সর্বকালের সেরা ১০ ধনী

মূল লেখার লিংক
সর্বকালের সেরা ১০ ধনী
চলমান শতাব্দীকে পৃথিবীর ইতিহাসে ধনীদের স্বর্ণযুগ বা স্বর্ণসময় বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বিল গেটসকে তারা মনে করেন সর্বকালের সেরা। এ সব ধারণা আদতে ভুল। বাস্তবতা বলে বিশ্বের সমসাময়িক ধনী ব্যক্তিরা অতীত ইতিহাসের ধনীদের তুলনায় অনেকটাই ফ্যাকাশে এবং সর্বকালের ধনীর তালিকায় আজকের যুগের ধনাঢ্যরা অনেকটাই পিছিয়ে।

আজকের সময়ে বিশ্বের অধিকাংশ ব্যক্তিই তাদের অর্থের পাহাড় ব্যবসায়িক বিনিয়োগ ও দখলদারিত্বের মাধ্যমে গড়ে তুললেও ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে সম্পদশালী হওয়ার পথ আরো অনেক বেশি সাংঘর্ষিক ছিল।

সময়ের বিশাল ব্যবধান, অর্থনৈতিক পদ্ধতি ও মুদ্রামানের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান সত্ত্বেও বিশ্বের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা দশ ধনীর তালিকায় প্রাচীন আমলই বেশি আলোকিত।

১০. চেঙ্গিস খাঁ

সর্বকালের অন্যতম সফল একজন সামরিক শাসকের নাম চেঙ্গিস খাঁ। মঙ্গল সাম্রাজ্যের এ শাসকের নিয়ন্ত্রণ ছিল চীন থেকে শুরু করে সুদূর ইউরোপ অবধি। ইতিহাসে সবচেয়ে বিশালায়তন সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন তিনিই। তবে বিপুল প্রভাবশালী হওয়া সত্ত্বেও চেঙ্গিস খাঁ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেন, তিনি কখনোই সম্পদ আহরণ বা মজুদ করতেন না। বিপরীত মত থেকে জানা যায়, চেঙ্গিস খাঁর প্রভাবের চাবিকাঠিই ছিল তার উদারতা।

তার সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি ছিল লুণ্ঠনকৃত সম্পত্তি নিজের সৈনিক ও সেনাপতিদের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়া। অনেক প্রাক-আধুনিক সেনাবাহিনীর সাথে মঙ্গল সৈনিকদের পার্থক্য ছিল এই যে মঙ্গল সৈনিকরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে লুটপাট করত না। কোনো অঞ্চল দখলে সফল হওয়ার পর সেখানকার প্রতিটি জিনিসের একটি তালিকা তৈরি করতেন সরকারি কর্মচারীরা এবং তারপর তালিকা অনুসারে সেগুলো সেনাবাহিনী ও তাদের পরিবারের মধ্যে বণ্টন করা হতো।

এরপর অবশিষ্ট যা কিছু চেঙ্গিস খাঁর ভাগে পড়তো, সেগুলো দিয়ে তার ধনী হওয়া খুব একটা সম্ভবপর নয়। তার নিজের কিংবা নিজ পরিবারের জন্য চেঙ্গিস খাঁ কোনো প্রাসাদ, কোনো মন্দির, কোনো দরবার, কোনো সমাধি, এমনকি কোনো বাড়িও নির্মাণ করেননি। যেভাবে জন্মেছিলেন, সেভাবেই একজন সাধারণের মতই পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিয়েছিলেন তিনি।

৯. বিল গেটস

বিশ্বের সর্বকালের ধনীতম ব্যক্তিত্বের তালিকার একমাত্র জীবিত ব্যক্তিটির নাম বিল গেটস। জীবিত বলেই ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র বিল গেটসের সম্পদেরই সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর মাইক্রোসফট প্রতিষ্ঠাতার নিট আয় ৭৮.৯ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান বিশ্বে জীবিত দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তি জারা’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যামানিকো ওর্টেগার চাইতে আট বিলিয়ন ডলার বেশি মূল্যের সম্পদের মালিক গেটস।

৮. অ্যালান রুফুস

সম্রাট উইলিয়ামের ভাতিজা রুফুস ইংল্যান্ড বিজয়ে নরম্যানদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন চাচার বাহিনীতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে। মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন ১১ হাজার পাউন্ডের মালিক, ‘রিচেস্ট অব দ্য রিচ’ বইয়ের লেখক ফিলিপ বেরেসফোর্ড এবং বিল রুবিনস্টেইনের তথ্য অনুযায়ী- সে সময় এই ১১ হাজার পাউন্ড ছিল তৎকালীন ইংল্যান্ডের মোট জিডিপি’র সাত শতাংশ। তখনকার ১১ হাজার পাউন্ড ২০১৪ সালের বাজারমূল্যে ১৯৪ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।

৭. জন ডি রকফেলার

১৮৬৩ সালে তেল শিল্পে বিনিয়োগ করতে শুরু করেছিলেন রকফেলার এবং ১৮৮০ সাল নাগাদ তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্ট্যান্ডার্ড অয়েল, যে প্রতিষ্ঠানটি সে সময় গোটা যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ শতাংশ তেলের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করত।

১৯১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় আয়কর রিটার্ন বিভাগ সূত্রে জানা যায়- রকফেলার প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদের মালিক ছিলেন, যা সে বছর গোটা দেশটির মোট আয়ের দুই শতাংশ ছিল।

ওই বছরের দেড় বিলিয়ন ডলার ২০১৪ সালের বাজারমূল্যে ৩৪১ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।

৬. অ্যান্ড্রু কার্নেগি

সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ টানতে সক্ষম হয়েছিলেন রকফেলার। কিন্তু গোটা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা ধনী ব্যক্তি সম্ভবত অ্যান্ড্রু কার্নেগিই। তার প্রতিষ্ঠান ইউএস স্টিল ১৯০১ সালে ৪৮০ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি করেছিলেন জেপি মর্গানের কাছে। সে সময়ে এই অর্থ তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জিডিপি’র ২.১ শতাংশ ছিল। আর কার্নেগির মোট সম্পদ ২০১৪ সালের বাজারমূল্যে ৩৭২ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ।

৫. জোসেফ স্তালিন

আধুনিক অর্থনীতির ইতিহাসে স্তালিনের নাম খুব একটা শোনা যায় না। প্রবল প্রতাপশালী স্তালিন ছিলেন একজন স্বৈরশাসক এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। সোভিয়েত ইউনিয়নের মোট সম্পদ থেকে স্তালিনের মোট সম্পত্তি পৃথক করা দৃশ্যত অসম্ভব হলেও এই দুইয়ের মিশেলের কারণেই বিশেষজ্ঞরা তাকে সর্বকালের সেরা অন্যতম ধনী ব্যক্তি হিসেবে মনোনীত করে থাকেন।

৪. সম্রাট আকবর

ভারতবর্ষে মোগল সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ অধিপতি সম্রাট আকবর তার সময়ে সারা বিশ্বের মোট আয়ের এক-চতুর্থাংশের মালিক ছিলেন।

ইতিহাসবিদরা বলেন, আকবরের অধীনে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি তৎকালীন রানী এলিজাবেথের শাসনাধীন ইংল্যান্ডের মাথাপিছু জিডিপি’র সাথে তুলনীয় ছিল। কিন্তু সম্রাট আকবর ও তার অধীনে শাসক শ্রেণির ‘অমিতব্যয়ী ও অসংযত জীবনযাপনের কারণেই ইউরোপীয় সমাজের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে’ ভারত।

জনগণের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের দিক থেকে মোগল সাম্রাজ্য ছিল ইতিহাসের অন্যতম সফল সাম্রাজ্য।

৩. সম্রাট শেনজং

চীনের সং সাম্রাজ্য (৯৬০-১২৭৯) ছিল অর্থনৈতিক দিক থেকে সর্বকালের অন্যতম প্রভাবশালী সাম্রাজ্য। তামকাং ইউনিভার্সিটির সং সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ, চীনা অধ্যাপক রোনাল্ড এ এডওয়ার্ডস জানান, শাসনের সফলতম সময়ে সং সাম্রাজ্যের জাতীয় আয় ছিল সারা বিশ্বের অর্থনীতির ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ।

আয়কর সংগ্রহে দারুণ দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন- এই দুইই ছিল সং সাম্রাজ্যের বিপুল সম্পদের মূল উৎস। ইউরোপীয় সরকার আমলের কয়েকশ’ বছর আগেই এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছিল সং সাম্রাজ্য।

এ ছাড়া, সং সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা ছিল ভীষণরকমের কেন্দ্রীভূত। অর্থাৎ গোটা অর্থনীতির ওপরেই সম্রাটের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল।

২. অগাস্টাস সিজার

অগাস্টাস সিজার ছিলেন এমন একটি সাম্রাজ্যের অধিপতি, যার মোট আয় ছিল তৎকালীন সময়ে গোটা বিশ্বের মোট আয়ের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। শুধু তাই নয়, শাসনের এক পর্যায়ে সাম্রাজ্যের মোট অর্থনীতির এক-পঞ্চমাংশের সমপরিমাণ ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জন করেছিলেন তিনি, যা ২০১৪ সালের বাজারমূল্যে ৪.৬ ট্রিলিয়ন ডলারের সমতুল্য।

১. মনসা মুসা

টিমবুক্তুর রাজা মনসা মুসা, যাকে এক কথায় সর্বকালের ইতিহাসে সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে স্বীকার করেন আজকের বিশ্বের প্রত্যেক ইতিহাসবিদ।

গবেষণা বলে, মুসার পশ্চিম আফ্রিকান রাজ্য ছিল বিশ্বের বৃহত্তম স্বর্ণ উৎপাদনকারী অঞ্চল, তাও এমন এক সময়ে- যখন স্বর্ণের ব্যাপক চাহিদা ছিল।
কেমন ধনী ছিলেন মুসা? তার সম্পদের সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করা যায়নি আজও। তথ্যেরও রয়েছে অভাব, বলতে গেলে তথ্য নেইই। সমসাময়িক সূত্রে জানা যায়, মুসা যতোটা ধনী ছিলেন- ততটা ধনী হওয়ার বিষয়ে সে সময়ে অন্য কারো জন্য অসম্ভব এবং কল্পনাতীত ছিল।

মক্কায় হজযাত্রী হিসেবে মনসা মুসার যাত্রার ঘটনা বেশ বিখ্যাত এবং এ বিষয়ে রয়েছে প্রচুর গল্পও। সে সময়ে মুসার জীবনযাত্রা এতটাই বিলাসবহুল ছিল যে এর ফলে মিশরের মুদ্রাবাজারে ব্যাপক সংকট শুরু হয়ে যায়। ওই হজযাত্রায় মুসার বহরে থাকা অর্ধশতাধিক উটের পিঠে করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কয়েকশ’ পাউন্ড ওজনের স্বর্ণ।

অনেকে বলেন- কেবল ওই এক যাত্রাতেই মুসার সাথে যাত্রা করা সেনাবাহিনীতে ৪০ হাজার জন তীরন্দাজসহ ছিল দুই লাখ সৈনিক, আজকের বিশ্বে অনেক পরাশক্তিশালী দেশই যে সংখ্যক সৈনিক যুদ্ধের ময়দানে নামানোর কথা ভাবতেই পারবে না।

যখন কারো সম্পদের পরিমাণ নির্ণয়ই করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, তখন বুঝতেই হবে যে তিনি কল্পনাতীত রকমের ধনাঢ্য!

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: