কলেজ জীবনের সাতকাহন (গ্যাং অব চোর)

মূল লেখার লিংক
কলেজে থাকতে আমরা ছ’জন ছিলাম আম-কাঁঠাল চুরির ওস্তাদ। আমি, নাসিম, শহিদ, মেহেদি, শফি আর আনিসুল। আমি ছিলাম আশঙ্কাজনক রকমের হ্যাংলা পাৎলা, জোর বাতাসে উড়ে যাবার মত পলকা। তাই আমাদের অপারেশনগুলোতে শরীরের চেয়ে মাথা আর চোখ-কান ব্যবহারের কাজেই আমাকে বেশি ব্যবহার করা হত। অসাধারণ মেধাবী অথচ কেয়ারলেস এবং রিতিমত পালোয়ানী ফিগারের নাসিমের কাজ ছিল ধরা খাবার সম্ভাব্য পরিস্থিতিতে তাঁর সুবোধ বালক সুলভ ইমেজটা ব্যবহার করে নিজের এবং বাকিদের পিঠ বাঁচানো। শহিদ আর মেহেদি – দুটোর শরীরেই দারুণ বল। এরমধ্যে মেহেদি তো, সেই বয়সেই প্রায় আসুরিক শক্তির অধিকারি ছিল। নেইল কাটারের ব্লেড দিয়ে ফলবতি এবং দশাসই সাইজের এক একটা কলাগাছ সে অবলীলায় ঘ্যাচা ঘ্যাঁচ মাটিতে পেড়ে ফেলত! কাঁঠাল পাড়ার সময় ছুরি চাকুর কোনো ধার ধরতো না, দুহাতে ধরে হ্যাঁচকা টানে গাছ থেকে নামিয়ে আনতো। তবে তার সবচেয়ে ভয়াবহ কাজটি ছিল আধলা বা সিকি সাইজের ইট ছুঁড়ে মেরে ২০/৩০ ফিট উঁচু গাছ থেকে ডাব পেড়ে ফেলা। সেগুলো এমনই নারকীয় এবং আসুরিক ব্যাপার ছিল যে, চোখে না দেখলে বিশ্বাসই হবে না। এবং যতদূর জানি, আজ পর্যন্ত মেহেদির সেই ডাব পাড়ার রেকর্ড কেউ স্পর্শ করতে পারেনি। দলের বাকি দুজন – শফি আর আনিসুলও ছিল খানিকটা আমার মতই, মুলতঃ চুরি করা ফল ভর্তি বস্তা টানাই ছিল আমাদের অন্যতম প্রধান দায়ীত্ব।

এভাবেই বেশ দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের ডর্মে দুটো খালি কাবার্ড ছিল। ওদুটো ছিল আমাদের চোরাই ফলের ভাঁড়াড়। পুরো ব্যাচের সবার জন্য উন্মুক্ত। যার যখন ফল খেতে ইচ্ছা হত সে তখনই আমাদের ডর্মে এসে দু’মুঠো আম-কাঁঠাল-কলা কিংবা জাম-পেয়ারা খেয়ে যেত। কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো আমাদের HSC পরীক্ষার মাস ছয়েক আগে, কোন এক শুক্রবারের পড়ন্ত বিকেলে।

স্টকের কাঁঠাল সব শেষ। তাই ছয় চোরা মিলে বের হলাম কাঁঠাল কব্জা করার মানসে। ছয় জনেই প্রেয়ার ড্রেস পড়ে রওয়ানা হলাম মসজিদের পানে। হুনাইন হাউজের পাশের পুকুরের মসজিদ-প্রান্তে বেশ কয়েকটা গাছে সেবার কাঁঠাল ধরেছিল বেশুমার। বিগত কয়েক সপ্তা ধরে ইভনিং প্রেয়ারে যাবার সময় সেগুলির দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে চেয়ে থেকেছি প্রতিদিন। সেখানে গিয়েই গাছগুলো থেকে মেহেদি আর শহিদ ধাপাধাপ একের পর এক কাঁঠাল টেনে নামাতে লাগলো আর আমরা পালাক্রমে সেগুলো বয়ে নিয়ে এলাম বদর হাউজে, আমাদের ডর্মে। এভাবে ২২ টা কাঁঠাল আনার পরে সিদ্ধান্ত নিলাম এখানে আর না। এবার প্রিন্সিপাল স্যারের অফিসের পেছনের গাছ থেকে কাঁঠাল চুরি করতে হবে। ওখানকার কাঁঠাল গুলো বেশ বড়সড়, তাছাড়া ওখানে একটা পাতিলেবুর বাগান ও আছে। বৃহস্পতিবার রাতের খিচুড়ির সাথে গাছের চোরাই পাতিলেবু আর হুনাইন হাউজের গার্ডেনের কাঁচা মরিচ দারুন যায়। ওহ! ভাবলে এখনও জিভে জল চলে আসে।

শফিউল্লা বলল, নাহ ওদিকে যাওয়া ঠিক হবে না। ধরা খেয়ে যেতে পারি। আমি বললাম, আরে নাহ, প্রদীপের নীচেই অন্ধকার থাকে। চুরি করার জন্য প্রিন্সিপালের অফিসের পেছনটাই তামাম কলেজের মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ যায়গা। তাছাড়া, তখন একাডেমিক বিল্ডিং এর মিটিং রুমে কি একটা গুরুত্বপুর্ন বিষয়ে যেন ফ্যাকাল্টি মেম্বার দের সাথে প্রিন্সিপ্যাল স্যারের ম্যারাথন মিটিং চলছিল। কাজেই, চুরিতে যাবার ওটাই ছিল মোক্ষম সময়। অতপর সবাই মিলে রওয়ানা দিলাম।

একাডেমিক ব্লকে বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের পাশের টয়লেটে গিয়ে জানালা দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করলাম। আমাদের অবস্থান থেকে টেইলারিং শপ পর্যন্ত অনেক খানি খোলা জায়গা দিয়ে যেতে হবে। ব্যাপারটা বেশ রিস্কি, তবুও গেলাম। এক দৌড়ে খোলা জায়গাটা পেরিয়ে ঝপ করে বসে পড়লাম টেইলারিং শপের কোনায়। সেখানে দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে ঘাপটি মেরে উঁকি দিয়ে দেখি আমাদের আর লেবু-কাঁঠালের বাগানের মাঝে কেউ নেই। শুধু প্রিন্সিপাল বাংলোর মালিটা সেখানে ঘাস কাটছে (ঘোড়ার না গাধার জানিনা)। তবে আমাদের জন্য সেটাতে দুশ্চিন্তার কিছু ছিল না। কারণ মালিটা ছিল বাকপ্রতিবন্ধী, কথা বলতে পারে না। আমাদের সবার পরানের গহীনে এক অদ্ভুত পৈশাচিক আনন্দ জেগে উঠলো। কোন প্রকার লুকোছাপা না করেই দৌড়ে চলে গেলাম কাঁঠাল বাগানে। মেহেদি আর শহিদ দাঁত খিঁচিয়ে কাঁঠাল ছিড়তে লাগলো, আর আমরা সেই ঘাস কাটা মালিকে দেখিয়ে দেখিয়ে দাঁত কেলিয়ে কেলিয়ে তাঁর সামনে দিয়ে সেগুলো বয়ে নিয়ে টেইলারিং শপের কোনায় জমা করতে লাগলাম। এক একটা দসাসই সাইজের কাঁঠাল, উঁচু করতেই প্রান রীতিমত ওষ্ঠাগত হয়ে যাবার যোগাড়। এভাবে কয়েক দফা কাঁঠাল পরিবহন করার পরে হঠাত খেয়াল করলাম যে, মালী আর সেখানে নেই! বাতাসে বিপদের গন্ধ পেলাম। সাথেসাথে কাঁঠাল গুলোকে টেইলারিং শপের কোনায় রেখেই সবাই দৌড়ে চলে এলাম বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের পাশের টয়লেটে। স্ট্রাটেজিক্যাল রিট্রিট!

টয়লেটের জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখি হতচ্ছাড়া মালীটা প্রিন্সিপাল অফিসের আর্দালীকে নিয়ে এসে টেইলারিং শপের কর্নারে রাখা কাঁঠালগুলি দেখাচ্ছে আর ইশারা-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, এগুলো ছয়জন ক্যাডেটের কাজ। কিছুক্ষণ পরে দু’জনেই গজগজ করতে করতে হন্তদন্ত হয়ে প্রিন্সিপ্যাল অফিসের দিকে ছুটে গেল। শহিদ বলল, সর্বনাশ! ব্যাটা তো প্রিন্সিপ্যালকে ফোন করতে যাচ্ছে। নাসিম বলল, সর্বনাশ টর্বনাশ বুঝিনা, এই রকম কিং সাইজ কাঁঠাল কোনভাবেই মিস করা যাবে না। চিন্তা করে দেখলাম কথাটা ঠিক। তাছাড়া এভিডেন্স ফেলে রেখে পালিয়ে গেলে সেটা হবে চৌর্য্য-সমাজের মুখে চুনকালি মাখানোর মত ভয়াবহ কাপুরুষতার বহিঃপ্রকাশ।

সাথে সাথেই আমাদের ক্ষাত্রতেজ জাগ্রত হয়ে গেল। আর্দালি ব্যাটা ফিরে আসার আগেই একছুটে দৌড়ে গিয়ে টেইলারিং শপের কর্নার থেকে কাঁঠাল গুলি নিয়ে চলে এলাম একাডেমিক বিল্ডিং এ। কিভাবে যে সেদিন আমরা ছজন এক স্পেলেই আঠারোটা আজদাহা মাপের কাঁঠাল বয়ে নিয়ে এসেছিলাম তা আজ ও আমার কাছে এক বিষম বিস্ময়। যাহোক, কাঁঠালগুলিকে ওখানে সিঁড়ির নিচে লুকিয়ে রেখে হাত টাত ধুয়ে আমরা দিব্যি ভদ্রলোকের মত রিল্যাক্সড ভংগিতে একাডেমিক বিল্ডিং এর বারান্দা দিয়ে হেঁটে হেঁটে মেইন এন্ট্রান্সের দিকে এগোলাম। আপাতত মিশন স্থগিত। রাতে কোনো এক সময়ে এসে কাঁঠাল গুলো ডর্মে নিয়ে যেতে হবে।
কিন্তু বিধি বাম! বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট অতিক্রম করে বামে মোড় নিয়ে দু’কদম না এগোতেই আকাশবাণী শুনতে পেলাম – “এই! আপনাঁরা এখানে কীঁ করশেন ষ্যার?”

– সাইদ বিশ্বাস স্যারের ট্রেডমার্ক আওয়াজ। উপরে তাকিয়ে দেখি, হ্যাঁ তিনিই। বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের ঠিক উপরে দোতলার বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। ঈশ! টাইমিংটা একটু এদিক সেদিক হলেই ওনার শ্যেনদৃষ্টিটা এড়ানো যেত। জানি, এসময়ে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়। মাথার ভিতরে ঢ্যাঢ্যাং ঢ্যাঢ্যাং করে ছয় বছর আগে শোনা সিএইচএম শহিদ ওস্তাদের অমোঘ বানী বাজতে লাগলো, “ক্যাডেটস! বন্দুকের গুল্লি আইলেও হিলবা না, ফন্না থুলা শাফ দ্যাকলেও গাফরাইতা না (ফনা তোলা সাপ দেখলেও ঘাবড়াবে না)”। সাপ-বিচ্ছু দেখে না ঘাবড়ালেও মিঃ বিশ্বাসকে দেখে না ঘাবড়ে থাকাটা সেই সময়ে খুব একটা সহজ কাজ ছিল না। কলেজের অন্যতম সিনিয়র ফ্যাকাল্টি মেম্বার, এবং সেকালে ক্যাডেট মাত্রেই ওনার ভয়ে সদা থরকম্প অবস্থায় থাকতো। তার উপরে উনি তখন খায়বার হাউজের হাউজ টিউটর। আমাদেরকে ধরিয়ে দিতে পারলে হাউজ ডিসিপ্লিন কম্পিটিসানে তাঁর হাউজ আমাদের চেয়ে এগিয়ে যাবে। শান্ত থাকার আপ্রাণ চেষ্টায় লিপ্ত আমাদের কেউ একজন বলল, “স্যার, এই তো, এসেছিলাম একটু নিরিবিলিতে গ্রুপ স্টাডি করতে। সেটা শেষ করে এখন একটু ঘুরে বেরাচ্ছি মাথটা রিফ্রেশ করার জন্য”। আমাদের কেউ খারাপ ছাত্র না, আমি আর সহিদ ছিলাম SSC তে স্ট্যান্ড করা, বাকিরাও কাছাকাছি, ফেলনা নয় কেউ, জ্ঞানের সাধনায় বেলায়-অবেলায় একাডেমিক ব্লকে তো আসতেই পারি। স্যারের চেহারায় একটু কি বিভ্রান্তির ছাপ দেখতে পেয়েছিলাম? ঠিক মনে নেই। এর পরে টুকটাক দুএকটা কথাবার্তার পরে তিনি বললেন, শুনলাম কারা নাকি কাঁঠাল পেরেছে। এই সময়ে এদিকে ঘোরাঘুরি না করে হাউজে চলে যাও। আমরাও একযোগে আকাশ থেকে পড়ার ভান করে সুবোধ বালকদের মত সেখান থেকে চলে এলাম।

ভেবেছিলাম এযাত্রায় বোধ হয় পার পেয়েই গেলাম। কিন্তু না, শনির দশায় পড়ার পরেও কারো দিন ভালো গেছে এরকম নজির তো তাবৎ পাঁজি-পুঁথি ঘেঁটেও কোথাও পাই না। আমাদের বেলায় ব্যতিক্রম হবে কেন? রাতেই হাউজ মাস্টারের রুমে তলব পেলাম আমরা ছয়জন। বাংলার মাহবুবুল আলম স্যার, হাউজ মাস্টার, লম্বা লম্বা পা ফেলে ঘরময় পায়চারী করছেন। উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হাতের পাঞ্জা দুটিকে এক নাগাড়ে ভেনাস ফ্লাই ট্র্যাপের মত করে এক করছেন আবার দুরে সরিয়ে নিচ্ছেন। আমরা লাইন দিয়ে দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে টেনিস ম্যাচের আম্পায়ারের মত একযোগে একবার ডানে একবার বামে মাথা ঘুরিয়ে চোখ দিয়ে ওনাকে অনুসরণ করে যাচ্ছি। একসময় তিনি হঠাৎ আর্তনাদের মত করে বলে উঠলেন, “নাচ্ছিম! একি করলে তোমরা? ইজ্জৎ তো দেখছি ডুবিয়েই দিলে!!” নাসিমও মুহূর্তের মধ্যে চোখে মুখে ততোধিক মর্মাহত হবার ভাব ফুটিয়ে মাথাটা নীচের দিকে তাক করল। ভাবখানা এমন যে, এই বুঝি ধরণী দ্বিধা হবে আর অমনি সে সুরুৎ করে সেখানে সেঁধিয়ে যাবে। আমরা বাকিরাও নাসিমের দেখাদেখি ধরণীপানে আঁখিসম্পাত করিয়া উহাতে গর্ত, ফাটল কিংবা নিদেন পক্ষে একটুখানি চিড় আবিষ্কার করিবার জোর প্রচেষ্টায় মগ্ন হইলাম।

যাহোক, এরপরে স্যার যা বললেন তার সারসংক্ষেপ হল এরকম – আমরা চলে আসার পরে মিঃ বিশ্বাস সিঁড়ির নিচে রাখা কাঁঠালগুলি আবিস্কার করেন। কাঁঠালগুলির কয়েকটা একটু পাকা পাকা ভাব ছিলো, হাল্কা গন্ধ ছড়াচ্ছিলো। এরপরে তাঁকে আর দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে কোন বেগ পেতে হয়নি। রিতিমত ইউরেকা মোমেন্ট! সোজা ছুটে গেলেন মিটিং রুমে। প্রিন্সিপ্যাল স্যার এবং অন্যান্য শিক্ষকগন তখনও সেখানেই ছিলেন। তাঁদের সামনে কলেজের সম্পদের এহেন “mass destruction” এর জন্য বদর হাউজের ছয় বদ-ক্যাডেটকে দায়ী করে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়ে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে ফেললেন। সব শুনে প্রিন্সিপ্যাল স্যার পারলে সেই মুহুর্তেই আমাদেরকে বাসায় পাঠিয়ে দেন। কিন্তু মিঃ মাহবুব ও অন্যান্য শিক্ষকগন এটা তুচ্ছ পাপে মহা দন্ড হয়ে যাবে বলে তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হন। শেষমেশ মিঃ বিশ্বাসের নেতৃত্বে একটা তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তদন্ত কমিটির কাজ শুরুর আগে নিজেই একটু খতিয়ে দেখতে চাইলেন মিঃ মাহবুব। অবিশ্বাস্য ভাবে দিন দুয়েক সময় মঞ্জুরও হল। এর ধারাবাহিকতায় এখন তিনি আমাদের সাথে কথা বলছেন। তিনি এও বললেন যে, আমরা যদি সত্য স্বীকার করি তাহলে তিনি আমাদেরকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

আমরা ততক্ষনে বুঝে গেছি যে, ঘটনা অস্বীকার করে খুব একটা লাভ হবেনা। তারচেয়ে বরং মাহবুব স্যারের তৈরি করে দেয়া সুযোগটা কাজে লাগানোটাই বুদ্ধিমানসুলভ আচরণ হবে। সকপটে সব কিছু স্বীকার করলাম। মানে সবকিছু না, শুধু ওই ১৮ টি কাঁঠালের ব্যাপারে সবকিছুই খোলাখুলি স্বীকার করলাম। এর সাথে কিছুটা আবেগ মিশিয়ে আমরা বললাম যে, ক্যাডেট জীবনের এই সায়াহ্নে এসে দু’মুঠো কাঁঠালই তো খেতে চেয়েছিলাম। তাও নিজেদের বাড়ির গাছের কাঁঠাল। সেজন্যে এত গঞ্জনা! সেজন্য আমাদেরকে চোর বলে অভিহিত করা! এই কলেজ প্রাঙ্গণটাকেই তো এতদিন নিজের বাড়ি মনে করে এসেছি, আর শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণকেই তো পরিবার ও বাবা-মায়ের স্থানে দেখে আসছি, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি…

এক পর্যায়ে মিঃ মাহবুব আমাদেরকে থামিয়ে দিলেন, এমন আবেগাপ্লুত ভাষণ শুনে তিনি নিজেও হয়তো কিছুটা আর্দ্র হয়ে পড়েছিলেন। আমরাও থামলাম, এখনই সব আবেগ শেষ করে ফেললে আগামীতে প্রয়োজনের সময়ে ঢালবার মত আবেগ আর অবশিষ্ট থাকবে না। তিনি আমাদেরকে দুএক দিনের মধ্যেই আমাদের বলা কথাগুলো বিবৃত করে একটা ব্যাখ্যাপত্র লিখে তাঁর কাছে জমা দিতে বললেন। আমরাও পত্রপাঠ ঝাঁপিয়ে পড়লাম। HSC র পড়াশুনা সিকেয় তুলে দিনরাত খেটে তিনদিনের মধ্যে নামিয়ে দিলাম ২২ পৃষ্ঠার এক বিশাল ব্যাখ্যাপত্র। সেখানে খুব সামান্য অংশ জুড়ে ছিল মূল ঘটনার বিবরন, বাকিটা ছিল আমাদের আঘাতপ্রাপ্ত অনুভুতির এক বিশাল বহিঃপ্রকাশ। আগাগোড়া আবেগের ঠাস বুননে গাঁথা সেই পত্রে ইতিহাস ছিল, ভুগোল ছিল, ছিল কিশোর মনস্তত্ত্ব। আমাদের যার যতটুকু সাহিত্য প্রতিভা ছিল তার সবকিছুই ঢেলে দিয়েছিলাম সেখানে। তার সাথে যোগ করেছিলাম হরলাল রায়ের বাংলা ব্যকরণ ও রচনা থেকে শুরু করে তৎকালীন বাংলা নোটবই উচ্চ নাম্বারের সিঁড়ি। এমন কি বাংলা সিনেমায় শাবানা কিংবা রঞ্জিৎ মল্লিকের ভাষন থেকে সংগৃহীত সাহিত্য নির্যাসও বাদ পড়েনি। সেই ইতিহাসের সূচনা ক্যাডেট কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি থেকে। (একটু কাঁপা কাঁপা গলায় পড়তে হবে) … দেশ মাতৃকার সেবায় জীবন উৎসর্গ করে দেবার মহান বাসনা নিয়ে আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগে যে শিশু ঝাঁপিয়ে পরেছিল ক্যাডেট কলেজ অ্যাডমিসন টেস্ট নামক এক দুরূহ সংগ্রামে … কালের প্রবাহে আজ সে সাফল্যের সাথে ক্যাডেট জীবন শেষ করার দ্বারপ্রান্তে … এই দীর্ঘ সময়ের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা থেকে তাঁর এই ক্ষণিক বিচ্যুতিকে আমরা কি অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করব? না কি এই কলেজ প্রাঙ্গণকে অন্তর থেকে নিজের মনে করার এক স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ হিসাবে গণ্য করব? … ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এরকম আরও হাজারো আবেগি কথাবার্তা দিয়ে ২২ পৃষ্ঠা ভরে ফেলেছিলাম। আর সেই ব্যাখ্যাপত্রের শেষ লাইনে একথা জানাতে ভুললাম না যে, শুধুমাত্র আমাদের পিতৃতুল্য হাউজ মাষ্টারের স্নেহ, ভালোবাসা আর দায়িত্ববোধের কাছে পরাস্ত হয়েছি বলেই তাঁর কাছে কিছুই লুকোতে পারিনি।

তিনদিন পরে হাউজ মাষ্টারের রুমে গিয়ে সেই পত্র দিলাম মিঃ মাহবুবের হাতে। রিডিং গ্লাসটা পরে নিয়ে তিনি সেটি পড়তে বসলেন, গভীর মনোযোগে। স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে আমরা ছয়জোড়া চোখ চেয়ে আছি। একসময় দেখি হাউজ বেয়ারার এবাদত ভাইও রুমের ওপ্রান্ত থেকে গলা লম্বা করে পত্রের লিখন পড়ার চেষ্টা করছে। হাউজ বেয়ারারের এহেন বেয়াড়াপনা দেখেও বিরক্ত হবার মত মানসিক অবস্থা ছিল না আমাদের একজনেরও। মাহবুব স্যার পড়ছেন, কখনও হয়তো কপালে ভ্রুকুঞ্চন দেখা দিচ্ছে তো একটু পরে তা অপসৃত হয়ে যাচ্ছে। কখনও মাথাটি মৃদু নাড়লেন, বার দুয়েক সশব্দে নিশ্বাস ছাড়লেন নিজের অজ্ঞাতেই। একবার তো হাত দুটোকে দিয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত ভেনাস ফ্লাই ট্র‍্যাপ ও বানালেন! পত্রের শেষ লাইনটা পড়ার সময় একটু জোরের সাথেই মাথাটি উপর-নিচ করলেন। পড়া শেষ করে আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকালেন তিনি, সেই সাথে বুঝি ভাগ্যদেবীও। চোখে মুখে সাংঘাতিক রকমের ইম্প্রেসড অভিব্যক্তি নিয়ে বললেন, “নাচ্ছিম! এটা তোমরা কি লিখলে? সবাই কে তো দেখছি আবেগে ডুবিয়ে মারবে!!” আমরা বুঝলাম, শনির দশা কেটে গেছে।

বিশেষ করে শেষ লাইনটা তাঁকে সাংঘাতিক রকমের ইম্প্রেসড করেছিল। সেটা তাঁর কথার মাঝে বারবার প্রকাশ হয়ে যাচ্ছিলো। যাহোক, এই ব্যাপারটি নিয়ে আমাদেরকে আর কোন দুঃচিন্তা না করে HSC র পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে বললেন। আর বাকিটা কিভাবে কি করা যায় সেটা তিনি দেখবেন বলে আশ্বস্ত করলেন। তবে কথা দিতে হবে, আর কখনও এরকম দুষ্টুমি করব না। তাঁর উচ্ছ্বাস এবং আশ্বাসবাণীতে আমাদের যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়লো। নো প্রবলেম, অকাতরেই আমরা সেই শর্তে রাজি হয়ে চৌর্য্যবৃত্তি ছেড়ে দেবার অঙ্গিকার করলাম। তারপরে মনে একটা স্বস্তির ছোঁয়া নিয়ে ফিরে এলাম ডর্মে। প্রিন্সিপ্যাল স্যারের ফাইনাল ভারডিক্ট কি হবে সেটা নিয়ে ভাববার সময় নেই, আজকে আফটার লাইটস আউট ফিস্ট হবে, ফিয়েস্তা দি য়াকা – কাঁঠালভোজের মচ্ছব। মস্কের পাশের গাছ থেকে আনা সেই ২২টা কাঁঠাল এই ক’দিনে বেশ পেকে উঠেছে।
(লাইটস আউট)

গল্প শেষের গল্পঃ
প্রিন্সিপ্যাল স্যারের ফাইনাল ভারডিক্ট নিয়ে চিন্তা করতে চাইনি, কখনও করতেও হয়নি। সপ্তাহ খানেক পরে কোন একদিন লাঞ্চের আগে হাউজে ঢুকতে গিয়ে দেখি সামনের লনে যত্ন করে রাখা সুবিশাল এক কাঁঠাল। ডর্মে ঢুকে দেখি আমাদের ছয়জনের প্রত্যেকের টেবিলের উপরে একটা করে বাচ্চা কাঁঠাল! এবাদত ভাই জানালো, এগুলো আমাদের জন্য প্রিন্সিপ্যাল স্যারের উপহার। তিন হাউজের ক্লাস টুয়েলভ এর জন্য তিনটা হাল্ক সাইজের কাঁঠাল আর আমাদের ছয়জনার জন্য স্পেশাল ভাবে ছয়টা ছোট কাঁঠাল। লাঞ্চের সময়ে প্রিন্সিপ্যাল স্যার স্বয়ং ডাইনিং হলে এসে ঘুরে ঘুরে আমাদের ছয়জনের কাছেই এসেছিলেন। পাশে এসে জিজ্ঞাসা করছিলেন, হাউ ইজ দ্য টেস্ট অব দ্য কাঁঠাল, ইজ ইট সুইট? মনে মনে বলেছিলাম, আপনার অফিসের পেছনের বাগানের গুলো আর টেস্ট করতে পারলাম কই! শুধু শফিউল্লাটা মিনমিন করে বলে উঠলো, স্যার একটু সর্ষের তেলের যোগান দিলে ভালো হয়, কাঁঠাল ছাড়াতে ছাড়াতে আমাদের স্টক প্রায় শেষ অথচ ডর্মে এখনও অনেকগুলো কাঁঠা… এই পর্যায়ে জোর চিমটি দিয়ে ওকে না থামালে সর্বনাশটা প্রায় ঘটেই যাচ্ছিলো! যাহোক, সবকিছু ভালো ভাবেই শেষ হল, আর এরপর থেকে প্রতি সপ্তাহে একদিন নিয়মতভাবে আমাদের টেবিলে কাঁঠাল কিংবা অন্য কোন মৌসুমি ফল আসতে থাকলো।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: