবার জন্য মবিলিটি করিডোর একটাই; এমেসা-দামেস্ক-জাবিয়া রোড। অর্থাত ৫টা আর্মিকে একটার পেছনে একটা মার্চ করতে হবে, যার মানে সময় বেশি লাগবে।

সময় বেশি লাগা মানে ক্যম্পেইনের ডিউরেশন বেড়ে যাওয়া। আর সময় বেড়ে যাওয়া মানেই লজিস্টিক ব্যয় বেড়ে যাওয়া। আবার জাবিয়ার নিকটবর্তী একমাত্র লজিস্টিক বেইজ হল দামেস্ক। অথচ সদ্যই মুসলিমদের সিরিয়ান ক্যাম্পেইন এর ধকল কাটিয়ে উঠে দামেস্ক এখনো বিশাল ৫টা আর্মিকে সাপোর্ট করার মত অবস্থায় নেই। তারমানে ক্যাম্পেইনটা শুরুই হবে লজিস্টিক ড্রব্যাক নিয়ে।

সর্বোপরি অনুর্বর মরু শহর মক্কা-মদিনা দখলের কোন ইচ্ছেই হেরাক্লিয়াসের নেই। কিন্তু লেভান্ট পুনর্দখলের স্বার্থে মুসলিম আর্মিকে হারানো ছাড়া আর কোন উপায়ও নেই। অগত্যা হেরাক্লিয়াস তার আর্মিগুলোর এডভান্স অব্যহত রাখার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন।

মুসলিম ফোর্সেস জাবিয়াতে কন্সেন্ট্রেট করার পর দেখা গেল যে ইয়াজিদ ক্যাসারি অবরোধ ছেড়ে চলে আসার পর দামেস্ক অক্ষের পাশাপাশি ক্যাসারি হতে আরেকটা বাইজান্টাইন এভেনিউ অব এপ্রোচ খুলে গেল। মানে এখনো দুই দিক থেকে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রয়েই গেল। তাই খালিদ ফের ট্যাক্টিক্যাল রিডেপ্লয়মেন্টের নির্দেশ দিলেন; এবার গন্তব্য জাবিয়া থেকে ইয়ারমুখ।

ওদিকে খলিফা উমরের এনভয় সন্ধি প্রস্তাব নিয়ে ইতোমধ্যে পার্সিয়ান সম্রাট ইয়াজদেগার্ডের রাজদরবারে পৌছে গেল।

 

পর্ব ০৪_________________________________________________________

মুসলিম আর্মি জাবিয়া পৌছে গুছিয়ে উঠবার আগেই হেরাক্লিয়াস তার বাইজান্টাইন আর্মি গুলোকে দ্রুত এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিলেন। ক্যাসারির বাইজান্টাইন গ্যারিসন অবরোধ বাতিল করে দিয়ে ইয়াজিদ জাবিয়ার পথ ধরতেই ক্যাসারি থেকেও বাইজান্টাইন সৈন্যরা পিছু ধাওয়া করতে চেস্টা করল। সামনে দামেস্কের দিক থেকে আর পেছনে ক্যাসারির দিক থেকে একযোগে বাইজান্টাইন আক্রমনের আশঙ্কায় আবু উবায়দা খালিদের আন্ডারে ৪০০০ ঘোড়সওয়ারের মোবাইল গার্ডকে রিয়ার গার্ড হিসেবে রেখে মুসলিম আর্মি নিয়ে জাবয়া রোড ধরে ইয়ারমুখে শিফট করলেন।

খালিদ যথারীতি তার স্বভাবমত জাবিয়া বসে না থেকে বরং দামেস্কের দিকে এগিয়ে গিয়ে বাইজান্টাইন এডভান্সিং কলামের ভ্যানগার্ডকে আক্রমন করে দামেস্ক অবধি ধাওয়া করে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন। এরপর বাইজান্টাইনরা আর মুসলিম আর্মির জাবিয়া রিডেপ্লোয়মেন্টে কোন বাগড়া দেবার চেস্টা করেনি। সমগ্র মুসলিম আর্মি ইয়ারমুখে ক্যাম্প করার পর খালিদও জাবিয়া ছেড়ে ইয়ারমুখে ফিরে গেল।

ইয়ারমুখ যুদ্ধক্ষেত্রটি গোলান মালভূমির দক্ষিন-পূর্বে গ্যালিলি সাগরের পূর্বে আর ইয়ারমুখ নদীর উত্তরে বর্তমান ইসরায়েল, জর্ডান আর সিরিয়া সীমান্তের সংযোগস্থলে অবস্থিত। যুদ্ধক্ষেত্রের পশ্চিম প্রান্ত ওয়াদিউর রাক্বাদ নামের রাভিন বা গিরিখাত দ্বারা সীমাবদ্ধ যা উত্তর থেকে নেমে এসে দক্ষিনে ইয়ারমুখ নদীতে যোগ দিয়েছে। পূর্বে আজরা হিল ট্র্যাক্টস। পূর্বে জাবিয়া রোড আর পশ্চিমে জর্ডান নদীর শাখা ইয়ারমুখ নদী। ইয়ারমুখ প্রান্তরে দুই আর্মির জন্যই পর্যাপ্ত ঘাস আর পানি ছিল।

অবশেষে জেনারেল ভাহান দ্য আর্মেনিয়ান তার বাইজান্টাইন বহুজাতিক বাহিনী নিয়ে ইয়ারমুখ পৌছে দেখলেন খালিদের মুসলিম আর্মি নিয়ে ইতোমধ্যে ইয়ারমুখের প্রান্তরের পুর্ব প্রান্তে ডানে জাবিয়া রোড আর বামে ইয়ারমুখ নদীর মধ্যবর্তী লাভা গঠিত সমতলে ক্যাম্প করে বসে আছে। খ্রীস্টের জন্মের ৪০০ বছর আগে চৈনিক সমর দার্শনিক সানজু বলে গেছিলেন যে যুদ্ধক্ষেত্রে যে আগে পৌছায়, সে এডভান্টেজে থাকে। খালিদও তেমনি তিনটা এডভান্টেজ নিয়েই যুদ্ধ শুরু করলেন।

প্রথমতঃ খালিদের মুসলিম আর্মি পুর্ব প্রান্তে ক্যাম্প করার ফলে ভাহানের বাইজান্টাইন আর্মি মুসলিম ক্যাম্পের বিপরীতে ইয়ারমুখের প্রান্তরের পশ্চিম প্রান্তে ক্যাম্প করতে বাধ্য হল। পজিশনাল এই এডভান্টেজের ফলে সকাল থেকে দুপুরের আগ পর্যন্ত বাইজান্টাইনদের চোখের ওপর সূর্য থাকত; ব্যাপারটা বাইজান্টাইন তীরন্দাজদের জন্য তো বটেই এমনকি পদাতিক সৈন্যদের জন্যও ছিল বেশ অস্বস্তিকর। পক্ষান্তরে সূর্যের বিপরীতে থাকায় সকাল থেকেই মুসলিম সৈন্যরা প্রতিপক্ষকে স্পষ্ট দেখতে পেত।

দ্বিতীয়তঃ ইয়ারমুখ প্রান্তরের সেন্টারে পর্যাপ্ত ফ্রন্টেজ পেতে গিয়ে বাইজান্টাইনরা পশ্চিম প্রান্তে ওয়াদি উর রাক্বাদ নামের এক গভীর গিরিখাদ পেছনে রেখে ক্যাম্প করতে বাধ্য হল। গিরিখাদটি স্থানে স্থানে প্রায় ২০০ মিটারের মত গভীর আর আইনাল ধাকার এলাকার একটা মাত্র ক্রসিং সাইট ছাড়া ইয়ারমুখের প্রান্তর থেকে পিছিয়ে এই গিরিখাতের ওপারে যাবার আর কোন উপায় ছিলনা। ইয়ারমুখ যুদ্ধের ষষ্ঠদিন এই আইনাল ধাকার বেদখল হয়ে যাবার কারনে বাইজান্টাইনরা দূর্ভাগ্যজনক এনিহিলেশনের শিকার হয়েছিল। অবশ্য আগের পাঁচদিনের বাইজান্টাইন নৃশংশতার কারনে খালিদের নির্দেশও ছিল কোন যুদ্ধবন্দী গ্রহনের ঝামেলায় না যাবার।

তৃতীয়তঃ যুদ্ধক্ষেত্রের পূর্ব প্রান্তে ক্যাম্প করায় খলিফা উমর প্রতিদিন সকালের দিকে ছোট ছোট দলে রিইনফোর্সমেন্ট পাঠাতে লাগলেন। ছোট ছোট এই দলগুলো হৈচৈ আর ঢাক ঢোল পিটিয়ে এমনভাবে এসে মুসলিম ক্যাম্পে যোগ দিত যে সকালের সুর্যের কারনে বাইজান্টাইনরা তাদের সঠিক সংখ্যাটা ঠাহর করতে না পেরে ক্রমেই আরো ফ্রাস্ট্রেটেড হতে উঠত।

বিশাল বাইজান্টাইন আর্মি ক্যাম্প করতেই তাদের জেনারেল ডাইরেকশন অব এটাক আর ফ্রন্টেজ স্পষ্ট হয়ে উঠল; খালিদ এর সাথে সামঞ্জস্য রেখে মুসলিম ডেপ্লয়মেন্ট এডজাস্ট করে নিলেন। তখনকার যুদ্ধের নর্ম অনুযায়ী যুদ্ধের চূড়ান্ত দিনক্ষন (ডি ডে) ফাইনাল হবার আগ পর্যন্ত দু পক্ষই মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে নিজ নিজ রেকি, প্ল্যানিং, অর্ডারস আর লজিস্টিক বিল্ডাপে মনোযোগ দিল। এরিমধ্যে ভাহানের কাছে হেরাক্লিয়াসের নির্দেশ এল শান্তিপূর্ন উপায়ে এই ঝামেলা মেটানোর সব উপায় এক্সপ্লোর করার আগেই যেন কোন প্রকার হোস্টাইলিটি শুরু না করা হয়।

প্রথমে বাইজান্টাইন জেনারেল গ্রেগরি এল মুসলিম ক্যাম্পে আবু উবায়দার সাথে দেখা করতে। বাইজান্টাইন প্রস্তাব ছিল লেভান্ট ছেড়ে যেন মুসলিমরা আরবে ফিরে যায়, আর কথা দিতে হবে আর কখনো লেভান্ট দখলের চেস্টা করা হবে না। আবু উবায়দা প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে গ্রেগরি ফিরে গেল শুন্য হাতেই।

ইউরোপিয়ান গ্রেগরির চেয়ে প্রাচ্যদেশীয় জাবালাহ বেশি ফলপ্রসু হবেন ভেবে এরপর ভাহান পাঠালেন জাবালাহ কে, কিন্তু ফলাফল একই। অগত্যা মুসলিম আর্মির স্ট্রেন্থ পরীক্ষা করতে জুলাইয়ের গোড়ার দিকে ভাহান ফের জাবালাহ কে পাঠালেন রেকি ইন ফোর্সে। জাবালাহ মুসলিম ফ্রন্টে পৌছাতেই খালিদের মোবাইল গার্ডের তুমুল আক্রমনের মুখে পড়ে ফিরে এলেন। ভাহান বুঝলেন মুসলিম আর্মি সহজেই পিছু হটবে না।
এরপর আরো মাসখানেক দুই পক্ষই যার যার ক্যাম্পে বসে রইল। হেরাক্লিয়াস চেস্টা করে যাচ্ছিল পার্সিয়ান সম্রাট ইয়াজদেগার্ডকে যুদ্ধে রাজী করাতে, আর মুসলিমরা ধীরে ধীরে শক্তিবৃদ্ধি করছিল আরবের বিভিন্ন প্রান্ত হতে যোদ্ধা এনে এনে।

আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষ দিকে ভাহান যুদ্ধ শুরু করার ফাইনাল প্রিপারেশন শুরু করলেন। তার আগে শেষ বারের মত তিনি যুদ্ধ এড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে এ সংকট সমাধানের চেষ্টা করতে তিনি মুসলিম শিবিরে আলোচনার প্রস্তাব পাঠালেন। আবু উবায়দা এবার খালিদকে পাঠালেন বাইজান্টাইন ক্যাম্পে আলোচনার জন্য।

আলোচনার শুরুতেই ভাহান বললেন, “জানি মরুভূমির কষ্টসাধ্য জীবন আর ক্ষুধাই তোমাদের নিজ দেশের বাইরে টেনে আনে বারবার। আমরা তোমাদের জনপ্রতি ১০ দিনার করে দিচ্ছি, দেশে ফিরে যাও। আর আগামী বছরও একই পরিমান অর্থ মদিনায় পাঠিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।

ক্ষুব্দ খালিদ ক্রোধ সামলে বললেন, “আসলে রক্তের পিপাসায় আমরা দেশের বাইরে বেরিয়ে আসি, আর শুনেছি রোমান রক্তের চে সুস্বাদু রক্ত আর হয় না। আমি বরং তোমাকে তিনটা অপশান দিচ্ছি, তোমার পছন্দেরটা তুমিই বেছে নাও। হয় ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে মুসলমান হয়ে যায়, নয়ত জিজিয়া কর দিয়ে নিজের মত থাক, কিংবা আর সময় নস্ট না করে অস্ত্রধারন কর আর আমাদেরকে যুদ্ধে পরাজিত কর।”

ভাহান শেষ অপশানটা বেছে নিলেন আর পরদিন সকাল থেকেই যুদ্ধ শুরু হবে বলে কথা দিলেন। “তথাস্তু” বলে খালিদ ভাহানের তাবু থেকে বেরিয়ে মুসলিম আর্মির ক্যাম্পের দিকে পা বাড়ালেন।

পর্ব ০৫_________________________________________________________

অধুনা যুদ্ধে ডি-ডের (যুদ্ধ শুরু হবার তারিখ) তথ্য প্রতিপক্ষের কাছ থেকে সযত্নে লুকিয়েই রাখা হয় না শুধু, পাশাপাশি একচুয়াল ডি-ডের তারিখ সম্পর্কে ডেলিবারেটলি শত্রুকে মিসলিডও করা হয়। রাত আর দূর্যোগপূর্ন আবহাওয়া কে আক্রমনের আদর্শ সময় আর অপ্রস্তুত শত্রুর কন্সেন্ট্রেশনের ওপর অতর্কিতে হামলাকে আদর্শ রণকৌশল গন্য করা হয়। অধুনা যুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোন যুদ্ধক্ষেত্র বলতে কিছুই নেই, আর সেনাপতি আর অফিসারদের সবার আগে আক্রমন করা হয় সৈন্যদের মধ্যে লিডারশিপ ক্রাইসিস তৈরি করতে। এই এক যন্ত্রনায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে অফিসারদের যেন দূর থেকে চিহ্নিত না করা যায় সে জন্য চকচকে পিতলের র্যাথঙ্কের পরিবর্তে যুদ্ধক্ষেত্রে কাপড়ের ফিল্ড র্যা ঙ্ক পরিধানের প্রচলন হয়ে গেল।

কিন্তু আগেকার যুদ্ধের কিছু নর্ম ছিল সত্যি বেশ রাজসিক। যেমন উভয়পক্ষের সম্মতিক্রমে যুদ্ধক্ষেত্র, ডি-ডে ইত্যাদি নির্ধারন করা হত। ক্ষেত্র বিশেষে রণডঙ্কা বা দামামা বাজিয়ে দিনের যুদ্ধ শুরু হত, মূলযুদ্ধ শুরুর আগে বেলিজারেন্ট চ্যাম্পিয়নরা মল্লযুদ্ধে অবতীর্ন হত। সাধারন সৈন্যরা সাধারনত সেনাপতি বা রাজাদের সরাসরি এনগেজ করত না, অবশ্য তাদের হাইলি স্কিল্ড বডি গার্ডদের পেরিয়ে তার কাছে পৌছানো প্রায় দুঃসাধ্য ছিল, সেটাও একটা কারন ছিল। আবার দিনশেষে দামামা বাজিয়ে দিনের যুদ্ধে ইতি টেনে সৈন্যরা যার যার শিবিরে রিট্রিট করত; আর অভিজাত সেনাবাহিনী রাতে সাধারনত কোন যুদ্ধে লিপ্ত হত না, এবং শত্রুর আগোচরে শত্রুর ক্যাম্প রেইডের তো প্রশ্নই ওঠেনা।

ভাহান আর খালিদের নিস্ফল পার্লে শেষে ১৫ আগস্ট ৬৩৬ ইয়ারমুখ যুদ্ধের ডি-ডে নির্ধারিত হয়ে গেল। অবশ্য উভয় পক্ষই ইতোমধ্যে ফাইনাল প্রিপারেশন শুরু করে দিয়েছে। ব্যাটেল প্রসিডিউরের অংশ হিসেবে কমান্ডাররা তাদের নিজ নিজ ব্যাটালিয়নের জায়গা রেকি করে নিল, অফিসার আর এনসিওরা লাস্ট অর্ডার পাস করার পর সৈন্যদের অস্ত্র-বর্ম আর ঘোড়ার নাল ইন্সপেক্ট করল, ধর্ম যাজকেরা ভরপেট খেয়ে নিয়ে মোটিভেশনাল স্পিচ দিতে দিতে মুখে ফেনা তুলে ফেলল। রাত গভীর হবার আগেই আজ লাইটস অফ হয়ে গেল। যুদ্ধের আগের রাতে সৈন্যদের পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে ডিউটি অফিসাররা তাবুতে তাবুতে উকি দিতে লাগল। আর প্রিয় কারো স্মৃতিচিহ্ন মুঠোর ভেতর আকড়ে ধরে সৈন্যরা অন্ধকার তাবুর ছাদের দিকে অপলক চেয়ে থেকে থেকে একসময় ঘুমে ঢলে পড়ল।

শুধু জেনারেলরা জেগে থাকল গভীর রাত অবধি। দীর্ঘ সামরিক জীবনের উত্থান পতনের ভেতর দিয়ে একেকজন জেনারেলের জন্ম। বিগত প্রত্যেকটা যুদ্ধে নিজেকে প্রমান করতে পেরেছেন বলেই আজ তারা জীবিত আর জেনারেল। আর জেনারেল বলেই পরদিন সকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া যুদ্ধটা নিয়ে তারা ভীষনভাবে চিন্তিত। নিজের পৈতৃক প্রাণটা বাঁচানোর সহজাত তাগিদেই যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রত্যেক সৈন্য প্রাণপণে লড়ে, কিন্তু সচেতন আর অবচেতনে তারা বিশ্বাস করে তার কমান্ডার আর জেনারেল এই যুদ্ধ জিতবার জন্য সেরা প্ল্যানটাই করেছেন; এবং দিনশেষে তারাই জিততে যাচ্ছে।

এ এক আমোঘ দায়বদ্ধতা যা প্রত্যেক কমান্ডার আর জেনারেলকে সারাক্ষন তাড়া করে বেড়ায়। প্রতিপক্ষ দুই জেনারেলের কেউই কারো চেয়ে যুদ্ধের অঙ্ক কম বোঝেন না। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট সময়ে কিছু নির্দিস্ট পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা কাউকে জিতিয়ে দেয় আর কেউ হেরে বসে। পরাজিত জেনারেলও ভাল করেই জানেন ঠিক কী কারনে তিনি হারতে যাচ্ছেন, আর কী করতে পারলে এই অবস্থা থেকেও জিতে বের হয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তখন আর সেই করনীয়টা করবার মত ফোর্স অথবা রিসোর্স তার হাতে থাকে না। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রত্যেক জেনারেল যুদ্ধের সব পর্যায়ে একটা রিজার্ভ ফোর্স আর রিসোর্স হাতে রাখতে চান, আর প্রতিপক্ষের রিজার্ভ ফোর্স অথবা রিসোর্সটাকে নস্ট করবার জন্য তক্কে তক্কে থাকেন।

বাইজান্টাইন ফিল্ড কমান্ডার ভাহান সৈন্য সংখ্যায় তার প্রতিপক্ষের চে ঢের এগিয়ে। তারপরও এই বেলিজারেন্ট রেশিওর এডভান্টেজ তাকে স্বস্তি দিতে পারছে না। ইউরোপিয়ান, আর্মেনিয়ান, আরব ইত্যাদি মিলিয়ে এমন হেটারোজেনাস বাহিনী কমান্ডের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা তার নেই। এমেসায় ছোট্ট একটা মুসলিম বাহিনীর সাথে যুদ্ধের কথা বলে এদের বেশিরভাগকে আনা হয়েছিল। এমেসায় জিতলে সে মোরালে পরের ক্যাম্পেইনে নিয়ে যেতে তেমন সমস্যা হতনা। জয়ের জন্য যেমন মোরাল অপরিহার্য, তেমনি জয়ের চে বড় মোরাল আর কিছুই হয় না। কিন্তু খালিদের ট্যাক্টিক্যাল রিডেপ্লয়মেন্টের কারনে ইয়ারমুখ পর্যন্ত আসতে আসতে এরা ইতোমধ্যে বেশ ক্লান্ত, অনেকেই ইতোমধ্যে বাড়ি ফিরতে উন্মুখ হয়ে উঠেছে। তাছাড়া বহুজাতিক বাহিনীতে তুচ্ছ সব কারনে নিজেদের ভেতর ফ্যাসাদ লেগেই থাকে। গত একমাসের বেশি সময় ধরে তাই নতুন এরাবিয়ান টেরেইন আর ওয়েদারে এদের এক্লেমেটাইজ করে নেয়াটা জরুরী ছিল।

একই ফ্যাসাদ বাইজান্টাইন কমান্ড লেভেলেও। হেরাক্লিয়াস তার কোষাধ্যক্ষ ট্রিথুরিয়াসকে পাঠিয়েছিলেন বাইজান্টাইন আর্মির স্ট্রেটেজিক কমান্ডার হিসেবে যেন বেতন নিয়ে সৈন্যদের মনে অযথা সংশয় না দেখা দেয়। কিন্তু সেই ট্রিথুরিয়াস এখন ভাহানের ওপর খবর্দারির চেস্টা করছে। খ্রিস্টান আরব প্রিন্স জাবালাহর চেয়ে ভাল করে আর কোন বাইজান্টাইন কমান্ডার এই টেরেইন বোঝার কথা না, অথচ জাবালাহর কোন কথাই ইউরোপিয়ান কমান্ডারেরা পাত্তা দিচ্ছে না। কমান্ডারদের এই মিউচুয়াল মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিং সৈন্যদের মাঝে রিউমার আর মিসট্রাস্টের নতুন নতুন ডালপালা গজিয়ে চলেছে।

সামনে মুসলিম ক্যাম্পে প্রতিদিনই দলে দলে রিইনফোর্সমেন্ট যোগ দিচ্ছে। পেছনে দামেস্ক পাঁচটা বিশাল বাইজান্টাইন আর্মির রশদ জোগাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। গ্রীষ্ম প্রায় শেষ, শিগগিরই খাদ্যশষ্য আর ঘোড়ার খাদ্যে টান পরবে। দামেস্কের গভর্নর মনসুর ইতোমধ্যে তাগাদা দিচ্ছে যা করবার তারাতারি করতে।

সবচে দূর্ভাবনা খালিদকে নিয়ে। ফ্রন্টে মুসলিম আর্মি সাকুল্যে তিন চার ফাইলের বেশি পদাতিক সৈন্য দাড় করাতে পারবে না, অথচ বাইজান্টাইনদের ন্যুনতম দশ ফাইল সৈন্য দাঁড়াবে। তাই ওয়েট অব এটাক নিয়ে ভাহানের মনে কোন সংশয় নেই, মুসলিম ফ্রন্ট আক্রান্ত হবার পর দুমড়ে যাওয়াটা স্রেফ সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু খালিদের মোবাইল গার্ড নিয়েই যত বিপত্তি। ক্যভুলরি নিয়ে ফ্ল্যাঙ্কিং ম্যানুভারে রোমানরাও কম যায় না, যদিও ভাহান ইনফেন্ট্রি ট্যাকটিক্সেই বেশি স্বচ্ছন্দ্য। কিন্তু খালিদ এই ব্যাপারটায় মাস্টার। যুদ্ধক্ষেত্রে আনএক্সপেক্টেড সব টাইম আর ডিরেকশনে এসে উপস্থিত হবার রেকর্ড তার আছে।

তাছাড়া ব্যাটেলফিল্ডে তার নিজের লোকেশনটাও ভাহানের ঠিক মনপুত হচ্ছে না। সারা ইয়ারমুখ প্রান্তরে একটাই উচু টিলা, সেটা আবার মুসলিম আর্মির ভাগে পড়েছে। ভাহানের জন্য মোটামুটি উচু একটা স্থানে একটা উচু মাচা করা হয়েছে অবশ্য, কিন্ত সেটা তার এয়রে অফ ফোর্সের ঠিক স্কয়ার না হয়ে কিঞ্চিত ডানে পড়ে গেছে। ফলে যুদ্ধের সময় বাইজান্টাইন বাম ফ্ল্যাঙ্কের ব্যাটেল ডেভেলপমেন্ট অব্জার্ভ করা দুরূহ হয়ে পরবে বলেই মনে হচ্ছে। একরাশ উদ্বেগ আর অস্বস্তি নিয়ে ভাহান ঘুম না আসা পর্যন্ত তাই তাবুময় অস্থির পায়চারি করতেই থাকলেন।

সেই তুলনায় খালিদ বেশ ফুরফুরে মেজাজেই আছেন। গত একমাসে প্রায় ৬০০০ সৈন্যের ফ্রেশ রিইনফোর্সমেন্ট এসেছে। এর বেশির ভাগই ইয়েমেনী তীরন্দাজ। সৈন্য সংখ্যা বেশি তাই শুরু থেকেই ভাহান অফেন্সিভ লড়বে, অতএব ডিফেন্সিভ লড়াই ছাড়া খালিদের গত্যান্তর নেই; অন্তত প্রথম দুই তিনদিন তো নয়ই। এমন ডিফেন্সিভ ব্যাটেলে প্রতিপক্ষে হতাহতের সংখ্যা বাড়াতে আর শত্রুকে ধীরে ধীরে কাহিল করতে তীরন্দাজদের গুরুত্ব অপরিসীম। তার উপর প্রায় ১০০০ জনের মত সাহাবী পাঠিয়েছেন খলিফা উমর যাদের ভেতর প্রায় ১০০ জন বদরের যুদ্ধের ভেটেরান। আর আছেন মহানবী (সাঃ) এর আত্মীয় আবু সুফিয়ান আর তার স্ত্রী হিন্দ। এদের উপস্থিতির কারনে মুসলিম আর্মির মোরাল আর মোটিভেশন এখন তুঙ্গে।

মুসলিম আর্মির স্ট্রেটেজিক কমান্ডার আবু উবাইদা অক্সিলারি ফোর্স হিসেবে হিন্দ এর নেতৃত্বে প্রত্যেক মুসলিম গৃহিনীকে ক্যাম্পে স্ট্যান্ডবাই রেখেছেন যেন মুসলিম যোদ্ধারা পিছু হটার কথা ভাবতে না পারেন, আর যুদ্ধে আহতদেরও যেন দ্রুত শুশ্রসা নিশ্চিত করা যায়।
বাইজান্টাইন ওয়েট অব এটাক নিয়ে খালিদও দুশ্চিন্তায় আছেন। বিশেষত গ্রেগরির ইউরোপিয়ান আর্মি টেস্টুডো ফর্মেশনে লড়বে। এরা সামনে আর চার পাশে ম্যান টু ম্যান শেকল বেধে এগোয়, ফলে কিছুটা স্লো এগুলেও এদের থামান কঠিন। তাছাড়া শেকলের কারনে ক্যভুলরি চার্জ করেও খুব একটা সুবিধা করা কঠিন, কারন শেকলে বেধে শুরুতেই ঘোড়া হোচট খেয়ে পরে যায়।

খালিদও ভাল করেই জানেন বাইজান্টাইন এটাকের মুখে মুসলিম ফ্রন্ট কোথাও না কোথাও ভাংবেই। তাই রাত জেগে তিনি কখন কোথায় ভাঙ্গন ধরলে কিভাবে কোন পথে কী করবেন সেই কন্টিজেন্সির হিসেব নিকেশ করতে থাকলেন।

১৫ আগস্ট ৬৩৬। এক মাইলের কিছু কম ব্যবধানে ইয়ারমুখ প্রান্তরের কেন্দ্রে বাইজান্টাইন আর মুসলিম আর্মি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। বাইজান্টাইন রোমান লিজিয়ন তাদের সুশোভিত বর্ম-শিরস্ত্রান, রংবেরঙের রেজিমেন্টাল পতাকা আর উচু উচু ক্রুশ দেখিয়ে মুসলিম সৈন্যদের চোখ ধাধিয়ে দিল প্রায়। কিন্ত বাইজান্টাইন সৈন্যদের চোখে মুসলিম সৈন্যদের প্রতি সমীহও চোখ এড়ালো না কারো, সিরিয়ান আর পার্সিয়ান ক্যাম্পেইনে অবিশ্বাস্য মুসলিম সাফল্যের প্রেক্ষিতেই যে এই সমীহ তা আর নতুন করে বলে দিতে হয় না।

প্রায় ঘন্টা খানেক কোন পক্ষই কোন ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া দেখাল না। তারপর হঠাত বাইজান্টাইন সেন্টার থেকে একজন অফিসার দুলকি চালে তার ঘোড়া ছুটিয়ে মুসলিম সেন্টারের দিকে এগিয়ে এল। সেই সময়ে যুদ্ধ শুরুর আগে দুই পক্ষের চ্যাম্পিয়ন যোদ্ধারা এভাবেই দুই প্রতিপক্ষের মাঝের নো ম্যানস ল্যান্ডে এসে প্রতিপক্ষের চ্যাম্পিয়ন যোদ্ধাদের দ্বন্দ যুদ্ধে আহবান জানাত। মুসলিম চ্যাম্পিয়নদের বলা হত মুবারিজুন। বাইজান্টাইন এই অফিসারের নাম জর্জ। মুসলিম সেন্টারের কাছাকাছি এসে জর্জ তার ঘোড়া থামিয়ে উচু গলায় খালিদ বিন ওয়ালিদকে এগিয়ে আসতে আহবান জানাল। কিছুক্ষনের ভেতরই মুসলিম ফ্রন্টের একটা অংশে সৈন্যরা দুপাশে চেপে গিয়ে পথ করে দিল, আর সে পথে খালিদ তার ঘোড়ার পিঠে চড়ে দৃপ্ত পদক্ষেপে বেড়িয়ে এল।

পর্ব ০৬_________________________________________________________

খালিদ তার ঘোড়া নিয়ে জর্জের দিকে এগিয়ে গেলেন, এবং এগুতেই থাকলেন যতক্ষন পর্যন্ত না দুজনের ঘোড়ার গলা পাশাপাশি একে অন্যেরটা ক্রস করল। বাইজান্টাইন আর মুসলিম ফ্রন্ট জুড়ে পিন পতন নিস্তব্ধতা। কিন্তু আসন্ন দ্বন্দযুদ্ধের শুরু আর শেষ নিয়ে দুপক্ষের উন্মুখ দর্শকদের জল্পনা কল্পনায় জল ঢেলে দুজন বরং কথোপকথন শুরু করল।

জর্জ জানতে চাইল, “শুনেছি তোমার ঈশ্বর নাকি স্বর্গ থেকে তোমাদের নবীর জন্য একটা তরবারি পাঠিয়েছিল, আর তিনি নাকি সেটা তোমাকে দিয়ে দিয়েছিলেন?”
জর্জের চোখ থেকে চোখ না সরিয়ে খালিদ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, “নাতো।“
“তাহলে লোকে কেন তোমাকে ‘সাইফুল্লাহ’ ডাকে?” জর্জ কথা চালিয়ে গেল।
খালিদ বলল, “আমার নেতৃত্বে মুতার যুদ্ধে জয়ের সংবাদ শুনে আমাদের মহানবী (সাঃ) নাকি বলেছিলেন যে অবশেষে একজন ‘সাইফুল্লাহ’ যুদ্ধের হাল ধরেছে। সেই থেকেই লোকে আমাকে ‘সাইফুল্লাহ’ ডাকতে শুরু করেছে।“
“আমার জন্য তোমার পরামর্শ কী?” দ্বিধান্বিত জর্জ জানতে চাইলেন।
“কালেমা পড়, আর মুসলমান হয়ে যাও।“
“যদি তা না হতে চাই?”
“তাহলে জিজিয়া কর দিতে রাজি হও, আমরা তোমাকে নিরাপত্তা দেব।“
“তাতেও যদি রাজি না হই?”
“সেক্ষেত্রে তরবারি উঠাও, এসো লড়াই শুরু হোক।“
জর্জ খালিদের প্রস্তাব নিয়ে কিছুক্ষন ভেবে বললেন, “আজকে যে তোমার ধর্মে বিশ্বাস আনবে, তার জন্য কি ব্যবস্থা?”
খালিদ সাথে সাথেই জবাব দিলেন, “ইসলামে সবাই সমান। তোমার জন্য আলাদা কোন ব্যবস্থা নেই। তুমি ইসলাম কবুল করলে আজ আমাদের পাশে সাধারন একজন মুসলিম যোদ্ধা হিসেবেই লড়তে হবে।“
জর্জ বললেন, “তোমাকে বিশ্বাস করছি আর তোমার ধর্মও গ্রহন করলাম।“
এরপর দুই বাহিনীকেই হতবাক করে দিয়ে খালিদ মুসলিম ফ্রন্টের দিকে ঘোড়া ঘুরিয়ে ফিরে আসতে লাগল, জর্জ তাকে অনুসরন করল। জর্জ অবশ্য প্রথম দিনের যুদ্ধেই শহীদ হয়ে ছিলেন।

পাশ্চাত্যের খ্রিস্টান ইতিহাসবিদেরা অবশ্য এ ঘটনাকে কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দেয়। অবশ্য তারা পারতপক্ষে ইয়ারমুখ নিয়ে খুব একটা মুখ খুলতে চান না। ইনিয়ে বিনিয়ে তারা বাইজান্টাইন সৈন্য সংখ্যা যতটা পারা যায় কমিয়ে বলতে ভালবাসেন। এতোদিন বলা হত ইয়ারমুখ যুদ্ধে ২৪ থেকে ৪০ হাজার মুসলিম সেনাদের বিরুদ্ধে লড়েছিল ১ থেকে ৪ লাখ বাইজান্টাইন সেনা। ইদানিং উইকিপিডিয়ার দাবী মুসলিম ২৫ থেকে ৪০ হাযার আর বাইজান্টাইন ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ। যাহোক অন্তত একটা ফ্যাক্ট তারা মেনে নিয়েছে যে বাইজান্টাইনরা সংখ্যায় মুসলিমদের থেকে অনেক বেশিই ছিল।

আর জর্জের আগেও ইহুদি আর খ্রীস্টানদের অনেকেই অনেক কারনে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্মে কনভার্ট হতে শুরু করেছিল। যেমন ‘জোনাহ দ্য লাভার’ এর কাহিনী। মুসলিম আর্মি ছয় মাস ধরে দামেস্ক অবরোধ করে রেখেছিল। তখন জনৈক গ্রিক ধনকুবের মার্কাসের পুত্র জোনাহর বিয়ে গেল আটকে কারন এই অবরোধের ভেতর তার হবু শ্বশুর বিয়ের কথা মাথায়ই আনছিলেন না। অগত্যা ফ্রাস্ট্রেটেড জোনাহ দেয়াল টপকে খালিদের কাছে গিয়ে ইসলাম কবুল করে বলে দিল যে ১৮ই সেপ্টেম্বর রাতে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে শহরের ডিফেন্সিভ ওয়ালে সেন্ট্রির সংখ্যা অনেক কম থাকবে। সুযোগটা লুফে নিয়ে খালিদ সে রাতেই একটা কমান্ডো স্টাইলে হামলা চালালেন। একই সময়ে আবু উবাইদাও শহরের পশ্চিম প্রান্তে বাইজান্টাইনদের সাথে আলোচনায় বসলেন। আলোচনার মাঝখানে যখন খবর এল যে পূর্ব প্রান্ত দিয়ে মুসলিম সৈন্যরা শহরে ঢুকে গেছে, তখন আবু উবাইদার শর্ত মেনে নিতে বাইজান্টাইনরা আর দ্বিমত করেনি। অবশ্য জোনাহ তার বাগদত্তাকে আর বিয়ে করতে পারেনি এবং সেও ইয়ারমুখ যুদ্ধে বাইজান্টাইনদের সাথে লড়ে শহীদ হয়েছিলেন।

যাহোক, খালিদ আর জর্জ ফিরে আসার পর পরই মুসলিম চ্যাম্পিয়ন ‘মুবারিজুন’ রা একে একে নো ম্যানস ল্যান্ডে গিয়ে দাড়াতে লাগল আর বাইজান্টাইন অফিসারদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে লাগল। এই ওয়ার্ম আপ ডুয়েলের ফলাফল জানার আগে সময় হয়েছে দুই বাহিনীর ডেপ্লয়মেন্ট সম্পর্কে জানার। কেননা ব্যাটেলফিল্ডে দুই বাহিনীর ডেপ্লয়মেন্ট প্যাটার্ন সম্পর্কে ক্লিয়ার আইডিয়া ছাড়া ব্যাটেলের ডেভেলপমেন্ট আর ট্যাক্টিক্যাল মেনুভার পড়ার মজাটাই নস্ট হয়ে যাবে।

ভাহান মুসলিম আর্মির বিরুদ্ধে পুর্ব্দিকে মুখ করে তার বাহিনী দাড় করালেন। ফ্রন্টের দৈর্ঘ দাড়াল প্রায় ১২ মাইল। তিনি যেকোন কারনেই হোক ট্র্যাডিশনাল বাইজান্টাইন ডেপ্লয়মেন্ট প্যাটার্ন ফলো না করে সামনে চারটা আর্মি রেখে ফ্রন্ট সাজালেন, এবং চারটাই পদাতিক আর্মি। সাধারনত বাইজান্টাইন জেনারেলরা যুদ্ধে মাঝখানে পদাতিক রেখে দুই পাশে ক্যভুলরি অশ্বারোহীদের রাখতেন বেটার মবিলিটি আর ফ্ল্যাঙ্কিং মেনুভার পেতে। কিন্তু ভাহান তার ক্যভুলরিকে সমান চার ভাগে ভাগ করে চার পদাতিক আর্মির পেছনে রিজার্ভ হিসেবে রাখলেন।

চারটা আর্মি নিয়ে যখন ফ্রন্ট গঠন করা হয় তখন ডান আর বামের আর্মিকে বলে রাইট আর লেফট উইং, এবং মাঝের দুই আর্মিকে বলে সেন্টার। আবার সেন্টারের ডানের আর্মিকে বলে রাইট সেন্টার আর বামেরটা লেফট সেন্টার। বাইজান্টাইন লেফট উইং এর দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল কানাত্বির আর রাইট উইং এ জেনারেল গ্রেগরি, লেফট সেন্টারে জেনারেল দাইরজান আর রাইট সেন্টারে ভাহান নিজে। অবশ্য ভাহান যেহেতু অভার অল কমান্ডে ছিলেন তাই গোটা সেন্টারই দাইরজান একাই সামলাচ্ছিলেন। প্রিন্স জাবালাহ তার ঘোড়া আর উটের বাহিনী নিয়ে ছিলেন চার বাহিনীর সামনে স্ক্রীন আর স্কার্মিশার হিসেবে।

বাইজান্টাইন ক্যভুলরি কমান্ডারদের নাম জানা যায়নি। তবে তাদের হেভি আর লাইট দুই ধরনের ক্যভুলরিই ছিল। ভারী ক্যভুলরিতে যোদ্ধা আর ঘোড়া দুটোই বর্ম দিয়ে এমনভাবে মোড়ানো থাকত যে ঘায়েল করা দুস্কর। অবশ্য বর্মের ওজনের কারনে এদের স্পিডও অপেক্ষাকৃত কম ছিল, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে এদের ইফেক্ট ছিল ডেভাস্টেটিং। সেই তুলনায় লাইট ক্যভুলরি ছিল অনেক ফাস্ট আর তারা ঘোড়ার পিঠে থেকেই তীর চালাতে এক্সপার্ট ছিল।

ফ্রন্টের ইনফেন্ট্রি ডিভিশন গুলোর প্রথম তিন চার সারি পদাতিক সৈন্যরা দাঁড়াত, তার পেছনে তিন চার সারি তীরন্দাজেরা, তার পেছনে আরো তিন সারি ভারী পদাতিক সৈন্য। বাইজান্টাইন এই পদতিক এই ইউনিটগুলো অবস্থা ভেদে চমৎকারসব ফর্মেশনে লড়তে পারত। অর্গানাইজড ফ্যাশনে দুই পাশে সরে গিয়ে পেছন থেকে ক্যভুলরিকে ফ্রন্টে আসার রাস্তা করে দিতে পারত, ক্লোজ ফর্মেশনে তীর ঠেকাতে পারত আবার শত্রুর ক্যভুলরি এটাকও রিপালস করে দিতে পারত।

তীরন্দাজেরা একসাথে দুই এঙ্গেলে তীর ছুড়ত। একদল লো এঙ্গেলে এনিমির হাঁটু বরাবর আর তাদের পেছনে আরেকদল একই সময়ে হাই এঙ্গেলে মাথা বরাবর। ওয়েল ট্রেইন্ড না হলে এমন একযোগে আসা তীরের বিরুদ্ধে একটা মাত্র শিল্ড বা ঢাল দিয়ে দুই এঙ্গেলের তীর ঠেকান এনিমির জন্য বেশ কঠিনই হত।

বাইজান্টাইন এই ডেপ্ল্যমেন্টের বিপরীতে খালিদ তার আর্মিকে ৪টা ডিভিশনে ভাগ করে প্রত্যেকটা বাইজান্টাইন আর্মির মুখোমুখি একটা করে ডিভিশন দাড় করালেন। মুসলিম আর্মির লেফট উইং এ জেনারল গ্রেগরির বিপরীতে থাকলেন জেনারেল ইয়াজিদ, লেফট সেন্টারে আবু উবায়দা, রাইট সেন্টারে সুরাবিল, আর সবচে ভালনারেবল রাইট উইং এ জেনারেল কানাত্বিরের বিরুদ্ধে থাকলেন জেনারেল আমর বিন আস।

খালিদ তার ক্যভুলরি ফোর্সকে চার ভাগ করলেন। তারপর দুই উইং এ দুইটা ইউনিট আর গোটা সেন্টারের জন্য একটা ইউনিট কায়েস, মায়সারা আর আমিরের হাতে তুলে দিলেন। আবশিষ্ট একটা ইউনিট রাখলেন রিজার্ভ হিসেবে নিজের আন্ডারে, জাররার থাকলেন এই মোবাইল গার্ডের উপ অধিনায়ক হিসেবে।

মুসলিমরা তখন পর্যন্ত মূলত ‘তাবিয়া’ ফর্মেশনে ডিফেন্সিভ ব্যাটেল লড়ত, আর ‘ক্বার ওয়া ফার’ ট্যাক্টিক্সে আক্রমন করত। তাবিয়া ফর্মেশনে সৈন্যরা রোমান ‘টেস্টুডো’ ফর্মেশনের মতই ঘন হয়ে দাঁড়াত যেন ফ্রন্টে আক্রমনকারী শত্রু ভাংগন ধরাতে না পারে। ইয়ারমুখ যুদ্ধের প্রথম চারদিন এই ফর্মেশনেই মুসলিমরা একের পর এক বাইজান্টাইন এটাক রিপালস করে দিয়েছিল। আর ‘ক্বার ওয়া ফার’ মানে ‘হিট এন্ড রান’ কৌশল। এই পদ্ধতিতে মুসলিমরা ছোট ছোট দলে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে শত্রুর ওপর হামলে পড়ে শত্রু শক কাটিয়ে উঠার আগেই আবার দ্রুত ডিজেনগেজড হয়ে দূরে সরে আসা। এভাবে একের পর এক এটাক করে শত্রুকে দুর্বল করে নিয়ে ফাইনালি ক্যভুলারি চার্জ করে শত্রুকে ধ্বংস করা হত।

দুই পক্ষই সারা ফ্রন্টেজ জুড়ে মুখোমুখি দাড়াল। অবশ্য মুসলিমরা বাইজান্টাইনদের ১৫ থেকে ৩০ ফাইল গভীর ফ্রন্টের সমান ফ্রন্ট অটুট রাখতে গিয়ে সাকুল্যে তিন সারি পর্যন্ত সৈন্য দাড় করাতে পারল। মুসলিমদের পেছনে আজরা পাহাড়ের সারি একটা বিশাল মরাল ফ্যাক্টর হিসেবে থাকল, কারন কোন কারনে পিছু হটতে হলে এই পাহাড়ের সারিতে ঢুকে যাওয়া যাবে। কিন্তু বাইজান্টাইনদের পেছনে গভীর ওয়াদি উর রাক্বাদ থাকায় তাদের পিছু হটার পথ বন্ধ। অবশ্য বাইজান্টাইনরা পিছু হঠার কথা ভাবছেও না, কিন্তু ওয়াদি উর রাক্বাদ কে ‘এনভিল’ ধরে একটা ‘হ্যামার এন্ড এনভিল’ মুভ খালিদের মাথায় শুরু থেকেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

যাহোক, মুসলিম মুবারিজুনদের ডাকে সারা দিয়ে একের পর এক বাইজান্টাইন অফিসার আর চ্যাম্পিয়নরা নো ম্যানস ল্যান্ডে এগিয়ে এল আর মুবারিজুনদের হাতে মারা পরতে লাগল। দুপুর পর্যন্ত চলা এইসব ডুয়েলে আব্দুর রহমান বিন আবি বকর একাই পাঁচজন বাইজান্টাইন অফিসার কতল করে দিনের শ্রেষ্ঠ মুবারিজুন হয়ে গেলেন।

এভাবে চলতে থাকলে যুদ্ধ শুরুর আগেই প্রচুর অফিসার মারা পড়বে আর সৈন্যদের মোরালের ওপরও নেগিটিভ ইম্প্যাক্ট পড়বে বুঝে ভাহান আক্রমনের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু প্রথম দিনেই তিনি ডিসাইসিভ কোন এঙ্গেজমেন্টে যেতে চাইলেন না। তিনি চাইলেন মুসলিম ফ্রন্টের স্ট্রেন্থ টেস্ট করতে আর নিজের সৈন্যদের ব্যাটেল ফুটিং এ আনতে।

বাইজান্টাইন চার আর্মিরই তাদের ত্রিশ ফাইলের প্রথম দশ ফাইল করে আক্রমনে পাঠালেন। বাইজান্টাইনরা মুসলিম তীরন্দাজদের রেঞ্জে আসতেই মুসলিম তীরন্দাজরা তীর নিক্ষেপ শুরু করল। কিন্তু তাতে বাইজান্টাইনরা দমল না। এরপর শুরু হল প্রতিপক্ষ পদাতিক সৈন্যদের ভেতর সম্মুখযুদ্ধ। সন্ধ্যে অবধি যুদ্ধ চলল, ভাহান তার পদাতিকদের রিইনফোর্স করলেন না। অতএব দিনশেষে মুসলিমরা তাদের ফ্রন্ট অটুট রাখতে সমর্থ হল, আর বাইজান্টাইনরা হতাহতদের নিয়ে নিজেদের আগের অবস্থানে ফিরে গেল।

রাতে ভাহান তার ওয়ার কাউন্সিলরদের নিয়ে পরদিনের যুদ্ধ পরিকল্পনায় বসলেন। ভাহান চাইলেন পরদিন ভোরের আলো ফুটবার আগেই মুসলিমরা যখন ফজরের নামাজে ব্যস্ত থাকবে ঠিক তখনি ‘ডন এটাক’ করতে। মূল পরিকল্পনা হল জেনারেল দাইরজান তার সেন্টার ফোর্স দিয়ে আবু উবায়দা আর সুরাবিলের বাহিনীকে সেন্টারেই এনগেজড রাখবেন, আর জেনারেল গ্রেগরি আর কানাত্বির তাদের দুই উইং দিয়ে কনকারেন্টলি মেইন এটাক লঞ্চ করবেন; মেইন এফর্ট হবে মুসলিম রাইট উইং এর আমর বিন আসের বাহিনীকে হটিয়ে দেয়া অথবা সুরাবিলের রাইট সেন্টারের দিকে পুশ করে ক্যভুলারি চার্জ করে যুদ্ধ শেষ করার।

পরদিন ইয়ারমুখ যুদ্ধের ২য় দিন সকালেই ফজরের নামাজ পড়ার সময়ই মুসলিমরা দামামার শব্দ শুনতে পেল। আউট পোস্টের দূতেরা ঘোড়া ছুটিয়ে এসে জানাল বাইজান্টাইনরা সারা ফ্রন্ট জুড়ে এক যোগে ফ্রন্টালি আক্রমন করতে এগিয়ে আসছে।

পর্ব ০৭_________________________________________________________

৭৩ বছর বয়েসী আবু সুফিয়ান তার দীর্ঘ জীবনে অসংখ্যবার যুদ্ধের জন্য অস্ত্র ধারন করেছেন, সম্মুখ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাই তার জন্য নতুন কিছু না। কিন্তু জেনারেল গ্রেগরির মত রোমান ধাঁচে লড়াই করা প্রতিপক্ষ তিনি এই প্রথম মোকাবেলা করছেন। ভারী আর লম্বা শিল্ডে সজ্জিত বাইজান্টাইন এই সৈন্যরা পাশাপাশি একজনের সাথে আরেকজনের শিল্ড জোড়া লাগিয়ে এতোটাই ক্লোজড ফর্মেশনে এগুচ্ছে যে দেখলে মনে হয় একটা নিরেট দেয়াল এগিয়ে আসছে। সেই দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে তাদের বর্শার লম্বা ফলা বের হয়ে আছে।
মুসলিম তীরন্দাজদের ফ্ল্যাট ট্র্যাজেক্টরিতে ছোড়া তীর কোন কাজেই আসছে না। আর হাই এঙ্গেলে তীর ছোড়া মাত্র শত্রুর প্রথম সারির পেছনের সবাই যার যার ঢাল মাথার ওপর তুলে দিয়ে কচ্ছপের খোলের মত নিজেদের ঢেকে ফেলছে। গ্রেগরির বাইজান্টাইনদের এডভান্সের গতি খুব ধীর কিন্তু তারা বিরতিহীন এগুচ্ছে।

ইয়াজিদের ক্বার ওয়া ফার কাউন্টার এটাকও কোন কাজে আসছে না। কারন কাউন্টার এটাকে যেতে শুরু করা মাত্র গ্রেগরির ফ্রন্টের সৈন্যরা হাঁটু গেঁড়ে বসে তাদের শিল্ডের দেয়াল ঢালু করে পেছনের তীরন্দাজদের লাইন অফ সাইট ক্লিয়ার করে দিচ্ছে আর তীরন্দাজরা বৃস্টির মত তীর ছুড়ছে দুই এঙ্গেলে। তারপরেও যদিওবা ওদের ফ্রন্টে পৌছানো যায় তখন ওদের শিল্ডের দেয়ালে আটকা পরতে হয়। মুসলিম যোদ্ধাদের কেউ মাটিতে পড়ে যাওয়া মাত্র ওরা শিল্ড একটু ওপরে তুলে তাকে ভেতরে টেনে নিয়ে ফের শিল্ড নামিয়ে দেয়। আর সেট ফরোয়ার্ড ফোর্সের সাহায্যে ঘোড়া নিয়ে এই শিল্ডের দেয়াল ভেদ করা গেলেও ওদের ম্যান টু ম্যান বাঁধা শিকলে হোঁচট খেয়ে ঘোড়া উল্টে সৈন্য হারাতে হচ্ছে।

একমাত্র সুবিধা করা যাচ্ছে ওরা যখন এসল্ট করছে তখন। কারন একমাত্র তখনি শিল্ডের দেয়াল আলগা হলে ওদের ফাইলের ভেতর ঢুকে ক্লোজ কোয়ার্টারে তরবারি চালান যাচ্ছে। কিন্তু এসল্টে আসার আগে যে পরিমান তীর ছুড়ে আসে তাতে তাবিয়া ফর্মেশনে ফ্রন্ট ইন্ট্যাক্ট রাখাই দুস্কর। তাই দুপুর গড়ানোর আগেই মুসলিম লেফট উইং পিছু হটতে বাধ্য হল।


ইয়ারমুখের যুদ্ধঃ ১৬ আগস্ট ৬৩৬ঃ ২য় দিনঃ বাইজান্টাইন আক্রমন পর্ব

ওদিকে মুসলিম রাইট উইং এ আমর বিন আসের ডিভিশনের অবস্থা আরো শোচনীয়। ফজরের ওয়াক্তে বাইজান্টাইনরা এগিয়ে আসতে শুরু করতেই তরিঘরি করে সবাই যার যার ব্যাটেল ফর্মেশনে গিয়ে দাড়িয়েছিল। ভাগ্যিস বাইজান্টাইনরা এমন করতে পারে ভেবে রাতেই খালিদ নো ম্যানস ল্যান্ড বরাবর আউট পোস্টের স্ট্রেন্থ বাড়িয়েছিল। এরাই সকালে বাইজান্টাইন এডভান্সটা অনেকটা স্লো করে দিয়ে মুসলিম মেইন ফোর্সকে রেডি হবার জন্য কিছুটা বেশি সময় এনে দিয়েছিল। ফলে মুসলিম আর্মিকে অপ্রস্তুত অবস্থায় এটাকের বাইজান্টাইন পরিকল্পনাটা ভেস্তে গেল।

ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া আর হাতাহাতির মাধ্যমে বাইজান্টাইন সেন্টার মুসলিম সেন্টারকে এনগেজড রাখল ভোর থেকেই। কিন্তু দুই উইং/ফ্ল্যাঙ্কে তারা হার্ড প্রেস করতে লাগল। দুপুরের আগেই জেনারেল কানাত্বির পরপর তিন বার আমরের আর্মিকে আক্রমন করল। প্রথম দুই এটাক রিপালস করার পর তৃতীয়বার আমরের কাছে ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ড করবার কিংবা কাউন্টার এটাক করার মত কোন ফ্রেশ ট্রুপসই অবশিষ্ট থাকল না। অগত্যা তার ফর্মেশনে ভাংগন ধরল আর মুসলিম রাইট ফ্ল্যাঙ্ক পিছু হটতে শুরু করল। এমন সময় কানাত্বির ফের এটাক রিনিউ করে এগিয়ে আসতেই মুসলিম রাইট উইং হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ল। এমন সময় আমর তার ক্যভুলরি রিজার্ভ লঞ্চ করে একটা কাউন্টার এটাক করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সেই এটাক বাইজান্টাইনরা রিপালস করে দিল।

মুসলিম ক্যভুলরির কাউন্টার এটাক রিপালসড হতেই সৈন্যরা সব উর্ধশ্বাসে তাদের ক্যাম্পের দিকে পালতে শুরু করল। সবার আগে ক্যাম্পে পৌছালো ঘোড় সওয়াররা এবং এই অবস্থায় ক্যাম্পে থাকা মুসলিম নারীরা তাবুর ডান্ডা আর পাথর নিয়ে তাদের ওপর চড়াও হলেন। স্ত্রীদের সামলানোর চেয়ে বাইজান্টাইনদের মোকাবেলা করা নিঃসন্দেহে সহজতর। তাছাড়া তাদের স্ত্রী সন্তানেরা কিছুক্ষনের ভেতরই বাইজান্টাইনদের দ্বারা নিগৃহীত হতে যাচ্ছে দেখে আমরের সৈন্যরা যুদ্ধক্ষেত্রে ফিরে গেল।
প্রায় একই সময়ে ইয়াজিদের ক্যভুলরি কাউন্টার এটাক ফেইল করল আর তার সৈন্যরাও পালাতে শুরু করল। এই পলায়নে সবার সামনে ছিলেন বৃদ্ধ আবু সুফিয়ান এবং তিনি ক্যাম্পের কাছে পৌছাতেই মুসলিম নারীদের দেখা পেলেন। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন তারই স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবা। ভয়ঙ্কর এই রমনী তাকে দেখে পাথর ছুড়তে ছুড়তে উহুদের যুদ্ধে গাওয়া গানটা আবার গেয়ে উঠলেন।

We are the daughters of the night;
We move among the cushions
With a gentle feline grace
And our bracelets on our elbows.
If you advance we shall embrace you;
And if you retreat we shall forsake you
With a loveless separation.

অগত্যা আবু সুফিয়ান সময় নস্ট না করে ফ্রন্টের দিকে ঘোড়ার মুখ ঘুরালেন।এবার তাদের সাথে মুসলিম কিছু নারীও চললেন ফ্রন্টের পথে। নারী যোদ্ধাদের সহ আবু সুফিয়ানকে ফিরতে দেখে ইয়াজিদের লেফট উইং ফের জেগে উঠল।

ইয়ারমুখের যুদ্ধঃ ১৬ আগস্ট ৬৩৬ঃ ২য় দিনঃ আমরের বাহিনীকে উদ্ধার

মুসলিম সৈন্যরা ফ্রন্টে ফিরতেই খালিদ আমর আর ইয়াজিদ কে নির্দেশ দিলেন যার যার অবস্থানে থেকেই নিজ নিজ ফ্রন্ট রেস্টোর করার জন্য। ইয়াজিদ আর আমর সর্বশক্তি দিয়ে রোমান এডভান্স আটকে দিয়ে খালিদের পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় থাকলেন।
বাইজান্টাইনরা মুসলিম আর্মির এই রিনিউড রেজিস্ট্যান্সে থমকে গেল। অবশেষে তারা ফ্রেস আরেকটা করে এটাক লঞ্চ করার প্রস্তুতি নিতে লাগল। একটা এটাক করার পর পেছন থেকে ফ্রেশ ট্রুপস এনে নতুন একটা এটাক লঞ্চ করতে বেশ খানিকটা সময়ের প্রয়োজন হয়। আর খালিদ সেই সুযোগটাই নিতে চাইলেন।

প্রথমেই তিনি কায়েস কে তার ক্যভুলরি রেজিমেন্ট নিয়ে আমরের বাহিনীর পেছন দিক দিয়ে ঘুরে কানাত্বীরের বাহিনীর বাম ফ্ল্যাঙ্কে পাঠিয়ে দিলেন। এরপর নিজে তার মোবাইল গার্ড নিয়ে কানাত্বিরের বাহিনীর ডান ফ্ল্যাঙ্কে অবস্থান নিলেন এবং একযোগে দুই দিক থেকে ক্যভুলরি চার্জ করলেন। সুযোগ বুঝে আমরও সামনে থেকে প্রেস করলেন। মুহুর্তের ভেতর ত্রিমুখী আক্রমনে কানাত্বিরের ফ্রন্ট আর ফ্ল্যাঙ্ক দুমড়ে গেল আর হতবিহবল কানাত্বির তার আর্মিকে রিট্রিট করবার নির্দেশ দিতে বাধ্য হলেন। আমরের বাহিনী বাইজান্টাইনদের পিছু ধাওয়া করে গেলেন এবং সকালে যে লাইনে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন সেখান অবধি গিয়ে থেমে গেলেন। বাইজান্টাইনরাও তাদের লাইনে ফিরে গিয়ে নিজেদের গুছিয়ে নেবার চেষ্টা শুরু করল।

ইয়ারমুখের যুদ্ধঃ ১৬ আগস্ট ৬৩৬ঃ ২য় দিনঃ ইয়াজিদের বাহিনীকে উদ্ধার

মুসলিম রাইট উইং স্ট্যাবিলাইজ করার সাথে সাথে খালিদ তার মোবাইল গার্ড নিয়ে এবার মুসলিম লেফট উইং এ ইয়াজিদের বাহিনির দিকে ছুটলেন। ইতোমধ্যে ইয়াজিদ তার ক্যভুলরি রিজার্ভ কমান্ডার আমির ইবন তুফায়িল কে গ্রেগরির বাহিনীর বামে পাঠিয়ে দিলেন যেন খালিদের মোবাইল গার্ড গ্রেগরির বাহিনীর ডান ফ্ল্যাঙ্কে আক্রমনের সুযোগ পায়।

খালিদ আন্দাজ করে নিয়েছিলেন যে কানাত্বিরের বাহিনীকে দুই ফ্ল্যাঙ্ক থেকে ক্যভুলরি নিয়ে আক্রমনের খবরটা ইতোমধ্যে ভাহানের কাছে পৌছে গেছে এবং গ্রেগরির ক্ষেত্রেও যেন খালিদ সেই সুযোগ না পায় ভাহান তাই নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেন। তাই আমরের ফ্ল্যাঙ্ক থেকে ইয়াজিদের ফ্ল্যাঙ্কে আসার পথেই তিনি ভাহানকে ধোঁকা দিতে তার মোবাইল গার্ডের উপ অধিনায়ক জাররারকে এক রেজিমেন্ট ঘোড় সওয়ার নিয়ে আবু উবায়দা আর ইয়াজিদের বাহিনির মাঝখান দিয়ে ঢুকে পড়ে বাইজান্টাইন রাইট সেন্টারের ফ্ল্যাঙ্কে আক্রমন করতে বললেন।

মুসলিম আর বাইজান্টাইন সেন্টার সকাল থেকেই নো ম্যানস ল্যান্ড বরাবর লড়ছে। কিন্তু গ্রেগরি ইতোমধ্যে ইয়াজিদের বাহিনিকে অনেকটাই পিছিয়ে এনেছে। ফলে এই গ্যাপের ভেতর দিয়ে ফের খালিদ আক্রমন করতে পারে, এমনকি গ্রেগরির বাহিনীকে বাইজান্টাইন মূল বাহিনী থেকে কাট অফও করে দিতে পারে। এমন আশংকায় বাইজান্টাইন সেন্টারের দায়িত্বে থাকা জেনারেল দাইরজান গ্রেগরির বাহিনীর ফ্ল্যাঙ্ক প্রোটেক্ট করবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ঠিক এমন সময় জাররার তার ক্যভুলরি নিয়ে বাইজান্টাইন রাইট সেন্টারে চার্জ করে বসলেন। তার আক্রমনের শক এতোটাই প্রবল ছিল যে বাইজান্টাইনরা গুছিয়ে উঠবার আগেই তিনি দাইরজানের কাছে পৌছে গেলেন এবং দাইরজানকে প্রথম সুযোগেই হত্যা করলেন।

ফ্ল্যাঙ্ক থেকে হঠাত যুদ্ধ কিভাবে সেন্টারে ছড়িয়ে পড়ল সে কনফিউশন ক্লিয়ার করতে বাইজান্টাইনরা কিছু সময় নিয়ে ফেলল। কিন্তু যখন তারা গুছিয়ে উঠল তখন জাররারের পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে উঠল। তার উপর নির্দেশ ছিল ডাইভার্সন ক্রিয়েট করার, আর ডাইভার্সন যুদ্ধের উদ্দেশ্যই হল মূল এটাক থেকে শত্রুর দৃস্টি কিছুক্ষনের জন্য অন্যত্র সরিয়ে নেয়া। অতএব সেন্টারে বাইজান্টাইনরা যখন জাররারের বাহিনীটাকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করল, তখন সে দ্রুত বাইজান্টাইন এন্সার্কেলমেন্ট ভেঙ্গে ফিরে এল।

জাররার যখন বাইজান্টাইন সেন্টারে আক্রমন করেছিল, প্রায় একই সময়ে খালিদও তার মোবাইল গার্ড নিয়ে গ্রেগরির বাম ফ্ল্যাঙ্কে আছড়ে পড়লেন। রি ইনফোর্স্মেন্টের কোন আশা নেই বুঝে অগত্যা গ্রেগরি পিছু হটলেন। দিন শেষে তারা তাদের লাইনে ফিরে গেলেন আর ইয়াজিদও তার সকালের লাইন ফিরে পেলেন।

দিনশেষে উভয় বাহিনী তাদের নিজ ক্যাম্পে ফিরে গেল। আমরের বাহিনীর অবস্থা সবচে শোচনীয়। তারপরও তারা শোকর গুজার করল কারন খালিদের কারনে দিনশেষে তারা তাদের হারানো গ্রাউন্ড আবার ফিরে পেয়েছে। ডিফেন্সিভ ব্যাটেলের দৃস্টিকোন থেকে এই দিনে বিজয় আসলে মুসলিমদেরই হয়েছে, কেননা তারা বাইজান্টাইন সব আক্রমন ফিরিয়ে দিয়ে তাদের ক্যাম্পে ফেরত পাঠাতে পেরেছে।
ওদিকে বাইজান্টাইন শিবিরে হতাশার মেঘ ছায়া ফেলেছে। দিনশেষে প্রচুর হতাহত নিয়ে সব কয়টা এটাক ব্যর্থ হবার পাশাপাশি দাইরজানের মত একজন অভিজ্ঞ আর নির্ভরশীল কমান্ডার হারানো অনেক বড় ক্ষতি। তাই ভাহান এবার তার প্রত্যাশার পরিমান কমিয়ে আনতে বাধ্য হলেন। তৃতীয় দিনের যুদ্ধে তিনি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিম রাইট ফ্ল্যাঙ্কে কেই টার্গেট করবেন বলে মনস্থ করলেন।

দাইরজানের পরিবর্তে তিনি জেনারেল কুরিনকে তিনি দায়িত্ব দিলেন বাইজান্টাইন রাইট সেন্টার সামলানোর আর আবু উবায়দাকে এনগেজড রাখার। গ্রেগরি রাখবেন ইয়াজিদ কে। জেনারেল কানাত্বির গোটা বাইজান্টাইন লেফট উইং আর লেফট সেন্টার নিয়ে কাল আমর আর সুরাবিলের বাহিনীর মাঝখান দিয়ে ঢুকে মুসলিম বাহিনীর পেছনে গিয়ে খালিদের মোবাইল রিজার্ভকে এনগেজ করার চেষ্টা করবে। এরপর মূল মুসলিম বাহিনী থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া আমরের বাহিনীকে প্রথমে ধ্বংস করে পরে সুরাবিলের ওপর একযোগে আক্রমন করা হবে। মুসলিম রাইট সেন্টার আর রাইট উইং হারানোর পরও যদি মুসলিমদের লড়াই করার খায়েশ থাকে তখন কানাত্বির আবু উবাইদার বাহিনীকে তার ডান আর পেছন থেকে কন্টেইন করবে, এবং জেনারেল কুরিন আর গ্রেগরি বাকি কাজ সেরে ফেলবে।

কিন্তু বাইজান্টাইনরা তখনো আঁচ করতে পারেনি খালিদ বিন ওয়ালিদ কী চিজ।

পর্ব ০৮_________________________________________________________

ইয়ারমুখ যুদ্ধের তৃতীয় দিনও আবার একযোগে তিন দিক থেকে আক্রান্ত হয়ে জেনারেল কানাত্বির হতবিহবল বোধ করলেন। ঠিক গতকালই সকালে ইনিশিয়াল সাকসেস পাবার পরও দুপুরের পর প্রায় একই ভাবে খালিদের কাউন্টার এটাকের কারনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে তাকে বাইজান্টাইন লাইনে ফিরে যেতে হয়েছিল। ‘পিনসার’ অথবা ‘ডাবল এনভেলপমেন্ট’ নামের এই কৌশলটা কানাত্বিরের কাছে একেবারে অজানা কিছু না। কিন্তু যুদ্ধের আগে তিনি সম্ভবত খালিদ বিন ওয়ালিদকে খুব ভাল করে স্টাডি করার সুযোগ পাননি। করলে জানতেন যে ঠিক গতবছরই খালিদ ইরাক ফ্রন্টে ওয়ালাজার যুদ্ধে এই কৌশলটি প্রয়োগ করে বিশাল সসনিয়ান আর্মির বিরুদ্ধে জয় হাসিল করে নিয়েছিলেন।

কিন্তু আজ অবস্থা আরো শোচনীয় লাগছে। কারন খলিদ তার ‘পিনসার’ মুভে আরো ভ্যরিয়েশন এনে যুদ্ধক্ষেত্রকে আরো জটিল করে তুলেছে। সুরাবিল আর আমরের মুসলিম পদাতিক বাহিনী এই মূহুর্তে তাদের সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স বরাবর বাইজান্টাইনদের লেফট উইং আর লেফট সেন্টারকে পিনড ডাউন করে রেখেছে। আর এই সুযোগে খালিদ একযোগে বাইজান্টাইনদের ডান আর বাম থেকে তো ক্যভুলারি চার্জ করেছেই, সবচে ভয়ঙ্কর হল সুরাবিল আর আমরের বাহিনীর মাঝখান দিয়ে আরও একটা ক্যভুলরি রেজিমেন্ট একই সময়ে এসে কানাত্বিরের লেফট সেন্টারের বাম ফ্ল্যাঙ্কে চার্জ করে বসেছে। তিনদিক থেকে আক্রান্ত বাইজান্টাইনরা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে স্টিফ রেজিস্টেন্স দিতে বাধ্য হল। কানাত্বিরের ক্যভুলরি রিজার্ভ ট্র্যাভার্স করতে গিয়ে ইতোমধ্যে একবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। শুরু হল অভাবনীয় রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ। সঙ্গত কারনেই জেনারেল কানাত্বির অসহায় বোধ করলেন। কারন যুদ্ধের এই পর্যায়ে ভাহান তার বাইজান্টাইন রিজার্ভ লঞ্চ না করলে এই যুদ্ধে জেতা প্রায় অসম্ভব।


অথচ ইয়ারমুখ যুদ্ধের সকালটা শুরু হয়েছিল বাইজান্টাইনদের অনুকুলেই। সবকিছুই ভাহানের প্ল্যান মতই এগুচ্ছিল। ভোরের আলো ফুটতেই বাইজান্টাইনরা একযোগে সমস্ত মুসলিম ফ্রন্ট জুড়ে আক্রমণ করল। জেনারেল গ্রেগরি আর কুরিন বাইজান্টাইন রাইট উইং আর রাইট সেন্টার নিয়ে ইয়াজিদ আর আবু উবায়দার মুসলিম লেফট উইং আর লেফট সেন্টারকে ব্যস্ত রাখল যেন শুরুতেই খালিদ তার মোবাইল রিজার্ভ কোন একটা নির্দিস্ট সেক্টরে লঞ্চ করার সুযোগ না পায়।

এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী কানাত্বির বাইজান্টাইন লেফট উইং আর লেফট সেন্টার নিয়ে সর্বশক্তিতে ঝাপিয়ে পরল মুসলিম রাইট উইং আর রাইট সেন্টারের ওপর। গতকালের যুদ্ধে আমরের বাহিনী ইতোমধ্যে যথেষ্ট দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই শুরু থেকেই কানাত্বির আমরের রাইট উইং এর উপর চড়াও হল। আমর সর্ব শক্তিতে তার ফার্স্ট লাইন অফ ডিফেন্স ধরে রাখার চেষ্টা করলেন। দিনের শুরুতেই পিছু হটা ঠেকাতে আমর তার কাভুলরি রিজার্ভ লঞ্চ করলেন। কিন্তু বাইজান্টাইনরা সম্ভবত আমরের এই মুভটার জন্য রেডিই ছিল। তাই তাদের কঠিন প্রতিরোধের মুখে আমরের ক্যভুলরি রিজার্ভ কমান্ডার কায়েস রিপালসড হয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন।

কায়েসের ক্যভুলরি চার্জ রিপালসড করার পর পরই কানাত্বির এটাকের মোমেন্টাম বজায় রাখতে পেছন থেকে ফ্রেস টুপস রিসাইকেল করে এনে পুর্নোদ্যমে আক্রমন চালালেন। এবার তার মূল লক্ষ্য আমর আর সুরাবিলের বাহিনীর সংযোগ স্থল গুড়িয়ে দিয়ে মুসলিম বাহিনীর পেছনে পৌছানো। সুরাবিল আর আমর প্রাণপণ চেষ্টা করলেন ফ্রন্ট অটুট রাখতে কিন্তু দুপুরের আগেই প্রেশার এত বেশি প্রচন্ড হয়ে উঠল যে একইসাথে মুসলিম ফ্রন্টের বেশ কয়েক পয়েন্টে ভাঙ্গন ধরল। অযথা সৈন্যক্ষয় কমাতে আমর পিচড ব্যাটেল থেকে নিজের ট্রুপস ডিসেঙ্গেজ করে নিয়ে সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্সে পিছু হটলেন। আমর আর সুরাবিলের বাহিনীর মাঝখান দিয়ে মুসলিম ফ্রন্টের পেছনে যাবার বাইজান্টাইন পরিকল্পনা ঠেকাতে আমরের বাহিনীর সাথে সমতা রেখে সুরাবিলের বাহিনীও সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্সে পিছু হটল।

দুপুর নাগাদ দুটো আলাদা ফ্রন্টে যুদ্ধ চলতে লাগল। ফার্স্ট লাইন অফ ডিফেন্সে ইয়াজিদ আর আবু উবায়দা বনাম গ্রেগরি আর কুরিনের বাহিনী, এবং সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্সে সুরাবিল আর আমরের বিরুদ্ধে কানাত্বিরের সম্মিলিত বাহিনী। অনেক ইতিহাসবিদই মনে করেন আমরের সাথে সুরাবিলের পিছিয়ে আসাটা খালিদের পুর্ব পরিকল্পনারই অংশ ছিল।


সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্সে এসে আমর আর সুরাবিল দ্রুত তাদের ফোর্স রি অর্গানাইজ করে খালিদের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকল। মুসলিম সৈন্যদের সেকেন্ড লাইনে ফের অর্গানাইজড হতে দেখে কানাত্বির নতুন করে আক্রমনের প্রস্তুতি নিল। ঠিক এমন সময় খালিদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কানাত্বিরের বাহিনীর ডান আর বাম দিক থেকে একযোগে চার্জ করল মুসলিম ক্যভুলরি। আর তা দেখে আমর আর সুরাবিলও তাদের পদাতিক বাহিনী নিয়ে ফ্রন্টাল এটাক লঞ্চ করলেন। সুরাবিল আর আমরের বাহিনীর গ্যাপ দিয়ে যখন আরো একটা মুসলিম ক্যভুলরি ইউনিট কানাত্বিরের বাহিনীর মাঝ বরাবর চার্জ করে বসল তখন শুরু হল চরম রক্তক্ষয়ী এক সংঘর্ষ।

জয়ের দ্বার প্রান্তে এসে এভাবে পরাজয় বাইজান্টাইনরা সহজে মেনে নিতে চাইল না। আর মুসলিম বাহিনীও জানত পিছু হটার আর কোন উপায় নেই। ফলে ইয়ারমুখের প্রান্তর বাইজান্টাইন আর মুসলিম সৈন্যদের রক্তে লাল হয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু ত্রিমুখী আক্রমনের তোড়ে একসময় বাইজান্টাইন ফ্রন্ট আর ফ্ল্যাঙ্ক ক্রমশ ফর্মেশন হারাতে শুরু করল। ওদিকে ভাহানের পক্ষ থেকে কোন রিজার্ভ তখনো এসে পৌছেনি। অতএব মর্মান্তিক সৈন্যক্ষয় আর নিশ্চিত পরাজয় এড়াতে বাধ্য হয়ে কানাত্বির তার বাহিনীকে দ্রুত রিট্রিট করার আদেশ দিলেন।

মুহুর্তে বাইজান্টাইনরা মুসলিম আর্মির কাছ থেকে ডিজেঙ্গেজ হয়ে ফর্মেশন বদলে রিয়ার গার্ড একশনের মাধ্যমে পিছু হটা শুরু করল। খালিদ তাদের ধাওয়া করার লোভ সংবরন করলেন। কারন ইতোমধ্যে সুরাবিল আর আমরের বাহিনী এতোটাই ডিপ্লেটেড যে তাদের পক্ষে আর বাইজান্টাইনদের পিছু ধাওয়া করে হারাবার মত শক্তি অবশিষ্ট নেই।

যাহোক, সূর্য অস্ত যাবার সাথে সাথে তৃতীয় দিনের যুদ্ধ শেষ হল। উভয় পক্ষেই হতাহতের সংখ্যা চক্রবৃদ্ধিহারে বেড়েছে। তুলনামূলকভাবে বাইজান্টাইনদের হতাহত অনেক বেশি। তারউপর তৃতীয় দিন শেষেও তারা যে লাইন থেকে যুদ্ধ শুরু করেছিল সেই লাইনেই ফিরে গেছে, তাই মানসিকভাবেও তারা ভীষনভাবে দমে গেছে।

পক্ষান্তরে মুসলিম ক্যাম্পে সৈন্যদের মনোবল এখন তুঙ্গে। যদিও হতাহত হয়েছে অনেক কিন্তু তিন দিনের যুদ্ধ শেষে তাদের ডিফেন্সিভ ব্যাটেলের মাধ্যমে বাইজান্টাইনদের ঠেকিয়ে রেখে দূর্বল করার উদ্দেশ্য বেশ ভাল ভাবেই সফল হয়েছে। কিন্তু তিনদিনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুসলিম তীরন্দাজেরা। তাদের সংখ্যা সাকুল্যে ২০০০ জনে এসে ঠেকেছে। অগত্যা খালিদ তার চার আর্মির জন্য মাত্র ৫০০ জন করে তীরন্দাজ ভাগ করে দিলেন।

রাতে ভাহান আর খালিদ দু জনেই জানতেন যে যুদ্ধ এই মুহুর্তে সবচে ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে এসে পৌছে গেছে। আগামীকালই বাইজান্টাইনরা শেষ চেষ্টা চালাবে। হয় তারা সফল হবে অথবা আক্রমনের সামর্থ হারিয়ে যুদ্ধের ফলাফলের ভার খালিদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হবে। পরদিনের যুদ্ধে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা আদায় করে নিতে ভাহান তার জেনারেল, অফিসার আর সৈন্যদের জন্য বিশাল সব পুরস্কার ঘোষনা করলেন।

ওদিকে খালিদ আর আবু উবায়দা গভীর রাত অবধি তাবুতে তাবুতে গিয়ে সবার খোঁজ খবর নিলেন। তারপর খালিদ পরদিনের যুদ্ধের পরিকল্পনা আর কন্টিজেন্সি নিয়ে ভাবতে বসলেন। তিনি বাতাসে রক্তের গন্ধ পাচ্ছেন, কারন তিনি স্পষ্ট আঁচ করতে পারছেন যে আগামীকাল ইয়ারমুখ যুদ্ধের চতুর্থ দিন ইয়ারমুখ প্রান্তরে রক্তগঙ্গা বইতে চলেছে।

ইয়ারমুখ যুদ্ধের চতুর্থ দিনের যুদ্ধকে ইতিহাস চেনে “ব্যাটেল অব লস্ট আইজ” নামে…

পর্ব ০৯_________________________________________________________

৪র্থ দিনের যুদ্ধ – “দ্য ব্যাটেল অব লস্ট আইজ”

ইয়ারমুখ যুদ্ধের ৪র্থ দিন, ১৮ আগস্ট ৬৩৬, দুপুর নাগাদ খালিদকে তার মুসলিম বাহিনীর রাইট উইং নিয়ে বেশ চিন্তিত দেখাল। বাইজান্টাইন জেনারেল জাবালাহর নেতৃত্বে খ্রিস্টান আরব আর আর্মেনিয়ান সৈন্যরা ইতোমধ্যে সুরাবিলের বাহিনীর ফ্রন্টে বেশ কয়েক জায়গায় পেনিট্রেট করে ফেলেছে। আরো ডানে আমরের বাহিনী জেনারেল কানাতিরের বাহিনীর বিরুদ্ধে মাটি কামড়ে যুঝছে। কিন্তু সুরাবিল মনে হয়না আর খুব বেশিক্ষন তার ফ্রন্ট ধরে রাখতে পারবে । আর সুরাবিল একবার পিছু হটতে শুরু করলে আমরের পক্ষে এককভাবে তার ফ্রন্ট ইন্টেক্ট রাখাটা অসম্ভব, তাই সেও পিছিয়ে আসতে বাধ্য হবে। তাই তার ক্যভুলরি রিজার্ভ এখনই লঞ্চ করতে না পারলে দেরী হয়ে যাবে, আর পরাজয় ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পরবে।

খালিদের ক্যভুলরি রিজার্ভ যখন আক্রমনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখনই হঠাত খালিদকে বেশ বিচলিত ভাবে কিছু একটা খুঁজতে দেখা গেল। তার সহযোদ্ধারা যখন জানতে চাইল তিনি কি খুজছেন, তখন খালিদ জানালেন যে তিনি তার লাল রঙের টুপিটা খুঁজে পাচ্ছেন না। অবশেষে একজন সহযোদ্ধা তার সেই লাল টুপিটা খুঁজে এনে দিল আর খালিদের মুখে প্রশান্তি আর আত্মবিশ্বাস ফিরে এল।

তখন সহযোদ্ধারা সেই লাল টুপির মাহাত্ম্য জানতে চাইলে খালিদ জানালেন যে একবার হজ্বের সময় যখন মহানবী (সাঃ) তার মাথা কামিয়েছিলেন তখন তিনি মহানবী (সাঃ) এর কিছু চুল সংগ্রহ করছিলেন। ব্যাপারটা দেখতে পেয়ে মহানবী (সাঃ) খালিদকে তার চুল কুড়ানোর কারন জানতে চাইলেন। জবাবে খালিদ বলেছিলেন যে সে এই চুল স্মৃতি হিসেবে তার সংগ্রহে রাখতে চান। জবাব শুনে মহানবী(সাঃ) নাকি বলেছিলেন যে এই চুল যতদিন তার সাথে থাকবে আল্লাহর ইচ্ছায় ততদিন খালিদ যুদ্ধে হারবেন না। এরপর খালিদ তার ঐ লাল টুপিতে সেই চুল সেলাই করে নিয়েছিলেন আর ঐ টুপি ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে পা ফেলতেন না।

যাহোক ইয়ারমুখ যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই ভাহান মুসলিম বাহিনীর রাইট উইং দিয়ে বারবার আক্রমন করে সাফল্য পাবার চেস্টা করছে, ফলে উপর্যুপরি বাইজান্টাইন আক্রমন সামলাতে সামলাতে ইতোমধ্যে আমরের বাহিনীর অবস্থা বেশ শোচনীয়। সেনাপতি হিসেবে আমরের সুনাম মুসলিম সেনাবাহিনীতে খালিদের পরেই, আর বাইজান্টাইন কোন সেনাপতিই সেনাপতিত্বে তার ধারে কাছেও নেই। কিন্তু গত তিনদিনের যুদ্ধে তার সৈন্যরা শুধু পরিশ্রান্তই না বরং সংখ্যায়ও তারা প্রথম দিনের চেয়ে আজ অনেক কমে গেছে।

ব্যাপারটা খালিদের মতই ভাহানও বেশ ভাল করেই জানেন। গত তিনদিনের ব্যর্থতার কারনে ইতোমধ্যে বাইজান্টাইনদের ভেতর হতাশা দানা বাধতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে কিছু সৈন্য ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে গেছে বলেও রিপোর্ট আসছে। তাই আজকেই যুদ্ধেই মুসলিম সেনাবাহিনীর ওপর চূড়ান্ত আঘাত হেনে জয় নিশ্চিত করে ফেলাটা ভাহানের জন্য খুব জরুরী।
জেনারেল আমর বিন আসের অধীন মুসলিম রাইট উইং গত তিনদিনের যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ডিপ্লিটেড, তাই ভাহান আজও চূড়ান্ত হামলাটা মুসলিম রাইট উইং দিয়েই শুরুর প্ল্যান করলেন। মুসলিম রাইট উইং আক্রান্ত হলে মুসলিম সৈন্যদের উদ্ধার করতে খালিদ তার ক্যভুলরি রিজার্ভ লঞ্চ করতে বাধ্য হবেন। আর খালিদ যখনি তার ক্যভুলরি রিজার্ভ নিয়ে মুসলিম রাইট উইং সামলাতে ব্যস্ত থাকবেন তখনি ভাহান তার জেনারেল কুরিন আর গ্রেগরির বাহিনী নিয়ে মুসলিম লেফট সেন্টার আর লেফট উইং এ আবু উবায়দা আর ইয়াজিদের বাহিনীকে আক্রমন করবেন; এবং খালিদ তার রাইট উইং সামলে মুসলিম লেফট উইং উদ্ধারে ফিরে আসার আগেই যুদ্ধ শেষ করে ফেলবেন। এমন একটা ব্রড ফ্রন্ট এটাক সামলানোর সাধ্য আসলে এই মুহুর্তে মুসলিম বাহিনীর নেই।

দিনের শুরুতেই কানাতির তার স্লাভ সৈন্য বাহিনী নিয়ে আমরের বাহিনীকে আর আর্মেনিয়ান ও খ্রীস্টান আরবদের নিয়ে প্রিন্স জাবালাহ সুরাবিলের বাহিনীকে আক্রমন করলেন। গত তিনদিনে আমরের বাহিনী বাইজান্টাইনদের আক্রমনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। স্লাভদের আক্রমনের তোড়ে আমরের বাহিনী কিছুটা পিছু হটতে বাধ্য হল ঠিকই কিন্তু এবার তারা প্রচন্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলে স্লাভদের অগ্রযাত্রা অনেকখানিই ঠেকিয়ে দিল।

কিন্তু সুরাবিলের ফ্রন্টে মুসলিম সৈন্যরা বাইজান্টাইন অগ্রযাত্রার গতি কমাতে সমর্থ হলেও তাদের ঠেকাতে পারছিল না। ফলে আর্মেনিয়ানরা প্রিন্স জাবালাহর খ্রিস্টান আরবদের সহযোগে একাধিক পয়েন্টে মুসলিম ফ্রন্ট পেনিট্রেট করে ফেলল। সুরাবিলের মুসলিম বাহিনী যে আর খুব বেশিক্ষন বাইজান্টাইনদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না সে কথা প্রকাশ্য দিবালকের মত স্পস্ট হয়ে উঠল। তাই ক্যাভুলরি রিজার্ভ নিয়ে খালিদের এগিয়ে আসা ছাড়া আর কোন উপায়ই অবশিষ্ট রইল না। সবকিছুই আজ যেন ভাহানের প্ল্যান মতই ঘটতে চলেছে।

ক্যভুলরি রিজার্ভ নিয়ে সুরাবিলের ফ্রন্ট স্ট্যবিলাইজ করতে এগিয়ে যাবার প্রস্তুতি নেবার সময়ই খালিদের মনে এই আশংকা উকি দিল যে বাইজান্টাইনরা এবার মুসলিম লেফট সহ একটা ব্রড ফ্রন্টে এটাক করে বসতে পারে; এবং খালিদ তার এই ব্যাটেলফিল্ড ইন্সটিঙ্কটটিকে যথাযথ গুরুত্বসহকারেই আমলে নিলেন। গত তিনদিনের যুদ্ধে সৈন্য হারিয়ে মুসলিম ফ্রন্টের ডেপথ এই মুহুর্তে ২য় বা ৩য় দিনের তুলনায় অনেক কম। তাই বাইজান্টাইনরা এখন ব্রড ফ্রন্টে এটাক করে বসলে আজ ঠিক কয় স্থানে মুসলিম ফ্রন্ট ধ্বসে পরবে তা নিশ্চিত বলা মুস্কিল। সেক্ষেত্রে তার একটা মাত্র ক্যভুলরি রিজার্ভ নিয়ে কোন ক্রমেই সব কয়টা বাইজান্টাইন পেনিট্রেশনের বিরুদ্ধে লড়ে জেতা সম্ভব না। যুদ্ধের এমন ক্রিটিক্যাল স্টেজে তিনি অত্যন্ত দুঃসাহসী আর বাইজান্টাইনদের জন্য অপ্রত্যাশিত একটি সিদ্ধান্ত নিলেন; তিনি সুরাবিলের বাহিনীকে উদ্ধারের জন্য নিজের কভ্যুলরি রিজার্ভ লঞ্চ করবার আগে আবু উবায়দা আর ইয়াজিদকে জেনারেল কুরিন আর গ্রেগরির বাহিনীর ওপর অতর্কিতে হামলা চালানোর নির্দেশ দিলেন।

আবু উবাইদা আর ইয়াজিদও ইতোমধ্যে লক্ষ্য করেছিলেন যে তাদের সামনের বাইজান্টাইনরা সকাল থেকেই আক্রমনের জন্য নিশপিশ করছিল। এবার খালিদের নির্দেশ পেয়েই আবু উবাইদা আর ইয়াজিদ তাদের বাহিনী নিয়ে বাইজান্টাইন রাইট সেন্টার আর রাইট উইং এর উপর স্পয়েলিং এটাক লঞ্চ করলেন। আক্রমনের তীব্রতায় কুরিন আর গ্রেগরির বাহিনী খানিকটা পিছু হটতে বাধ্য হল। বাইজান্টাইন ব্রড ফ্রন্ট এটাকের সম্ভাবনা নস্যাত করে দিয়ে এবার খালিদ সুরাবিলের বাহিনীকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ছুটলেন।

খালিদ তার ক্যভুলরি রিজার্ভ কে সমান দুই ভাগ করে নিয়ে সুরাবিলের বাহিনীর দুই পাশ দিয়ে একযোগে এগিয়ে গেলেন। জাবালাহর খ্রীস্টান আরব আর আর্মেনিয়ানদের দুই ফ্ল্যাঙ্কে মুসলিম ক্যভুলরিকে আক্রমন করতে দেখে সুরাবিলের পদাতিক মুসলিম বাহিনীও বীরদর্পে সামনে থেকে আক্রমন চালাল। জবাবে বাইজান্টাইনরা তুমুল প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু করল। কিন্তু তিনদিন থেকে খালিদের এই থ্রি প্রঞ্জড ফ্ল্যাঙ্কিং মেনুভারের কাছে অবশেষে পরাজয় স্বীকার করে নিয়ে খ্রীস্টান আরব আর আর্মেনিয়ানরা দ্রুত পিছু হটল।

একই সময়ে আমরও তার ক্যভুলরি রিজার্ভকে জেনারেল কানাতিরের বাইজান্টাইন স্লাভ বাহিনীর বামে পাঠিয়ে দিয়ে নিজের পদাতিক মুসলিম বাহিনী নিয়ে সামনে থেকে পূর্নোদ্যমে আক্রমন শানালেন। কিন্তু আগের দুই দিনের অভিজ্ঞতায় কানাতির আজ আমরের এই চালের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। তাই আমরের ক্যভুলরি চার্জ নস্যত করতে তিনি নিজের বাইজান্টাইন ক্যভুলরি রিজার্ভটাকে স্লাভদের বাম দিয়ে সামনে পাঠিয়ে আমরের ক্যভুলরি রিজার্ভকে এনগেজ করবার নির্দেশ দিলেন। রোমান কমপ্লেক্স মিক্সড ফর্মেশনে কানাতিরের এই কাউন্টার কাউন্টার এটাক সাফল্যের মুখ দেখতে পারার আগেই সুরাবিলের বাহিনীর সামনের খ্রীস্টান আরব আর আর্মেনিয়ানরা খালিদের আক্রমনে পিছু হটতে শুরু করল। ফলে কানাতিরের স্লাভ বাহিনীর ডান ফ্ল্যাঙ্ক সম্পুর্ন উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। তাই তার এই উন্মুক্ত ডান ফ্ল্যাঙ্কে খালিদ সহজেই তার ক্যভুলরি নিয়ে আক্রমন করে বসতে পারে বুঝে কানাতির অনিচ্ছাসত্বেও তার স্লাভ বাহিনীকে দ্রুত পিছু হটার নির্দেশ দিলেন।

এরি মধ্যে সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পরতে শুরু করেছে। আচমকা কানাতিরের স্লাভ বাহিনী দ্রুত পিছু হটাতে শুরু করায় তার পরিকল্পিত রোমান কমপ্লেক্স মিক্সড ফর্মেশন এলোমেলো হয়ে গেল। ফলে তার বাইজান্টাইন ক্যভুলরি রিজার্ভ হঠাতই স্লাভ পদাতিক বাহিনীর মিউচুয়াল সাপোর্ট হারিয়ে ফেলল। কনফিউজড বাইজান্টাইন ক্যভুলরিকে হাতের কাছে পেয়ে জাররার তার মুসলিম ক্যভুলরি ইউনিট নিয়ে অতর্কিতে তাদের উপর আক্রমন করে বসলেন। আক্রান্ত হয়ে বাইজান্টাইন ক্যভুলরি দ্রুত পিছু হটার চেস্টা করল। কিন্তু নাছোড়বান্দা জাররার তাদের পিছু ধাওয়া করতে লাগলেন।

বাইজান্টাইন ক্যভুলরি পিছু হটার ভান করে শত্রুকে টেনে এনে ফাঁদে ফেলে আক্রমনের রণকৌশল বেশ ভাল করেই রপ্ত করেছিল। কিন্তু কানাতিরের পিছু হটার হঠাত সিদ্ধান্ত আর মুসলিম ক্যভুলরিকে ফাঁদে ফেলার কোন পূর্ব পরিকল্পনা না থাকায় বাইজান্টাই ক্যভুলরি কোন সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে উর্ধ্বশ্বাসে ওয়াদি উর রাকাদের ব্রিজ বরাবর পালাতে চেস্টা করল। কিন্তু জাররার জোকের মত তাদের পিছু লেগে থাকলেন এবং পথেই কানাতিরের এই ক্যভুলরি রিজার্ভকে পরাস্ত করে ফেলেন।

কানাতিরের কভ্যুলরি রিজার্ভকে হারাতে গিয়ে ইতোমধ্যে জাররার তার বাহিনী নিয়ে ওয়াদি উর রাকাদের ব্রিজের বেশ কাছাকাছি পৌছে গিয়েছিলেন। এবার তিনি সুযোগ বুঝে ব্রিজের পাহারায় থাকা বাইজান্টাইন গার্ডদের আক্রমন করে বসলেন। বাইজান্টাইন মূল বাহিনী তখন ফ্রন্ট সামলাতে ব্যস্ত, তাই কেউই ব্রিজ পাহারায় থাকা বাইজান্টাইন গার্ডদের সাহায্য করতে এগিয়ে এল না।

অতএব তেমন কোন বড় প্রতিরোধ ছাড়াই জাররার বাইজান্টাইনদের পিছু হটার একমাত্র পথ এই ওয়াদি উর রাকাদের ব্রিজটি দখল করে নিলেন। তারপর ব্রিজটি সিকিউর করতে কিছু মুসলিম সৈন্য পাহারায় বসিয়ে তিনি ফের যুদ্ধক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। বাইজান্টাইন মুল বাহিনী তখনো সদ্য বেদখল হয়ে যাওয়া এই ব্রিজের ব্যাপারে কিছুই জানতে পারেনি। অথচ এই ব্রিজটি হারানোর কারনেই শেষ দিনের যুদ্ধে তাদের খুবই চড়া মাশুল গুনতে হয়েছিল। অবশ্য ভাহান তখন মুসলিম লেফট উইং বরাবর পাওয়া মোক্ষম সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চূরান্ত বিজয় হাসিল করে নিতেই বেশি ব্যস্ত।

যাহোক, খালিদকে মুসলিম রাইট ফ্রন্ট স্ট্যাবিলাইজড করবার সুযোগ করে দিতে গিয়ে আবু উবায়দা আর ইয়াজিদ তাদের বাহিনী নিয়ে জেনারেল কুরিন আর গ্রেগরির বাহিনীকে আক্রমন করে শুরুতে বাইজান্টাইনদের কিঞ্চিত হচকে দিতে পেরেছিলেন ঠিকই। কিন্তু কিছুক্ষনের ভেতরই কুরিন আর গ্রেগরির বাহিনী নিজেদের সামলে নিল এবং বুঝে ফেলল যে আবু উবায়দা আর ইয়াজিদ আসলে তাদের ফ্রন্ট পেনিট্রেট করতে চাইছেন না বরং স্রেফ তাদের আটকে রাখতে চাইছেন যেন তারা ব্রড ফ্রন্টে মুসলিমদের এটাক করতে না পারে। তাই ব্রড ফ্রন্টে এটাকে যাবার আগে বাইজান্টাইনরা তাদের মুসলিম প্রতিপক্ষকে আরো ডিপ্লিটেড করে নিতে চাইল।

কুরিন আর গ্রেগরির বাহিনী ফ্রন্ট বরাবর ঢালের দেয়াল তুলে দিয়ে এবার তাদের সব ধরনের তীরন্দাজদের কাজে লাগালেন। ইয়াজিদ আর আবু উবায়দার ক্যভুলরি রিজার্ভ খালিদের ক্যভুলরি রিজার্ভকে সাপোর্ট দিতে চলে যাওয়ায় তারা প্রায় কোন প্রকার ক্যভুলরি সাপোর্ট ছাড়াই গ্রেগরি আর কুরিনের বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। বাইজান্টাইনরা এই সুযোগে তাদের অশ্বারোহী তীরন্দাজদের মাঠে নামালেন। সামনে থেকে বাইজান্টাইন পদাতিক তীরন্দাজ আর দুপাশ থেকে তাদের অশ্বারোহী তীরন্দাজদের তীর আক্রমনে ইয়ারমুখের আকাশ যেন তীরে ঢেকে গেল প্রায়। ইতিহাসে তীরন্দাজদের দ্বারা এমন সুপরিকল্পিত অভিযানের দৃস্টান্ত এবং যুদ্ধে তীরন্দাজদের এমন ভয়াবহ হয়ে উঠবার উদাহরন সত্যি বিরল।

বাইজান্টাইনদন চেয়ে মুসলিম তীরন্দাজদের তীরের রেঞ্জ যেমন অপেক্ষাকৃত কম ছিল, তেমনি মুসলিম তীরন্দাজদের তীরের রিজার্ভও ধীরে ধীরে কমে আসছিল। তাছাড়া গত তিনদিনের যুদ্ধে ইতোমধ্যে মুসলিম তীরন্দাজদের সংখ্যাও অনেক কমে গিয়েছিল। তাই এবার বাইজান্টাইন অশ্বারোহী তীরন্দাজরা পরিকল্পিতভাবে মুসলিম তীরন্দাজদের আক্রমন করতে শুরু করল। বাইজান্টাইন সম্মিলিত তীরন্দাজদের তীরের এই আক্রমন এতটাই প্রবল ছিল যে কথিত আছে যে প্রতি ৭০০ জন মুসলিম যোদ্ধার একজন তীরের আঘাতে এই যুদ্ধে চোখ হারিয়েছিলেন। আবু সুফিয়ানও এদিন তার একটি চোখ হারান। তাই এদিনের যুদ্ধ ইতিহাসে ‘দ্য ব্যাটেল অব লস্ট আইজ’ নামে পরিচিত।

অগত্যা তীরন্দাজ আর ক্যভুলরি সাপোর্ট হারিয়ে তীব্র এই তীরের আক্রমনের মুখে ইয়াজিদ আর আবু উবায়দা তাদের মুসলিম পদাতিক বাহিনী নিয়ে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন। মুসলিমদের পিছু হটতে দেখে ভাহান বুঝলেন এই সেই মোক্ষম সময়। খালিদ তখনো মুসলিম রাইট উইং সামলাতে ব্যস্ত। তাই এখন মুসলিম লেফট উইং এর ওপর আক্রমন চালালে এত কম সময়ের ভেতর খালিদের পক্ষে আক্রান্ত রাইট উইং ফেলে রেখে লেফট উইং এ চলে আসা কোনভাবেই সম্ভব না। তাই ভাহান কানাতিরকে প্রাণপণে লড়ে যাবার নির্দেশ দিয়ে এবার নির্দ্বিধায় গ্রেগরি আর কুরিনকে একটা অল আউট এক্সপ্লোয়টেশনে যেতে নির্দেশ দিলেন।

পিছু হটতে থাকা মুসলিম বাহিনীর পিছু ক্ষুধার্ত হায়েনার মত ছুটে এল বাইজান্টাইন সৈন্যরা। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর পিছু হটাকে নিরাপদ করতে ইকিরিমাহ বিন আবু জাহল তার ইউনিট নিয়ে রিয়ারগার্ড এর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। তাই এবার ইকিরিমাহর রিয়ারগার্ড আপ্রান লড়তে শুরু করল। ইকিরিমাহ তার বাহিনী নিয়ে শুধু সামনে থেকেই বাইজান্টাইনদের ঠেকালেন না বরং তাদের রিয়ারগার্ডকে আউটফ্ল্যাঙ্ক বা বাইপাস করে মূল মুসলিম বাহিনীর কাছে পৌছুবার সব বাইজান্টাইন প্রচেষ্টাও নস্যাৎ করে দিতে লাগলেন। অগত্যা বাইজান্টাইনরা সর্বশক্তি দিয়ে ইকিরিমাহর রিয়ারগার্ডকে তিনদিক থেকে আক্রমন করল। ইকিরিমাহর মুসলিম সেনারা শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে বাইজান্টাইনদের ঠেকিয়ে রাখার চেস্টা করে একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগলেন। অবশেষে বাইজান্টাইনরা যখন ইকিরিমাহর রিয়ারগার্ডকে পরাস্ত করতে সক্ষম হল ততক্ষনে ইকিরিমাহ আর তার রিয়ারগার্ডের প্রত্যেকটি সদস্য হয় শাহাদত বরন করেছেন অথবা মৃত্যু পথযাত্রী।

যুদ্ধের এই চরম অবস্থার গুরুত্ব বুঝতে পেরে আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দ আর জাররার এর বোন খাউলাহ সহ অন্যান্য নারী যোদ্ধারা হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে ফ্রন্টের দিকে ধেয়ে এলেন। ইতোমধ্যে পিছু হটতে থাকা মুসলিমরা যখন তাদের পাশে তাদের স্ত্রী সন্তানদেরও লাঠিসোটা হাতে দেখতে পেলেন, মূহুর্তে মুসলিম ফ্রন্টের চেহারা পাল্টে গেল। শুরু হল এমন এক রক্তক্ষয়ী এক সংঘর্ষ যেখানে না আছে কোন জেনারেলশিপ আর না আছে কোন ফর্মেশন অথবা মেনুভারের বালাই। স্রেফ সৈন্যে সৈন্যে রোমহর্ষক দ্বৈরথ চলতে থাকল।

গ্রেগরির ইউরোপিয়ান আর কুরিনের আর্মেনিয়ান সৈন্যরা দীর্ঘদিন যাবত তাদের নিউমেরিক সুপেরিওরিটি দিয়ে শত্রুকে চিরে চ্যাপ্টা করে যুদ্ধ জয়ে অভ্যস্ত। পারতপক্ষে তারা বরাবরই পিচড ব্যাটেল এড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু মুসলিম যোদ্ধারা প্রত্যেকে আজ নাঙ্গা তরবারি হাতে আসুরিক শক্তি নিয়ে উন্মাদের মত ক্লোজ কোয়ার্টারে লড়ে চলেছে। কোন এক অপার্থিব শক্তিতে বলীয়ান এই যোদ্ধাদের ঠেকানোর কোন কৌশলই বাইজান্টাইনদের জানা নেই। এমনকি জাররারের বোন খাউলাহ পর্যন্ত এক বাইজান্টাইকে তরবারি হাতে ধরাশায়ী করে ফেললেন। অবশ্য দ্বন্দযুদ্ধের এক পর্যায়ে সেই বাইজান্টাইন যোদ্ধার তরবারির আঘাতে খাউলাহর মাথা থেকে তখন দরদর করে রক্ত পড়ছে। লড়তে লড়তে খাউলাহ একসময় মাটিতে লুটিয়ে পরেন আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরনে তিনি জ্ঞান হারান। পরে জাররার মুমুর্ষ অবস্থায় তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে খুজে পেয়েছিলেন।

মুসলিম বাহিনীর এমন অপার্থিব প্রতিরোধযুদ্ধের মুখে দিনের আলো নিভে এল আর জয়ের এতোটা কাছে এসেও বাইজান্টাইনরাও ধীরে ধীরে পিছু হটতে বাধ্য হল। বিমর্ষ ভাহান দেখলেন টানা চারদিন যুদ্ধের পরেও তার বিশাল বাহিনী ক্ষুদ্র এই মুসলিম বাহিনীকে তাদের অবস্থান থেকেই হঠাতে পারেনি। যুদ্ধ শেষে হতাহতের সংখ্যা জেনে তিনি মুষড়ে পড়লেন। কিন্তু সবচেয়ে বড় শক পেলেন যখন শুনলেন ওয়াদি উর রাকাদের ব্রিজ এখন মুসলিম বাহিনীর দখলে। আগামীদিন আরেকবার আক্রমনে যাবার শক্তি আর ইচ্ছে কোনটাই আর বাইজান্টাইনদের অবশিষ্ট নেই, তার উপর ব্রিজটাও হাতছাড়া হওয়ায় পিছু হটার পথও এখন বন্ধ। পঞ্চম দিনের পরিনতির কথা ভাবতে গিয়েই ভাহান শিউরে উঠলেন। কারন পাশার দান পাল্টে গেছে, কাল থেকে যুদ্ধের ইনিশিয়েটিভ খালিদ বিন ওয়ালিদের হাতে!

পর্ব ১০_________________________________________________________

যুদ্ধের ৫ম এবং শেষ দিনঃ দ্য ডে রোমান ক্রুসেডরস ক্রাম্বল্ড বিফোর ইসলাম

১৯ আগস্ট ৬৩৬, ইয়ারমুখ যুদ্ধের ৫ম দিন সকালে বাইজান্টাইন আর মুসলিম সেনাবাহিনী আরো একবার ইয়ারমুখ প্রান্তরে ঠিক প্রথম দিনের মতই যে যার ফ্রন্ট লাইন বরাবর মুখোমুখি রনপোমে দাঁড়িয়ে গেল। অবশ্য দুপক্ষেরই প্রথম দিনের সেই টগবগে উত্তেজনা আজ অনেকটাই উবে হয়ে গেছে। গত চারদিনের রক্তক্ষয়ী দ্বৈরথ পেরিয়ে আজ পর্যন্ত যারা দুপায়ের উপর খাড়া আছে তাদের প্রত্যেকেই কমবেশি আহত আর ভয়ানক ক্লান্ত।

সুর্য উঠবার পর একঘন্টা পেরিয়ে যাবার পরও আজ বাইজান্টাইন ফ্রন্টে আক্রমনের কোন প্রস্তুতি চোখে পড়ল না। তারপর হঠাত বাইজান্টাইন সেন্টার থেকে সাদা পতাকা উড়িয়ে ছোট্ট একটা অশ্বারোহী দল দুলকি চালে মুসলিম ফ্রন্টের সেন্টারের দিকে এগিয়ে এল। ছোট্ট এই বাইজান্টাইন প্রতিনিধিদলের প্রধান খালিদের সাথে দেখা করতে চাইল।

খালিদ এবং আবু উবায়দা দুজনেই বাইজান্টাইন প্রতিনিধির মাধ্যমে জানলেন যে গত চারদিনের যুদ্ধেও যেহেতু কোন পক্ষই চূড়ান্ত কোন ফলাফলের দেখা পায়নি তাই ভাহান আপাতত কিছুদিনের জন্য যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাব করছেন। একথা প্রকাশ্য দিবালোকের মতই স্পষ্ট যে গত চারদিনে মুসলিমদের তুলনায় বাইজান্তাইনদের সৈন্যক্ষয় নিঃসন্দেহে অনেক বেশিই হয়েছে, তাই ভাহান এই যুদ্ধ বিরতির মাধ্যমে আসলে তার ডিভিশঙ্গুলোর রেস্ট আর রিফিট নিশ্চিত করে যুদ্ধের জন্য ফের রিওর্গানাজ করতে সময় কিনতে চাইছে। কিন্তু মুসলিমদের অবস্থাও তথৈবচ; বরং বাইজান্টাইনদের চাইতে মুসলিম সেনাদের বিশ্রামের জরুরত আরো বেশি। তাই মুসলিম সেনা প্রধান হিসেবে আবু উবায়দা সঙ্গতকারনেই ভাহানের এ সন্ধি প্রস্তাবে অমত করার কোন কারন খুঁজে পেলেন না।

কিন্তু বাধ সাধলেন খালিদ। ঠিক গতকাল সন্ধ্যায়ই তার উরুতে মাথা রেখে প্রায় একই সাথে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে তারই বাল্যবন্ধু ইকিরিমাহ আর ইকিরিমাহর ছেলে আমর। আবু সুফিয়ানের মত জ্যৈষ্ঠ যোদ্ধা এক চোখ হারিয়েছেন। গতকাল বিকালের ‘ব্যাটেল অব লস্ট আইজ’ যুদ্ধে তার প্রত্যেকটা অফিসার আর কমান্ডার এমনভাবে লড়েছে যে রাতে তাদের বিশ্রাম নিশ্চিত করতে সেনা প্রধান হয়েও আবু উবায়দা স্বয়ং ডিউটি অফিসারের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়ে তাবুতে তাবুতে খোঁজ নিয়েছেন আর আউটপোস্ট পরিদর্শন করে এসেছেন।

কিন্তু তারপরেও মুসলিম সেনাদের মোরাল এই মুহুর্তে তুঙ্গে আর বাইজান্টাইনদের মোরাল এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। গত চারদিনের নিরলস পরিশ্রম আর ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহ পাক মুখ তুলে তাকিয়েছেন এবং অবশেষে ডিফেন্সিভ ফর্মেশন ঝেড়ে ফেলে মুসলিম সেনাবাহিনীর এবার কাউন্টার অফেন্সিভে যাবার দুর্লভ সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুঃসাহসী জাররার গতকালই ওয়াদি উর রাকাদের উপর একমাত্র ব্রিজ আইনাল দাকারের ওপারের পাহাড়ে কিছু মুসলিম সেনাকে হাইড আউটে রেখে এসেছে। চাইলে আজ রাতেই ব্রিজ পুনর্দখল করে নিয়ে বাইজান্টাইনদের একমাত্র পিছু হটার পথ রুদ্ধ করে দেয়া সম্ভব। অতএব সর্বসম্মতিক্রমে ভাহানের সন্ধি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বাইজান্টাইন প্রতিনিধিদের সসম্মানে বিদায় করে দেয়া হল।

অতএব ইয়ারমুখ যুদ্ধের ৫ম দিন কোন পক্ষই হোস্টাইলিটি শুরু না করায় দিনটি কেটে গেল বিনাযুদ্ধে। কিন্তু রাতে খালিদ জাররারের নেতৃত্বে ৫০০ ঘোড়সওয়ার পাঠিয়ে দিলেন আইনাল দাকার ব্রিজ কব্জা করতে। জাররার যখন তার দল নিয়ে সন্তর্পনে ঘুর পথে আইনাল দাকারের পথে রওনা দিলেন তখন খালিদ তার সেনাবাহিনীর বাকি সব ক্যভুলরি সৈন্যদের একত্রিত করে তার নিজের মোবাইল গার্ডসহ একটা মাত্র ক্যভুলরি রিজার্ভ তৈরি করলেন।

ইয়ারমুখ যুদ্ধের ষষ্ঠ ও শেষ দিন, ২০ আগস্ট ৬৩৬, সকালে বাইজান্তাইন আর মুসলিম সেনারা ফের তারের ফ্রন্ট লাইন বরাবর ফর্ম আপ করল। কারা আগে আক্রমন সূচনা করবে সেই দ্বিধায় ঘন্টা খানেক কেটে গেল। হঠাত বাইজান্টাইন বাহিনীর সেন্টার থেকে বিশালদেহী জেনারেল গ্রেগরি একাই ঘোড়া ছুটিয়ে মুসলিম ফ্রন্টের সামনে এসে দাড়ালেন। তারপর বাজখাই গলায় হাক দিলেন, “মুসলিম জেনারেলদের মধ্যে কে আছো আমার সাথে লড়তে চাও, এগিয়ে এসো।”

চলনে, বলনে এবং গড়নে ইউরোপিয়ান জেনারেল গ্রেগরি আসলেই ছিলেন শক্তিশালী মল্লযোদ্ধা। তাই ষষ্ঠ দিন সকালে তিনি নিজেই এগিয়ে এলেন যেন দু’একজন মুসলিম জেনারেলকে দ্বন্দযুদ্ধে নিজ হাতে হত্যা করে যুদ্ধের শুরুতেই মুসলিম সৈন্যদের ডিমোরালাইড করে ফেলা যায়। আর সেই দু’একজনের ভেতর একজন যদি খালিদ হয় তবে তো আর কথাই নেই।

গ্রেগরির চ্যালেঞ্জে সবার প্রথম সাড়া দিলেন আবু উবায়দা নিজে। কিন্তু গ্রেগরির আস্ফালন দেখে অন্য মুসলিম কমান্ডারেরা সবাই তাকে নিবৃত করতে চাইলেন। বরং দ্বন্দযুদ্ধে খালিদের ঐতিহাসিক রেকর্ড বিবেচনায় তারা সবাই মত দিল খালিদের পক্ষে। কিন্তু এবার আবু উবায়দা তার সেনা প্রধানের পদাধিকার বলে নিজ সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। তারপর নিজের ঘোড়ার পিঠে চড়ে খালিদের উদ্দেশ্যে বললেন, “যদি আমি না ফিরি সেক্ষেত্রে উমর বিন খাত্তাবের পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত মুসলিম সেনাবাহিনী দেখভালের দায়িত্ব তোমাকেই দিয়ে যাচ্ছি।”

আবু উবায়দা মুসলিম ফ্রন্ট ছাড়িয়ে সামনে গিয়ে ঘোড়া থামালেন। তারপর খাপ থেকে তরবারি হাতে নিয়ে লাগাম ঢিলে করে “আল্লাহু আকবার” বলে হুঙ্কার দিয়ে ঘোড়ার পেটে গোড়ালি দাবালেন। মুহুর্তেই তীর বেগে তার ঘোড়া গ্রেগরির দিকে ধেয়ে যেতে শুরু করল। আবু উবায়দাকে এগিয়ে আসতে দেখে গ্রেগ্ররিও তার তরবারি ড্র করে আবু উবায়দার দিকে তার ঘোড়া ছুটালেন। নোম্যানস ল্যান্ডের মধ্যিখানে শুরু হল এক শ্বাসরুদ্ধকর দ্বৈরথ।

বাইজান্টাইন আর মুসলিমসেনারা সবাই যারযার সেনাপতির জন্য গলাফাটিয়ে চিৎকার করে উৎসাহ দিতে লাগল। দুজন অভিজ্ঞ তরবারি যোদ্ধার তরবারিতে রোদের আলো মুহুর্মুহু ঝলসে উঠতে লাগল। কিছুক্ষনের জন্য যেন সময় থেমে গেল আর সমানে সমান যুদ্ধ চলল। এরপর হঠাত গ্রেগরি ঘোড়া ঘুরিয়ে পিছ টান দিল। কিন্তু নাছোড়বান্দা আবু উবায়দা গোয়াড়ের মত সর্বোচ্চ গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে গ্রেগরির পিছু নিলেন। হালকা পিছু ফিরে আবু উবায়দাকে আসতে দিখে গ্রেগরি সন্তুষ্টির মুচকি হাসি হাসলেন, কারন আরব জেনারেল তার ফাঁদে পা দিয়েছেন।

গ্রেগরিকে পিঠটান দিতে দেখে মুসলিম ফ্রন্ট তখন উল্লাসে ফেটে পড়েছে। উল্লসিত আবু উবায়দা যখন প্রমত্তা টর্নেডোর মত গ্রেগরির পেছন থেকে এগিয়ে আসতে লাগলেন তখন হঠাত করেই গ্রেগরি তার ঘোড়ার গতি কমিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্যটা ছিল নিজের ঘোড়াকে হঠাত ব্রেক কষিয়ে থামিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করা, যেন পাশ দিয়ে আবু উবায়দা তার ঘোড়া নিয়ে তীব্র গতিতে বেড়িয়ে যাবার সময় তার বুকে তরবারি চালিয়ে দু’টুকরা করে ফেলা যায়।

কিন্তু আবু উবায়দাও অভিজ্ঞ যোদ্ধা। হয়ত তিনি গ্রেগরির এই চাল ধরে ফেলে ছিলেন অথবা স্রেফ সহজাত রিফ্লেক্সের কারনেই গ্রেগরিকে অতিক্রম করার সময় তিনি হঠাত শূন্যে লাফিয়ে উঠলেন। মুহুর্তের জন্য গ্রেগরির হিসেবে গরমিল হয়ে গেল আর তিনি তার টার্গেটকে তরবারির নাগালে পেলেন না। কিন্তু আবু উবায়দা শুন্যে ভাসমান অবস্থায়ই গ্রেগরির কল্লা বরাবর কোপ চালালেন।

গতি, দেহের ভর আর বাহুর শক্তি মিলিয়ে আবু উবায়দার ভয়ানক সেই আঘাতে এক কোপেই গ্রেগরির ধর মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। আবু উবায়দা কষে লাগাম টেনে ঘোড়ার পিঠে নিজেকে সামলে নিয়ে মুসলিম ফ্রন্টের দিকে ঘোড়া ঘুরিয়ে রওনা দিলেন। মাটিতে পড়ে ধরফর করতে থাকা মন্ডুবিহীন গ্রেগরির দেহটার দিকে ফিরেও তাকাবার প্রয়োজন বোধ করলেন না তিনি।

আবু উবায়দা ফিরে আসতেই খালিদ মুসলিম পদাতিক বাহিনীর ভার তার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে আমরের বাহিনীর অবস্থানের দিকে ছুটলেন। কারন আমরের বাহিনীর পেছনেই আজ তার মোবাইল গার্ড ক্যভুলরি রিজার্ভ একক ইউনিট হিসেবে অপেক্ষায় আছে। ওয়ার্ম আপ দ্বন্দযুদ্ধের পালা শেষ। গত চারটা দিন ধরে খালিদ এই দিনটার আশায় বুক বেধে ছিলেন। অবশেষে শুরু হতে যাচ্ছে খালিদ বিন ওয়ালিদের সেই বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল কাউন্টার অফেন্সিভ।

খালিদের মূল পরিকল্পনা ছিল প্রথমেই গোটা বাইজান্টাইন আর্মির বাম দিকটা আটকে দেয়া, যেন কেউ ঐদিক দিয়ে জাবিয়া রোড ধরে দামেস্কের দিকে পালাতে না পারে। সেজন্য শুরুতেই তিনি বাইজান্টাইন ক্যভুলরি রিজার্ভকে টার্গেট করলেন। শুরুতেই বাইজান্টাইন ক্যভুলরিকে হঠিয়ে দিতে পারলে বাইজান্টাইন পদাতিক ডিভিশনগুলো ক্যভুলরি সাপোর্ট ছাড়া লড়বার উদ্যম হারিয়ে ফেলবে। যদিও সংখ্যায় এখনো তারা মুসলিমদের থেকে অনেক বেশি। কিন্তু ক্যভুলরি সাপোর্ট হারা বাইজান্টাইন ইনফেন্ট্রির পক্ষে মুসলিম ইনফেন্ট্রি আর ক্যভুলরির সমন্বয়ে করা এটাক সামলানো প্রায় অসম্ভব।

এরপর খালিদের পরিকল্পনা গোটা বাইজান্টাইন বাহিনীকে উত্তরদিক (বাইজান্টাইনদের বাম দিক) থেকে ঠেসে ধরে ওয়াদি উর রাকাদের দিকে নিয়ে যাওয়া। ওখানে গত রাতেই জাররার আইনাল ডাকার ব্রিজ দখলে নিয়ে নিয়েছে। সুতরাং বাম থেকে আক্রান্ত হয়ে পিছাতে না পেরে অগত্যা বাইজান্টাইনরা নিজেদের ডানে আরো দক্ষিনে ইয়ারমুখ নদীর দিকে চাপতে বাধ্য হবে। আর এই ওয়াদি উর রাকাদ আর ইয়ারমুখ নদীর সংযোগস্থলের ত্রিভুজভূমিই হল খালিদের কাংখিত কিলিং গ্রাউন্ড, যেখানে সে ইয়ারমুখ যুদ্ধের চূড়ান্ত নিস্পত্তি করতে চায়।

গ্রেগরিকে মল্লযুদ্ধে হারিয়ে আবু উবায়দা ফিরতেই খালিদ মুসলিম ইনফেন্ট্রি এটাকের দায়িত্ব তার হাতে তুলে দিয়ে নিজে তার মোবাইল গার্ডের সাথে মিশে গেলেন। খালিদের আক্রমন শুরুর সংকেত পেতেই সমস্ত মুসলিম ফ্রন্ট একযোগে বাইজান্টাইন ফ্রন্টের দিকে ধেয়ে গেল। ক্যভুলরি সাপোর্ট ছাড়াই ব্রড ফ্রন্টে এই জেনারেল এটাকে বাইজান্টাইনরা ক্ষনিকের জন্য চমকে গেল। কিন্তু দ্রুতই তারা চমক কাটিয়ে উঠে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলল।

পরিকল্পনা মাফিক ইয়াজিদ আর আবু উবায়দা জেনারেল কুরিনের অধীন বাইজান্টাইন রাইট উইং আর রাইট সেন্টারকে এনগেজড রাখলেন। কিন্তু সুরাবিল আর আমরের বাহিনী কানাতিরের আর্মেনিয়ান আর স্লাভ বাহিনীকে সামনে থেকে তীব্রভাবে আক্রমন করলেন। ঠিক একই সময়ে খালিদ তার ক্যভুলরি রিজার্ভের এক অংশকে কানাতিরের বাহিনীর পেছনে রাখা বাইজান্টাইন ক্যভুলরির ওপর লেলিয়ে দিয়ে নিজে অবশিষ্ট মোবাইল গার্ড নিয়ে কানাতিরের স্লাভ বাহিনীর বাম ফ্ল্যাঙ্কে চার্জ করলেন।

বাইজান্টাইন সেনাবাহিনীতে আর্মেনিয়ানদের সবচে সাহসী যোদ্ধা বলে গন্য করা হত, সম্ভবত সেকারনেই ইয়ারমুখ যুদ্ধেও বাইজান্টাইন সেন্টার আর্মেনিয়ান যোদ্ধাদের নিয়ে গড়া হয়েছিল। কিন্তু স্লাভরা বিখ্যাত ছিল কষ্টসহিষ্ণু শক্তিশালী যোদ্ধা হিসেবে। তাছাড়া সংখ্যায়ও স্লাভরা আজ আমরের বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি। তাই আমরের ইনফেন্ট্রি ফ্রন্টাল এটাক প্রায় রিপালসড হবার উপক্রম হল। কিন্তু তাদের বাম ফ্ল্যাঙ্ক থেকে খালিদ যখন ক্যভুলরি চার্জ করে বসল তখন পরিস্থিতি পাল্টে গেল।

স্লাভদের উপর ক্যভুলরি ফ্ল্যাঙ্কিং চার্জ করার আগেই খালিদ তার মোবাইল গার্ডের একাংশ দিয়ে স্লাভদের জন্য বরাদ্দ বাইজান্টাইন ক্যভুলারিকে আক্রমন করে বসায় স্লাভ ইনফেন্ট্রি ডিভিশনগুলো খালিদের মুসলিম ক্যভুলরি চার্জের মুখে দ্রুত খেই হারাতে শুরু করল। বাইজান্টাইন ক্যভুলরি প্রাণপণে চেস্টা করল মুসলিম ক্যভুলরিকে পথ থেকে সরিয়ে স্লাভ ইনফেন্ট্রি ইউনিটগুলোর সাপোর্টে এগিয়ে আসতে। কিন্তু খালিদের পাঠানো ক্যভুলরি রিজার্ভের একাংশ বাইজান্টাইন ক্যভুলরি আর স্লাভ ইনফেন্ট্রি ইউনিটগুলোর মাঝখানে দেয়ালের মত দাঁড়িয়ে গেল।

সামনে থেকে আমরের ফ্রন্টাল এটাক আর বাম ফ্ল্যাঙ্ক থেকে খালিদের ফ্ল্যাকিং চার্জের দ্বিমুখী আক্রমনে দিশেহারা স্লাভরা প্রথমে পিছু হটতে চাইল। কিন্তু তাদের ঠিক পেছনেই তখন খালিদের ক্যভুলরির একাংশের সাথে বাইজান্টাইন লেফট উইং ক্যভুলরির তুমুল লড়াই চলছে। অগত্যা সামনে পেছনে আর বাম ফ্ল্যাঙ্ক থেকে অবরুদ্ধ স্লাভরা হুড়মুড় করে তাদের ডানে সুরাবিলের বিরুদ্ধে লড়তে থাকা আর্মেনিয়ানদের সাথে মিশে যাবার চেস্টা করল। স্লাভদের এই এলোমেলো আগমনে একদিকে আর্মেনিয়ানদের ফাইটিং ফর্মেশনে যেমন ভজঘট লেগে জগাখিচুড়ি অবস্থা তৈরি হল তেমনি স্লাভদের বয়ে আনা আতঙ্ক এবার আর্মেনিয়ান সৈন্যদের মাঝেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল।

স্লাভরা আর্মেনিয়ানদের সাথে মিশে যেতেই বাইজান্টাইন ফ্রন্টে যে কনফিউশন সৃষ্টি হল, তার সুযোগে খালিদ তার মোবাইল গার্ড ঘুরিয়ে তার পাশেই মুসলিম ক্যভুলরির একাংশের সাথে লড়তে থাকা বাইজান্টাইন লেফট উইং ক্যভুলরির ডান পাশে গিয়ে ফের উদয় হলেন। এবার টু প্রঞ্জড ক্যভুলরি চার্জের মুখে বাইজান্টাইন লেফট উইং ক্যভুলরি রণে ভংগ দিল এবং দক্ষিনে ভাহানের মূল ক্যভুলরি রিজার্ভের দিকে না গিয়ে সোজা উত্তরে দামেস্কের দিকে পালাল। কিন্তু খালিদ তাদের পিছু ধাওয়া করার কোন আগ্রহই না দেখিয়ে বরং তার ক্যভুলরি রিজার্ভের দুই অংশকে ফের একত্রিত করার আদেশ দিলেন।

খালিদ যখন তার মোবাইল গার্ড নিয়ে বাইজান্টাইন লেফট উইং ক্যভুলরিকে আক্রমন করতে সামনে থেকে সরে গিয়েছিল, আমর তখনি তার বাহিনী নিয়ে সেই শুন্যস্থান পুরন করে আর্মেনিয়ানদের বাম ফ্ল্যাঙ্কে ফর্ম আপ করলেন। কিছুক্ষন আগেও ঠিক এখানটায় দাঁড়িয়েই স্লাভ বাহিনী তার বিরুদ্ধে লরছিল। আমরের বাহিনীকে আর্মেনিয়ানদের বাম ফ্ল্যাঙ্কে ফর্ম আপ করতে দেখে সুরাবিল তার আক্রমনের ধার বাড়িয়ে দিলেন। কিছুক্ষনের মধ্যে আমরের বাহিনীও আর্মেনিয়ানদের বাম ফ্ল্যাঙ্ক থেকে হামলে পড়ল। কিন্তু সদ্য যোগ দেয়া স্লাভদের নিয়ে আর্মেনিয়ানদের সংখ্যা এই মুহুর্তে হঠাত করেই অনেক বেড়ে গিয়েছে। তাই সুরাবিল আমরের টু প্রঞ্জড ইনফেন্ট্রি এসল্টেও কাজ হচ্ছিল না।

আর্মেনিয়ানদের বাম ফ্ল্যাঙ্ক বরাবর ফর্মিং আপের সময়ই আমর আর্মেনিয়ানদের পেছনেই বাইজান্টাইন লেফট সেন্টার ক্যভুলরিকে ফর্ম আপ করতে দেখলেন। যেকোন বাহিনিরই ফ্ল্যাঙ্কই তার সবচে বড় দুর্বলতা। অবস্থা এখন এমন যে আমর এখন যখন তার বাহিনী নিয়ে আর্মেনিয়ানদের বাম ফ্ল্যাঙ্কে আক্রমন করবেন তখনি বাইজান্টাইন লেফট সেন্টার ক্যভুলরিও এসে আমরের বাহিনীর ডান ফ্ল্যাঙ্কে চার্জ করবে। ক্যভুলরি চার্জের বিরুদ্ধে তার ইনফেন্ট্রি ইউনিটগুলো কোনভাবেই কুলিয়ে উঠতে পারবে না, কিন্তু এই মুহুর্তে এসব ভেবে আর কোন লাভই নেই, পিছিয়ে আসবারও সময় আর নেই। তাই আল্লাহু আকবর বলে আমর তার সামনের আর্মেনিয়ান ফ্ল্যাঙ্কের দিকেই তার সব মনোযোগ নিবদ্ধ করে আক্রমন করে বসলেন।

হঠাত সব ক্যভুলরি রিজার্ভকে একত্রিত করে খালিদ এক শক্তিশালী মোবাইল রিজার্ভ তৈরি করে যেভাবে বাইজান্টাইন লেফট উইং ক্যভুলারিকে ইয়ারমুখ ছাড়া করেছেন, তা দেখে ভাহানের বোধোদয় হল। তিনি বুঝলেন যে খালিদ তার একক মোবাইল রিজার্ভ দিয়ে চার ভাগে বিভক্ত বাইজান্টাইন মোবাইল রিজার্ভের একটার পর একটাকে মাঠছাড়া করবার পায়তারা কষছে। ইতোমধ্যে তার লেফট উইং ক্যভুলরি দামেস্কের পথে পালিয়েছে। অতএব তিনি তার সকল কভ্যুলরি রিজার্ভকে একত্রিত করার নির্দেশ দিলেন যেন তার একত্রিত মোবাইল রিজার্ভ দিয়ে তিনি খালিদের মোবাইল রিজার্ভকে হঠিয়ে দিতে পারেন।

ভাহানের নির্দেশ আমরের জন্য আশীর্বাদ বলে প্রমানিত হল। সবিষ্ময়ে আমর দেখলেন তার বাহিনীর ডান ফ্ল্যাঙ্কে জড়ো হতে থাকা বাইজান্টাইন সেন্টারের কভ্যুলরি রিজার্ভ হঠাত আক্রমন না করে বরং দিক পাল্টে দ্রুত পেছনের দিকে চলে গেল। ওদিকে বাইজান্টাইন লেফট উইং ক্যভুলরি দামেস্কের পথে পালাতেই খালিদ এবার কানাতিরের আর্মেনিয়ানদের দিকে মনোযোগ দিলেন। তিনি তার মোবাইল গার্ড নিয়ে আর্মেনিয়ানদের পেছনে পৌছাতেই বাইজান্টাইন সেন্টারের কভ্যুলরি রিজার্ভকে পিছিয়ে যেতে দেখলেন।

মুহুর্তের জন্য খালিদ আর্মেনিয়ানদের পেছন থেকে আক্রমনের কথা একবার ভাবলেন। কিন্তু পরমুহুর্তে ভাহানের পরিকল্পনার কথা ভেবে আর্মেনিয়ানদের সুরাবিল আর আমরের হাতে ছেড়ে দিয়ে তিনি বাইজান্টাইন সেন্টারের কভ্যুলরি রিজার্ভের পিছু নিলেন। খালিদ ভাল করেই জানতেন ভাহান যদি একবার তার ক্যভুলরি রিজার্ভ একত্রিত করে নিতে পারেন তাহলে সেই বিশাল ক্যভুলরি রিজার্ভকে হারানোর সাধ্য খালিদের ক্যভুলরি রিজার্ভের নেই। কিন্তু ভাহানের ক্যভুলরি স্কোয়াড্রন গুলো এখনো একক ক্যভুলরি রিজার্ভ হিসেবে ফর্ম আপ করে উঠতে পারেনি। আর যেকোন বাহিনীই ফর্মিং আপের সময়ই কিছু সময়ের জন্য সবচে অপ্রস্তুত আর দূর্বল অবস্থায় থাকে। তাই খালিদ এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না।

খালিদ চলার পথেই আরো একবার তার মোবাইল রিজার্ভকে দুই ভাগ করে নিয়ে একযোগে ভাহানের ক্যভুলরি রিজার্ভের উপর হামলে পরলেন। ব্যাটেল ফর্মেশনে আসতে পারার আগেই এমন স্পয়েলিং এটাকের মুখে পরে বাইজান্টাইন স্কোয়াড্রন গুলো বিচ্ছিন্ন ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবার চেস্টা করল। কিন্তু বাইজান্টাইন ক্যভুলরি স্কোয়াড্রন গুলোর চাইতে খালিদের স্কোয়াড্রনগুলো অপেক্ষাকৃত হালকা হওয়ায় খালিদের স্কোয়াড্রন গুলো ছোট ছোট ঢেউয়ের মত বারবার এসে ভারী বাইজান্টাইন ক্যভুলরিকে বিপর্যস্ত করে তুলল।
অবস্থার বেগতিক দেখে বাইজান্টাইন কভ্যুলরি কমান্ডাররা হঠাত হাল ছেড়ে দিল। আর্মেনিয়ান ক্যভুলরি তাদের সেনা প্রধান ভাহানকে ঘিরে ফেলে গার্ড করে উত্তরে দামেস্কের দিকে ছুটে চলল। বাকি বাইজান্টাইন ক্যভুলরি অর্গানাইজড রিয়ারগার্ড একশনের মাধ্যমে পিছু নেয়া মুসলিম ক্যভুলরির হাত থেকে নিজেদের ছাড়িয়ে নিতে চেস্টা করে গেল।

এবার খালিদ পলায়নরত বাইজান্টাইন ক্যভুলরিকে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্য তার মোবাইল গার্ডের আরেক অংশকে দায়িত্ব দিয়ে নিজের অংশ নিয়ে আর্মেনিয়ানদের ফ্রন্টে ছুটে চললেন। ইতোমধ্যে সামনে আর বাম থেকে আক্রান্ত আর্মেনিয়ান বাহিনী তুমুল লড়ছিল। কিন্তু খালিদ যখন পেছন থেকেও তাদের আক্রমন করে বসল তখন তাদের সব প্রতিরোধ দুমড়ে গেল। আর্মেনিয়ানদের হাল ছেড়ে দিতে দেখে এবার আবু উবায়দা আর ইয়াজিদও তাদের দক্ষিন ফ্রন্টে আক্রমনের ধার বাড়িয়ে দিল।
মুহুর্তে অবশিষ্ট বাইজান্টাইন ফ্রন্টজুড়ে পিছু হটার হিরিক পড়ে গেল। সবাই তখন ওয়াদি উর রাকাদের ব্রিজ আইনাল দাকারের দিকে ছুটল। ধুর্ত খালিদ তাদের পিছু হটার সুযোগ করে দিলেন। আমর, সুরাবিল, আবু উবায়দা আর ইয়াজিদের বাহিনী তখন মালার মত বাইজান্টাইনদের পিছু পিছু নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে অনুসরন করল। খালিদ তার মোবাইল রিজার্ভ নিয়ে পিছু হটতে থাকা বাইজান্টাইনদের উত্তরদিকটা বিশাল এক কাট অফ পার্টির মত করে গার্ড করে রাখলেন যেন কেউ দামেস্কের দিকে পালাতে না পারে, এবং ভাহানের মোবাইল রিজার্ভ হঠাত ফিরে এলেও যেন কোনভাবেই মূল বাইজান্টাইন আর্মির সাথে মিলিত হতে না পারে।

খালিদের কারনে উত্তরে পালাবার পথ বন্ধ জেনে বাইজান্টাইনরা অগত্যা আইনাল দাকারের পথই ধরল। ওয়াদি উর রাকাদ গিরিখাতের হোম ব্যাঙ্কটা সমতল হলেও আইনাল দাকার ব্রিজের ওপারে ফার ব্যাঙ্কে শুরু থেকেই পাহাড়ের সারি। ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে পৌছাতেই প্রবেশমুখটা সংকীর্ন হয়ে এসেছে। বাইজান্টাইনরা ব্রিজের উপর উঠতেই ওপারের পাহাড়ের আড়াল থেকে এতক্ষন ধরে লুকিয়ে থাকা জাররারের সৈন্যরা তীর-ধনুক, পাথর আর তরবারি হাতে বেরিয়ে এল।

ব্রিজের ওপারের ভূমির গঠনই এমন সংকীর্ন যে ব্রিজ পেরিয়ে খুব বেশি লোক একসাথে জমায়েত হবার সুযোগই নেই। তারপরও কিছু সাহসী বাইজান্টাইন জাররারদের হঠিয়ে দিতে প্রানের মায়া ত্যাগ করেই এগিয়ে গেল এবং জাররারের বাহিনী হাতে প্রান হারাল। ওদিকে পেছনের বাইজান্টাইন সৈন্যরা কিছু না বুঝেই সামনে ঠেলতে লাগল। ফলে ওয়াদি উর রাকাদের কিনারা থেকে অনেকেই গড়িয়ে পড়তে লাগল আর গভীর খাদের তলায় আছড়ে পরতে লাগল।

এপথে কোন সুবিধা হবে না বুঝে বাইজান্টাইনরা এবার ওয়াদিউর রাকাদ ধরে আরো দক্ষিনে এগিয়ে যেতে লাগল। এগিয়ে যেতে যেতে একসময় তারা ইয়ারমুখ নদীর সামনে এসে আটকে গেল। অবশেষে খালিদ তার প্রতিপক্ষকে পছন্দের কিলিং গ্রাউন্ডে পেয়ে গেল।
মুসলিম ইনফেন্ট্রি আর ক্যভুলরি এবার ইয়ারমুখ নদী আর ওয়াদিউর রাকাদ রাভিনের সংযোগস্থলের ত্রিভুজে বাইজান্টাইনদের ঘিরে ধরে বৃত্তটা ক্রমশ ছোট করে আনছিল। সামনে মুসলিম বাহিনী আর পেছনে ভয়ঙ্কর খাড়া ঢাল, উভয় সংকটে পরে বাইজান্টাইনরা শেষ বারের মত মুসলিম বাহিনীকে আক্রমন করার চেস্টা করল। উদ্দেশ্য ছিল একসাথে সবাই এগিয়ে এসে যে যেখান দিয়ে পারে মুসলিম বাহিনীর বৃত্ত ভেঙ্গে দামেস্কের দিকে পালিয়ে যাওয়ার।

কিন্তু তারা আক্রমন শুরু করতে পারার আগেই খালিদ তাদের সাড়সির মত চেপে ধরলেন। বাইজান্টাইন প্রথম লাইনের পেছনের সৈন্যরা কুনুই নড়াবার জায়গাটাও পাচ্ছিল না। খালিদ বুঝলেন জেনারেলশিপ দেখানোর সময় এবার শেষ। রোমান বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পতন ঘন্টা বেজে গেছে। এবার সেই পতন নিশ্চিত করতে তিনি নিজে খোলা তরবারি হাতে সাধারন সৈনিকের মতই হাতাহাতি যুদ্ধে নেমে পড়লেন।

গত পাঁচদিনের যুদ্ধের ক্ষোভ, ভাই-বন্ধু আর সাথী হারানোর তীব্র আক্রোশ নিয়ে মুসলিম সৈন্যরা কচুকাটা করতে লাগল বাইজান্টাইনদের। কিছু বাইজান্টাইন স্বেচ্ছায় যুদ্ধবন্দী হতে চাইল। কিন্তু নিজ সৈন্যদের আবেগকে উপেক্ষা করবার শক্তি খালিদের ছিলনা। তাছাড়া এতোবড় বাহিনীকে যুদ্ধবন্দী করার ঝুকি তিনি নিতে চাননি। কারন যুদ্ধ শেষে এসব যুদ্ধ বন্দীরা মিলে বিদ্রোহ করে মুসলিমদের আরো ক্ষতির কারন হতে পারে। সর্বোপরি একটা পরিস্কার বার্তা ইসলামে ভবিষ্যত শত্রুদের কাছে পৌছানোও হয়ত জরুরীই ছিল যা আফ্রিকা আর ইউরোপে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে সহজ করে দিয়েছিল। সম্ভবত এই বার্তার কারনেই বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের পতনের পরপরই চতুর্দিকে বিদ্যুতগতিতে ইসলামের সম্প্রসারন শুরু হয়ে গেল, আর আমর বিন আল আস, তারিক বিন যিয়াদ, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আর সালাউদ্দিন আইয়ুবির মত গ্রেট মুসলিম জেনারেলরা যুগের পর যুগ ইসলামের ঝান্ডা সমুন্নত রাখতে পেরেছিলেন। যাহোক, সেসব ভিন্ন গল্প, পরে কখনো হবে খন।

মূল লেখার লিংকঃ http://www.somewhereinblog.net/blog/delHkhan/30109019

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: