পড়ুয়ার ডায়েরি-১: কেউ ভোলে না কেউ ভোলে

মূল লেখার লিংক
অনেকদিন আগে শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের “বদলি মঞ্জুর” নামে একটি ছোট গল্প পড়েছিলাম। করুণ সেই গল্পটি মনে দাগ কেটেছিল। এরপর তাঁর আরো কয়েকটি ছোটগল্প পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কল্লোল যুগের প্রতিনিধি এই সাহিত্যিক এবং চলচ্চিত্র পরিচালকের আর কোন গল্প কিংবা উপন্যাস পড়া হয়নি। দেখা হয়নি তাঁর কোন চলচ্চিত্র। সেদিন বইয়ের দোকান গুলিতে ঢুঁ মারতে মারতে হঠাৎ দৃষ্টি চলে গেল তাঁর নামাঙ্কিত একটি বইয়ের দিকে।

বইয়ের শিরোনাম “কেউ ভোলে না কেউ ভোলে”।

শৈলজা যে কাজী নজরুল ইসলামের বাল্যসখা ছিলেন এই তথ্যটি অজানা ছিলনা। নজরুলের গানের লাইন এবং শৈলজানন্দের নাম দুইয়ে মিলে কিঞ্চিৎ আগ্রহের সৃষ্টি হল। বইটি তাক থেকে নামিয়ে দেখি নজরুলেরই ছবি অঙ্কিত প্রচ্ছদে।

পাতা উল্টে উৎসর্গপত্রটি পড়ে মন ভিজে গেল-

“আমার সৌভাগ্য, আমি আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে পেয়েছিলাম এমন একটি মানুষকে, ঠিক যেরকম মানুষ সচরাচর চোখে পড়ে না। কবি নজরুল ইসলাম সেই বিরলসংখ্যক মানুষের মধ্যে একজন। অনেকের চেয়ে স্বতন্ত্র। অজস্র প্রাণপ্রাচুর্য, অবিশ্বাস্য রকমের হৃদয়ের উদারতা, বিদ্বেষ কালিমামুক্ত, অপাপবিদ্ধ একটি পবিত্র মন, আর নিরাসক্ত সন্ন্যাসীর মতো একটি আপনভোলা প্রকৃতি। আমার সৌভাগ্য, আমিই তার একমাত্র বন্ধু যার কাছে তার জীবনের গোপনতম কথাটি পর্যন্ত সে অকপটে প্রকাশ করেছে।আমার দুর্ভাগ্য, আমার সেই পরমতম বন্ধুর জীবনের মধ্যাহ্নবেলায় ভাগ্যের নিষ্ঠুর একটি মসীকৃষ্ণ যবনিকা নেমে এলো তার মানসলোকে। আমার এ দুর্ভাগ্যের দুঃখ কেউ যদি বোঝে তো বুঝবে মাত্র একজন-যার দুঃখ-দুর্ভাগ্যের কোনও সীমা-পরিসীমা নেই।

সেই পরম সৌভাগ্যবতী এবং চরম অভাগিনী
কবি-প্রিয়া শ্রীমতি প্রমীলার
হাতে এই বইখানি তুলে দিলাম”।

এ বই যতদিনে প্রকাশিত হয়েছে ততদিনে নজরুলের জীবনে নেমে এসেছে ঘোর অমানিশা। থেমে গেছে সদাচঞ্চল প্রাণোচ্ছল কবির সকল উচ্ছলতা। বাকশক্তিরহিত নজরুলের জীবন সুধা নিঃশেষপ্রায়। কি করুণ আর যন্ত্রণাময় সেই জীবন!

তবে এই বই নজরুলের সেই দুর্ভাগ্য কণ্টকিত দিনগুলি নিয়ে নয়। এই বই নজরুল আর শৈলজানন্দের শৈশব, কৈশোর আর প্রথম তারুণ্যের সেই আনন্দময় আলোকিত দিনগুলি নিয়ে। যে দিনগুলি নিয়ে অনেক অনেক দিন পর পক্ককেশ আর দন্তহীন মাড়ি নিয়েও অস্পষ্ট স্বরে বলা যায় “আহা কি সুখের দিন ছিল”।

রাণীগঞ্জের রায়সাহেবের ফুলবাগানের পাশে ছোট্ট মাটির ঘর। খড়ে ছাওয়া সে ঘরের নাম ‘মহামেডান বোর্ডিং’।
“পাঁচটি মুসলমানের ছেলে বাস করে এখানে। সেই পাঁচটি ছেলের ভেতর একটি হল-দুখু মিঞা। ভালো নাম-কাজি নজরুল ইসলাম।”

রায় সাহেবের নাতি শৈলজানন্দের সাথে দুখু মিয়ার বন্ধুতার শুরু এই মহামেডান বোর্ডিঙের মাটির ঘরেই। ‘শিয়াড়শোল রাজার স্কুলে’ পড়ুয়া নজরুলের সাথে শৈলজার সেই আজীবন বন্ধুতার প্রারম্ভের গল্প মন কেমন করা স্নিগ্ধ ভাষায় পড়তে পড়তে যেন সেই সময়টাতে ফিরে গিয়েছিলাম নিমেষেই।

বইয়ের প্রথম কয়েক পাতা উৎসর্গীকৃত ‘ছিনু’ নামের স্বাস্থ্যবান সুন্দর সদাহাস্যময় একটি চরিত্রের প্রতি। নজরুলকে বড় ভালোবাসত এই ছিনু। নজরুলের সব দৈনন্দিন কাজ বিনা দ্বিধায় করে দিত ছিনু। ছিনু সবাইকে হাসিয়ে মারতো। এই আনন্দময় কিশোরটির কথায় “মনের সকল অন্ধকার কেটে যেত”, “প্রাণ খুলে হেসে বাঁচতাম”- লিখেছেন শৈলজা।

লেখক এই উচ্ছল কিশোরটিকে বহুদিন পর আবার খুঁজে পেয়েছিলেন এক জনাকীর্ণ রেলস্টেশনে। ততদিনে জীবনের কাছে হেরে যাওয়া দুঃখজর্জর এক শীর্ণ বৃদ্ধে পরিণত হয়েছে ছিনু। রেলের কম ভাড়ার টিকিট কিনতে গিয়ে মার খাওয়া সেই বৃদ্ধের ভেতর আনন্দোচ্ছল প্রাণবন্ত সেই ছিনুকে খুঁজে পেলেন না শৈলজা। ছিনুর শেষ কথাটি বুকে বড় বাজে-“তোমাকে দেরি করিয়ে দিলাম মিঞা সাহেব। আর ক’দিনই বা বাঁচবো। তবু যাবার আগে একবার দেখা হল…”

শৈলজা এবং নজরুলের সেই মাটি মাখা শৈশবের বয়ে যাওয়া দিনগুলিতে ঘটে যাওয়া বিচিত্র সব ঘটনা মায়াময় ভাষায় আমাদের সামনে এসে হাজির হয় লেখকের কলমে।

চঞ্চল দুটি কিশোর কখনো ট্রেনে কাটা পড়া সাঁওতাল মেয়েকে দেখতে গিয়ে পথহারা ইংরেজ পরিবারকে পথ দেখান, কখনো গরিব ইংরেজ শেকার সাহেবের কাছে ইংরেজি শিখতে গিয়ে সঞ্চয় করেন বিচিত্র অভিজ্ঞতা। দুগগা আর মোতির মা নামের দুটি উজ্জ্বল চরিত্রের সাথে পরিচয় হয় এই সময়েই।

একবার স্কুলে ছোট্ট একটি চড়ুই ছানা পড়ে গেল বাসা থেকে। নজরুল কাঁধে করে মই বয়ে এনে বাচ্চাটিকে তুলে রাখলেন তাঁর বাসায়। এই চড়ুই ছানাটিকে নিয়ে শৈলজানন্দ লিখলেন একটি কবিতা আর নজরুল লিখলেন একটি কথিকা( শৈলজানন্দের মতে বর্তমানের গদ্য কবিতা)। প্রিয় বন্ধুর লেখা সেই কথিকা খানি সযত্নে তুলে রেখেছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়।

পঞ্চু নামের সেই বড়লোক বন্ধুটি, যার ঐশ্বর্যের সীমা নেই। পঞ্চুর আছে গাদা গাদা ডিটেকটিভ নভেল, টিনের বাক্সো ভর্তি বিলেতি বিস্কুট, ঘরভর্তি পঞ্চম জর্জ, সপ্তম এডোয়ার্ড আরো কত লাট বেলাটের ছবি! সর্বোপরি পঞ্চুর ছিল নজরুলের কাছে মহার্ঘ্য বস্তু একটি বিলেতি এয়ারগান। পঞ্চুর সেই এয়ারগানটি নিয়ে কিশোর নজরুল প্রতিনিয়ত পরখ করে চলেন হাতের টিপ। পেঁপে কিংবা ইটের দেয়ালকে ইংরেজ বানিয়ে লক্ষ্যভেদ করতে থাকেন নজরুল। সেসবের নিত্য সঙ্গী প্রিয় বন্ধু শৈল।

দুজনের জীবনেই ঘটে যায় আরো কত কত বিচিত্র সব ঘটনা। এর মাঝেই কৈশোর থেকে সদ্য তারুণ্যে উত্তীর্ণ দুই বন্ধু ঘর ছাড়ার পণ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে তখন। প্রতিদিন ট্রেন ভর্তি করে বাঙালি ছেলেরা যুদ্ধ করতে যাচ্ছে বাঙালি পল্টনে যোগ দিয়ে। নজরুল একদিন এমনি একটি সৈনিক ভর্তি ট্রেন দেখিয়ে শৈলকে বললেন-“যাবে?”।

শৈল এক মুহূর্ত দেরি না করে বল্লেন-“ হ্যাঁ যাবো”।

নজরুল ইংরেজের উপর মোটেও প্রসন্ন নন, রাজভক্তি একদমই নেই। শৈল তাই নজরুলকে জিজ্ঞেস করলেন কেন যাচ্ছো যুদ্ধে?

নজরুল উত্তর দিলেন-“যুদ্ধ একটা বিদ্যে জান তো, সেই বিদ্যেটা আমরা শিখে নেব”। নজরুল যুদ্ধবিদ্যা শিখে এসে বিরাট সৈন্যবাহিনী গঠন করে দেশ থেকে ইংরেজ তাড়াবেন এই মতলবের কথা বন্ধুকে বলেছিলেন। আর শৈল যুদ্ধে যেতে চেয়েছিলেন শুধুই প্রিয় বন্ধুর সঙ্গ সুখ লাভের আশায়।

কিন্তু বিধিবাম! যুদ্ধে যাবার জন্য নজরুলের বুকের ছাতি যথেষ্ট চওড়া হলেও শৈলজার বুকের ছাতি নাকি তা নয়! বন্ধুর সাথে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা, অপমান ক্ষোভে বিহ্বল শৈলজানন্দের দুঃখে পাঠক আমিও বিচলিত হয়ে উঠি।

এর পরের গল্পটুকু মূলত শৈলজার। নজরুল চলে যাবার পর বন্ধুহীন শৈল একদিন অচেনা নির্জন পথ ধরে চলে যান তাঁর বাউন্ডুলে বাবার কাছে। সেই বাবা থাকেন শাল বনের প্রান্তরে, শেয়ালের ডাক আর সাঁওতালদের মাদলের আওয়াজে মুখর, মহুয়ার গন্ধে মাতাল একটি গ্রামে।

শৈলজার বাবা পথে প্রান্তরে, বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ান, সাপ ধরেন, বিনা পয়সায় লোকের চিকিৎসা করেন, জাদু দেখিয়ে বেড়ান। বহুবর্ণিল বিচিত্র সেই বাবার সাথে মৃত্তিকার সন্নিধানে কিছুদিন কেটে যায় শৈলজার।
এর ভেতরেও নজরুল আছেন। শৈল এবং নজরুল চিঠি লিখতে থাকেন একে অপরকে।

তারপর একদিন শৈলজা সেই মৃন্ময় আশ্রয় ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন, আর বাঙালি পল্টন ভেঙে গেলে হাবিলদার নজরুলও ফিরে এলেন। ফিরে এলেন বন্ধুর কাছেই।

সদ্যযুবা দুই বন্ধুর আবার একসাথে পথ চলার শুরু এখান থেকেই।

প্রিয় সখা নজরুলকে নিয়ে শৈলজানন্দের রেখাচিত্রের সমাপ্তিও এইখানে।

এই বই প্রিয় বন্ধুর প্রতি নিষ্কলুষ ভালবাসার প্রতিচ্ছবি, অসাধারণ দুটি মানুষের শৈশবের অলোকিত আখ্যান। শৈশব, কৈশোর আর সদ্য তারুণ্যের রঙিন দিনের কথকতা শৈলজার মায়াময় ভাষায় পড়তে পড়তে আবেগাকুল হয়েছি বারবার। এমন বই বারবার পড়া যায়, এমন বই মনে যে রেখা অঙ্কন করে তা মুছে যায় না দীর্ঘদিনেও।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: