একজন কিংবদন্তীর কথা বলছিঃ ক্লাইভ লয়েড (১ম পর্ব)

মূল লেখার লিংক
প্রখ্যাত ক্রিকেট সাংবাদিক অরুনভ সেনগুপ্ত কয়েক বছর আগে ক্রিকেট সংক্রান্ত ওয়েবসাইট cricketcountry.com এ ক্লাইভ লয়েডের উপর বিশাল এক আর্টিকেল লিখেছিলেন। আর্টিকেলটির নাম Clive Lloyd: The mastermind behind West Indies’s domination of world cricket. এতে তাঁর ক্রিকেট জীবনের শুরু থেকে প্রায় সবকিছুই দারুণভাবে উঠে এসেছে। সুপাঠ্য এই লেখাটি সবার পড়ার জন্য দুই খণ্ডে অনুবাদ (ভাবানুবাদ) করার চেষ্টা করছি। মূল লেখাটি পাওয়া যাবে এখানে

ক্লাইভ হুবার্ট লয়েড এর জন্ম ৩১ আগস্ট, ১৯৪৪ সালে, ব্রিটিশ গায়ানার জর্জটাউনে। ক্রিকেটের ইতিহাসের অন্যতম ধ্বংসাত্মক ব্যাটসম্যান এবং সফলতম ক্যাপ্টেন তিনি। ১৯৭৪ সালে থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্বেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ক্রিকেটের শীর্ষস্থান দখল করেছিল এবং একচ্ছত্র আধিপত্য চালিয়েছিল। প্রথম ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটার হিসেবে তিনি ১০০ টেস্ট খেলার গৌরব অর্জন করেছিলেন। ক্রিকেট বিশ্বে আজও তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ও পছন্দনীয় ব্যক্তিত্ব!

25clive-lloyd-1

মোটেই অহিংসার পূজারী নন!

ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং তাণ্ডবের কারণে পুলিশ ডাকতে হচ্ছে-এমনটি ক্রিকেটে খুব কমই দেখা যায়। ক্লাইভ লয়েড এমনই ভয়ানক ব্যাটিং করতেন যে তাঁর ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে! ল্যাংকাশায়ারের হ্যাসলিংডেন এ স্টেডিয়ামের পাশে এক বৃদ্ধা থাকতেন। ক্রমাগত কাচ ভাঙ্গার আওয়াজ এবং মিসাইলের মত শব্দ করা বলের ভয়ে একবার তিনি স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেছিলেন! ক্লাইভ লয়েডের বিরুদ্ধে করা অভিযোগটি ছিল সম্পত্তি বিনষ্টের (Destruction of Property)!

আসলে এটা খুব অস্বাভাবিক ছিল না। ক্লাইভ লয়েড অনেক ভারী ব্যাট দিয়ে খেলতেন। ব্যাটের সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার এবং বলকে সজোরে আঘাত করায় তিনি ছিলেন অন্যদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তবে শুধু খেলার জন্যই নয় তাঁর বিরুদ্ধে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ক্যাপ্টেন্সি করারও ‘অভিযোগ’ ছিল! একদল অত্যন্ত মেধাবী কিন্তু প্রচণ্ড অধারাবাহিক এবং ক্যাজুয়াল ক্রিকেটারদের তিনি ধ্বংসাত্মক অস্ত্রে পরিণত করেছিলেন। অবশ্য তাঁর কৌশল ছিল বেশ সরল-চারজন অত্যন্ত গতিময় এবং ভয়ানক বোলার নিয়ে একের পর এক প্রতিপক্ষের উপর চড়াও হতেন। প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানকে আক্ষরিক অর্থেই ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলতেন! এর আগে পৃথিবীর কোন দলই এতটা সফল ছিল না এবং ডগলাস জারডিনের (বডি লাইন বিতর্ক) পর কোন ক্যাপ্টেনই তাঁর মতন সমালোচিত ছিলেন না!

ভাবতে অবাক লাগে কথা-বার্তা, চাল-চলন এবং স্বভাবে এত শান্ত মানুষটি ক্রিকেট মাঠে কিভাবে এতটা আক্রমণাত্মক হতেন! কে বলবে ১২ বছর বয়সে তিনি একটি মারপিট ঠেকাতে গিয়ে নিজের চোখে আঘাত পান এবং তখন থেকেই চশমা পড়তে বাধ্য হন!

তবে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপগুলো তাঁকে এখনও দেবতার মতন পূজা করে এবং তাঁর অবদান গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। জ্যামাইকার স্যাবাইনা পার্কে তিনি যেদিন ১০০ তম টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন তখনই ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ তাঁর মহত্ম্যকে সম্মান জানিয়েছিল। গায়ানা সরকার তাঁকে ‘অর্ডার অব দ্যা রোরেইমা’ পদক দিয়ে ভূষিত করেছিল। যা কিনা দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা! ক্রিকেট খেলা অবস্থাতেই তিনি হয়ে গিয়েছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান! জীবন্ত কিংবদন্তী! বোর্দা (Bourda) তে তাঁর নামে একটি ক্রিকেট স্ট্যান্ডের নামকরণ করা হয়। ত্রিনিদাদ দরকার তাঁকে দেয় চাকোনিয়া মেডাল ক্লাস ওয়ানঃ গোল্ড (Chaconia Medal Class One: Gold) পদক। শুধু তাই নয়, সুদূর আটলান্টিকের ওপারেও তাঁকে সম্মাননা জানানো হয়। ইংল্যান্ডের ল্যাংকাশায়ারের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার জন্য ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার এন্ড হাল তাঁকে দেয় সম্মানসূচক ডিগ্রী!

শুধুমাত্র নিজের ক্রিকেট বোর্ড থেকে সম্মাননা পেতেই যা একটু দেরি হয়েছিল! কেননা, দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের প্রাপ্য সম্মান, অর্থের জন্য তিনি সবসময় বোর্ডের সাথে লড়াই করতেন। মাঝে মাঝে যা তিক্ততার পর্যায়েও চলে গিয়েছিল, বিশেষ করে ক্যারি প্যাকার সিরিজের সময়ে। প্যাকার সিরিজে খেলার দায়ে ডেজমন্ড হেইন্স সহ তিন জন ক্রিকেটারের দল থেকে বাদ পড়া এবং ডেরিক মারে’র সহ-অধিনায়কের পদ কেড়ে নেয়ার প্রতিবাদে লয়েড অধিনায়কত্ব থেকে পদত্যাগ পর্যন্ত করেছিলেন! যা পরবর্তীতে দলে বিদ্রোহের সূচনা করে এবং অনেকেই খেলা বয়কট করেন। ফলে, ১৯৭৮ সালের অস্ট্রেলিয়া সফর এবং ১৯৭৮-৭৯ সালের ভারত সফরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ড দ্বিতীয় সারির দল পাঠাতে বাধ্য হয়।

যাই হোক, বিশালাকার এই মানুষটি যখন নিজের ১০০ তম টেস্ট খেললেন তখন ম্যাচ পরবর্তী অনুষ্ঠানে বোর্ড প্রেসিডেন্ট এলান রে বেশ আন্তরিকভাবে তাঁকে ধন্যবাদ জানান। তবে, সবচেয়ে দারুণ ভাষণ দিয়েছিলেন বিগ বার্ড জোয়েল গার্নার, ক্লাইভ লয়েডের অন্যতম আক্রমণভাগের অন্যতম অস্ত্র। ‘ক্লাইভ লয়েড প্রতিটি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটারের কাছে একাধারে পিতা, বড় ভাই, অভিভাবক এবং পথ প্রদর্শকের মত। আমরা সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করি কেননা তিনি নিজে নিজেকে এবং আমাদের সবাইকে সম্মান করেন। বলা হয় (ফ্রাঙ্ক) ওরেল নেতৃত্ব দিতেন অনুপ্রেরণা দিয়ে এবং (গ্যারি) সোবার্স দিতেন উদাহরণের মাধ্যমে (নিজে পারফর্ম করে)। লয়েড নেতৃত্ব দেন দুটো মিলিয়ে!’

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ফাস্ট বোলার এবং লয়েডের যখন অভিষেক হয় সে আমলের সতীর্থ খেলোয়াড় ওয়েস হল বলেছেন, সারা বিশ্বের সকল ক্রিকেটার এবং ক্রিকেট সংক্রান্ত সকল সাংবাদিক তাঁকে শ্রদ্ধা করে। এক যুগ ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে একজন মহাশক্তিধরের মতন সে শাসন করেছে!

জ্যামাইকার সানডে পত্রিকায় দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাইকেল ম্যানলি লিখেছিলেন, ক্লাইভ লয়েডের মধ্যে অধিনায়কত্ব একটি সহজাত বৈশিষ্ট্য। তিনি এমন একজন গ্রেট খেলোয়াড় যে অন্যদের কাছ থেকে অনায়াসেই প্রশ্নাতীত আনুগত্য আদায় করে নেন। সময়ের সাথে সাথে তিনি বিশালতায়, পরিপক্বতায় এবং ক্রিকেটীয় জ্ঞানে আরও সমৃদ্ধ হয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বকে তুলনা দেয়া যায় রেনেসাঁ আমলের মহাপরাক্রমশালী কোন সম্রাটের সাথে! শৃঙ্খলা, সততা, নৈপুণ্য, আত্মমর্যাদা এবং শিষ্টাচারসহ সকল ক্ষেত্রেই দারুণ অবদান রেখে তিনি অন্যদের জন্য অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেন!
এর চেয়ে ভালভাবে ক্লাইভ লয়েডের বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয়!

শুরুর কথা!

ব্যাপারটি একটু অদ্ভুত যে ক্লাইভ লয়েড এসেছেন গায়ানা থেকে! দক্ষিণ আমেরিকার এই দ্বীপ দেশটি প্রতিবেশী অন্যান্য দ্বীপগুলোর মতন ‘ক্যারিবিয়ান’ পরিচয়ে পরিচিত ছিল না। অন্যান্যদের সাথে বাণিজ্য এবং ক্রিকেটে কিছুটা মিল থাকলেও সাংস্কৃতিক তেমন কোন মিলই ছিল না। আর এই দেশ থেকেই কি না ক্লাইভ লয়েডের উত্থান, যে পুরো ক্যারিবিয়ান অঞ্চলকে এমন এক শক্তিতে রূপান্তর করলেন, যা আগে কখনো দেখা যায় নি!

ক্লাইভের ক্রিকেট ব্যাকগ্রাউন্ড তেমন আহামরি কিছু ছিল না। তাঁর বাবা ছিলেন স্থানীয় একজন ডাক্তারের গাড়িচালক, যার ক্রিকেটে তেমন কোন আগ্রহ ছিল না। ছেলেকে বড় করে নতুন এভার্টন উইক্স বানাবার চিন্তা তার ছিল না, তা বলাই বাহুল্য! তবে, ক্লাইভের মা ক্রিকেটের ভক্ত ছিলেন। শুধু তাই নয়, খালা ছিলেন মিসেস গিবস, যিনি ল্যান্স গিবস এর মা। ল্যান্স গিবসকে বলা হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের সর্বকালের অন্যতম সেরা স্পিনার।

গিবস বয়সে ক্লাইভ লয়েডের চেয়ে ১০ বছরের বড় ছিল। ক্লাইভ যখন মাঠে যাওয়া শুরু করেছেন এবং একটি একটু করে খেলাটা বোঝার চেষ্টা করছেন, ততদিনে প্রতিশ্রুতিশীল ক্রিকেটার হিসেবে গিবস এর নাম-ডাক শুরু হয়ে গিয়েছিল। বয়সের পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তাঁরা দুজনে ক্রিকেট নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করতেন। এছাড়া, ক্লাইভ লয়েডের বাড়ি থেকে কয়েক রাস্তা পরেই সাবেক ক্যারিবিয়ান ব্যাটসম্যান রবার্ট ক্রিস্টিয়ানি থাকতেন। লয়েড যখন টিনেজার হিসেবে ক্রিকেট খেলা শুরু করেন, ক্রিস্টিয়ানি তখন রেডিওতে জনপ্রিয় নাম! ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের খেলা পাগল হাজার হাজার মানুষ তাঁর কণ্ঠে খেলার ধারাভাষ্য শুনত।

সে সময় গায়ানার বেশ কয়েকজন নামকরা ক্রিকেটার বাড়ির কাছের ডেমেরারা ক্রিকেট ক্লাবের (Demerara Cricket Club) হয়ে খেলতেন। বন্ধুদের সাথে ক্লাইভ লয়েডের দিনের বেশিরভাগ সময় ক্লাবের আশপাশেই কাটত। হয়ত বেড়ার ফাঁক দিয়ে খেলা দেখতেন কিংবা কেউ চার-ছয় মারলে সেই বলের পেছনে ছুটে যেতেন! ওয়েস্ট ইন্ডিজের অন্যান্য কিশোরদের মতন আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামের বাইরের গাছে চড়ে সারাদিন পার করে দিতেন। সাথে করে খাবারও নিয়ে নিতেন, ফলে গাছ থেকে নামার কোন প্রয়োজনই হত না!

কৈশোরের শুরুতেই লয়েড গায়ে-গতরে যুবকদের মতন বেড়ে ওঠেন। বাম হাতে ব্যাট করতে এবং বলকে মারতে পারতেন প্রচণ্ড গায়ের জোরে! ব্যাটিং এর টেকনিকও মন্দ ছিল না। পা দু’টো বেশ লম্বা হবার কারণে দ্রুতগতিতে দৌড়তে পারতেন। এমনকি নামী-দামী অনেক দৌড়বিদও তাঁর সাথে পাল্লা দিয়ে পারত না! ক্লাইভের বাসার পাশের এক টায়ার সারানোর দোকানে কিছু প্রায় অচল শরীর চর্চার যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ছিল। কিশোর লয়েড ওসব দিয়েই শরীর চর্চা করতেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ফিটনেসের ব্যাপারে দারুণ খুঁতখুঁতে ছিলেন।

১৫ বছর বয়সে তাঁর বাবার অকাল মৃত্যু হয়। পড়াশুনায় ভাল এবং বৃত্তি থাকা সত্ত্বেও পরিবারের বড় সন্তান হবার কারণে তাঁকে কাজ করা শুরু করতে হয়। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় জর্জটাউন হাসপাতালের ক্লার্কের চাকুরী পান, যদিও বেতন খুবই অল্প ছিল। অবশ্য, কাজের চাপ বেশি না থাকার কারণে তাঁর পক্ষে ক্রিকেটে বেশি সময় দেয়া সম্ভব হয়।

প্রথমবার যখন বোর্দার ডেমেরারা ক্লাবের হয়ে ব্যাট করতে নামে মাত্র ১২ রান করেন। স্থানীয় ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা বলেই দেন ক্লাইভ লয়েডের ক্রিকেটার হবার মতন প্রতিভা নেই। ক্লাইভ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পান যখন শোনেন তাঁর ছোট বেলার নায়ক রবার্ট ক্রিস্টিয়ানি-ও নেতিবাচক মনোভাবকারীদের দলে রয়েছেন। যাই হোক, সৌভাগ্যবশতঃ ক্লাবের দলনায়ক ফ্রেড উইলিস তাঁর উপর বিশ্বাস হারান নি। উলটো, লয়েডের অর্থনৈতিক দীনতার কথা জানতেন বলে ঘোষণা দেন সেঞ্চুরি করতে পারলে আর্থিক পুরস্কার থাকবে! ‘লোকটির হৃদয় ছিল বিশাল অট্টালিকার চেয়েও বড়’, পরবর্তীতে ক্লাইভ লয়েড তাঁর প্রথম দলনেতা সম্পর্কে এরকমই মন্তব্য করেছিলেন।

লাইম লাইটে আসা

দ্রুতই ক্লাইভ লয়েড সবার দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হলেন। এমনকি অস্ট্রেলিয়া যখন গায়ানাতে খেলতে এল তখন তিনি রিজার্ভ ফিল্ডার হিসেবে দলে ছিলেন। উল্লেখ্য, একবার তিনি পানি পানের বিরতির সময় দলের ম্যানেজার ফ্রাঙ্ক ওরেলের নির্দেশনা মাঠের ভেতরে থাকা অধিনায়ক গ্যারি সোবার্সের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিশোর ক্লাইভের এটি ছিল অন্যতম সুখস্মৃতি!

যাই হোক, তাঁর প্রথম শ্রেণি ক্যারিয়ারের শুরুটা কিন্তু তেমন ভাল হয় নি। প্রথম দুই ম্যাচে বলার মত তেমন কিছু করতে পারেন নি। গায়ানার হয়ে খেলা তৃতীয় ম্যাচটি ছিল বার্বাডোজের বিরুদ্ধে। প্রথম ইনিংসে সোবার্সের চায়নাম্যান বোলিং এ বোকা বনে শূন্য রানে আউট হন। সোবার্স প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট নেবার পাশাপাশি ব্যাট করতে নেমে দ্বিশতক হাঁকান! ফলে বার্বাডোজ ৩৩২ রানের বিশাল লিড পায়। দ্বিতীয় ইনিংসে ১০৭ রান করে লয়েড কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুললেও ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত গায়ানা হেরে যায়। চারদিন পর জ্যামাইকার বিরুদ্ধে ঝকঝকে ১৯৪ রানের ইনিংস খেলেন ক্লাইভ লয়েড।

অবশ্য, প্রথম শ্রেণিতে ধারাবাহিকভাবে ভাল খেলার পরও ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড সফরে লয়েডের জায়গা হয় নি। বিভিন্ন দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বই ছিল মূল কারণ। ক্রিকেটীয় অপ-রাজনীতির শিকার হয়ে স্বল্প বয়সী লয়েড মানসিকভাবে বেশ ভেঙ্গে পড়েন। অনেক পরে তৎকালীন ক্যাপ্টেন গ্যারি সোবার্স স্বীকার করেন লয়েডের অন্তর্ভুক্তি না করাটা ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ডের অনেক বড় ভুল ছিল।

১৯৬৬-৬৭ সালের ভারত সফরে ঠিকই দলে ডাক পড়ল লয়েডের। সে সময় ম্যানেজার ফ্রাঙ্ক ওরেল বলেছিলেন, ইংল্যান্ড সফরে না থাকাটা সম্ভবত শাপে বরই হয়েছে। কেননা, কঠিন ইংলিশ কন্ডিশনে অভিষেক হবার চেয়ে ভারতের স্লো পিচে হওয়াটা অনেক শ্রেয়!

দারুণ উজ্জীবিত ক্লাইভ লয়েড জীবনের প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে পৌঁছলেন। শুধু তাই নয়, ইনফর্ম সেইমুর নার্স হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় বোম্বেতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রথম টেস্টের মূল একাদশেও জায়গা পেলেন! ম্যাচের প্রথম ইনিংসে যখন ব্যাট করতে পাঠে নামলেন, দল তখন ৮২ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে। পরবর্তী মাত্র ২ ঘণ্টায় ৮২ রানের ইনিংস খেললেন, ১৫ চার এবং একটি বিশাল ছক্কার সাহায্যে। দীর্ঘকায় হবার কারণে তাঁর স্ট্রাইডও অনেক বড় ছিল, ফলে ভাগাওয়াথ চন্দ্রশেখরের ভয়ংকর স্পিন বোলিং মোকাবেলা করতে তেমন সমস্যা হয় নি। ভারতীয় দলে আরও তিনজন বড় মাপের স্পিনার ছিলেন-সেলিম দুরানি, শ্রীনিভাস ভেঙ্কাটারাঘবন এবং বাপু নাড়কার্নি। বাম-হাতি লয়েড ব্যাট করার সময় ডান পা’টা সামনে বাড়িয়ে সবার স্পিনকে একেবারে সাধারণ মানে নামিয়ে এনেছিলেন। বোম্বে ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে জয়ের জন্য ১৯২ তাড়া করে খুব সহজেই ৬ উইকেটে জেতে ক্যারিবিয়রা। লয়েড অপরাজিত থাকেন ৭৮ রানে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা হল দুর্দান্ত!

image_20130831104537

প্রথম শতক পেতেও খুব বেশি দেরী করতে হল না। পোর্ট অব স্পেনে ১৯৬৮ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলা ম্যাচে প্রথম শতক হাঁকালেন! বার্বাডোজে হওয়া সিরিজের তৃতীয় টেস্টে আবার শতক! এবারের শতকটি হল মাত্র ১৫৭ মিনিটে, ১৪ টি চার এবং এক ছক্কায় সাজানো।

নামকরা সাংবাদিক ব্রায়ান ক্লোস লিখলেন, ‘পরিণত হবার পর এই লয়েড ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ব্যাটিং এর অন্যতম স্তম্ভ হবে!’

তিক্ত অভিজ্ঞতা!

সাফল্যের পাশাপাশি লয়েডের জন্য বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাও অপেক্ষা করছিল তা কে জানত! ইংল্যান্ডের সাথে চলমান সিরিজের শেষ ম্যাচে গ্যারি সোবার্স ২য় ইনিংসে ৯২/২ থাকা অবস্থাতেই ডিক্লেয়ার করে দেন, ইংল্যান্ডের লক্ষ্য দাঁড়ায় ২১৫ রান। কুইন্স পার্ক ওভালে সেটি ভাল লক্ষ্য হলেও শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস্যভাবে ইংল্যান্ড সেই ম্যাচ জিতে নেয়!! তরুণ লয়েড এই ম্যাচ থেকে ভাল একটি শিক্ষা পান। পরবর্তীতে দলনেতা হবার পর ১৯৭৬ সালে প্রায় একইরকম ভুল (আগেই ডিক্লেয়ার করে দেয়া) করেন। এই দু’টি ঘটনার শিক্ষাই একসময় তাঁকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা অধিনায়ক হতে সাহায্য করেছিল!

ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের কাছে সিরিজ হেরে যায়। সোবার্সের অতি সাহসী সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আরও কিছু ব্যাপার লয়েডের চোখে পড়ে। তাঁর চোখে দলের বেশিরভাগ সদস্যের খেলার প্রতি উদাসীনতা, ট্রেনিং এর ব্যাপারে অনীহা এবং শৃঙ্খলার অভাব-ই ছিল সিরিজ পরাজয়ের মূল কারণ। এই সিরিজ থেকে নেয়া শিক্ষা কাজে লাগিয়েই পরবর্তীতে প্রায় দেড় যুগ ধরে তিনি ক্রিকেট বিশ্ব শাসন করেছেন!

ফর্মহীনতা

১৯৭০ সালে ল্যাংকাশায়ারের হয়ে জন প্লেয়ারস্‌ লীগ এবং জিলেট কাপ জিতলেও আন্তর্জাতিক ম্যাচে লয়েডের ফর্ম তেমন ভাল যাচ্ছিল না। সত্যি কথা বলতে কি, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলগতভাবেও বেশ খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এসময় তারা ভারতের কাছে নিজের ঘরে লজ্জাজনকভাবে হেরে যায়। শুধু তাই নয়, অপেক্ষাকৃত বেশ দুর্বল নিউজিল্যান্ড দলকেও হারাতে ব্যর্থ হয়।

বিশ্ব একাদশের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এডেলাইডে ম্যাচ চলাকালীন এশলে ম্যালেটের ক্যাচ নিতে গিয়ে ক্লাইভ লয়েড মেরুদণ্ডে ব্যথা পান। এই ইনজুরি তাঁকে বেশ কিছুদিন ক্রিকেট থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। এরপর নিউজিল্যান্ডের সাথে শেষ টেস্টে দুই ইনিংসে মাত্র ১৮ ও ৫ করার পর সফররত অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পরের সিরিজে দল থেকে বাদ পড়েন।

দল থেকে বাদ পড়ার রাগ ঝাড়তেই কি না জিলেট কাপ ফাইনালে ল্যাংকাশায়ারের হয়ে ১২৬ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন এবং দলকে শিরোপা জিততে সহায়তা করেন। কাউন্টির খেলা শেষ হতে না হতেই অস্ট্রেলিয়ার ক্লাব ক্রিকেট খেলার জন্য প্রস্তাব পান।

প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ!

এরপর যেসব ঘটনা ঘটল তা থেকে কিছুটা আন্দাজ পাওয়া যায় ঐ সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড কতটা খামখেয়ালীপূর্ণ ছিল। ইনজুরির কারণে তৎকালীন ক্যারিবিয়ান দলের ক্যাপ্টেন গ্যারি সোবার্স অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে খেলতে পারলেন না, স্বভাবতই কে ক্যাপ্টেন হবে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেল। সবচেয়ে বেশি যার নাম ঘুরে ফিরে এলো তিনি হলেন ক্লাইভ লয়েড, যিনি কিনা দলেই নেই! বোর্ড থেকে লয়েডকে দ্রুত দেশে ফেরার জন্য বলা হল, কেননা সে সময় তিনি অস্ট্রেলিয়ায় ক্লাব ক্রিকেট খেলছেন!

গায়ানার প্রধানমন্ত্রী ফোর্বস বার্নহাম, যিনি লয়েডের ভীষণ ভক্ত ছিলেন, তিনি নিজে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে ফোন দিলেন যেন ক্লাব কমিটি ক্লাইভ লয়েডকে চুক্তি থেকে অব্যাহতি দেয়! শুধু তাই নয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে ম্যানচেস্টারে পৌঁছানোর পর সেখানকার গায়ানিজ হাইকমিশন থেকে লয়েডকে জানানো হয় যে ইংল্যান্ড থেকে দেশের ফেরার সকল খরচ সরকার বহন করবে! বিস্ময়াভূত লয়েড রওনা হতে মোটেই দেরী করলেন না।

অবশ্য দেশে ফেরার পর দলের ম্যানেজার ওয়েস হল তাঁকে আস্তে করে ডেকে জানিয়ে দেন যে রোহান কানাইলালকে সাময়িকভাবে ক্যাপ্টেন করা হয়েছে। অসম্ভব প্রতিভাবান এই ব্যাটসম্যান তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে চলে এসেছেন বলে বোর্ড থেকে এটা সামান্য সৌজন্য উপহার! তবে, স্থায়ীভাবে ক্যাপ্টেন শেষ পর্যন্ত লয়েডই হবেন।

যাই হোক, বার্বাডোজ টেস্টে লয়েড দ্বাদশ খেলোয়াড় হিসেবে থাকলেন। এরপর, ত্রিনিদাদের ম্যাচে দলে অন্তর্ভূক্তি হলেও রান পেলেন না, মাত্র ২০ ও ১৫ করলেন। এমনকি তাঁর বাজে ফর্মের জন্য নিজের দেশের দর্শকও গ্যালারি থেকে দুয়ো ধ্বনি দিচ্ছিল!

চতুর্থ টেস্ট খেলা হল গায়ানাতে। প্রথমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ব্যাটিং শুরু করল। দ্বিতীয় উইকেটের পতন হবার পর ব্যাট হাতে ক্লাইভ লয়েড মাঠে নামলেন। এরপর যা হল তা এক কথায়-ইতিহাস! টনি কোজিয়ারের ভাষায়, ‘প্রধানমন্ত্রী বার্নহামের উপস্থিতিতে বামহাতি এই ব্যাটসম্যান বিপক্ষ দলের উপর চড়াও হয়ে শুধু নিজেকেই দলে প্রতিষ্ঠিত করলেন না, বরং তাঁর মধ্যে টেস্ট খেলোয়াড় হবার মত যোগ্যতা আছে কি না- এরকম সন্দেহও ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিলেন। ঐদিন তিনি কন্টাক্ট লেন্স ছেড়ে পুরনো চশমা পড়ে ব্যাট করতে নেমেছিলেন। লয়েড ছিলেন একেবারেই অপ্রতিরোধ্য! আক্রমণাত্মক ও আত্মবিশ্বাসের সাথে ২৪ টি চার ও ১ টি ছয়ের সাহায্যে ১৭৮ রান করলেন!

শেষ পর্যন্ত অবশ্য অস্ট্রেলিয়াই ম্যাচটি জিতে যায়! তবে, ব্যক্তিগতভাবে লয়েড এরপর থেকেই নিজের সেরা খেলাটা উপহার দেয়া শুরু করেন। পরের ইংল্যান্ড সিরিজে ৩ টেস্টে করেন ৩১৮ রান, যার মধ্যে ওভালে করা ১৩২ এবং এজব্যাস্টনের ৯৪ রানের ইনিংস ছিল। অবশেষে, ১৯৭৪-৭৫ মৌসুমে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল যখন ভারত সফরে গেল, প্রথমবারের মতন দলের অধিপতি হলেন ক্লাইভ হুবার্ট লয়েড!

অধিনায়কত্ব গ্রহণ

‘অধিনায়কত্ব পাবার খবরটি নিশ্চিত হবার পর আমার অবস্থা ছিল যাকে বলে এক কথায়… মাথায় বাজ পড়ার মত!’-সেদিনের কথা এভাবেই স্মরণ করেন তিনি। তবে, তিনি যতই বিনয় দেখান না কেন-অধিনায়ক হবার জন্য তাঁর মতন প্রস্তুত ও যোগ্য মানুষ কমই ছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে-সম্ভবত ফ্রাংক ওরেলের পর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে নেতৃত্ব দেবার ব্যাপারে আর কেউ লয়েডের মত এতটা চিন্তা-ভাবনা করেন নি।

তাঁর নিজের ভাষায়-‘কিছুটা ধাতস্থ হবার পর আমি উপলব্ধি করতে পারলাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ড সম্ভবত দীর্ঘমেয়াদী নেতৃত্ব দেবার জন্য আমার কথা ভেবে রেখেছে। তাই, কাজটাকে যথাসম্ভব সিরিয়াসলি নিলাম এবং শুরুতেই বেশ কিছু লক্ষ্য স্থির করলাম। অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা…আমি সবাইকে আশ্বস্ত করলাম দলের সবার অবস্থান ও গুরুত্ব বাড়বে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়গণ যেন প্রাপ্য শ্রদ্ধা ও সম্মান পান-এ ব্যাপারে কাজ শুরু করলাম।’

image_20130831105243

অধিনায়ক হিসেবে ক্লাইভ লয়েডের শুরুটা হল চমকপ্রদ, ভারতের মাটিতে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিরিজ জয়ের মাধ্যমে! ব্যাঙ্গালোরের প্রথম টেস্টে লয়েড ১৬৩ করলেন, দলও ১-০ তে এগিয়ে গেল। দিল্লীতে তরুণ খেলোয়াড় ভিভ রিচার্ড নিজস্ব দ্বিতীয় ম্যাচেই ১৯২ রানের অনবদ্য ইনিংস খেললেন, লয়েডও খেললেন ৭১ রানের ধৈর্য্যশীল ইনিংস। ফলাফলঃ ২-০ ব্যবধান! ভারত পরের কলকাতা ও মাদ্রাজের টেস্ট জিতে দারুণভাবে সিরিজে ফিরে এলো। সিরিজ নির্ধারণী বোম্বের ম্যাচে ক্লাইভ লয়েড নিজের ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ইনিংসটি খেললেন। প্রায় ৭ ঘণ্টা ব্যাট করে অপরাজিত রইলেন ২৪২ রানে, সত্যিকারের ক্যাপ্টেন’স নক! ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ জিতল ৩-২ ব্যবধানে।

Advertisements

One Trackback to “একজন কিংবদন্তীর কথা বলছিঃ ক্লাইভ লয়েড (১ম পর্ব)”

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: