রুবিক’স কিউব

মূল লেখার লিংক

কারো কারো ক্ষেত্রে মারফি’স ল যে কতটা কার্যকর উদাহরণ হতে পারে, তা আরো একবার প্রমাণিত হলো অক্সফোর্ড রোডের সেলুনগুলো রোববার বন্ধ থাকার মধ্যে দিয়ে। দু’তিন সপ্তাহের গড়িমসি শেষে যখন সময় এবং সম্মতি দুটোই জুটলো ওদের বাবা ছেলের কাকের বাসা, বাজারের ঝাঁপিসম চুলগুলো ভদ্রস্থ সমাজোপযোগী করার, ঠিক সেদিন মাইলকয়েক পথ হেঁটে এসে জানা গেলো গুণেগুণে কেবল সেলুনগুলোই আজ বন্ধ থাকবে, যদিও আশেপাশের অন্য সব দোকান বহাল তবিয়তে খোলা। কি আর করা, এসেই যখন পড়েছি এদিক ওদিক ঢুঁ মেরে যাই ভেবে ঢুকলাম পাশের চাইনিজ দোকানে। এ দোকানগুলোতে সস্তায় কাজের জিনিস পাওয়া যায় শুনি। কথা সত্য পুঁইশাক, কচুর মুখি থেকে শুরু করে ঝাঁটা, বাড়ুন কি নেই?! আমি কি নেব অথবা কোনটা টেনে বাসা পর্যন্ত নিতে পারব ভাবতে ভাবতেই আমাদের একমাত্র বাহক মেয়ের প্রামের ধারণক্ষমতার বেশী জিনিস ভরে গেলো বাপ-বেটার ঝুড়িতে। চুল কাটার বদলে শপিং সই। গাদাখানেক কাজের অকাজের সদাই নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। যার মধ্যে উল্ল্যখযোগ্য হলো – মুখে বাতাস খাওয়ার দুই ব্যাটারির মিনি ফ্যান, ডলার পাউন্ডের ছবি আঁকা সাইজে লম্বা পিগি ব্যাংক, স্টিকি প্যাড, কালারফুল ক্রেয়ন আর একটা রুবিক’স কিউব।

রুবিক’স কিউবটা দেখামাত্র আমার গলা দিয়ে চিৎকার মতো বেরিয়ে আসে, আরে এটা কই ছিল, কে নিলো?

জামাই তার চিরাচরিত ফিচলে হাসি দিয়ে বলে, নিলাম আরকি। তবে চাইনিজ জিনিস, ভরসা নাই।

আমি কথা না বাড়িয়ে নিজের মনে পাইলাম ইহা পাইলাম বলে সেটা হাতে তুলে নিই। ডানে-বাঁয়ে, উপরনিচ ঘুরিয়ে দেখি। অতো স্মুথ না। কায়দামতো না ঘুরালে বাঁধছে। তবে খারাপ না, চলবে।

রুবিক’স কিউবের সাথে আমার সম্পর্ক পুরোনো। ২০০৫ এ বিলাত পাড়ি জমানো ননাসের সংসারের ফেলে যাওয়া ছোট-বড় নানা স্মৃতি সংকলনের একটা অংশ ছিলো রুবিক’স কিউব। বহুদিন সেটা বাসায় এমনিই পড়ে ছিলো। এক ননাসপুত্র ছাড়া এই বস্তুর প্রতি বাড়ির অন্য সদস্যদের আগ্রহ শূন্য। বিষণ্ণতার সাথে নারীসম্পর্কও পুরোনো। ছেলে পেটে আসার প্রথম দিকটায় যখন শরীরময় হরমোন হুটোহুটি বাঁধিয়ে হুলস্থুল কর্মযজ্ঞ শুরু করে ফেলছে, এবং শরীরের আকস্মিক সে পরিবর্তন আমার মনকে বড় খানাখন্দ ভরা কোন রাস্তার লক্করঝক্কর এক ট্রাকে ঝুলন্ত বাক্স-পেটরার সাথে বেঁধে ফেলছে, তখন কোন এক বিষণ্ণ সময়ই হবে সে রুবিক’স কিউবটা হাতে তুলে নিয়েছিলাম।

আমি ছিলাম ওয়ান সাইড সলভার। তিন স্তর (৩x৩x৩) কিউবের ছ’রঙা (লাল-কমলা, নীল-সবুজ, হলুদ-সাদা) পিঠের যেকোন এক পিঠ বেশ ভালই মিলাতে পারতাম, এরপর বহু কাঠখড় পুড়িয়ে কিউবের মাঝের স্তরটা পর্যন্ত মিলিয়েছি, কিন্তু বরাবর উপরটায় এসে ভয়ানক ভজঘট পাকিয়ে মিলানো পিঠটাই আবার বেড়াছেড়া করে ফেলতাম, তারপর আবার যে কে সেই, শুরু থেকে শুরু, বিন্দু দিয়ে সিন্ধু… যা চলতেই থাকত রাতদিন বিরামহীন। একে প্রথম প্রেগন্যান্সি তার উপর তুচ্ছ রুবিক’স কিউবের কারণে পেটের গুটলা’র প্রতি মাত্রাতিরিক্ত অনিয়মে নিজের উপর বোধহয় নিজেই বিরক্ত হচ্ছিলাম, যেকারণেই হোক তখন কিউবটা চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলেছিলাম। এরপর মায়ের বাসা, পড়াশুনা, ছেলে হওয়া। ছেলে আসার পর বাড়ি বদল, সবশেষে দেশ ছাড়া। তবে নিশ্চিত খুলনার আদি বসতবাড়ির উপরের ঘরগুলোর অসংখ্য পোঁটলাবন্দি স্মৃতি সংকলনের কোন একটাতে এখনো সে রুবিক’স কিউবটা রয়েছে।

নতুন রুবিক’স কিউব হাতে পেয়ে পুরোনো দক্ষতায় আবার এর এক পিঠ মিলিয়ে ফেলি। তা দেখে আমার জুনে দশ বছরে পা রাখা ছেলে এতোটাই অবাক হয় যেন আমি হিমালয় না হলেও মৈনাক পর্বত জয় করে ফেলেছি। এবার শুরু হয় মাঝের স্তর মিলানোর যুদ্ধ। যার এককোণ মিলে তো আরেক কোণ ছুটে যায়, প্রতিটা কোণ জায়গামতো আনা গেলেও মেলানো পিঠটাই এলোমেলো হয়ে যায়। অসাধ্য সাধন করে এক সময় মাঝের স্তরও মিলিয়ে ফেলি। এবং সে পর্যন্ত ঠিক আছে, এরপর যখন উপর পিঠ মেলানোর পালা আসে তখন আমার মতো মস্তিস্কবিহীন উন্মাদের আক্ষরিক অর্থে মাথার চুল টেনে ছিঁড়া ছাড়া উপায় থাকে না। সকালে উঠতে হবে জেনেও শেষরাত অব্দি এই বস্তুর পিছনে লেগে থেকে একূল ওকূল সব কূল হারিয়ে জীবনেও আর হাতে নিব না – এ অখণ্ড ব্রত নিয়ে ছুঁড়ে ফেলি। আবার সকালে উঠে পায়ের কাছে ছোট বাবুর মতো গড়াতে দেখে, সব ভুলে আদরের হাত বাড়িয়ে দেই। ফের আদাজল খেয়ে উঠে পড়ে লাগি। চুলোয় রান্না, লণ্ড্রী’র কাপড়, ছেলে-মেয়ে দু’টোর দ্বারা ঘরময় অবিরাম ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প, ঘুর্ণিঝড়, সাইক্লোন কোনো কিছুই আমার মনোযোগ ফেরাতে পারে না। এবং দিনশেষে অর্জন বিশাল এক শূন্য, তা থেকে অন্তহীন ব্লাকহোল।

শীঘ্র রুবিক’স কিউব আমার ব্যাগে মেয়ের ডায়াপারের মতো পাকাপোক্ত জায়গা করে নেয়, ছেলেকে স্কুল থেকে নিতে গিয়ে বেল দেয়ার দু’মিনিটের মাঝেও এটা ব্যাগ থেকে বেরিয়ে পড়ে। ছেলে বলে, ‘লুক্স লাইক মা গট আ টয়।‘

আমি বলি, ‘হ্যাঁ পণ্ডিত, মা’রও টয় লাগে।‘

কোথাও বেড়াতে গেলেও সুযোগ বুঝে ঠিক এটা ব্যাগ থেকে বেরিয়ে হাতে চলে আসে। জনৈকা সুন্দরী সাইকোলোজিস্টের সাথে কথা বলার সময়ও এটা আমার হাতে থাকে। যদিও এটা দেখে সে (সেন্সর) বাগড়া দিয়ে বলেছিলো, ‘মেক শিওর, এটা তোমাকে বেশী স্ট্রেস না দেয়। আমি একবার এটা সল্ভ করার চেষ্টা করেছিলাম, আর আমার মেজাজ ভায়ানক বিগড়ে গিয়েছিলো।‘

আমি বলি, ‘আরে না, আমি এটা শুধুই ফান হিসেবে নিচ্ছি। অন্তত কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকছি, অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় থেকে মনকে ডাইভার্ট করতে।‘

পরের শনিবার ছেলে’র চুল কাটার সময়টা সেলুনে বসে রুবিক’স কিউবের তিন স্তর ছ’পিঠ প্রায়ই মিলিয়ে ফেলেছিলাম। পাশে বসা আমার ছেলের বয়সী দু’টো ছেলে খুব আগ্রহ নিয়ে তা দেখছিলো। মাঝে মাঝে ‘ইয়েস, গো অন’ এরকম টুকরো শব্দ দিয়ে আমাকে চিয়ার করে যাচ্ছিল। ভেতরে ভতরে আমি চেনা এক ভয় টের পাই, প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার ভয়, শেষমেশ ছেলে দু’টোকে হতাশ হতে হবে এই ভয়। Anxiety disorder, panic attack শব্দগুলোর সাথে আমার পরিচয় খুব বেশী দিনের না। কষ্টের চেনা প্যাটার্নে নতুন শব্দের সংযোজন এর মাত্রার খুব বেশী হেরফের ঘটায় না যদিও। বড়জোর কষ্টগুলোকে সমস্যা হিসেবে দেখে সমাধানে কষা লাগে অঙ্ক, জানা লাগে সূত্র, মেলানো লাগে কোনো রুবিক’স কিউব। অথচ দূর্বল মাথায় অতশত আঁটে না বলেই না যত গরমিল! আমি প্রায়ই গুছিয়ে আনা সমীকরণ আবার ভুল করি। এক পর্যায়ে খেলা বন্ধ করে কিউবটা ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেলি। সেলুনের বড় আয়নায় নির্বিকার নিজেকে দেখতে থাকি।

সাইকোলোজিস্ট বেটিকে ধুনফুন যাই বোঝাই না কেন, এ পর্যায়ে এসে রুবিক’স কিউবকে আমি মোটামুটি জীবনদর্শন হিসেবে দাঁড় করে ফেলেছি – রুবিক’স কিউব হলো জীবনের মতো। ধরা যাক, এর ছ’দিকে আছে জীবনের ছ’রং। জীবনের রঙগুলোও তো কখনো নিয়মতান্ত্রিক ছকে মিলে আসে না, আসে খাপছাড়া ভাবে। সামান্য কিছু জন্মলব্ধ প্রতিভাধর অথবা সৌভাগ্যবান মানুষই হয়তো হাতের মুঠোয় জীবনের সব রং নিয়ে খেলতে পারে, সহজে ছকে সাজাতে পারে, ছ’পিঠের উপর সমান দখল বজায় রাখতে পারে। আর বাকিরা যারা আমার মতো জীবনের এক পিঠ মিলিয়ে বাকীগুলোর জন্য কষ্ট করে যায়, তাদের হাতে বারবার তুচ্ছ সমীকরণ ভুলে একরঙা মিলানো পিঠটাও ছুটে যায়।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: