টীকা কিভাবে কাজ করে

মূল লেখার লিংক
বর্তমান সময়ের বিজ্ঞানের এক বিস্ময়কর আবিস্কার হলো টীকা বা vaccine. টীকা আমাদের শরীরের প্রাকৃতিক রোগ-প্রতিরোধ (immune system) ব্যবস্থার সাথে একসাথে কাজ করে অনেক ভয়ঙ্কর ও জীবনঘাতী রোগ-সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদেরকে সয়হাতা করেছে এবং করছে। এ লেখায় ব্যাখ্যা করা হবে কিভাবে আমাদের দেহ বিভিন্ন রোগ সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং কিভাবে টীকা এ লড়াইয়ে আমাদেরকে শক্তিশালী ও কার্যকরী নিরাপত্তা প্রদান করে।
immunesystem110413
আমাদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা—

টীকার কার্যপদ্ধতি বোঝার জন্য আমাদেরকে আগে জানতে হবে কিভাবে আমাদের শরীর বিভিন্ন অসুখের বিরুদ্ধে লড়াই করে। যখন কোনো জীবাণু যেমন ব্যাকটেরিয়া অথবা ভাইরাস আমাদের শরীরে প্রবেশ করে, তখন সেই জীবাণু আমাদের দেহের স্বাভাবিক কার্যক্রমের উপর আক্রমন চালায় এবং একই সাথে নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি করে যেতে থাকে। এই ধরণের বহিরাক্রমণের ঘটনাকে বলা হয় সংক্রমণ (infection) এবং এই সংক্রমণ আমাদের দেহে বিভিন্ন ধরণের অসুস্থতার জন্য অনেকাংশেই দায়ী। এই ধরণের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য আমাদের দেহে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা। যেমন আমাদের রক্তের শ্বেত রক্তকণিকা (leukocyte) আমাদের দেহের রক্ষক হিসেবে কাজ করে এবং বিভিন্ন ধরণের রোগ-সংক্রমণ দমনের জন্য তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। শ্বেত কণিকা রয়েছে মূলত তিন ধরণের- বি লিম্ফোসাইট (B-lymphocytes), টি লিম্ফোসাইট (T-lymphocytes) ও ম্যাক্রোফেজ (macrophages). এদের কাজ সম্পর্কে নিচে কিছু সংক্ষিপ্ত তথ্য দেয়া হল—

১. ম্যাক্রোফেজ- ম্যাক্রোফেজ আমাদের দেহের মৃত বা মৃতপ্রায় কোষ গুলো ভক্ষণের পাশাপাশি রক্তে অনুপ্রবেশকারী বিভিন্ন জীবাণুদেরকেও ধ্বংস করে এবং রক্তে অ্যান্টিজেন (antigen) নামক সেইসব বহিরাগত জীবাণুর কিছু অংশ রেখে যায়। আমাদের শরীর তখন সেইসব অ্যান্টিজেন গুলোকে ক্ষতিকর ও বিপদজনক বস্তু হিসেবে সনাক্ত করে এবং এর প্রতিরোধে আক্রমনের জন্য উদ্দীপনা যোগায়।

২. বি লিম্ফোসাইট- বি লিম্ফোসাইট থেকে উৎপন্ন হয় অ্যান্টিবডি (antibody) এবং এই অ্যান্টিবডি ম্যাক্রোফেজের ফেলে রেখে যাওয়া অ্যান্টিজেনে উপর আক্রমণ চালায়।

৩. টি লিম্ফোসাইট- টি লিম্ফোসাইট দেহের সংক্রমিত কোষ গুলোর উপর আক্রমণ চালায় সেগুলোকে ধ্বংস করে।

শরীর যখন প্রথমবারের মত কোনো নতুন জীবাণুর সম্মুখীন হয় তখন সেই সংক্রমণের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক কার্যকরী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কয়েকদিন থেকে সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। অতঃপর সংক্রমণের পর সেই জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ প্রক্রিয়া আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধক ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম সংরক্ষণ করে। পরবর্তীতে সেই জীবাণুটি যদি আবারও শরীরে অনুপ্রবেশ করে তবে টি লিম্ফোসাইট সাথে সাথে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং রক্তে আবারও একই ধরণের অ্যান্টিজেন উপস্থিত হলে বি লিম্ফোসাইট তার প্রতিরোধে কার্যকরী অ্যান্টিবডি তৈরী ও অবমুক্ত করে।

টীকার কার্যপদ্ধতি–

টীকার প্রয়োগ দেহে এক ধরণের নকল সংক্রমণের সৃষ্টি করে এবং এ প্রক্রিয়ায় আমাদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধক ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়। এ ধরণের সংক্রমণ দেহে কোনো ধরনের অসুস্থতার সৃষ্টি না করলেও এটি দেহে টি লিম্ফোসাইট ও অ্যান্টিবডি তৈরিতে গুরত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখে। তথাপি টীকা প্রয়োগের পর শরীরে কিছু ছোটখাটো রোগের উপসর্গ দেখা যায় যেমন হালকা জ্বর বা শরীরে ব্যাথা অনুভব হতে পারে। কিন্তু এগুলা অস্বাভাবিক কিছু নয় বরং টীকা প্রয়োগের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।

নকল সংক্রমণের তীব্রতা কমে গেলে শরীরে থেকে যায় টি লিম্ফোসাইট ও বি লিম্ফোসাইট যা মনে রাখে ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে পরবর্তীতে কিভাবে লড়াই করতে হবে। টীকা দেবার পর শরীরে পর্যাপ্ত টি লিম্ফোসাইট ও বি লিম্ফোসাইট তৈরী হতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এর পরই শরীর সেই জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরির জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়।

vaccine-syringe-dark-blue

টীকার প্রকারভেদ–

বিজ্ঞানীরা কোন জীবাণুর সংক্রামণের বিরুদ্ধে টীকা তৈরির জন্য নানা ধরণের পন্থা অবলম্বন করেন। এই পন্থাগুলা নির্ধারিত হয় সেই জীবাণুর ধরণের উপর নির্ভর করে, যেমন সেই জীবাণুটি কিভাবে দেহের কোষকে আক্রমণ করে কিংবা দেহের রোগ-প্রতিরোধক ব্যবস্থা সেই জীবাণুর দ্বারা কি রকমভাবে প্রভাবিত হয়। এছাড়া টীকার আঞ্চলিক ব্যবহারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারণ জীবাণুর প্রকরণ (strain), পরিবেশ (যেমন তাপমাত্রা, আবহাওয়া), টিকার সরবরাহ অথবা ঝুকি ইত্যাদি এক এক অঞ্চলের ক্ষেত্রে এক এক রকম হয়। এসকল বিষয়ের উপর ভিত্তি করে মূলত পাঁচ ধরনের টীকা রয়েছে —

১. জীবিত কিন্তু দূর্বল টীকা (Live, attenuated vaccines)- এ ধরণের টীকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। এই টীকাতে কিছুটা দূর্বলকৃত কিন্তু জীবন্ত ভাইরাস ব্যবহার করা হয়। ব্যবহৃত ভাইরাস দূর্বল হবার কারণে তা সরাসরি মানুষের দেহে কোনো অসুস্থতার সৃষ্টি করে না কিন্তু ভাইরাসগুলো জীবিত থাকবার কারণে দেহ এক ধরণের বাস্তব সংক্রমণের শিকার হয়। ফলে আমাদের রোগ-প্রতিরোধক ব্যবস্থা সেই দূর্বল সংক্রমণকে নিরীক্ষা করে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। হাম (measles), মাম্পস (mumps), রুবেলা (rubella), চিকেনপক্স (chickenpox) ইত্যাদির প্রতিরোধে এই ধরণের টীকা ব্যবহৃত হয়। এই ধরণের টীকা ব্যবস্থা খুবই কার্যকরী হলেও সবাই এটি গ্রহণ করতে পারে না, বিশেষ করে বাচ্চারা যাদের রোগ-প্রতিরোধক ব্যবস্থা দূর্বল (যেমন যারা কেমোথেরাপি নিচ্ছে) তাদের জন্য এটি মোটেই উপযোগী নয়।

২. নিষ্ক্রিয় টীকা (­Inactivated vaccines)- এই ধরণের টীকাও ভাইরাস দ্বারা সংগঠিত সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই টীকা তৈরীর সময় ভাইরাসকে একেবারে নিস্ক্রিয় অথবা মেরে ফেলা হয়। পোলিও টীকা হলো এই ধরণের টীকার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে পোলিও ভাইরাস কে একেবারে নিস্ক্রিয় করে টীকা প্রস্তুত করা হয়। এই টীকার ক্ষেত্রে রোগ-প্রতিরোধক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখবার জন্য অনেক সময় একাধিক ডোজ এর প্রয়োজন হতে পারে।

৩. টক্সয়েড টীকা (Toxoid vaccines)- ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংগঠিত রোগ প্রতিরোধের জন্য ব্যবহার হয় এই ধরণের টীকা। এই টীকা প্রস্তুতিতে বিষকে (toxin) দূর্বল করে ফেলা হয় যাতে তা কোনো অসুস্থতার সৃষ্টি করতে না পারে। এই দূর্বলকৃত বিষকে বলা হয় টক্সয়েড। শরীর যখন এই ধরণের টীকা গ্রহণ করে তখন শরীর বুঝতে পারে কিভাবে সেই বিষটিকে প্রশমন করতে হবে। এই টীকার একটি উদাহরণ হলো DTaP টীকা যাতে ডিপথেরিয়া ও টিটেনাস এর টক্সয়েড রয়েছে।

৪. সাবইউনিট টীকা (Subunit vaccines)- এই টীকার প্রস্তুতিতে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার অংশবিশেষ ব্যবহৃত হয়। কারণ এই টীকা গুলো সম্পূর্ণ জীবাণুর পরিবর্তে কেবল প্রয়োজনীয় আন্টিজেন গুলোই বহন করে। তাই এতে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও তুলনামূলক ভাবে কম দেখা যায়। হুপিং কাশির (pertussis) টীকা প্রস্তুতিতে এই পন্থা অবলম্বন করা হয়।

৫. অনুবন্ধী টীকা (Conjugate vaccines)- বিভিন্ন ধরণের ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধে এই টীকার ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে যেসব ব্যাকটেরিয়ার আন্টিজেন এর চারপাশে পলিস্যাকারাইড এর আবরণ রয়েছে। এই ধরনের আবরণ থাকবার জন্য শরীরের রোগ-প্রতিরোধক ব্যবস্থা সহজে সেই আন্টিজেন টিকে সনাক্ত করতে পারে না। তাই এর প্রতিউত্তর সরূপ আন্টিবডি তৈরীও কঠিন হয়ে দাড়ায়। এই টীকাগুলো পলিস্যাকারাইড ও আন্টিজেন এর মাঝে এক ধরণের অনুবন্ধী সম্পর্ক স্থাপন করে, যার ফলে শরীরের রোগ-প্রতিরোধক ব্যবস্থা খুব সহজেই এটিকে সনাক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা মূলক ব্যবস্থা নেয়। Haemophilus influenzae type B ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংঘটিত রোগ প্রতিরোধের জন্য হিব (Hib) টীকা প্রস্তুতিতে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

টীকার ডোজ–

অনেক টীকার ক্ষেত্রেই শিশু কিংবা পূর্ণবয়স্কদের একের অধিক ডোজ এর প্রয়োজন হতে পারে। এর বেশি কিছু কারণ রয়েছে—

১. নিষ্ক্রিয় টীকার (­Inactivated vaccines) ক্ষেত্রে প্রথম ডোজ পর্যাপ্ত প্রতিরোধ সক্ষমতা (immunity) প্রদান করতে পারে না। তাই পরিপূর্ণ প্রতিরোধ সক্ষমতার জন্য একাধিক ডোজের প্রয়োজন হয়। যেমন মেনিনজাইটিস (meningitis) রোগ প্রতিরোধে এর প্রতিষেধকের একাধিক ডোজ প্রয়োজন।

২. আবার DTaP এর টীকার ক্ষেত্রে শিশুদেরকে প্রাথমিক ভাবে চারটি ডোজ দেয়া হয়। কিন্তু কয়েকবছর পর সেই টীকার কর্মক্ষমতা কমে গেলে আবার একটি বুস্টার (booster) ডোজ দেয়া হয় যাতে শরীর আবারও রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা ফিরে পায়। DTaP এর ক্ষেত্রে এই বুস্টার ডোজ ৪-৬ বছর বয়সের মধ্যে দেয়া হয় এবং পরবর্তিতে আবারও ১১-১২ বছর বয়সে দেয়া হয়। পূর্ণবয়স্কদের জন্য এই বুস্টার ডোজ Tdap নামে পরিচিত।

৩. কিছু টীকার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ইমিউনিটি বা রোগের অনাক্রম্যতা অর্জনের জন্য একাধিক ডোজের প্রয়োজন হয়। যেমন MMR টীকার ক্ষেত্রে একটি ডোজ যথেষ্ট নয় বিধায় পর্যাপ্ত আন্টিবডি তৈরির জন্য দ্বিতীয় আর একটি ডোজ দেয়া হয়।

৪. ফ্লু (flu) সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য প্রতিবছরই টীকা গ্রহণ করা দরকার। কারণ এই ফ্লু সংক্রমণের জন্য দায়ী ভাইরাস গুলো এক এক বছর এক এক রকম হতে পারে, তাই এদের প্রতিরোধের জন্য প্রতি বছরই টীকার প্রয়োজন। তাই বিশেষ বিশেষ ফ্লু ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য প্রতিবছরই এই টীকা নতুন ভাবে বানানো হয়। ৬ মাস থেকে ৮ বছরের শিশুরা যারা আগে কখনো ফ্লুর টীকা গ্রহণ করেনি তাদেরকে প্রথমবারেই দুইটি ডোজ দেয়া হয়।

যেকোনো ওষুধের মতই টীকার কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু টীকার আবিষ্কার ও প্রচলন আমাদেরকে অনেক মরণঘাতী, জীবননাশী রোগ-সংক্রমণ, অসুখ থেকে রক্ষা করেছে। টীকার প্রচলন পৃথিবীতে বিভিন্ন রোগে অকাল মৃত্যুর হার বিশাল অংশে হ্রাস করেছে। যেকোনো রোগের ক্ষেত্রেই চিকিৎসার চেয়ে এর প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা। টীকা আমাদেরকে রোগ হবার আগেই সেই প্রতিরোধের সক্ষমতা দান করেছে।

** চিকিৎসা শাস্ত্রে ব্যবহিত বিভিন্ন শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন ব্যাপার। তাই এখানে বিভিন্ন শব্দের যথাসাধ্য বাংলা অনুবাদের পাশাপাশি ইংরেজি শব্দটিও উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: