তিনি ছিলেন ক্রিকেটের পাদরি

মূল লেখার লিংক
জগমোহন ডালমিয়ার সঙ্গে সৈয়দ আশরাফুল হক
১৯৭৯ সালে জগমোহন ডালমিয়ার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের সময় তিনি ক্রিকেটার। পরে ক্রিকেট প্রশাসনে যোগ দেওয়ার পর পরিণত হন ডালমিয়ার ঘনিষ্ঠ সহচরে। গত পরশু রাতে ডালমিয়ার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে বিপর্যস্ত সৈয়দ আশরাফুল হক স্মৃতিচারণা করলেন তাঁর প্রিয় জগুদার

খবরটা পাওয়ার পর থেকে নিজেকে কী যে বিধ্বস্ত লাগছে! এত দিন আমার মাথার ওপর একটা ছাতা ছিল, সেটি আর নেই। কারও কাছে বেশি মনে হতে পারে, তবে সত্যি বলছি, নিজেকে একেবারে এতিম মনে হচ্ছে। আমার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর যেমন একটা শূন্যতা ঘিরে ধরেছিল, তার চেয়েও বেশি শূন্য লাগছে সব। মনে হচ্ছে আমার আর কেউ নেই।

প্রায় সবার মতো আমিও জগমোহন ডালমিয়াকে জগুদা বলে ডাকতাম। জগুদা সম্পর্কে আমি যদি বলতে যাই, তাহলে কথা কখনো শেষ হবে না। আজ আমি যা, সেটি ওনারই কল্যাণে। আমাকে উনি তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন। আইসিসি সভাপতি হওয়ার পর বক্তৃতায় উনি বলেছিলেন, ‘অ্যাশ আমার ডান হাত। আমি যদি ওকে উঁচু একটা বিল্ডিংয়ের ওপর থেকে লাফিয়ে পড়তে বলি, ও তা-ই করবে।’
এতে যদি তাঁর ওপর আমার আস্থা ও আনুগত্য প্রকাশ পেয়ে থাকে, আমার ওপরও তাঁর একই রকম আস্থা ছিল। আমাকে তিনি অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন। ক্রিকেট প্রশাসক হিসেবে আমি যতটুকুই যা করতে পেরেছি, তাতে ওনার বড় অবদান। সেই ১৯৮৩ সালে বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের তো সেভাবে কোনো পরিচিতিই ছিল না। তখনই তিনি আমাকে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের যুগ্ম সম্পাদক বানিয়েছিলেন। সে বছরই এসিসির জন্ম। প্রথম মিটিংয়ে জগুদা বললেন, ‘আমরা টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোই সব পদ নিয়ে নেব কেন, অ্যাশ জয়েন্ট সেক্রেটারি হোক।’ প্রায় ২০ বছর পর সেই এসিসির প্রথম সিইও-ও বানালেন আমাকে।
১৯৯৬ বিশ্বকাপে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। বিসিসিআইয়ে এত লোক, অথচ আমাকে বড় বড় সব দায়িত্ব দিলেন। আইসিসি সভাপতি হিসেবে নির্বাচন করবেন, আমাকে বানালেন ওনার ক্যাম্পেইন ম্যানেজার। ১৯৯৬ বিশ্বকাপে কলকাতায় সেমিফাইনালের সময় আমাকে বললেন, ‘তুমি একটা পার্টি থ্রো করো। সবাইকে ডাকো। ওই পার্টিতে আইসিসি সভাপতি পদে প্রার্থী হিসেবে আমার নাম ঘোষণা করবে।’ আমি বললাম, ‘আমি এত টাকা পাব কোথায়?’ জগুদা হেসে বললেন, ‘আরে, টাকা তো আমি দেব। কিন্তু নিজেই নিজের নাম ঘোষণা করলে কেমন দেখায় না!’
আমি খোঁজখবর নিয়ে জানলাম, দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিস ম্যাকারধুজও প্রার্থী হতে চাইছে। জগুদাকে বললাম, ‘আমি আপনার নাম প্রস্তাব না করে আফ্রিকা থেকে কাউকে দিয়ে করাই। তাহলে আফ্রিকা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাবে।’ উনি আমার পিঠ চাপড়ে দিলেন, ‘দারুণ ভেবেছ তো!’
কথাবার্তা একটু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। কারণ জগুদার এত স্মৃতি যে, একটা বলতে গিয়েই আরেকটা মনে পড়ে যাচ্ছে। আমার জীবনের সব সংকটেই উনি আমার পাশে ছিলেন। একেক সময় একেক ভূমিকায়। তাঁর মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর থেকে মনে হচ্ছে, আমি একই সঙ্গে বাবা-বড় ভাই-ঘনিষ্ঠ বন্ধু সবাইকে হারালাম। ব্যক্তিগত সেই সম্পর্ককে পাশে সরিয়ে রেখে যদি ক্রিকেট প্রশাসক ডালমিয়াকে বিচার করি, তা হলেও আমি তাঁকে অনেক ওপরের আসনে রাখব। আমি তো বলব, জগমোহন ডালমিয়া বিশ্ব ক্রিকেটে সবচেয়ে নিরপেক্ষ প্রশাসক। তাঁর মধ্যে দেশ-বর্ণ এসব নিয়ে কোনো পক্ষপাতই ছিল না। তিনি ছিলেন ‘ক্রিকেটের পাদরি’। আইসিসি সভাপতি হিসেবে ভারতের স্বার্থ নয়, সবার আগে দেখেছেন ক্রিকেটের স্বার্থ। ইংলিশরা, অস্ট্রেলিয়ানরা তাঁকে অন্যভাবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে। তবে এত বছর কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ক্রিকেট নিয়ে তাঁর একটা বৃহত্তর ভিশন ছিল। বিশ্বায়নের কথা তিনি শুধু মুখেই বলতেন না, ক্রিকেটের প্রসারের জন্য এর কোনো বিকল্প নেই বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। এসিসি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এশিয়ায় ক্রিকেট ছড়িয়ে দেবেন বলে। আরেকটা উদ্দেশ্যও অবশ্য ছিল। তখন ক্রিকেটে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মৌরসিপাট্টা। ওদের ‘ভেটো পাওয়ার’-ও ছিল। জগুদা তাই এসিসি গঠন করে এশিয়ান ব্লককে একতাবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন।
ডালমিয়ার ক্রিকেট-দর্শন একটা উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হবে। তাঁর সময়েই বিশ্ব ক্রিকেটের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে এশিয়ার উত্থান। ২০০০ সালে আইসিসির সভায় সিদ্ধান্ত হলো, এশিয়া থেকেই যেহেতু বেশি টাকা আসে, মোট আয়ের ৫০ শতাংশ এশিয়া পাবে। জগুদা বললেন, ভারতের অনেক আছে। ভারতকে কিছু দিতে হবে না। এই টাকা এসিসিকে দিয়ে দাও। ওরা ক্রিকেট উন্নয়নে কাজ করুক। এই ধারাটা আইসিসির পরের সভাপতি এহসান মানির সময়েও চালু ছিল। কিন্তু শ্রীনিবাসন সভাপতি হয়েই এটা বাতিল করে দিল। উল্টো ভারতকে আরও বেশি টাকা দেওয়ার দাবি তুললেন। এই লোকটার সঙ্গে এখন ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার জাইলস ক্লার্ক ও ওয়ালি এডওয়ার্ডসও গাঁটছড়া বেঁধেছে। ডালমিয়ার সঙ্গে এঁদের পার্থক্য হলো, ডালমিয়া ছিলেন ‘ভিশনারি’ আর এরা সব ‘মার্সেনারি’। ডালমিয়া নিজেও ব্যবসায়ী ছিলেন, ভারতীয় ক্রিকেটের বাণিজ্যিক যুগও তাঁর হাতেই শুরু, কিন্তু শ্রীনিবাসনদের মতো টাকাটাই তাঁর কাছে সব ছিল না।
ডালমিয়ার যে বিশ্বায়ন-মন্ত্রের কথা বলছিলাম, সেটির সবচেয়ে বড় সুফল তো বাংলাদেশই পেয়েছে। তিনি আইসিসি সভাপতি থাকার সময়ই ঢাকায় মিনি বিশ্বকাপ হলো, এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল হলো। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়াতেও তাঁর সমর্থন অবশ্যই বড় ভূমিকা রেখেছিল। মনে আছে, লর্ডসে আইসিসির সভায় আমাদের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া নিশ্চিত হওয়ার পরই উনি বললেন, ‘তোমরা প্রথম টেস্টটা কিন্তু আমাদের সঙ্গে খেলবে। পাকিস্তানও জোরাজুরি করবে, তবে আমি চাই বাংলাদেশের প্রথম টেস্টটা ভারতের সঙ্গে হোক।’
মাস ছয়েক আগে জগুদার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তাঁর শারীরিক অবস্থা তখনই খুব একটা সুবিধার মনে হয়নি। তার পরও কল্পনাও করিনি, সেটিই জগুদার সঙ্গে শেষ দেখা হয়ে থাকবে!
সৈয়দ আশরাফুল হক: বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এসিসির সাবেক প্রধান নির্বাহী

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: