বনলতার দেশে

মূল লেখার লিংক
২০ আগস্ট, রাত সাড়ে ৯টা। কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছে শুনি ট্রেন সাড়ে পাঁচ ঘন্টা লেটে চলছে। আক্কেল গুড়ুম! এখন কী করি। মাঝে মাঝেই বৃষ্টির বাগড়া। বাসায় ফিরে আবার আসতে মন চাইল না। সাথে অক্ষয় কুমার মৈত্রয়ের রানী ভবানী বইটা নিয়েছিলাম। ভাবলাম স্টেশনে বসেই বইটা পড়া যাক। অনেক অজানা ইতিহাস সেখান থেকে বেরিয়ে এলো।
এমাসের শুরুতেই উত্তরবঙ্গ ভ্রমণের ভূত চাপে মাথায়। ইতিহাস তো আছেই। পাখি সংরক্ষণে ওদিকে অনেক কাজ হচ্ছে। ওগুলোর একটা আকর্ষণ ভেতরে ভেতরে অনুভব করছিলাম। ওখানে দুজন বন্ধু রয়েছে। নাটোরে রয়েছে পাখিপ্রেমী বন্ধু জুয়েল রানা। বগুড়ায় মিজানুর রহমান। তাদের সাথে যোগাযোগ করেই দিন তারিখ ঠিক হলো। প্রথমে যাবো বনলতার দেশে।
IMG_1870

রাত ১টা ৩০ মিনিটে কমলাপুর পৌঁছালো লালমনি এক্সপ্রেস। তখন ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। ট্রেনে উঠেই চোখে ঘুম লাগল। যতক্ষণে ফের চোখ মেললাম, ততক্ষণে সকাল হয়ে উঠেছে। সূর্যের তখন গ্রহ-বৈগুন্য চলছে। শত চেষ্টা করেও মেঘের পরত ভেদ করে উঁকি দেবার সাধ্য তার নেই। ট্রেন তখন বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বদ্বারে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন ছাড়ল। যমুনার বুকে তখন মেঘ আর জলীয় বাষ্পের খেলা। ঘোরলাগা একটা পরিবেশ। ট্রেনের জানালা দিয়ে যমুনার জলধোয়া শীতল বাতাস হু হু করে ঢুকছে। রাতে বৃষ্টির ভয়ে সবকটা জানালা বন্ধ ছিল, এখন শীতল বাতাসের লোভে সবগুলো খুলে দেওয়া হলো। যমুনার বুকে চর পড়ে একটা জংলা দ্বীপের মতো সৃষ্টি হয়েছে। জনহীন দ্বীপটা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
IMG_1858
কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেতু পার হয়ে ট্রেন ঢুকে পড়ল উত্তরবঙ্গে। চলন বিলের মাঝদিয়ে চলেছে আঁকাবাঁকা ট্রেনলাইন। বর্ষায় দেশের বৃহত্তম বিল এখন টইটুম্বুর। যেন বঙ্গপোসাগরের একটা অংশ তুলে নিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে এখানে।
IMG_1931
IMG_1925

চারদিকে থৈ থৈ পানি। বিলের মাঝের গ্রামগুলো বর্ষাকালে পানিতে আটকা পড়ে। যেন ছেঁড়া ছেঁড়া দ্বীপ ভেসে রয়েছে অথৈই সাগরের বুকে। এ পথ আমার অচেনা নয়। আমাদের খুলনাগামী ট্রেনগুলোও এই পথে চলে। কিন্তু নতুন ভূমির দেখা পেলাম ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশন থেকে।
IMG_1932

IMG_1895

IMG_1933

IMG_1941

IMG_1945
ডানে ঢুকে গেল একেবারে অচেনা এক দেশের উদ্দেশ্যে। মাঝপথে কত স্টেশন পড়ল। সবগুলোর নাম মনে রাখা সম্ভব হত না। তাই প্রায় প্রতিটা স্টেশনের নাম ফলকের ছবি তুলে রাখছি।

IMG_1948
সকাল আটটার দিকে ট্রেন পৌঁছল বনলতা সেনের দেশে। হাজার বছর ধরে পথ হাঁটা ক্লান্ত পথিকের মতো স্টেশন থেকে নেমে এলাম রাস্তায়, দুদ- শান্তির জন্য। পাখিপ্রেমী বন্ধু জুয়েল রানার গ্রামের বাড়ি যাব। নলডাঙ্গা উপজেলার শমসখোলসি গাঁয়ে। তার আগে মমিনপুর নামে ছোট্ট একটা বাজার আছে। সেখানেই জুয়েল রানার পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইডা’র কার্য্যলয়। ওখানেই পেয়ে গেলাম জুয়েলকে। ছোটখাটো একটা মিটিং ছিল ওদের। এরপর সোজা জুয়েল রানার গ্রামে।
প্রথমেই একটা দোতলা কাঁচাবাড়িতে নিয়ে গেল জুয়েল। ওটা তাঁর শিক্ষক বিরল কুমারের বাড়ি। বিরল স্যারের বাড়িতেই আস্তানা গেঁড়েছে কয়েকশো শামুকখোল পাখি। পাখি দেখেটেখে সোজা জুয়েল রানার বাড়িতে। ততক্ষণে দুপুর দুটো। রাতে ট্রেনে ছিলাম, তাই গোসল হয়নি। বাড়ির পেছনেই টলটলে একটা পুকুর। সাঁতার দিয়ে গোসল করার লোভ সামলাতে পারলাম না। দুপুরের খাওয়ার পর বেরিয়ে পড়লাম আবার নাটোরের উদ্দেশ্যে। রানী ভবানীর রাজবাড়িতে।
এবার আর আগের পথে নয়। অন্যপথে নাকি হালতির বিল আছে। দর্শনীয় স্থান।

IMG_2216
অবশ্য পুরো এলাকটাকেই আমার বিলাঞ্চল বলে মনে হলো। আমাদের যশোর-কুষ্টিয়ার সমতটেও বিল-বাওড় আছে। বর্ষায় সেগুলো ছাপিয়ে যায়। ডুবিয়ে দেয় কৃষকের ফসলি জমি। কিন্তু এমন নিম্নভূমির পরিমাণ সমতটে নগন্য। ঘোর বর্ষাতেও উঁচু জমির সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। এদিকে তা নয়। উঁচু জমির দেখা সেই যমুনা ব্রিজ পার হবার পর আর পায়নি। সব জমি তলিয়ে গেছে বর্ষার পানিতে। ফসল বলতে শুধু ধান আর আখ। পানিতে অর্ধেক ডুবে শুধু মাথটাই উঁচু করে রেখেছে ধানেরা। আর আখের হাঁটুপর্যন্ত পানি।

IMG_2164

গাঁয়ের মেঠোপথ। তবে পাকা। এদিকে সমতটের মতো গ্রামগঞ্জে লোকাল বাসের আনাগোনা নেই। হয়তো জনসংখ্যার কম ঘনত্বের কারণে। তাই ব্যাটারি বা ইঞ্চিনচালিত ভ্যান, ভডভড ইঞ্জিনের নসিমন, করিমন আর ব্যাটারি চালিত অটোর সংখ্যা অনেক বেশি। গ্রামাঞ্চলে অবশ্য ভ্যানেরই আধিক্য। কিন্তু সেটাও মিলল না। তাই হাঁটতে হলো বেশ খানিকটা পথ।

IMG_2155

IMG_2150
সারদিন সূর্যের মুখ দেখিনি। সারাদিনই বা বলি কেন? কয়েক সপ্তাহই তো এমন চলছে। একটানা বৃষ্টি হচ্ছে না। কিন্তু সুর্য মুখ লুকিয়ে থাকছে সবসময়। রাস্তায় নামনেই হঠাৎ করে সূর্য মেঘের পরত ছিন্নভিন্ন করে ফেটে পড়ল অট্টহাসিতে। সূর্য দেখা না দিলে উত্তর-পুবের হিসাবটা গড়মিলই থেকে যেত। নতুন জায়গায় গেলে আমি দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ি। এখানেও তাই হয়েছে। যেটাকে আমি পশ্চিম ভেবেছিলাম আদৌ সেটা পশ্চিম নয়। বিচ্যূতির পরিমাণ ১৮০ ডিগ্রি। অর্থাৎ পশ্চিমটা হয়ে গেল পূর্ব। বাকি দিক দুটোও বাধ্য হলো স্থান পরিবর্তন করতে।

IMG_2146

IMG_2159

ঝকঝকে রোদে হেসে উঠল নাটোরের জলজ মাঠ। সবুজের উজ্জ্বলতা বাড়ল। আকাশে নীল-সাদার এক অপুর্ব সম্মিলন। নাটোরের মেঠোপথে অন্য এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল তনুমনে। চারপাশে ইতিউতি করে পাখি খুঁজে চলেছি। কিন্তু আকাশে ঝাঁক ঝাঁক শামুকখোল ছাড়া অন্যপাখি তেমন চোখে পড়ল না। অবশ্য দোয়েল আর শালিকের অভাব নেই। আমাদের এলাকায় এই বর্ষাতেও হরেকরকম পাখির দেখা মেলে। এদিকে নেই, তার কারণ বোধহয় জলবদ্ধতা। ভূচর পাখিদের খাবারের অভাব।

IMG_2220

বলতে আপত্তি নেই আরও একটা জিনিস খুঁজে চলেছি– পাখির নীড়ের মতো দুটি চোখ। পেলামও একজনকে। কিন্তু পাখি-প্রকৃতির দিকে যত সহজে ক্যামেরা তাক করা যায়, বনলতাদের দিকে ক্যামেরা তাক করা অত সহজ নয়। বনলতা বিরক্ত হলে খবর আছে। তাই সেই ঝুঁকিতে না গিয়ে প্রকজৃতিকন্যাদেরই ছবি তুলে গেলাম।

IMG_2177
এখানকার আরেকটা জিনিস ভালো লাগল। রাস্তার দুধারে খেজুর আর তালগাছের সারি। দেশের অন্য এলাকায় রাস্তার দুধার দখল করে স্থানীয় নেতারা দ্রুতবর্ধনশীল বিদেশি গাছ লাগায়। পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে ওসব বিদেশি গাছ। বিপরীতে নাটোর, রাজশাহী, নওগাঁ, জয়পুরহাট, বগুড়ায় তিনদিনে কতগ্রাম কত পথ পাড়ি দিলাম। রাস্তার দুধারে ছোট-বড়-চারা তালগাছের সারি মুগ্ধ করল। তালগাছ বাবুই ও বাতাসি পাখিদের অভয়ারণ্য।
IMG_2156

IMG_2202
ছোট্ট একটা বাজারে পেয়েছিলাম এক নৌকার কারিগরের দেখা। আপন মনে নৌকা তৈরি করছেন।

IMG_2199
তিন রাস্তার এক মোড়ে এসে একটা ব্যাটারিচালিত ভ্যান পেলাম। রাস্তা এদিকটায় খারাপ। ভাঙা ভাঙা। ঝাঁকি খেতে খেতে অনেকগুলো গ্রাম, হাট, মোড় পাড়ি দিলাম। সবগুলোর নাম মনে রাখা সম্ভব নয়। তাই যেখানে যে বাজার পেয়েছি চেষ্টা করেছি সেখানকার কোনও এক দোকানের সাইনবোর্ডের ছবি তুলে রাখতে।

IMG_2148

IMG_2139
একেবারে নতুন আসা এক জেলার গ্রাম। তবে ছবিগুলো চিরচেনা। রাস্তার দুপাশে মাঝে মাঝে বসতবাড়ি। ভেজা পাঠখড়ির ঝুঁটি শুকাতে দেওয়া হয়েছে বাড়ির পেছনে। কোথাও কোথাও আউস ধানের খড়ের গাদা। এ ছবি কী শুধু একংবিংশ শতাব্দির নাটোরের, নাকি গোটা বাংলার আবহমান কালের?
মাঝে মাঝে নদী, বিল, জলাশয়। নৌকা ছুটছে নানা কাজে। কবিগুরুর সোনার তরির সেই চরণ মনে পড়ে গেল–
চারি দকিে বাঁকা জল করছিে খলো।
পরপারে দখেি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মঘেে ঢাকা
প্রভাতবলো—

IMG_2230
অনেক আাঁকাবাাঁকা পথ পাড়ি দিয়ে, অনেক গ্রাম-মাঠ পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছুলাম পাটুল নামে এক বাজারে। এখানেই বিল হালতি অনন্য রূপ ধারণ করেছে। বর্ষায় এখানে একটা কৃত্রিম ঘাট তৈরি হয়। বড় বড় নৌকা, ট্রলার আর স্পিডবোট সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝি-মাল্লার দল হাঁকছে যাত্রীদের উদ্দেশ্যে। সবার এক দাবি, তার নৌযানই সবার আগে ঘাট ছাড়বে।
চলনবিলের মতোই চারদিক থৈ থৈ করছে বিল হালতির পানিতে। দূরে একটা গ্রাম দেখলাম। তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে রেখেছে বিল হালতির পানি। একটা বাড়ি চোখে পড়ল এতদূর থেকেও। চূড়া করে রাখা খড়ের গাদা, টিনের চাল, গাছপালার জটলা দেখা যাচ্ছে। বন্দে আলী মিয়ার সেই ছোট্ট স্বপ্নের এক গ্রাম যেন হাতছানী দিয়ে ডাকছে।

IMG_2233

বন্দে আলি মিয়ার সেই ছড়াটা মনে আঝে? —
‘আমাদের ছোটগাঁয়ে ছোট ছোট ঘর
থাকি সবে মিলেমিশে নাহি কেহ পর….’

IMG_2238
ইচ্ছে ছিল নৌকায় বা ট্রলারে চড়ে দ্বীপের মতো গ্রামটা দেখে আসব। কিন্তু হাতে সময় একেবারেই নেই। ৫ টার পর রাজবাড়ী বন্ধ হয়ে যায়। অতএব স্পিডবোটেই ইঠতে হলো। জনপ্রতি ৫০টাকা ভাড়া। আমরা চারজন। জুয়েল রানা, জুয়েল রানার ভাগ্নে জেম, জেমের বন্ধু সঞ্জয়। সঞ্জয় পাটুল গাঁয়েরই ছেলে।
স্পিড ছাড়ল।

IMG_2239

আকাশে তখন মেঘের একেবারে ঘনঘটা। যেকোনও সময় বৃষ্টি নামতে পারে। তবুও আমাদের উৎসাহে খামতি নেই। কিন্তু হারামিগিরি করল বোটওয়লা। বিলের মাঝখান থেকে ঘুরিয়ে নিয়ে এলো ঘাটে। জুয়েলের সাথে তর্কাতর্কি লেগে গেল। কিন্তু আমি ওকে শান্ত করলাম। সময় চলে যাচ্ছে।
এবার ব্যাটারি চালিত অটোতে নাটোরে পৌঁছুলাম।

IMG_2238

নাটোরে যতটুকু ঘোরাফেরা করেছি, তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি বনলতাকে। সে কোনও মানুষ না হোক, কোনও প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তত হবে। কিংবা কোনও রাস্তার নাম। অন্তত জীবননানন্দের নামে একটা রাস্তা হওয়া উচিৎ। হতাশ হতে হলো। কোথাও জীবনানন্দ কিংবা বনলতার চিহ্নমাত্র নেই।

IMG_2332
পরদিন মন খারাপ করে নাটোর ছাড়ছিলাম। রিকশায় চেপে চলেছি বাস স্ট্যান্ডের দিকে। হঠাৎ এক গলির ভেতর দেখি বনলতা দাঁড়িয়ে আছে স্বগর্বে। বনলতা উচ্চবালিকা বিদ্যালয়। ঠিক জায়গায় বসানো হয়েছে বনলাতার নাম। আর কোনও বনলতার দরকার নেই। যা পেয়েছি এটাই যথেষ্ট। আমার নাটোর ভ্রমণ সার্থক।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: