মার্শাল টিটোর সমাধিতে

মূল লেখার লিংক

“কমরেড স্টালিন গত পাঁচ মাসে আপনার পাঠানো বেশ কয়েকজন আততায়ী আমাদের হাতে ধরা পড়েছে। আমাকে মারবার জন্যে আপনি হয়তো এমন আরও অনেককে পাঠাতেই থাকেবন। কিন্তু জেনে রাখবেন আপনাকে খতম করার জন্যে কিন্তু আমার একজনকেই মস্কোতে পাঠাবার প্রয়োজন পরবে। সুতরাং আপনিই ভেবে দেখুন আপনার পরবর্তী কর্মপন্থা”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর যুদ্ধ জয়ের দীপ্তিতে প্রদীপ্ত, অহংকারী এবং আগ্রাসী রাষ্ট্রনায়ক স্টালিনকে যেখানে সমঝে চলতেন ইঙ্গ-মার্কিন রাষ্ট্রপতিরাও, সেখানে স্টালিনের মুখের উপর এভাবে জবাব ছুঁড়ে দিতে পারতেন একজনই, তিনি যুগোস্লাভিয়ার তৎকালীন দাপুটে রাষ্ট্রনায়ক মার্শাল ইয়সেপ ব্রজ টিটো।এখনকার ক্রোয়েশিয়া দেশটির রাজধানী জাগরেব থেকে এক ঘণ্টা দূরত্বে এক শান্ত নিরিবিলি গ্রাম কুম্রভেৎচ। এই গ্রামেই এক হতদরিদ্র পরিবারে জন্মান টিটো। টিটোর বাবা ক্রোয়াট, অন্যদিকে মা স্লোভেনিয়ান। যদিও টিটো, টিটো নামেই সর্বজনবিদিত কিন্তু এই টিটো নামটি কিন্তু এসেছে অনেক পরে। এ নিয়ে অবশ্য কিছুটা মতভেদও আছে। কেও কেও বলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টিটো যখন ছিলেন পার্টিজান দলগুলোর নেতৃত্বে, তখনই তার নাম হয়ে যায় টিটো। কারণটা নাকি হল টিটোর নির্দেশগুলো হতো খুবই সংক্ষিপ্ত এবং গোছান। স্লাভিক ভাষায় ‘টি’ শব্দের অর্থ ‘তুমি’ আর ‘টো’ শব্দের অর্থ ‘করো’। অর্থাৎ ‘তুমি করো’। টিটো নাকি এভাবেই নির্দেশ দিতেন, সবার মাঝে যুদ্ধের সকল কাজ ভাগ করে দিয়ে সুনিপুণ ভাবে চালনা করতেন নিজের গেরিলা দল। আবার অনেকে বলেন টিটো নামটি নাকি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ভিনদেশি কিছু সহযোদ্ধার দেয়া, যার অর্থটি নাকি ছিল “সৈনিক কাকা”। তবে কারণটি যাই হোকনা কেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর “ইয়সেপ ব্রজ টিটো” কে টিটো নামেই সারা বিশ্বের মানুষ চিনে নেয়, পরের প্রায় অর্ধ-শতাব্দী জুড়ে যুগোস্লাভিয়া আর টিটো এ দুটি নাম যেন হয়ে যায় সমার্থক।

সোফিয়া লরেন অভিনীত ‘সানফ্লাওয়ার” ছবিতে একটি দৃশ্যটি ছিল এমন যেখানে যুদ্ধের ক্ষতচিহ্নের উপর দাঁড়িয়ে থাকা দিগন্ত বিস্তৃত সূর্যমুখী ক্ষেতে নায়িকা তার স্বামীর স্মৃতি খুঁজে ফেরে। বেলগ্রেড বিমানবন্দরে নেমে মূল শহরে যাবার সময় মনে হচ্ছিলো এই যেন সেই সানফ্লাওয়ার সিনেমার শুটিং স্পট। ঠিক তেমনই ঢেউ খেলানো মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সূর্যমুখীর ক্ষেত, চারিদিকে কেবলই চোখ ঝলসানো হলদে আভা। গ্রীষ্মের সেই পড়ন্ত বিকেলে সূর্যমুখীর ঘ্রাণ বয়ে আনা মিষ্টি প্রশান্তিকর সমীরণে ভরে আছে চারপাশটা।

আমি এসে উঠেছি বেলগ্রেডের “জেলেনি ভেনাক” নামক জায়গায়, এটি একেবারে বেলগ্রেডের প্রাণকেন্দ্রে। চারধারে সব গমগমে বিপণি বিতান আর শহুরে স্বচ্ছলদের পদভারে মুখরিত এ এলাকাটি। হোটেলে এসেই ঠিক করেছিলাম পরদিন সকালে প্রথমেই যাব টিটোর সমাধিতে। হোটেলের ম্যানেজার ছেলেটির কাছ থেকে সেখানে যাবার বাসের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে পরদিন সকালে যখন নির্দিষ্ট বাসষ্টেশন থেকে বাসে উঠতে গেলাম তখন পড়তে হল এক বিপত্তিতে। আগের দিন বিমানবন্দর থেকে মূল শহরে আসার সময় যে ধরণের বাসে চড়েছিলাম, এই বাসটিও হুবহু তেমনই। তো আগের দিন কিন্তু বাসে চেপেই বাস চালকের কাছ থেকে টিকেট কিনেছিলাম। বাস চালকের ডান দিকেই থাকে এক টিকেট মেশিন, তাকে টাকা দিলে সে বোতাম টিপে বের করে দেয় টিকেট। তাই সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবারও আমি বাসে উঠেই বাসের চালককে খুচরো পয়সা দিয়ে অনুরোধ করলাম আমাকে টিকেটখানা বের করে দিতে। চালক আমাকে আমার দুর্বোধ স্লাভিক ভাষায় কি যেন বললেন। যতটুকু বুঝলাম তিনি বলছেন টিকেট লাগবেনা, ভেতরে গিয়ে বসতে পারো। ভেতরেতো গিয়ে বসলাম, কিন্তু এদিকে মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে এই বাস চালকের অদ্ভুত আচরণটি। পূর্ব ইউরোপে আমার অতীতের কিছু অভিজ্ঞতা থেকে জানি এ ধরণের গণপরিবহণে মাঝে মাঝেই টিকেট চেকাররা ওঠে এবং কোনও বিদেশী যদি নিয়ম না জানা বা অন্য কোনও কারণে ভুল করেও টিকেট না কাটে তবে তাকে চড়া অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়। ভাষাগত সমস্যার জন্যে সেসব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীর আর কোনও উপায় থাকেনা। কয়েক স্টপেজ পরে এই বাসটি থেকে নেমে আমার আরেকটি বাসে করে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে যাবার কথা। তাজ্জব ব্যাপার হল সেই দ্বিতীয় বাসটিতে উঠেও একই ঘটনার মুখোমুখি হলাম। এখানেও সেই বাস চালক আমাকে টিকেট না দিয়ে পেছনে বসতে ইশারা করলো। সে দিনটি ছিল শনিবার। তাই একবার ভাবছিলাম, এমন নয়তো যে শনিবারের ছুটির দিনে এ শহরের বাসগুলোতে বিনা ভাড়ায় ভ্রমণ করা যায়? আবার ভাবছিলাম নাকি বাসের ভেতরের সেই টিকেট কাটবার যন্ত্রটিই নষ্ট? তাই বা কি করে হয়? একটি বাসে না হয় নষ্ট হতে পারে, কিন্তু দু’দুটি বাসেই সেই টিকেট কাটবার যন্ত্র নষ্ট সে তো হতে পারেনা। কিছু একটা গড়বড় আছেই এর মধ্যে। আমার এই ভাবনার মাঝেই দেখলাম বাসটি থামতে যাচ্ছে পরের ছাউনিতে, যার পাশেই এক ছোট্ট মুদি দোকান। চট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম অযথা ঝুঁকি না নিয়ে নেমে যাব এখানে। দেখি ওই মুদি দোকানে কাওকে জিজ্ঞাসা করে ব্যাপারটা কি। সেই মুদি দোকানটি চালান এক বৃদ্ধা। আমি তাকে আকারে ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করলাম এই যে সামনে দিয়ে যে বাসটি চলে গেল এর টিকেট কাটবো কোথা থেকে? বৃদ্ধা বুঝতে পেলেন আমার সমস্যাটি, দোকান থেকে বেড়িয়ে তিনি রাস্তা থেকে বগলদাবা করে নিয়ে এলেন সে পাড়ারই আরেক বুড়োকে যিনি অল্প বিস্তর ইংরেজি জানেন। তো সেই বুড়োর কাছ থেকেই জানলাম ভেতরের মোদ্দা কথাটি। বেলগ্রেড শহরের ভেতরে যেই বাসগুলো চলে সেগুলোতে নাকি চালকের কাছ থেকে টিকেট কেনা যায়না। টিকেট কিনতে হয় এই মুদি দোকানের মতো দোকানগুলো থেকে। তারপর বাসে উঠে বাসের ভেতরে রাখা আরেকটি যন্ত্রে সেই টিকেটটি স্ক্যান করাতে হয়। অতঃপর সেই বৃদ্ধার দোকান থেকে পুরো দিনের জন্যে ‘ডে পাস” কিনে বৃদ্ধাকে অসংখ্য “কোয়ালা” অর্থাৎ ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে পড়লাম পরের বাসটিতে।

“সাভস্কি ভেনাক” বেলগ্রেডের এক অভিজাত এলাকার নাম। চওড়া রাস্তার দু’ধারে ঘন পাইন আর চেস্টনাট গাছের পাতা যেন ঢেকে রেখেছে পুরো রাজপথটিকে। এ এলাকার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল জীবনের শেষ ক’টা বছর টিটো কাটিয়ে গেছেন এই পাড়াতেই। শেষ দিকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ টিটো আর দানিয়ুবের পাড়ে নিউ ইয়র্কের জাতিসংঘ ভবনের আদলে গড়া পার্টি সদর-দফতর ভবন থেকে শাসন কাজ চালাতেন না। বরং এখানেই এক বাড়িতে এক ভারী ওক কাঠের টেবিলের পাশে উঁচু হেলানের আয়েসি এক চেয়ারে বসে চোখ বুলাতেন সরকারি ফাইলগুলোতে।

বাস আমাকে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো টিটোর সেই বাড়িটির দোরগোড়ায়। যদিও সেখানে নেমেই একটু দ্বিধায় পড়তে হয়। কারণ মূল সড়ক থেকে ভেতরের বাড়ির প্রায় কিছুই দৃষ্টিগোচর হয়না। তার কারণও আছে। ভেতরে ঢুকেই আসলে চোখে পরে বার্চ আর পাইনের বনে ঢাকা এক ছোটখাটো টিলা। তার মাঝ দিয়েই বানানো হয়েছে ইট বেছানো দুটি বাঁধানো পথ, যেটি গিয়ে সোজা থেমেছে পাহাড়ের একেবারে চুড়োয়। আর মূল বাড়িটিও সেই চুড়োতেই। এই বাঁধানো সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠবার সময় অবশ্য শুধু এই অমরাবতীর অপরূপ সুধাই চোখে পড়েনা, আরও চোখে পরে সেই পাহাড়ের হেথা সেথায় ইতস্তত ছড়ানো নানা শিল্পীর গড়া শিল্পকর্ম। নিজ দেশ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রখ্যাত কিছু শিল্পীর গড়া ভাস্কর্য টিটো সংগ্রহ করে নিয়ে এসেছিলেন নিজের এই বাড়িতে রাখবেন বলে। গাঢ় সবুজ ঘাসে ঢাকা সেই পাহাড়ে আরও আছে খোদ টিটোরও বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য, দেখলাম একটু দূরে মাটিতে রাখা সোনালি ফলকে লেখা শিল্পীর নাম “আন্তুন অগাসতিঙ্কিক”। বলা বাহুল্য টিটোর যেই ভাস্কর্যটির মতোই অবিকল আরেকটি ভাস্কর্য কিন্তু দেখেছিলাম বসনিয়ার সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে। আসলে পঞ্চাশের দশকে একই ভঙ্গিমার টিটোর এমন বেশ কিছু প্রতিমূর্তি গড়ে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো পুরো যুগোস্লাভিয়ায়।


ছবিঃ টিটোর সমাধি ভবন সংলগ্ন উদ্যানের কিছু ভাস্কর্য

টিটোর এই বাড়িটির পোশাকি নাম “ফুল বাড়ি”। কারণ নিজে ফুল ভালবাসতেন বলে এই বাড়ির পুরো আঙিনা জুড়েই লাগানো হয়েছিলো অসংখ্য গোলাপ আর টিউলিপের চারা। মূল বাড়ির সামনে এক গোলাকার ফোয়ারা পেরিয়ে কাঁচের ভারী দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পরে শ্বেত মর্মর পাথরে বাঁধানো টিটোর সমাধিটি। টিটোর মৃত্যুর পর তার এই প্রিয় বাড়ির ভেতরেই তাকে সমাহিত করা হয়। কিছুটা পরিবর্তন অবশ্য আনা হয় ভেতরের অঙ্গসজ্জায়। এই যেমন সমাধির উপরের ছাঁদে লাগানো হয় স্বচ্ছ কাঁচ, যাতে দিনের বেশির ভাগ সময় সূর্যের প্রাকৃতিক আলোয় আলোকিত থাকে পুরো ঘরটি।


ছবিঃ টিটোর সমাধি

এই সমাধির ডান দিকের দেয়ালে আলোকচিত্রের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে টিটোর সৎকার কাজের দিনে সমবেত জনতা এবং বিশ্বনেতৃবৃন্দের ছবি। বর্তমান স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুব্লিয়ানায় মৃত্যুবরণ করার পর টিটর মরদেহটি রাজধানী বেলগ্রেডে নিয়ে আসা হয় তার অতি প্রিয় সেই নীল রঙা রেলগাড়িটিতে চাপিয়ে, যেটিতে করে তিনি ঘুরে দেখতেন সারা দেশ। হাজার হাজার মানুষ সেদিন এই রেলপথের দুধারে দাঁড়িয়ে শেষ বিদায় জানিয়েছিল তাদের এই নেতাকে। টিটোর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানে ১২৭ টি দেশের মোট ২০৯ জন প্রতিনিধি অংশ নিয়েছিলেন। সে অনুষ্ঠানের বিভিন্ন আলোকচিত্রের পাশেই এক বিশাল ম্যাপে দেখানো হয়েছে কোন কোন দেশ থেকে প্রতিনিধিরা এসেছিলেন সেদিন। বাংলাদেশ থেকে জিয়াউর রহমান গিয়েছিলেন টিটোর এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। জোট-নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতা হওয়ায় সেই স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে টিটোর বেশ গ্রহণযোগ্য অবস্থান ছিল দু’ব্লকেই। সেই ম্যাপে খেয়াল করে দেখলাম যে দেশগুলো থেকে কেওই যাননি সেসব দেশের মধ্যে ছিল ভুটান, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের কয়েকটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র এবং যুগোস্লাভিয়ার প্রতিবেশী দেশ আলবেনিয়া। আলবেনিয়া সমাজতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও টিটোর যুগোস্লাভিয়ার সাথে সম্পর্কটা তেমন ভালো ছিলনা। আলবেনিয়ার সে সময়ের নেতা এনভার হোজ্জা ছিলেন কট্টর স্টালিনপন্থী, টিটোর স্টালিনিয় ধারা থেকে সরে ভিন্নভাবে সমজাতন্ত্রের প্রচলনকে ভালো চোখে নেননি এনভার। তাই পঞ্চাশের দশক থেকেই আলবেনিয়া-যুগোস্লাভিয়া সম্পর্কে গুরুতর ফাটল ধরে। অনেকটা একই কারণে সত্তরের দশকে গণচিনের সাথেও আলবেনিয়ার সম্পর্ক খারাপ হয়ে পরে।


ছবিঃ টিটোর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সমবেত বিশ্ব-নেতাদের একাংশ

ফিরে আসি এই সমাধি ভবনের কথায়। ওদিকে উল্টো দিকের দেয়াল জুড়ে রেখাচিত্রের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে যুগোস্লাভিয়ার নানা উত্থান-পতন আর বিবর্তনের ইতিহাস। স্লাভিক ভাষায় ‘যুগো’ শব্দের অর্থ ‘দক্ষিণ’। যুগোস্লাভিয়া অর্থাৎ ‘দক্ষিণ স্লাভিয়া’ নাম নিয়ে যে দেশটির যাত্রা শুরু হয়েছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পরই, সে দেশটি কিন্তু ধুঁকে ধুঁকে টিকে ছিল এই ২০০৬ সাল অবধি। আর তাই এই রেখাচিত্রে দেখানো হয়েছে কি করে এই দেশটির ইতিহাস প্রবাহিত হয়েছিলো তিনটি যুগসন্ধির মধ্য দিয়ে। প্রথম যুগোস্লাভিয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পরই প্যারিস চুক্তির মধ্য দিয়ে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর টিটোর নেতৃত্বে শুরু হয় দ্বিতীয় যুগোস্লাভিয়ার যাত্রা। এই দ্বিতীয় যুগোস্লাভিয়া ছিল মূলত একটি ফেডারেশন ভিত্তিক রাষ্ট্র যার অংশীদার ছিল ছটি ভিন্ন রিপাবলিক। এই ছটি রিপাবলিক হল- স্লোভেনিয়া, বসনিয়া, সার্বিয়া, ম্যাকেডনিয়া, মন্টিনিগ্রো এবং ক্রোয়েশিয়া। কসোভো আর ভয়ভদিনা ছিল সার্বিয়ার অন্তর্ভুক্ত দুটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ। টিটো যতদিন বেঁচে ছিলেন, শক্ত হাতে ধরে রেখেছিলেন এই বিশাল ফেডারেশনটিকে। তার মৃত্যুর পর থেকেই দানা বেঁধে উঠতে থাকে অসন্তোষ। বিশেষত উত্তরের রিপাবলিকগুলোর অভিযোগ ছিল তাদের আয় দক্ষিণের রিপাবলিকগুলোর মাঝে সমভাবে বণ্টন করা নিয়ে। এ ছাড়া সার্বিয়ার একচ্ছত্র আধিপত্তের ব্যাপারটি তো ছিলই। এসব কারণেই ১৯৯২ সালের মধ্যেই ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া আর বসনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসে। হারাধনের শেষ দুটি ছেলের মতো তখন রইলো বাকি সার্বিয়া আর মন্টিনিগ্রো। সার্বিয়ার ভেতরে তখনও রয়ে গিয়েছিলো কসোভো এবং ভয়ভদিনা। এই দুটি রিপাবলিক নিয়েই যে যুগোস্লাভ ফেডারেশন টিকে ছিল ২০০৬ সাল পর্যন্ত সেটিকেই সে ম্যাপে দেখানো হয়েছে তৃতীয় যুগোস্লাভিয়া হিসেবে। অবশ্য এর আগেই ১৯৯৮ সালের দিকে কসোভো এই তৃতীয় যুগোস্লাভিয়া থেকে বেরিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসে। বিপুল রক্তপাতের পর বেলগ্রেডে সেনা সদরদপ্তরে ন্যাটোর বোমাবর্ষণের মাধ্যমে যবনিকাপাত হয় সেই যুদ্ধের। বেলগ্রেডের সরকারি অফিস পাড়ায় বোমার চিহ্ন বুকে নিয়ে ভূতুড়ে বাড়ির মতো দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল সেই পরিত্যক্ত সেনা সদর দপ্তরটিও দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো। কোনও এক কারণে ভবনটিকে সংস্কার বা পুরোপুরি না ভেঙে ফেলে রাখা হয়েছে বোমাবর্ষণের পরবর্তী রূপেই। আর সেনা সদর সরিয়ে নেয়া হয়েছে পার্শ্ববর্তী আরেকটি ভবনে। যদিও আগের ভবনটি পুরোপুরিই পরিত্যক্ত তথাপি এক মিলিটারি পুলিশ অলস ভঙ্গিতে ভবনের এক কোণায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এটি পাহারা দেয়, কি পাহারা দেয় তা হয়তো একমাত্র সে নিজেই জানে। কাগজে কলমে এটি যেহেতু এখনও সামরিক বাহিনীর সম্পত্তি তাই এটি পাহারা দেয়া এবং পর্যটকদের এই ভবনের ছবি তুলতে বাঁধা দেয়াটা নাকি তাদের দায়িত্বের মধ্যে পরে।


ছবিঃ ন্যাটোর বোমাবর্ষণে ধ্বংসপ্রাপ্ত সাবেক সেনা-সদর

টিটোর কিছু ভাস্কর্যের কথা উল্লেখ করেছিলাম। মজার ব্যাপার কিন্তু হল টিটোর জন্ম যে ক্রোয়েশিয়ায় সে ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেবে টিটোর একটি প্রতিমূর্তিও আমার চোখে পড়েনি। এমনটি জাগরেবে জাতীয় থিয়েটার ভবনের সামনের রাস্তার নাম “মার্শাল টিটো” সড়ক থেকে বদলে ফেলা হয়েছে অন্য নামে। কয়েক জনের সাথে কথা বলেও মনে হয়েছিলো টিটোর প্রতি ক্রোয়েশিয়ানদের সহানুভূতি আসলে ততটা প্রবল নয়। যদিও টিটোর শাসনামলে অনেক বিষয়েই যে স্বাচ্ছন্দ্য ছিল সেটি অক্লেশে স্বীকার করেছেন সকলেই। প্রায় সকলেই আমাকে বলেছেন, ‘টিটোর সময়ে আমাদের প্রায় প্রতিটি পরিবারে একটি করে গাড়ি ছিল, ছিল থাকার ভালো বাসস্থান, ছিল সুনিশ্চিত কর্মসংস্থান। এ ছাড়া প্রতিবছর কোনও সমুদ্রতীরে অবকাশ যাপনের ব্যবস্থা তো ছিলই। প্রতিবেশী দেশগুলোতে খাবারদাবারের ব্যাপারেও যেমন অনেক অপ্রতুলতা ছিল, যুগোস্লাভিয়ায় তেমনটি ছিলনা মোটেও। এমনকি অবাক করার মতো ব্যাপার হল সেকালে কম্যুনিস্ট দেশের নাগরিকদের অন্য দেশে, এমনকি অন্য কম্যুনিস্ট দেশে ভ্রমণ করাটাও ছিল রীতিমতো গলদঘর্ম হবার মতো ব্যাপার। সেখানে টিটোর যুগোস্লাভিয়ায় এসব বিষয়ে বিধিনিষেধ ছিল অনেকটাই শিথিল। অনেকেই ঘুরতে চাইলে চলে যেত ইটালির আল্পসে, কিংবা কাজের সন্ধানে ‘গাস্ট আরবাইটার” হিসেবে জার্মানিতে”।

টিটো কেন ক্রোয়েশিয়ায় ততটা জনপ্রিয় নন, সেটি বলতে গেলে কিছুটা পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যখন টিটোর উত্থান সে সময়ে এই যুগোস্লাভ ভূখণ্ডে বিদ্যমান ছিল মূলত তিনটি দল। একটি হল ক্রোয়াট উশতাশা দল। এই উশতাশারা ছিল একাধারে ক্যাথলিক, নাৎসিপন্থী এবং ভয়াবহ নৃশংস। কথিত আছে তাদের নৃশংসতা দেখে অনেক সময় খোদ নাৎসিরাও শিউরে উঠত। যুদ্ধের সময় এরা গ্রহণ করে ‘এক-তৃতীয়াংশ’ নীতি। যার অর্থ ছিল ক্রোয়াট ভূখণ্ডে বসবাসকারী এক তৃতীয়াংশ অ-ক্রোয়াটদের হত্যা করা হবে, বাকি এক তৃতীয়াংশকে ক্যাথলিক মতে ধর্মান্তরিত করা হবে আর অবশিষ্ট এক তৃতীয়াংশকে ক্রোয়াট ভূমি ছাড়তে হবে। অন্যদিকে চেটনিক দলটি ছিল মূলত সার্বিয়ার রাজপন্থী এবং অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের একটি দল। এরা আবার ছিল সার্ব জাতীয়তাবাদী এবং নাৎসি বিরোধী। তবে সব চেয়ে শক্তিশালী দলটি ছিল পার্টিজানদের দল। পার্টিজানরা নাৎসি বিরোধী এবং এই পার্টিজান দলগুলোতে সব ভূখণ্ডের মানুষেরই অংশগ্রহন ছিল। টিটো ছিলেন এই পার্টিজান দলের নেতৃত্বে। যুদ্ধের পর যদিও টিটো সবাইকে নিয়ে এই ফেডারেশনটিকে গড়ে তলেন, তবুও বোধ করি ক্রোয়াট সমাজে উশতাশাদের একটি বিরাট প্রভাব রয়েই গিয়েছিলো। যে জন্যেই হয়তো টিটো ক্রোয়াট সমাজে ততটা সমাদৃত নন।

তবে এই বিভিন্ন রিপাবলিকের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস মোচন, কম্যুনিস্ট-বিরোধী রাজনীতি দমন কিংবা স্টালিনপন্থীদের মোকাবিলায় টিটো যে সব সময়েই খুব মসৃণ পথ গ্রহণ করেছিলেন তা নয়। বিশেষ করে পঞ্চাশের দশকে এই সংক্রান্ত বিরোধিতাগুলো টিটো দমন করেন কিছুটা নিষ্ঠুর ভাবে। হাজার হাজার বন্দীকে সে সময়ে পাঠানো হয় উত্তর পশ্চিমের ‘গোলী অটোক’ নামক এক নির্জন, রুক্ষ, বিরান দ্বীপে। যেখানে একবার পৌঁছুলে রোগে ভুগে আর মানসিক যন্ত্রণাতেই অধিকাংশ বন্দীর মৃত্যু ঘটত। সার্বিয়ায় গিয়ে শুনলাম সেই দ্বীপ সংক্রান্ত কিছু কিছু গোপনীয় ফাইল নাকি কিছু দিন আগে জনগণের সামনে প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়েছিলো, কিন্তু তারপর সরকারের একটি প্রভাবশালী অংশের চাপে সেটি ধামাচাপা দেয়া হয়। যদিও এখনকার সরকারে কম্যুনিস্ট পার্টির কোনও প্রতিনিধিনিত্ব নেই, কিন্তু লোকে বলে পার্টির অনেক নেতার পরিবারের পূর্বপুরুষরাই জড়িত ছিলেন টিটোর সেই নির্যাতন আর অপকর্মের সাথে। নিজ পরিবারের পূর্বের গ্লানি ঢাকতেই তাই অনেকে মরিয়া হয়ে ধামাচাপা দিয়ে ফেলেন সেই ফাইলগুলোকে।

এই সমাধি ভবনেরই এক কোণে সমাধিস্থ আছেন টিটোর সহধর্মিণী ইয়ভাঙ্কা, যিনি গত হয়েছেন এই গত ২০১৩ সালে। টিটোর মৃত্যুর পর তাকে অনেকটা গৃহবন্দী অবস্থাতেই কাটাতে হয়। তাই বাইরের পৃথিবী টিটোর সহধর্মিণীর কথা তেমন জানতে পারেনি, যদিও তিনি টিটোর মৃত্যুর পরও প্রায় ত্রিশ বছর বেঁচে ছিলেন। অনেকে বলেন এর পেছনেও আছে বেশ কিছু গুঢ় কারণ। টিটোর সাথে সব সময় থাকায় তিনিও সেসময়কার সরকারের অন্দরমহলের অনেক কোথা জানতেন। হয়তোবা এমন কিছু, যা পরবর্তীকালের শাসকদের জন্যেও ছিল সংবেদনশীল। তাই তাকে অনেকটা দ্বীপান্তরবাসীর মতো কাটাতে হয় জীবনের শেষ কয়েকটি দশক।

এই ভবনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে টিটোর সেই বিখ্যাত ওক কাঠের টেবিলটি। যার বাঁ পাশে আরেক ভারী কাঠের আলমারিতে শোভা পাছে টিটোর প্রিয় বইগুলো। টেবিলের পেছনের চেয়ারটির দিকে তাকালে চোখ চলে যায় ওধারের কাঁচের দরজার ওপাশের খোলা বারান্দাটির দিকে। বারান্দাটি এমন যে চাইলে দাঁড়িয়ে ছুঁয়ে দেয়া যায় পাশ ঘেঁষে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা পাইনের কচি সবুজ পাতা। প্রিয় এই বারান্দাটিতে দাঁড়িয়ে টিটো মাঝে মাঝে চোখ বুলিয়ে নিতেন নীচের সমতলে ছড়িয়ে থাকা বেলগ্রেড শহরটির প্রতি।


ছবিঃ ওক কাঠের টেবিলটি

এই সমাধি ভবনের আরেক অংশে প্রদর্শিত হচ্ছে টিটোর জীবনের নানা ভিডিও চিত্র- বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতাদের সাথে তার সাক্ষাতের কিংবা তার ভাষণের অংশ বিশেষ। আর ভিডিওচিত্রের সাদা পর্দার সামনের টেবিলটিতে সাজানো হয়েছে টিটোর সারা জীবনে পাওয়া অসংখ্য স্মারকের অংশবিশেষ। এই স্মারকগুলোর অধিকাংশই হল বিভিন্ন পাইওনিয়ার দিবসে টিটোকে উপহার দেয়া স্মারক। যুগোস্লাভ ফেডারেশনের যাত্রা শুরুর পর টিটোর সামনে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল পারস্পরিক দ্বেষ, অবিশ্বাস এর আস্থাহীনতায় ভরা বেশ কয়েকটি জাতি এবং ধর্মমতের মানুষদের এক পতাকাতলে নিয়ে আসা। সে লক্ষ্যে আরও অনেক কিছুর সাথে টিটো সোভিয়েত ইউনিয়নের কমসোমলের আদলে চালু করেন কিশোর পাইওনিয়ার দল। স্কুলের প্রথম শ্রেণীতে ঢোকা মাত্র শিশুরা এই দলের সদস্য হতে পারতো। আবার ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণী থেকে শুরু হতো আরেকটি দল, যাকে বলা হতো যুব সমাজতান্ত্রিক সঙ্ঘ। মূলত এই পাইওনিয়ার বা যুব সমজাতান্ত্রিক সঙ্ঘের মূল উদ্দেশ্য ছিল শিশু বয়স থেকেই জাতিগত পরিচয় ভুলিয়ে দিয়ে শিখিয়ে তোলা যে তারা এক অখণ্ড যুগোস্লাভ প্রজাতন্ত্রের অংশ। তাদের অনুগত্ত্য হবে শুধু দেশের প্রতি, কোনও বিশেষ জাতিগোষ্ঠীর প্রতি নয়। মাথায় জাহাজি নীল রঙের টুপি এবং গলায় গাঢ় লাল রঙের রুমাল বেঁধে প্রতি বছর এই পাইওনিয়ার এর যুব সঙ্ঘের ছেলে মেয়েরা বেলগ্রেডে যেত টিটোকে অভিবাদন জানাতে, আর তাদেরই দেয়া বিভিন্ন স্মারকে উপচে পড়ছে সেই টেবিলটি। আমার কিন্তু আগ্রহ ছিল টিটোর সেই বিখ্যাত কালো রোদচশমা আর টাইগুলো দেখার। কিন্তু সেগুলো কি এই সংগ্রশালায় নেই? সেখানকার একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম টিটোর ব্যবহৃত কিংবা জীবনদশায় উপহার হিসেবে পাওয়া প্রায় দ্রব্যই তাদের সংগ্রহে আছে। কিন্তু সে সংখ্যা এতই বিশাল যে তাদের পক্ষে একত্রে সব কিছু প্রদর্শিত করা সম্ভব নয়। মূল সংগ্রহের কিয়দয়ংশ তাই পালা করে প্রতি তিন মাস অন্তর প্রদর্শিত করা হয়। অর্থাৎ পুরো সংগ্রহটি দেখতে হলে এখানে আসতে হবে বেশ কয়েকবার এবং বেশ কয়েক বছর ধরে।


ছবিঃ টিটোকে উপহার দেয়া স্মারক

টিটোর এই সমাধি ভবন দেখে ফিরে আসার পথে ভাবছিলাম টিটোকে নিয়ে বলকানের অনেক অঞ্চলেই অনেক বিতর্ক থাকলেও কয়েকটি ব্যাপার হয়তো একেবারে অস্বীকার করা যায়না। এর একটি হল টিটো যুগোস্লাভিয়ার মানুষকে দিয়েছিলেন অর্থনৈতিক স্বস্তি, অন্যটি হল টিটো শক্ত হাতে যুগোস্লাভিয়ার অখণ্ডতা ধরে রাখার মধ্য দিয়ে এড়াতে পেড়েছিলেন জাতিগত হানাহানি এবং প্রাণনাশ। আর তাই আজও বলকানের অনেকেই কাছেই তিনি এক স্মরণীয় নাম এবং ব্যক্তিত্ব।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: