সোফিয়া থেকে দূরে কোথাও

মূল লেখার লিংক

দেশলাইয়ের বাক্সের মতো চৌকোনা পাথুরে এক ছোট্ট একতলা ঘর, তার ঠিক পেছনেই কিছুটা যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি ঘর। সবার শেষে আরেকটি ঘর, তৃতীয় ঘরটি ছাঁদ আবার দ্বিতীয় থেকে কিছুটা নিচুতে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাড়বার সাথে সাথে গৃহস্থের বাড়িতে যেমন খাপছাড়াভাবে বাড়তে থাকে ঘরের সংখ্যা, এ যেন অনেকটা তেমনই। মজার ব্যাপার হল ভিন্ন উচ্চতার এই তিনটি ঘর বানানো হয়েছিলো প্রায় চারশো বছরের ব্যবধানে। চারধারে ওক, পপলার, লিন্ডেন, পাইন আর ফার গাছের অরণ্যে ঘেরা অদ্ভুত নির্জনতায় ভরা যে এলাকায় এই ত্রি-কক্ষের ভবনটি সেটি কোনও এককালে ছিল বয়ানা নামক এক দুর্গম গ্রাম। তবে দুর্গম হলেও এই গ্রামের পাশ দিয়েই যেতে হতো রোমান সৈন্যদলের বাহিনীকে। সেকালে পশ্চিম ইউরোপ থেকে বসফরাশের তীরবর্তী বাইযানটাইন শহরে যেতে হলে বলকান পাহাড়ের মাঝের উপত্যকায় ভরা গ্রামের পথগুলো ছাড়া আর কোনও পথ ছিলনা। এ পথে চলাচল করতে সৈনিকদের এক সময় মাথায় আসে এখানে এক গির্জা স্থাপন করলে কেমন হয়? কিন্তু এই ভিন গ্রামে গির্জার ঘর না হয় তৈরি করা হল, কিন্তু ভেতরের অঙ্গসজ্জার শিল্পী জুটবে কোথায়? গ্রামবাসীর আর্থিক অবস্থাও তেমন নয় যে তারা নিজেরাই সে ব্যবস্থা করবে। অবশেষে রাজার কানে গেল সে কথা, বাইযানটাইন সম্রাট ব্যবস্থা করলেন এই দুর্গম গাঁয়ের গির্জাটিকে প্রার্থনার উপযোগী করে তুলতে। বয়ানা চার্চের এই হল আদি কথা। এরপর কেটে যায় কয়েকশো বছর, সময়ের অলঙ্ঘনীয় নিয়মেই আবছা হয়ে আসে গির্জার ভেতরের চিত্রকর্মগুলো। প্রয়োজন হয়ে পরে সেগুলো নতুন করে আঁকবার। শিল্পীর তুলির সর্বশেষ আঁচড় যে বার পরে এই গির্জার দেয়ালে সেটি সেই ষোলশ শতকের দিকে। আজকের এই গির্জায় যে চিত্রকর্মগুলো দেখা যায় সেগুলো মূলত বলা যায় তৃতীয় স্তরের তুলির আঁচড়। এর পেছনেই লুকিয়ে আছে হাজার বছর আগে আঁকা অন্য কোনও চিত্রকর্ম। কিছু কিছু জায়গায় দেয়ালের পলেস্তারা খসে গিয়ে আগের দু’স্তরের ছবিগুলো নিজেদের মাঝে মাঝে জানান দেয়। সাতশো থেকে এক হাজার বছর আগে কেমন ছিল এই পূর্ব ইউরোপের শিল্পীদের ছবি আকার ধরণ? কি ধরণের রঙেরই বা প্রাধান্য ছিল তাদের তুলির আঁচড়ে? আর এতসব কিছু জানতে হলে কি শুধু সোফিয়ায় বসে থাকলে চলে? এক সাতসকালে তাই হাজির হয়েছিলাম সোফিয়ার উপকণ্ঠের এই বয়ানা গ্রামে।

সেকালে সোফিয়ার আশেপাশে কি কোনও সমুদ্র ছিল? এ কথা বলছি কারণ এই চার্চের দেয়ালগুলোতে এক সাধু নিকোলাসের জীবনের বিভিন্ন চিত্রই আছে অন্তত গোটা বিশেক। আর এই সাধু নিকোলাস ছিলেন সমুদ্রগামী নাবিকদের কাছে পয়মন্ত এক সাধু। তাই ভাবছিলাম আশেপাশে সমুদ্র না থাকলে এখানে সাধু নিকোলাসের এতো প্রাধান্য কেন। সেকালের এই রেওয়াজও ছিল কিনা জানিনা, তবে মজার ব্যাপার হল আর সব সাধু-সন্ত, যীশু কিংবা মেরীর সাথে সাথে কিন্তু এখানে স্থান দেয়া হয়েছে সেসময়ের বুলগেরিয়ার জার আর তার সহধর্মিণীর। খুব সম্ভবত রাজার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপই তাকে স্থান দেয়া হয়েছে এই প্রার্থনা মন্দিরে। কিন্তু এই যে এতো এতো নিখুঁত চিত্রকর্ম কে বা কারা আঁকলেন এতসব? সেটি খুব ভালোভাবে জানা যায়না। কারণ হল সেকালে বলা হতো শিল্পী নিজে এই চার্চের ছবিগুলো আঁকেননা , বরং ঈশ্বর নিজেই তার হাত দিয়ে আঁকিয়ে নেন। তাই মূল কৃতিত্বটা আসলে অবিনশ্বর ঈশ্বরেরই। তবে তার পরও মানব মন তো, নিজের কাজের স্বীকৃতির জন্যে অনেকের মাঝেই হয়তো কাঙ্গালত্ত থেকেই যায়। এমনই এক শিল্পী চারকোলের কালি দিয়ে এই চার্চের দেয়ালের পলেস্তরার প্রথম প্রলেপের এক কোণে লিখে রেখেছিলেন নিজের নাম। তিনি জানতেন তার কদিন বাদেই সেই কাঁচা আস্তরণের উপর দেয়া হবে নতুন আস্তরণ, ঢেকে যাবে তার নামটি। তবুও এ যেন সেই মহাসমুদ্রে এক বোতলের ভেতর নিজের নামটি লিখে ভাসিয়ে দেবার মতোই ব্যাপার। যদিবা কোনদিন ভাসতে ভাসতে তীরে পৌছয় সেই বোতল, যদিবা হাতে পরে কারও। তবেই হয়তো উদ্ধার হতে পারে প্রেরকের নামটি। সময়ের বিস্তীর্ণ সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে একদিন কিন্তু সত্যি সত্যিই সেটি নামটি চোখে পরে একদল গবেষকের, এই তো গেল শতাব্দীর এক সময়ে। অর্থাৎ শিল্পীর নিজের নামটি লুকিয়ে লিখে রাখার প্রায় আটশ বছর পর।

পনেরো শতাব্দীর প্রথম দিকে মিলানের এক গির্জার দেয়ালে ভিঞ্ছি এঁকেছিলেন তার কালজয়ী ছবি “দ্যা লাস্ট সাপার”। ভিঞ্ছির আঁকা ছবিগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা ছিল এই ছবিটি। পোল্যান্ডের এক লবণ খনিতে বেড়াতে গিয়ে সেখানেও দেখা পেয়েছিলাম লাস্ট সাপারের, যেখানে লবণ দেয়াল খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিলো সেই চিত্রটিকে। যদিও সেটি ভিঞ্ছির আঁকা ছবিটি পুরোপুরি অনুসুরন করে বানানো নয়, তবুও অনেকটাই মিল ছিল। কিন্তু এই বয়ানা চার্চে এসে আমি আরেক লাস্ট সাপারের চিত্র খুঁজে পেলাম যেটি ভিঞ্ছির আঁকা ছবিটি থেকে পুরপুরিই ভিন্ন। বোঝাই যায় যে শিল্পী এক্ষেত্রে ভিঞ্ছির আঁকা ছবিটি থেকে অনুপ্রাণিত নন। এই ছবিটিতে যীশু উপবিষ্ট টেবিলের সর্ব বাম কোণে, আর তাকে ঘিরে রয়েছে আর বাকি বারোজন অনুসারী। টেবিলের উপরকার খাবারের মধ্যেও রয়েছে ভিন্নতা। ভিঞ্ছির আঁকা ছবিতে যেখানে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায় টেবিল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা রুটি আর পানিয়, সেখানে এই ছবিতে দেখা জায় পেঁয়াজ আর বিটের উপস্থিতি।

তবে শুধু লাস্ট সাপারই নয়, এই চার্চের প্রতিটি ঘরের দেয়াল আর ছাঁদ জুড়ে ছড়িয়ে আছে আরও অসংখ্য চিত্র, তার কোনটি যীশুর মর্ত্য থেকে কাওকে টেনে তুলে আনবার, কোনটি যীশুর জেরুজালেমে প্রবেশের, কোনটি ধর্মযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া সাধুদের মুখচ্ছবির, কোনটি মেরীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে দেবদূতদের।

বুলগেরিয়ায় খ্রিস্ট ধর্ম প্রচলন হয় অষ্টম শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ইউরোপের অন্যান্য দেশে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচলনের তুলনায় বেশ কিছুটা দেরিতেই বলা চলে এ দেশে খ্রিস্ট ধর্মের আগমন ঘটে। কাছাকাছি সময়েই খ্যাপাটে এক সাধু একদিন ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে ঈশ্বরের সন্ধানে বেছে নেন গুহাবাসী তপস্বীর জীবন। তাকে সঙ্গ দেয় রিলা পর্বতের শৃঙ্গগুলো আলতো করে ছুঁয়ে যাওয়া সারি সারি মেঘের দল আর পর্বতের বরফ গলা জল থেকে জন্ম নেয়া স্রোতস্বিনী রিলাস্কা নদী। একদিন এই সাধু জনের ইচ্ছে জাগে এইখান থেকেই তার আধ্যাত্মিক চিন্তা চেতনাকে আরও ছড়িয়ে দেবার। পাইনের বনে ঢাকা সারি সারি পর্বতের মাঝের এক চিলতে জমিতে তিনি স্থাপন করেন এক চার্চ এবং তার অনুসারীদের থাকবার জায়গা। কালক্রমে তার স্থাপন করা এই রিলা মনাস্টেরিটি হয়ে ওঠে বুলগেরিয়ানদের এক তীর্থ স্থানে। সোফিয়া থেকে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরের এই মনাস্টেরিটিই আমার পরবর্তী গন্তব্য।

রিলা মনাস্টেরির সাথে বয়ানা চার্চের একটি দৃশ্যমান পার্থক্য হল বয়ানা চার্চের ভেতরের ছবিগুলো হাজার বছরের ব্যবধানে মলিন প্রায়, রিলা মনাস্টেরির দেয়াল চিত্রগুলো কিন্তু তেমন মলিন নয়। বরং এই মনাস্টেরির চিত্রকর্মগুলো বেশ ঝকঝকে। মূল চার্চের ভেতরে তো বটেই, এমনকি বাইরের লম্বা টানা বারান্দার থাম, গম্বুজের ছাঁদ, প্রবেশদ্বারের উপরিভাগ কোথায় নেই চিত্রকর্ম? গাঢ় নীল, লাল আর হলুদের প্রাধান্যে ভরা এই চিত্রকর্মগুলো দেখে ভাবছিলাম এগুলো যদি প্রায় হাজার বছরের, নিদেনপক্ষে কয়েক শতকের পুরনোও হয় তবেও তো এতটা ঝকঝকে হবার কথা নয়। আসলে পরে জানলাম এই রিলা মনাস্টেরিটি বর্তমানে যে রূপে আছে সেটি মাত্র দেড়শ বছরের মতো পুরনো কাঠামো। এই মনাস্টেরির উপর বার বার আঘাত আসে বুলগেরিয়ায় অটোমান শাসনামলে। সে সময় বহুবারই এই মনাস্টেরিটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। প্রতিবারই অনুসারীরা আবার তিল তিল করে গড়ে তুলেছিল এই মনাস্টেরি। অনেকটা ত্রিকোণ আকৃতির এই মনাস্টেরি প্রাঙ্গণের একেবারে মাঝখানে হল মূল চার্চটি। এর চারপাশ ঘিরে রয়েছে চতুর্তল বিশিষ্ট কয়েকশ কক্ষের একটি আবাসিক ভবন।

রিলা মনাস্টেরিতে হামলাকারী অটোমান তস্করদের কথা জানতে গিয়ে শুনতে পেলাম তাদের অত্যাচারের আর নিষ্ঠুরতার কাহিনী। তেরশ শতকে যখন অটোমান সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়ে পড়ে বলকানসহ পূর্ব ইউরোপ জুড়ে, তখন এই বিশাল এলাকা নিয়ন্ত্রণের জন্যে অটোমান সম্রাটদের প্রয়োজন হয় স্থানীয় বিশ্বস্ত সৈনিকদের। সে লক্ষে অনেকটা দাস প্রথার মতোই এ অঞ্চলগুলো থেকে সদ্য কৈশোরে পড়া খ্রিস্টান কিশোরদের পরিবার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হত তুরস্কে। সেখানে তাদের শেখান হতো তুর্কী ভাষা, তুর্কী মূল্যবোধ, দেয়া হতো সামরিক প্রশিক্ষণ। আর এভাবেই একদিন তাদেরকে সুলতানের বিশ্বস্ত বাহিনীর সদস্যে পরিণত করে পাঠিয়ে দেয়া হতো নিজ এলাকায় সুলতানের স্বার্থ সংরক্ষণে। সেখানে তারা হাতিয়ার তুলত নিজ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে, একদা ফেলে আসা পরিবারের বিরুদ্ধে। শুধু বিদ্রোহ দমন আর শাসন ক্ষমতা পোক্ত করা নয়, এই যেনিসারি দলগুলোকেই কাজে লাগানো হতো রিলা মনাস্টেরির মতো ধর্মীয় স্থাপনাগুলো ধ্বংস করবার কাজেও। যেহেতু তারা এই ভূমিরই পুত্র, তাই তাদেরই তো ভালো জানা থাকবার কথা কোথায় কোথায় আছে খ্রিস্ট ধর্মের সাথে সম্পর্কিত পবিত্র স্থাপনাগুলো।

কয়েক ঘণ্টা মনাস্টেরির চত্বরে ঘোরাঘুরি আর ছবি তোলার পর যখন সময়ের ঘড়ি এগিয়ে চলেছে মধ্যাহ্ন থেকে অপরাহ্নের দিকে তখন মনে হল এবার পেটে কিছু না দিলেই নয়। সবচেয়ে কাছের খাবার জায়গাটিও এখান থেকে প্রায় পনের কিলোমিটার দূরে। তাই আমার দলটিকে তাগাদা দিলাম এবেলা রওনা না দিলেই নয়। সেই খাবার দোকানটিতে পৌঁছে কিন্তু মনে হল খাবার নয়, বরং ওই পাশ দিয়ে বয়ে চলা রিলাস্কা নদীর পানে চেয়ে থেকেই খিদে ভুলে সারাটি দিন কাটিয়ে দেয়া যায়। আমি নিলাম মচমচে এক আস্ত ট্রাউট মাছ ভাঁজা আর শুকনো গারলিক বুলগেরিয়ান রুটি। আমার পাশে বসেছে সানফ্রান্সিসকো থেকে আসা জনাথান। আমাকে ট্রাউট মাছ নিতে দেখে সেও ওই একই পদ অর্ডার করলো। ও কাজ করে সান সানফ্রান্সিসকোর এক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে। গত কয়েক বছর সকাল বিকেল অফিস করে গৎবাঁধা জীবনের প্রতি অতিষ্ঠ হয়ে এক মাসের ছুটি নিয়ে সে বেড়িয়ে পড়েছে পূর্ব ইউরোপ ভ্রমণে। এখানে আসবার আগে সে নাকি গিয়েছিলো ইউক্রেনের কিয়েভে। ইউক্রেনের কথা শুনে একটু নড়েচড়ে বসলাম। সেখানে কি এখনও যাওয়া নিরাপদ? আমার আশঙ্কার কথা ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে জনাথান বলল, “আরে ওসব যুদ্ধ-ফুদ্ধ সব হল ওদেশের পূর্ব প্রান্তে। কিয়েভে গিয়ে তুমি যুদ্ধের লেশ মাত্র বুঝতে পারবেনা”। খেতে খেতে বেশ আড্ডা জমল জনাথানের সাথে, ওর কাছ থেকে আরও শুনছিলাম ওর আলবেনিয়া আর কসোভো ভ্রমণের কথা। ফেরার সময় আমরা সবাই গাড়িতে উঠবো এমন সময় দেখা গেল নিউজিল্যান্ডের রুথকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। তাকে খুঁজতে বেড়িয়ে আমরা তাকে খুঁজে পেলাম এই হোটেলের কাছেই এক ফেরিওয়ালার দোকানের সামনে। সেখানে গিয়ে আমাদেরও রুথের মতো কয়েক মুহূর্ত থামতে হল বৈকি। কারণ মধু যে কতো পদের হতে পারে সেই ফেরিওয়ালার ক্ষুদ্র দোকানটিতে না এলে জানতে পেতাম না। তার দোকানের প্রতিটি পদের মধুই নাকি একেক ধরণের পাহাড়ি ফুলের থেকে উৎপন্ন হওয়া, শুধু তাই নয় তার দোকানে আরেকটি নতুন পদের খাবার দেখলাম। আর সেটি হল এই ঘন মিষ্টি মধুতে ডুবিয়ে রাখা নানা পদের বাদাম আর আখরোট। ছোট ছোট দৃষ্টিনন্দন বয়ামে ভরে সে রেখেছে এগুলো বিক্রির জন্যে। রুথ তো বটেই, জনাথানও দেখলাম ঝটপট কিনে নিল দু’বয়াম সেই পাহাড়ি তাজা মধুতে ডোবান মিষ্টি বাদাম।

গিওরগির একটি ভালো দিক হল ওকে বুলগেরিয়া নিয়ে কোনও প্রশ্ন করলে ও শুধু সে প্রশ্নের উত্তরটিই দেয়না, আগে পেছনের কিছু গল্পও বলে ফেলে। এই যেমন আমাদের ফেরার পথে বাঁ হাতের পাহাড়গুচ্ছগুলোকে দেখিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এই পাহাড় শ্রেণীর নাম কি? তাতে জানলাম এটিই সেই বলকান পাহাড় শ্রেণী, আরও জানলাম এক মজার কাহিনী। পৃথিবীতে আজকাল যত দৈ উৎপন্ন হয় তাতে মূলত দু’প্রকারের ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার কড়া হয়, যার একটি হল বুল্গারিকাস ব্যাকটেরিয়া। আর এই বুল্গারিকাস ব্যাকটেরিয়ার পেছনেই লুকিয়ে আছে এই বলকান পাহাড় শ্রেণীর নাম। গিওরগির কাছ থেকে শোনা সেই পেছনের গল্পটা বলি। বহু বহু কাল আগে এই বলকান পাহাড়ের আশেপাশের উপত্যকার গ্রামগুলোতে যে রাখাল শ্রেণী বাস করতো তাদের অনেকেই ভেড়ার পাল নিয়ে বেশ ক’দিনের জন্যে চলে যেত এই পাহাড়ের মাঝের ঢালু জমিতে শিকার আর ভেড়ার পালকে ঘাস খাওবার জন্যে। এতটা দীর্ঘ সময় বাড়ির বাইরে থাকতে গেলে এই রাখালের দলকে খাবারের জন্যে নির্ভর করতে হতো হাতের কাছে পাওয়া খাবার দাবারের উপরই। একদিন এক রাখাল তার পালের এক মৃত ভেড়ার পাকস্থলীকে সংরক্ষণ-আঁধার হিসেবে ব্যবহার করে তাতে কিছুটা ভেড়ার দুধ রেখে দিল পরের দিন খাবে বলে। কিন্তু পরের দিন সে আবিষ্কার করলে সেই পাকস্থলীতে দুধের বদলে ঘন চাক বাধা অন্য কিছু। আসলে এই বলকান পাহাড়ের উপত্যকার ঘাসেই জন্ম হয় সেই বুল্গারিকাস ব্যাকটেরিয়ার। সেই ঘাস খাবার পর সেই মৃত ভেড়ার পাকস্থলীতে রয়ে গিয়েছিলো সেই ব্যাকটেরিয়া যা কিনা দুধের সাথে বিক্রিয়ায় তৈরি করেছিল সুস্বাদু দৈ। আজ ইউরোপ আমেরিকায় যে দৈ পাওয়া যায়, তার একটা বড় অংশই নাকি এই বুল্গারিকাস ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি।

বুলগেরিয়ার এই দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ছোট ছোট গ্রামের মাঝের রাস্তা দিয়ে যাবার সময় আশেপাশের বাড়ি ঘরের অবস্থা দেখে বুঝলাম এ অঞ্চলটি বেশ দরিদ্র। বেশ পুরনো যেই বাড়িগুলো তার অনেকগুলোর বাইরের দেয়ালের পলেস্তারা খসে ইটের স্তরের মাঝে মাঝে হটাৎ উঁকি দেয় লম্বা কাঠের পাটাতন। প্রায় শ’ খানেক বছর আগে নাকি এ অঞ্চলে হয়েছিলো এক বড়সড় ভূমিকম্প। তাই সেই ভূমিকম্পের পর থেকে এখানকার অনেক বাড়ির ইট-পাথরের স্তরের মাঝে মাঝে এভাবে কাঠের পাটাতন গুঁজে দেয়া হয় ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি কিছুটা শুষে নেবার জন্যে।

যশোর-বনগাঁ রোডের দু পাশে যেমন হেলে আছে বৃহৎ সব শিশু গাছ, আমাদের ফেরার পথের দুপাশটিও তেমনি ঢেকে আছে পত্র-বহুল লিন্ডেন গাছে। এই লিন্ডেন গাছের কথা বলতে গিয়ে গিওরগি আমাকে জিজ্ঞেস করলো, “লিন্ডেন পাতার চা খেয়েছ কখনও?”। লিন্ডেন পাতার চা? সেও আবার হয় নাকি? “আলবৎ হয়, আমার বাড়ির সামনেই তো এক লিন্ডেন গাছ আছে, তার পাতা থেকে আমার বান্ধবী সিল্ভিয়া নিজেই এই চা বানিয়ে ফেলে। দাড়াও, ওর কাছ থেকে নিয়ে তোমাকে কিছু লিন্ডেন চা দিয়ে যাব তোমার হোটেলে। আমরা অবশ্য একে লিন্ডেন চা বলিনা, বুলগেরিয়ান ভাষায় আমরা একে বলি, ‘লিপা চাই’”।

সোফিয়াকে যদি বলা যায় বুলগেরিয়ার রাজনৈতিক আর বাণিজ্যিক রাজধানী তাহলে প্লভদিভ শহরটিকে মনে হয় বলা চলে এ দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী। সোফিয়া থেকে প্লভদিভ প্রায় আড়াই ঘণ্টার মতো দূরত্বে। পরদিন আমরা মাইলের পর মাইল ছড়ানো সূর্যমুখীর ক্ষেতকে দুপাশে রেখে ছুটে চললাম সেই শহরটির উদ্দেশ্যে। আজ আমাদের সাথে রয়েছে ব্রাজিলের সাও পাওলোর এক পরিবার। উচ্চ-পদস্থ ব্যাঙ্ক কর্মকর্তা মাউরো কারভালহ এসেছে তার স্ত্রী ইসাবেলা আর ছেলে ভিক্টরকে সাথে করে। মাউরো বেশ আমুদে লোক, কাজ চালানোর মতো বেশ ইংরেজি বলতে পারে। এর অবশ্য কারণ ও আছে, কিছুক্ষণের মাঝেই বুঝলাম কাজের প্রয়োজনে ওকে প্রতি বছরই দেশ বিদেশে যেতে হয়। আমি বাংলাদেশী জেনে ও বলল এই প্রথম ও কোনও বাংলাদেশী কারও সাথে পরিচিত হল। বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় আমাদের ঢাকা শহরের অর্ধেক বাড়ির ছাঁদেই যে শোভা পায় ব্রাজিলের পতাকা আর মাঝেমাঝে বচসা লাগে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থকদের মাঝে সে শুনে ওদের কি হাসি। আমাকে বলল, “দেশে ফিরে প্রথমেই সবাইকে বলবো এ গল্প”। এরপর নানা কথা নানা গল্পে আমরা দুজনে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেললাম। দেখা গেল আমার যেমন কোনও একদিন চেরনোবিলে ঘুরতে যাবার ইচ্ছে, মাউরোও তাই। আমরা তখুনি ঠিক করে ফেললাম যদি কোনদিন চেরনোবিলে যাই তবে দুজন এক সাথেই যাব।

মারিতজা নদীর ধারে সবুজ পাহাড় ঘেরা প্লভদিভ শহরটিতে পা দেবা মাত্র অনুভব করা যায় এ শহরের সাথে সম্পর্কিত হাজার বছরের ইতিহাস। মূল শহরে ঢোকার মুখে যেখানে আমরা গাড়ি থেকে নামলাম সেখানে ইতস্তত ছড়িয়ে আছে ট্রেসিয়ান সভ্যতার নানা নিদর্শন। কোনটি গুঁড়িয়ে যাওয়া থামের অংশবিশেষ, কোনটি বিলুপ্তপ্রায় ভবনের ভিতের শেষ চিহ্ন। ট্রেসিয়ান সভ্যতার শুরুটা হয়েছিলো খ্রিস্টের জন্মেরও কয়েকশ বছর পূর্বে। এর পর আরও নানা জাতি এসেছে এ শহরে। রোমান, হুন, আর্মেনিয়ান, রাশান, জিপসি, তুর্কী- এমন বহু জাতির সংমিশ্রণে আজ প্লভদিভের সমাজ সমৃদ্ধ। সর্বশেষ তুর্কী শাহসনামলে এ শহরটি হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। তবে তুর্কী শাসনামলের প্রাথমিক ঝাঁপটা থেকে বহুলাংশেই বেঁচে যায় এ শহরটি। কারণটা হল এ শহরে অবস্থান করতো যেনিসারি বাহিনীর একটা বড় ব্যাটালিয়ন, তারা এ শহরটি থেকেই তাদের বেতন উত্তোলন করতো। আরও ছিল দাদন ব্যবসায়ি ইহুদীরা, যাদের তুর্কীরাও একটু সমঝে চলতো। তাই তুর্কীরা এ শরটিকে তেমন ধ্বংস করেনি।

এ শহরের হাজার বছরের পুরনো এবড়ো খেবড়ো পাথর বেছানো পথ ধরে হাঁটার সময় দু’ ধারের রং-বেরঙের বাড়িগুলো দেখে পুলকিত হতে হয়। আর এ বাড়িগুলোর প্রায় প্রতিটির সামনের দিকে ঝুল বারান্দার মতো রয়েছে একটি করে ঝুল ঘর। এমন বিশেষ ধরণের ঘরের বিশেষত্ব কি? মজার ব্যাপার জানলাম এ ঘরগুলো নাকি ব্যবহৃত হতো গিন্নীদের সান্ধকালিন খুনসুটির ঘর হিসেবে।

কম্যুনিস্ট সময়ে এই প্লভদিভ হয়ে ওঠে কম্যুনিস্টবিরোধী গুপ্ত-আন্দোলনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে। প্লভদিভের বহু বুদ্ধিজীবী সে সময় তাদের কবিতা, গান, নাটক, রাজনৈতিক স্লোগান কিংবা নিছক কৌতুকের মাধ্যমে প্রকাশ করা শুরু করেন তাদের হতাশা। এমনকি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাসয়া মিতেরা একবার প্লভদিভে এলে তার সাথেও দেখা করেন কিছু বুদ্ধিজীবী, ঝিভকভের শাশনামল সম্পর্কে মিতেরাকে কিছুটা সত্য ধারণা দেবার জন্য। সেদিন মিতেরার সাথে তাদের প্রাতরাশ বৈঠকটি হয়েছিলো যে বাড়িতে সে বাড়িটি আজও সংরক্ষণ করা আছে একই ভাবে।

ঘুরতে ঘুরতে আমরা চলে এলাম শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্রে। এখানেই হল এ শহরের মূল আকর্ষণ এক রোমান মুক্ত নাট্যমঞ্ছ। এই মুক্তমঞ্ছের সামনের বেদিটি একসময় নাকি ছিল প্রায় ৭০ মিটার উঁচু। কিন্তু গত শতাব্দীর সেই প্রলয়্ংঙ্কারি ভুমিকম্পে এখন কেবল ৩০ মিটার অবশিষ্ট আছে। সেই বেদীতে আজ তাই চোখে পরে মুণ্ডুবিহীন মর্মর পাথরের মূর্তি কিংবা ভেঙে পড়া থামের অংশবিশেষ। এই মুক্তমঞ্ছ দেখা শেষ করে আমরা যখন এই শহরের আধুনিক অংশটির দিকে হাঁটা দিয়েছি তখন ছয়শ বছরের পুরনো তুর্কী ঝুমায়া মসজিদের দেয়ালে লাগানো সূর্য ঘড়িতে কাঁটা ঠিক বারটার ঘরে। কৌতূহলী হয়ে নিজের হাতের ঘড়ির সাথে মিলিয়ে দেখি সূর্য ঘড়ির সময় একেবারে পাক্কা, একটুও এদিক ওদিক নেই। অর্থাৎ ছয়শ বছর আগে সেই স্থাপত্যবিদ সূর্যের গতিপথ চিন্তা করে এমন ভাবে এই মসজিদের নকশা করেছিলেন যেনো সূর্য ঘড়ির হিসেব এক বিন্দু এদিক ওদিক না হয়।

এখানে আসার পথেই গিওরগি পই পই করে বলে দিয়েছিল প্লভদিভে এসে আর কিছু কিনি আর নাই কিনি, গোলাপের সুগন্ধি কিনতে যেন ভুল না করি। এতো সস্তা গোলাপের সুগন্ধি নাকি আর কোথাও মেলা ভার। গিওরগির কথাটি আসলে মিথ্যে নয়। আগেই উল্লেখ করেছিলাম এই প্লভদিভে বিভিন্ন শতাব্দীতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক এসে বসত গেড়েছিল। তাদেরই কেও মধ্য এশিয়ার দামেস্কাস থেকে নিয়ে আসে ভুবনমোহিনী গোলাপের এক জাত এ অঞ্চলে, যা পরে পরিচিতি পায় দামেসচেনা গোলাপ হিসেবে। প্লভদিভের খুব কাছেই এক উপত্যকায় চাষ হয় সেই পৃথিবী বিখ্যাত গোলাপের। সেই গোলাপের পাপড়ির নির্যাস থেকে তৈরি করা হয় নারীদের প্রসাধনী তেল, সুগন্ধি, সাবান আরও কত কি। এখানে কেও বেড়াতে এলে তাই নাকি ফিরবার সময় ব্যাগ বোঁচকা ভর্তি করে এসব নিয়ে বাড়ি ফিরে। বিশেষ করে নারীদের বিশেষ পছন্দ গোপালের পাপড়ি থেকে উৎপন্ন তেল, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে অট্ট। ছোট্ট এক শিশি সেই তেলের দাম প্রায় পাঁচ ডলার। দাম শুনে একটু বেশি মনে হাওয়ায় এক দোকানি আমাকে বলল, “তোমার মনে হয় এই তেল সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। এই যে দেখছ পাঁচ ডলারে এক শিশি, এটিই বলতে পারো চূড়ান্ত সস্তা দাম। কারণ এক শিশি অট্ট তুমি যদি পশ্চিম ইউরোপ বা আমেরিকার কোথাও কিনতে যাও তাহলে গুনতে হবে অন্তত তিন গুণ বেশি দাম। আমরা এর চেয়ে আর কমে দিতে পারিনা, কারণ প্রায় তিন টন গোলাপ থেকে আমরা তেল উৎপন্ন করতে পারি এক টনেরও কম”। এই অট্ট সম্পর্কে আমার আসলেই কোনও পূর্ব ধারণা ছিলনা, কিন্তু পরে ভিয়েনা বিমানবন্দরের এক দোকানে একই ধরণের গোলাপ তেলের শিশি হাতে নিয়ে দেখেছিলাম দোকানির কথাই সঠিক। সেখানকার দাম ছিল সেই প্লভদিভের দামের প্রায় তিন গুণ। আমি অবশ্য গিওরগির উপদেশ মেনে কিছু গোলাপের সাবান আর সুগন্ধি কিনেছিলাম প্লভদিভ থেকে স্যুভেনির হিসেবে।

এতোক্ষণ আমি একাই ঘোরাঘুরি করছিলাম, আর মাউরো ওর বউ ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়ে গিয়েছিলো অন্য দিকে। দুপুরের খাবার সারবার পর আমাদের আবার এক স্থানে মিলিত হবার কথা। এক বুফে দোকানে পেট পুরে খেয়ে সেই কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছে দেখে মাউরো আমার আগেই সেখানে পৌঁছে আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। এবার কি তবে ফিরে যাব সোফিয়ায়? নাকি আশপাশের আরও কোনও শহর ঘুরে দেখব? চমৎকার এক বুদ্ধি বাতলে দিল গিওরগি। ও আমাদের বলল, “আচ্ছা এখানে থেকে ঘণ্টা খানেক দূরে এক বিখ্যাত গ্রাম আছে যেখান থেকে বলতে পারো সুত্রপাত হয়েছিল তুর্কী খেদাও আন্দোলনের। সেখানে যেতে চাও তোমরা? দেখে এলে বুলগেরিয়ার এক সাধারণ গ্রামের চিত্র।“ আমি আর মাউরো দুজনেই লুফে নিলাম গিওরগির এই প্রস্তাব।

অতঃপর মেঘলা সেই দিনে আমাদের গাড়ির চাকা ছুটে চলল পাহাড়ি এক রাস্তা বেয়ে সুনশান ঘুমন্ত এক গ্রাম কপ্রিভিতস্কার পানে। দশ বছর আগেও নাকি বুলগেরিয়ার এই গ্রামীণ জনপদের রাস্তা ঘাটের অবস্থা ছিল একেবারেই তথবৈচ। ইদানিং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ঋণের টাকায় এই রাস্তাগুলোর বেশ সংস্কার করা হয়েছে। কপ্রিভিতস্কা গ্রাম হলেও সেটি ঠিক এঁদো গ্রাম নয়। যেখানে আমরা নামলাম সেই বাজারের মতো জায়গাটিতে আছে বাঁধানো এক চত্বর, আছে কিছু গ্রামীণ চা-কফির দোকান, আছে উজ্জ্বল রঙে রাঙানো পাথরের দেয়ালের কিছু বাড়ি, আছে শ্বেত-ধূম্র উড়িয়ে কাঠের পাইপ টানা বুড়োদের জটলা কিংবা মন্থর দিনে বিক্রির আশায় ঘরে বানানো জ্যাম জেলি নিয়ে বসে থাকা গাঁয়ের কিছু কিষাণী। সেই বাঁধানো চত্বরের পাশের এক খুপরি দোকানে গিয়ে ঢুকলাম আমি আর মাউরো। বিভিন্ন পুরনো জিনিশের সাথে এ দোকানে বিক্রি হচ্ছে কম্যুনিস্ট সময়ের বিভিন্ন ধরণের ব্যাজ। নাকি আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে দোকানি এই ব্যাজগুলো সংগ্রহ করে আনে, স্থানীয় মানুষের কাছে এগুলো হয়তো এখন এক পুরনো জঞ্জাল কেবলি। সেই ব্যাজের কোনটির উপর লেনিনের ছবি, কোনটিতে দিমিত্রভের, আবার কোনওটিতে কেবল সমাজতন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত নানা চিহ্ন। মাউরো পাগলের মতো বাছাই করতে লাগলো ব্যাজগুলো, পারলে পুরো দোকান সুদ্ধই কিনে নেয় আরকি। আমাকে বলছিল, “নব্বই এর দশকে যেবার মস্কোতে যাই সেবার মস্কোর ফুটপাথে এ ধরণের এন্টিক ব্যাজগুলো বেশ সস্তায় পেয়েছিলাম। কিন্তু তিন বছর আগে মস্কোয় আবার যখন গেলাম তখন দেখলাম এগুলোর দাম বেড়ে গেছে প্রায় দশগুণ। তাই বলছি ভায়া এখান থেকে যত পারো কিনে নাও, এই এক লেভায় এই ধরণের এন্টিক ব্যাজ আর কোথাও পাবেনা”।

পাইন আর লিন্ডেন গাছে ছাওয়া গাঁয়ের এক কোণে এক দুঃখিনী মা হতাশ বিবর্ণ ভঙ্গীতে বসে আছেন তার ছেলের অপেক্ষায় অনন্ত কাল ধরে। কোলের কাছটিতে রয়ে গেছে ভালোবেসে কারও রেখে যাওয়া এক থোকা হলুদ ফুল। নিজ থেকে আমাকে প্রশ্ন করতে হলনা, বরং এই প্রস্তর মূর্তিটি দেখিয়ে গিওরগি নিজেই বলছিল তুর্কী বিরোধী আন্দোলনে এই অজপাড়াগাঁ গ্রামটির ভূমিকার কথা। বহুকালের অন্যায় শোষণের প্রতিবাদে একদিন হটাৎ জ্বলন্ত বারুদের মতো জেগে ওঠে এ গাঁয়ের সাধারণ মানুষ। কর আদায় করতে আসা তুর্কী সৈনিকদের চারদিক থেকে ঘেরাও করে ধরাশায়ী করে ফেলে তারা। কিন্তু একটা বড় ভুল করেছিল তারা। তুর্কী সৈনিকদের মৃতদেহগুলো তারা ছুঁড়ে দিয়েছিল গাঁয়ের মাঝ দিয়ে ছুটে চলা এক স্রোতস্বিনী পাহাড়ি নদীতে। ফলে ভাটিতে ভেসে ওঠা মৃতদেহগুলো খুঁজে পেতে তুর্কীদের বড় একটা বেগ পেতে হয়নি। যথারীতি গ্রামবাসীদের চড়া মূল্য দিতে হয় এ জন্যে। প্রতিশোধ হিসেবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় গাঁয়ের প্রায় সকল সমর্থ যুবককে, যাদের অধিকাংশই আর কখনই ফিরে আসেনি তাদের মায়ের কোলে। এ গাঁয়ের গৃহস্থ পাড়াগুলোর মাঝ দিয়ে হাঁটার সময় একটি বিষয় খেয়াল করলাম, আর তা হল ল্যাম্প-পোস্ট কিংবা মোটা গাছের কাণ্ডে ঝোলান কিছু নোটিশ বাক্স। একটি দুটি নয়, বেশ কিছু। কৌতূহলী হয়ে কাছে গেলাম এই নোটিশ বাক্সের ভেতরে কি সেটি দেখবার জন্যে। তো দেখলাম সেখানে বিভিন্ন মানুষের ছবিসহ কি যেন লেখা বুলগেরিয়ান ভাষায়। একি তবে হারানো বিজ্ঞপ্তির নোটিশ বাক্স নাকি? কিন্তু তাই বা কি করে হয়? গ্রাম জুড়ে এতো মানুষ নিখোঁজ? এর মাঝে নিশ্চয়ই কোনও কিন্তু আছে। এই কিন্তু সম্পর্কে জানতে গিয়ে জানলাম প্রায় কয়েক শত বছর ধরে চলে আসা এক পুরনো প্রথা সম্পর্কে। অটোমানরা বুলগেরিয়া দখলের পরই নানা সময়ে হানা দিতো তুর্কী বাহিনী, কারণে অকারণে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো বাড়ির পুরুষদের। তাদের কেও কেও হয়তোবা দাসত্ব কিংবা জেল খেটে বহুদিন বাদে ফিরে আসতেন তাদের নিজ শহরে বা গ্রামে। কিন্তু ততদিনে হয়তো পাল্টে গেছে অনেক কিছুই, অনেক পরিচিত মানুষই হতো চলে গেছেন এই পৃথিবী থেকে। তাই গ্রামে প্রবেশের পর পরই যেন তারা জানতে পারেন সেই গত হওয়া মানুষদের কথা, সেজন্যে এ ধরণের নোটিশ বাক্সে ঝুলিয়ে রাখা হতো সেই মৃত ব্যক্তিদের গত হবার দিনক্ষণ, তাদের নাম, ঠিকানা ইত্যাদি। নিয়মটি নাকি ছিল কেও গত হবার এক সপ্তাহ, এক মাস এবং এক বছর পর নতুন করে নোটিশ বাক্সে সেই মৃত ব্যক্তির স্মরণে কাগজ টানানোর। যদিও সেই নোটিশ বাক্সে আমি দেখলাম প্রায় দশ বছর আগে পরপারে পাড়ি জমানো এক ব্যাক্তির নাম, ছবি এবং মৃতের স্মরণে লিখা কিছু কথা ঝুলছে। অর্থাৎ অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রায় দেড়শ বছর পেরিয়ে গেলেও মানুষ আজও ধরে রেখেছে পুরনো সেই কালের ধারা। শুধু যে কেবল গ্রামীণ জনপদের মানুষ এই ধারাটি বয়ে নিয়ে চলেছে তা নয়। পরে আমি খেয়াল করেছিলাম সোফিয়ায় আমার হোটেলের খুব কাছেই এই বুড়ো লাইম গাছের কাণ্ডেও ঝোলান ছিল এমনই এক কাঠের ঢাকনাসহ নোটিশ বোর্ড, যেখানে উল্লেখিত ছিল সে পাড়ার মৃত মানুষদের ছবিসহ ছোটোখাটো স্মৃতিকথা। সেই প্রত্যন্ত গ্রামের অভিজ্ঞতাটুকু না থাকলে হয়তো এই বোর্ডখানি হয় আমার চোখে এড়িয়ে যেত, নয়তো আমি ভুল কিছু ভেবে বসতাম।

এমনিতেই মেঘলা দিন, তার উপর এমন পাহাড়ি এলাকায় সন্ধ্যে নামে একটু তাড়াতাড়ি, ঝুপ করে। গাঁয়ের রাস্তায় ঘোরাঘুরি করতে করতেই সূর্য হেলে পড়লো দূরে মাথা উঁচিয়ে থাকা এক পাহাড়ের ঠিক পেছনে। গ্রীষ্মকাল হলেও এই আবছা আলোয় ভরা বিকেলে ঠাণ্ডাও বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। গিওরগি প্রস্তাব দিল এই শীতের বিকেলে এক কাপ কফি খেলে কেমন হয়? অতি উত্তম প্রস্তাব। দল বেঁধে আমরা গেলাম সেই বাজারের এক কফির দোকানে। দোকানের প্রবেশমুখে বিষণ্ণ মুখে দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবেশনকারী মেয়েটিকে ‘প্রিয়াত্নাভিচি’ অর্থাৎ ‘শুভ-বিকেল’ বলে ভেতরে প্রবেশ করে বুঝলাম দোকানটির বয়স কম করে হলেও অন্তত বছর পঞ্চাশ হবে। কিন্তু ভেতরটি বেশ পরিপাটি আর পরিচ্ছন্ন। দোকানটি চালায় এক তরুণী, এমন একটি অজপাড়াগাঁয়ের মেয়ে হলেও সে কিন্তু চমৎকার ইংরেজি বলতে পারে। আমরা অর্ডার দেবার প্রায় সাথে সাথেই চলে এলো কফি। কারণ পুরো দোকানে তখন খদ্দের বলতে আমরাই কেবল। কফি পরিবেশনের ধরণটিও বেশ সাবেকি। প্রথমে ছোট এক হাতল ছাড়া মৃৎপাত্র রাখা হয় সবার সামনে। তারপর কাঠ-পেতলের আরেকটি পাত্রে কফি এনে রাখা হয় তার পাশে। যেন যার যতটুকু খুশি ঢেলে নিতে পারে সেই ছোট পেয়ালাসুলভ মৃৎপাত্রে। এর সাথে আরেকটি পেতলের ছোট পাত্রে দেয়া হয় ‘বিয়াউলো স্লাতকা’ নামক এক ধরণের মিষ্টি ক্রিম। কড়া কফি খাবার পর একটু মুখ মিষ্টি করার জন্যে নাকি সেই ক্রিম চামচে ঢেলে একটু জল মিশিয়ে খাবার নিয়ম। এখানকার মানুষ নাকি কফিতে সরাসরি চিনি না ঢেলে এমন করেই কয়েক চুমুক কফি খাবার পর মুখ একটু মিষ্টি করে নেয়। তো এমন এক সুন্দর কফির দোকান এই বিরান গাঁয়ে চলে তো? গিওরগির কাছ থেকে শুনলাম আগে তেমন চলতনা, কিন্তু ইদানিং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হবার পর এই গাঁয়ের অর্থনৈতিক অবস্থাও বেশ ভালো হতে শুরু করেছে। এখন নাকি সোফিয়ার অনেক মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষ ছুটিছাটা পেলেই চলে আসে এমন পাহাড়ি গ্রামাঞ্চলের এলাকাগুলোতে এক-দু’দিন কাটিয়ে যেতে। গ্রামের অনেকেই ঘর ভাড়া দেয় এমন শহুরে অতিথিদের কাছে। তার জন্যে নাকি দিতে হয় প্রতিদিনে মাত্র ১০ ডলারের মতো। থাকা এবং খাওয়া দুই মিলে এ টাকায়। “বল কি? এ টাকায় তো খাবার খরচই ওঠবার কথা নয়”। “আসলে ঘর ভাড়ার জন্যে গাঁয়ের মানুষ আলাদা করে কোনও টাকা নেয় না। ওরা ধরে নেয় ঘর তো ওদের এমনিতেই খালি পরে থাকে। আর খাবার? সেও তো ওদের ক্ষেতের ফসল। ওই ১০ ডলার বলতে পারো ওদের মেহনতের মজুরি। এই পেলেই এ গাঁয়ের মানুষ মহা খুশি”।

পরদিন দুপুর বারোটায় আমার সোফিয়া থেকে ভিয়েনা যাবার ফ্লাইট। একটু বেশ দেরি করেই ঘুম ভাঙল। চোখ মুখ ধুয়ে লবিতে প্রাতঃরাশের জন্যে নেমে দেখি আগে থেকেই অপেক্ষা করছে গিওরগি, হাতে সিলভিয়ার বানানো লিন্ডেন পাতার সেই ‘লিপা চাই’ এর একটি প্যাকেট। আমি ভাবিনি যে গিওরগি সত্যি সত্যি এই চায়ের ব্যাপারটি মনে রাখবে। অবাক আর কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ হয়ে গিওরগিকে বললাম, “যেকোনও দেশকেই আমি দেখি সে দেশের মানুষের মধ্য দিয়ে। বুলগেরিয়াকেও আমি দেখব তোমার মধ্য দিয়েই। আর নিঃসন্দেহে সেই দেখাটি হবে শাশ্বত সুন্দর। যদি সম্ভব হয় আবার ফিরে আসবো তোমার দেশে”।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: