কীর্তনখোলার বাঁকে

মূল লেখার লিংক

“কীর্তনখোলায় পূর্ণিমা দেখবেন নাকি স্যার? জোস লাগে কিন্তু।“

বক্তার নাম নাহিদ। আমার প্রাক্তন কোম্পানির প্রাক্তন এরিয়া ম্যানেজার। স্বাধীনচেতা লোক। একটু বেশি স্বাধীনচেতা বলেই হয়ত কোম্পানির চাকুরিতে স্থির হতে পারছিল না। লোকাল পলিটিক্সের এক পরিচিত মুখ। আমাকে বেশ পছন্দ করে। পছন্দের পিছনে যৌক্তিক কারণও আছে। তাঁর এরিয়া ম্যানেজার পদে প্রমোশনের ব্যাপারে আমার কিঞ্চিৎ অবদান ছিল। সে আরেক ইতিহাস।

বরিশাল এসেছি শুনেই বাইক নিয়ে চলে আসল আমাকে নিয়ে ঘুরবে বলে। উপরের প্রশ্নটাই ছিল দেখা হবার পর আমাকে করা তাঁর প্রথম প্রশ্ন।

“আকাশে তো মেঘ। চাঁদ দেখা যাবে আজ?”
“দেখা না যাক, নদীর পাড়ে বসে হাওয়া তো খাওয়া যাবে।“
“কেবল হাওয়া?”
“না স্যার, ফুচকা-চটপটি সবই আছে।“

অতএব চললাম কীর্তনখোলা দেখতে। কীর্তনখোলার নাম শুনেছিলাম বহু আগেই। এই নামে একটা মুভিও হয়েছিল। যদিও হিট হয় নি কিন্তু অনেকগুলো জাতীয় পুরস্কারই সিনেমাটার কপালে জুটেছিল। বঙ্গদেশে যা হয় আর কি। আমার মনে ধরেছিল নামটা। কী-র-ত-ন-খো-লা। কি অদ্ভুত সুন্দর আর মায়াবী নাম। বরিশাল যাওয়ার ইচ্ছে তখন থেকেই মাথায় চাপে। কেবলমাত্র নদীটা দেখার জন্যই।

অফিসের ট্যুর আমার সেই স্বপ্ন পূরণের হাতিয়ার হয়ে চলে আসল। মিটিং এর পরদিন একটু ফ্রি ছিলাম। ব্লগে লেখালেখির সূত্রে পরিচিত এক ছোট ভাই (ফয়সাল) তখন বরিশাল মেডিকেলের ছাত্র। ফেসবুকে পরিচয় হয়েছিল। ভাবলাম রিয়েল লাইফে পরিচয়ের এইতো সুযোগ। মেডিকেল কলেজে গিয়ে দিলাম তাঁকে ফোন আর সেও এক বন্ধুসহ হাজির। সবাই মিলে চললাম কীর্তনখোলা দেখতে।

কীর্তনখোলা নদীর তীরে চমৎকার একটা পার্ক আছে যার নাম মুক্তিযোদ্ধা পার্ক। প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণ এই পার্কের প্রধান উদ্যোক্তা। গুগল থেকে পার্কের অবস্থানটা একবার দেখে নেওয়া যেতে পারে।

আহ, নদীতীরে এসে মনটা ভরে গেল। হিম বাতাসে শরীর-মন দুটোই জুড়িয়ে যায়। শীতের সময় ছিল না তারপরেও ভীষণ ঠান্ডা লাগছিল। ফয়সালের কথা অনুযায়ী “বৃষ্টি আসছে ভাই।“

পার্কটা সত্যিই চমৎকার। নদীর তীর ঘেঁষে অনেকদূর পর্যন্ত চলে গেছে খোয়া বিছানো রাস্তা। এই রাস্তা ধরে হাঁটতে দারুণ লাগে।

ফয়সালের ধারণা যে ভুল ছিল না সেটা প্রমাণ করবার জন্য দেখতে দেখতেই আকাশ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করল, এবং দেখতে না দেখতেই অঝোর ধারায় শ্রাবণের বর্ষণ শুরু হয়ে গেল।

বৃষ্টিতে আমরা সবাই মিলে একটা ছাউনিমত জায়গায় আস্রয় নিলাম। সেখানেই হামজা’কে চোখে পড়ল। কোন হামজা বুঝতে পারছেন কি? যে কোন নদীতে লঞ্চডুবি হলেই যেই দুইটা উদ্ধারকারী জাহাজের নাম আমরা পত্রিকায় দেখতে পাই তাঁর একটা হচ্ছে হামজা। নোঙর ফেলা হামজাকে চোখের সামনেই দেখতে পেলাম। রুস্তম ছিল না। হয়ত কোন ডুবে যাওয়া লঞ্চকে উদ্ধার করতে গেছে।

কীর্তনখোলার বৃষ্টি আবার দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই কিছুক্ষণ পরেই মেঘের বুক চিড়ে সূর্য উঁকি দিল। বোঝারই উপায় নেই যে এতক্ষণ চারপাশ আঁধারে ঢেকে গিয়েছিল। বৃষ্টির পর ভেজা পরিবেশ দেখতে মন্দ লাগে না। সবকিছুই কেমন যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। এই যেমন বৃষ্টির পর দেখি কীর্তনখোলার চেহারাই বদলে গেছে। সোনালি রোদে নদীর পানি রুপালী আভা বিলাচ্ছে।

প্রেম করবার জন্য নদী এবং পার্ক বেশ ভাল জায়গা। আমরা পার্কে গিয়ে প্রচুর কাপল দেখতে পেয়েছিলাম। এইরকম এক কাপলের ছবি কিভাবে জানি ক্যামেরায় উঠে গিয়েছিল। রাতের বেলা ল্যাপটপ খুলে ছবিটা পাই। আপনাদের সাথে শেয়ার করবার লোভ সামলাতে পারলাম না। আহা, এইরকম একটা প্রেম করতে পারলে বেশ হত।

কীর্তনখোলার সেই আগের যৌবন আর নেই। জীবনানন্দ দাস, মহাত্মা অশ্বিনী কুমার দত্ত, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের বরিশালের নদী কীর্তনখোলা এখন সব হারিয়ে বৈধব্য গ্রহণ করেছে। এক সময় অহরহ জাহাজ চলাচল করত কীর্তনখোলায়। কিন্তু আজ লঞ্চ চলাচল করাও বড় কষ্টকর। তারপরেও কিছু নৌকা আর তেলবাহী ট্যাংকার আমাদের চোখে পড়েছিল। আগের মত মাছও শুনেছি এখন আর কীর্তনখোলায় পাওয়া যায় না। তারপরেও জীবন কি আর থেমে থাকে? থেমে থাকে না বলেই এখনও লোকজন মাছের সন্ধানে নদী চষে বেড়ায়।

১৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট কীর্তনখোলা মূলত আড়িয়াল খাঁ নদের একটি শাখা। আড়িয়াল খাঁর উৎপত্তি পদ্মা থেকে। বরিশাল ঘেঁষে কীর্তনখোলা নদী পশ্চিমে এগিয়ে নলছিটি থানার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। একটি অংশ ধানসিড়ি নাম নিয়ে কচা নদীতে গিয়ে মিশেছে। অপর অংশ মিলেছে বিষখালী নদীতে। কীর্তনখোলা নদীতে ব্রিটিশ স্টিমার কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে চলত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাহাজ। রবীন্দ্রনাথ সেই জাহাজে করে বরিশালে এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ পানসীঘাটে পানসীতে রাতযাপন করেন। কীর্তনখোলার বুকে সে সময় জমিদারদের পানসী ভাসত নানান চমক নিয়ে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কীর্তনখোলার বুকে পদচিহ্ন এঁকে ছিলেন।

কীর্তনখোলা নদীর নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানান রহস্য। সরকারী কাগজপত্রে এই নদীর নাম কখনোই কীর্তনখোলা স্বীকার করা হয়নি। সিএস ও আরএস খতিয়ান ও অন্যান্য ম্যাপে নদীর নাম বলা হয়েছে বরিশাল নদী। বরিশালের ইতিহাস লেখক এক সময়ের ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরেট হেনরি বেভারিজ এই কথায়ই বলেছেন, তিনি তাঁর The district of Bakerganj, It’s history and statistics গ্রন্থে লিখেছেন,

জেলার সবচেয়ে বড় শহর বরিশাল এবং এখানে প্রধান আদালতগুলো অবস্থিত। বরিশাল নদীর পশ্চিম তীরে এর অবস্থান।

তিনি আবার ফুটনোট দিয়ে লিখেছেন,

আমি বিশ্বাস করি, নদীর প্রকৃত নাম কীর্তনখোলা। কিন্তু এ নাম কখনও উচ্চারিত হতে শুনিনি।

পরবর্তী ইতিহাস লেখকরা একথাই বলে গেছেন। জেলার যেসব সার্ভে ম্যাপ রয়েছে, সেখানে কীর্তনখোলা নদীর অস্তিত্বের কথা স্বীকার করা হয়নি। বলা হয়েছে, বরিশাল নদী।

স্থানীয়ভাবে নদীর নামকরণ নিয়ে দু/তিনটি বক্তব্য শোনা যায়। নদীর পার ঘেঁষেই শহরের সবচেয়ে পুরনো হাট রয়েছে। প্রচলিত রয়েছে, সেখানে কীর্তনের উৎসব হতো। সেই থেকে এই নদীর নাম হয়েছে কীর্তনখোলা। কেউ কেউ হাটখোলায় স্থায়ীভাবে কীর্তনের দল বসবাস করার কারণে এর নাম কীর্তনখোলা হয়েছে বলে মনে করেন। তবে নদীর নামকরণের সঙ্গে কীর্তনের কিংবা কীর্তনীয়দের যে একটা সম্পর্ক রয়েছে তা নিশ্চিত। কৃষ্ণলীলার কাহিনী নিয়ে কীর্তনীয়রা গানে মেতে থাকতেন। কৃষ্ণ রাধাকে নিয়ে যমুনা নদীতে লীলায় মেতে উঠতেন। বরিশালে যমুনা না থাকলেও কীর্তনখোলা নদীই যেন রাধা-কৃষ্ণের অমর প্রেমের গাথা হয়ে আছে।

নাহিদের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। নাহিদের কথা দিয়েই শেষ করছি। ফয়সালের সাথে ঘুরাঘুরি শেষ করে সন্ধ্যায় নাহিদের সাথে দেখা করেছিলাম। নাহিদ বলছিল দোল পূর্ণিমার রাতে এখনও নাকি কীর্তনখোলার বুকে উৎসব হয়। লঞ্চঘাটের অদূরে কীর্তনখোলার জলে পা ভিজাতে ভিজাতে তাঁকে জিগ্যেস করেছিলাম, দোল পূর্ণিমার মাহাত্ম্য কি? তাঁর কাছেই শুনলাম, এই রাতেই রাধা আর কৃষ্ণ একজন আরেকজনকে খুঁজে পেয়েছিল। তাই এইরাতেই মানুষের মনে প্রেমের ভাব জাগ্রত হয়, অর্থাৎ প্রেমে নর-নারীর হৃদয় দোলে। সত্যিই চমৎকার ব্যাখা।

রাতের কীর্তনখোলার সৌন্দর্য একদমই অন্যরকম। দূর থেকে লঞ্চঘাটের আলো দেখলে মনে হয় কোন এক ভিনজগত যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। একটা সময় বরিশাল শহর ছিল নোংরা এবং অগোছালো। শহরটাকে খুব সুন্দর করে সাজিয়েছিলেন প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরণ। বরিশালের সবাই একবাক্যে বলেন যে এত উন্নতি এর আগে বরিশালে কখনোই হয় নি। দুঃখের বিষয় হচ্ছে জাতিগতভাবে আমরা প্রচণ্ড রকমের অকৃতজ্ঞ প্রকৃতির। তাই শওকত হোসেন হিরণ পরবর্তী নির্বাচনেই পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। তাঁর জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে বিরোধী দলসহ নিজ দলের কিছু রাজনীতিবিদগণও বিপক্ষে চলে গিয়েছিলেন। হিরণ পরলোকগত হয়ে অবশ্য সবকিছুর ঊর্ধে চলে গেছেন। তাঁর অন্যতম অবদান ছিল এই বরিশাল নদীবন্দরের আধুনিকায়ন।

আমরা ফিরে চললাম। পিছনে রেখে আসলাম কিছু স্মৃতি আর কিছু ইচ্ছা। হয়ত কোন এক দোল পূর্ণিমার রাতে নৌকায় চড়ে দোল উৎসবে অংশ নিব। পূর্ণিমার আলোর অবগাহনে মত্ত থাকব সারা রাত্রি। নৌকার পাটাতনে শুয়ে আকাশ দেখব আর গাইব,

কীর্তনখোলা, নদী রে আমার
এই নদীতে সাঁতার কাইটা বড় হইসি আমি
এই নদীতে আমার মায়ে কলসিতে নিসে পানি
আমার দিদিমা আইসা প্রতিদিন ভোরে
থাল-বাটি ধুইয়া গ্যাসে এই নদীর কিনারে
আজ ১০ বছর পর বিদেশ করে ফিইরা আইসা দেহি
হগলি বদলাইয়া গ্যাসে
নদী আমার যেমন ছিল তেমনই আছে
ও নদী, তেমনই আছে।

গানটা চাইম ব্যান্ডের আল-আমিন বাবু’র লেখা ও গাওয়া। আগ্রহীরা চাইলে ইউটিউব থেকে থেকে শুনে নিতে পারেন।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: