১০১টা ছবির গল্প – মেরা গিরিখাত

মূল লেখার লিংক

আমার প্রথম বাইক ছিলো এস এস সি পরীক্ষায় প্রাপ্ত বৃত্তির টাকায় কেনা। ষোলশ টাকার ফনিক্স, কেনার সময় চাইনিজ ভাবলেও পরে জেনেছি এই সাইকেল দেশেই তৈরি হয়, তেঁজগায় এদের ফ্যাক্টরি একসময় ল্যান্ডমার্ক ছিলো। নিকেতনে ঢোকার প্রথম গলি আর জিএমজির মোড়ের মাঝামাঝি “বাংলাদেশ সাইকেল ফ্যাক্টরী” রিকশাওয়ালাদের কাছে ঐ সময়ের একমাত্র ল্যান্ডমার্ক।চালানো শিখেছিলাম কেনার আগেই। আমাদের এক খালাত ভাইয়ের একটা র‍্যালি সাইকেল ছিলো, একটু বড়সড় ধরনের বিলাতি সেই সাইকেল চালাতে গিয়ে বেশ কবারই পড়ে যেয়ে হাত পা ছিলেছিলাম। এই হাত পা ছিলা নিয়ে আমার বড় ভায়ের ছেলে সৌম্য’র বলা একটা জোক মনে পড়ে গেল। নতুন চালাতে শেখা এক বালক চালাতে চালাতে একবার হ্যান্ডেল থেকে হাত তুলে চালানো শুরু করলো। সামনে পরিচিত কাউকে দেখে হাত পেছনে নিয়ে খুশিতে বলতে থাকলো, “দেখ দেখ আমার হাত নাই হাত নাই!” দর্শকদের উৎসাহ পেয়ে এবার সে পা তুলে চালাতে থাকলো আর বলতে থাকলো, “দেখ দেখ আমার পা নাই পা নাই!” এবারও দর্শকদের হাততালি পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে আরো জোরে চালাতে যেয়েই পড়ে যেয়ে বিপত্তি ঘটলো। তাতেও উদ্যম না হারিয়ে সে ঘুরে এসে দর্শকদের দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে বলতে থাকলো, “দেখ দেখ আমার দাঁত নাই দাঁত নাই।”

সেই সাইকেল চালানো শিকেয় উঠেছিলো ঢাকায় আসার পর থেকে। এই বিদেশে আসার পরও বছরতিনেক সাইকেল চালানো হয়নি। এখন আবার চালানো শুরু করার পেছনের ঘটনাটা চমকপ্রদ।

আমাদের এখানে সাইকেলের প্রচলিত নাম বাইক আর সাইক্লিংকে বলে বাইকিং। এই বাইকিং আবার নানা ধরনের- রোড বাইকিং, ট্রেইল বাইকিং, মাউন্টেইন বাইকিং ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার ছেলে মাতিস কিছুদিন হলো মাউন্টেইন বাইকিং শুরু করেছে। ট্রেনিংয়ের জন্য সপ্তায় একদিন ওকে পাহাড়ে নিয়ে যেতে হয়। মাতিসকে পৌঁছে দিয়ে হাঁটাহাঁটি ছাড়া কয়েকঘণ্টা আমার কোন কাজ থাকে না। বেশ কয়েকজন চ্যাম্পিয়ন বাইকারদের সাথে ও চলে যায় ট্রেইলে আর আমি ঘুরি। ও ফিরে এলে বুঝতে পারি ওর সঙ্গের বাইকাররা ওর চাইতে শতগুণ অভিজ্ঞ, ওদের কাছাকাছি পর্যায়ে যেতে গেলেও মাতিসের ওদের সাথে চালানো ছাড়াও আলাদা প্র্যাকটিস লাগবে, সপ্তায় একদিনে হবে না। এই ভেবে আমার জন্যও একটা বাইক নেওয়ার চিন্তা করলাম। তাতে মাঝেমাঝে আমিও ওর পিছনে পিছনে ট্রেইলে ঘুরতে পারবো আর চাইলে ছবিও তুলতে পারবো।

কিন্তু চাইলেই হয় না, এখানে ভালো “অল টেরেইন” বাইকের দাম গাড়ির চাইতেও বেশি। তারপরেও খুঁজে পেতে নিজের জন্য আরেকটা স্বল্পব্যবহৃত বাইক কিনেই ফেললাম। এখন চালাতে যেয়ে বুঝি আমার কলকব্জা মাতিসদের চাইতে অনেক পুরোনো, তাল মেলাতে কষ্ট হয়। তারপরেও চালাতে চেষ্টা করি। এখানকার বেশিরভাগ সুন্দর জায়গাগুলোই হয় হেঁটে নাহয় বাইকে যেয়ে দেখতে হয়। এইসব সুন্দর জায়গা দেখার আনন্দের তুলনায় কষ্ট তেমন কিছুই না।

গত কয়েকদিন আমার ছুটি থাকায় আর মাতিসের মেঝো মামার পরিবার ডালাস থেকে এখানে ঘুরে যাওয়ায় বেড়ানো হয়েছে অনেক, কিন্তু বাইকে ঘোরা হয়নি কোথাও। তাই ছুটি থাকতে থাকতেই সহজ একটা বাইক ট্রেইল খুঁজছিলাম, যেখানে আমার কষ্ট কম হবে আর অসুবিধা মনে করলে মাঝপথে ক্ষান্ত দিয়ে ফিরেও আসা যাবে। সেভাবে খুঁজতে খুঁজতে এই ট্রেইলটার সন্ধান পেলাম। একসময়য়ের বিখ্যাত ক্যাটল ভ্যালি রেলওয়ের পরিত্যক্ত রেলওয়ে করিডোর। যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত থেকে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার হোপ পর্যন্ত নানাদিকে প্রায় ছয়শ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডোর তার চারদিকের অবাক করা সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে বাইকাররা এখানে আসে তাদের বাইকিং ইতিহাসে একটা পালক যুক্ত করার জন্য।

পুরো ট্রেইল ঘুরতে চাইলে কয়েকদিন ক্যাম্পিং করা ছাড়া সম্ভব না। আমরা যেহেতু ক্যাম্পিং করবো না সেহেতু ট্রেইলের একটা অংশ ঠিক করলাম। আমাদের বাসা থেকে সাড়ে চারশ কিলোমিটার দূরে কেওলোনা শহরের কাছে মেরা গিরিখাত, গিরিখাতটি পাশে এক কিলোমিটারের কম হলেও এর গভীরতা এক কিলোমিটারেরও বেশি বলে সরাসরি রেল না বসিয়ে তিন দিকে ঘুরিয়ে নেয়া হয়েছে। এই তিন দিক ঘুরে ট্রেইলের যে অংশটুকু আমরা তাতেই বাইক চালাবো। কেওলোনা শহর থেকে প্রায় তেরশ মিটার উপর দিয়ে এই ট্রেইল। ক্যাটেল ভ্যালি রেলওয়ে করিডোরের সবচাইতে সুন্দর অংশগুলোর একটি, দশ/বারো কিলোমিটার ট্রেইলে আঠারোটি ট্রেসেল ব্রিজ আর দুইটি টানেল সারা বছরই এখানে পর্যটক টানে।

বিশাল ওকানাগান লেকের পাড়ে দুপাশের পাহাড় জুড়ে গড়ে উঠা কেওলোনা ছোট হলেও ছিমছাম আর সুন্দর। যেকোনো প্রান্ত থেকে ওকানাগান লেক চোখে পড়ে। সারাবছরই লেকের পাড় জুড়ে পর্যটকদের ভিড় থাকে। যারা একটু রোমাঞ্চপ্রিয় তাদের জন্য আশেপাশে ঘোরাঘুরি আর ক্যাম্পিংয়ের প্রচুর জায়গা। আমার ধারণা বছরের যেকোনো সময়ে শহরের স্থায়ী বাসিন্দা আর পর্যটকদের সংখ্যা সমান সমান।

সকাল পৌনে দশটায় বাসা থেকে বের হয়ে বিসি-ওয়ান হাইওয়ে ধরে পূর্ব দিকে দেড়শো কিলোমিটার যেয়ে হোপ পেরিয়ে বিসি-পাঁচ কোকিহালা হাইওয়েতে ঘণ্টাদেড়েকের মাথায় পৌঁছে গেলাম। এবার এই হাইওয়ে ধরে উত্তরে মেরিটের দিকে যেতে হবে আরো একশ কিলোমিটার। এই একশ কিলোমিটার বেশ উঁচু (গাড়ি চালিয়ে প্রায় তেরশ মিটার উপরে উঠে আবার নামতে হয়), বেশ কিছু পাকদণ্ডী এ রাস্তায় অনেক দুর্ঘটনার কারণ। আমরা ফেরার পথে এই রাস্তার মাথায় হোপের কাছে একটা দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলাম। কিছুক্ষণ আগেই ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় কয়েকটি গাড়ি পাঁচশ মিটার জুড়ে ছড়িয়ে আছে। সাত/আট জনকে রাস্তায় পড়ে থাকতেও দেখেছি। আমরা দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই পুলিশ চলে এসেছিলো আর আমাদের প্রায় সাথে সাথেই অ্যাম্বুলেন্স। যা হোক, কোকিহালা পেরিয়ে মেরিটের ঠিক আগেই প্রিন্সটন-কেমলুপস্ হাইওয়ে ধরে আমরা যখন কেওলোনা পৌঁছালাম ঘড়িতে প্রায় একটা বাজে তখন। প্রিন্সটন-কেমলুপস্ হাইওয়েও বেশ উঁচুতে, আর আশেপাশে জনবসতি না থাকাতে কিছু কিছু জায়গায় সেলফোনের নেটওয়ার্কও নাই। সুতরাং ভালো গাড়ি আর পর্যাপ্ত তেল না থাকলে রাস্তাটা যেকারো জন্য বিপদজনক হয়ে যেতে পারে। এ রাস্তায় আমাদের ফেরার পথে কেওলোনা থেকে মেরিটের মাঝামাঝি এক মেয়েকে গাড়ির ইমার্জেন্সি লাইট জ্বালিয়ে রাস্তায় হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থেমে তুলে নিয়েছিলাম পরবর্তী শহরে নামিয়ে দেওয়ার জন্য। ওর কাছে শুনেছি গাড়ি নষ্ট হয়ে যাবার পর প্রায় তিন ঘন্টা হলো এভাবেই সাহায্যের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলো সে।

কেওলোনাতে থেমেছি কফি খাবারের জন্য। এরপর রাস্তা খোঁজা। মেকুলোক স্ট্রিট, এ রাস্তাই আমাদের নিয়ে যাবে পাহাড়ের কাছে। এরপর আট কিলোমিটার পাথুরে রাস্তা বেয়ে উঠতে হবে ট্রেইলের একপ্রান্তে। এন্ড্রু মেকুলোক যার নামে এই রাস্তা পেশায় তিনি ছিলেন একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। ক্যাটল ভ্যালি রেলওয়ের এই চ্যালেঞ্জিং অংশটুকু উনারই করা। কেওলোনা শহরের এই রাস্তা ছাড়াও একটা রেল স্টেশন আর একটা লেকের নামকরণ হয়েছে উনার নামে। এমন বিখ্যাত একজনের নামের রাস্তা বের করতে আমাদের খুব সময় লাগেনি। কিন্তু সময় লেগেছে পাথুরে রাস্তা বেয়ে আট কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে উঠতে। অবশেষে দুপুর দুইটার দিকে আমরা মেরা গিরিখাতের উপর মেরা স্টেশনে পৌঁছে গেলাম।

স্টেশনের কাছে পার্কিং লট, একটা বাইক রেন্টালের স্টল আর টয়লেট। পার্কিং লটে শখানেক গাড়ি আমাদের আগেই চলে এসেছে। নাম্বার প্লেট দেখে বুঝা যায় ব্রিটিশ কলম্বিয়া ছাড়াও আলবার্টা আর অন্যান্য প্রদেশের লোকজনও এখানে এসেছে। ছায়ামতো জায়গা খুঁজে না পেয়ে খোলা জায়গাতে গাড়ি রেখে উপর থেকে বাইক নামিয়ে আমাদের দ্বিতীয় পর্যায়ের যাত্রা শুরু হলো।

শুরুর আগেই ঠিক করে নিয়েছি আমরা ট্রেইলে থাকবো সর্বোচ্চ সাড়ে তিন ঘণ্টা। নিচের ট্রেসেল আর আশেপাশের ছবিগুলো আমাদের বাইকিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে তোলা। বাইকিং আর ছবি তোলা পাশাপাশি করতে গেলে একটাতে মনযোগ কম দিতে হয়। আমাদের মনযোগ ছিলো বাইকিংয়ে, তাই ছবির মান নিয়ে কথা না বলাই ভালো।
পুনশ্চ: সম্ভবত ২০০৩ সালে এই এলাকায় বিশাল অগ্নিকাণ্ডে প্রায় বিশ হাজার একর পুড়ে যায়, নেড়া পাহাড়গুলো যার সাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। সেই আগুনে আমরা যেই ট্রেসেল ব্রিজগুলো দেখেছি সবগুলোই পুড়ে গিয়েছিলো। পরে এগুলো আবার ঠিক করা হয়েছে এবং সেই কাজ এখনও চলছে।

চলুন এবার ছবি দেখি

পরপর কয়েকটি ট্রেসেল


আমি, মাতিসের তোলা ছবি

পুড়ে যাওয়া ডঙ্কি ইঞ্জিন

গিরিখাতের আরেক প্রান্ত থেকে দেখা একটি ট্রেসেল

ট্রেসেলের নীচে পুড়ে যাওয়া কাঠ পরে আছে

আঠারোটি ট্রেসেলের ভেতর সবচাইতে লম্বা এটি

ট্রেইলে মাতিস

ট্রেসেলের উপর মাতিস, পেছনে একটি টানেল, পুড়ে যাবার দাগ এখনও দেখা যায়

ট্রেসেল ৬

আরেকটি টানেলের মুখ

ট্রেইলে মাতিস, সামনে গিরিখাতের ওপারে আরেকটি ট্রেসেল হালকা দেখা যায়

গিরিখাতের একপাশে উপরে দাঁড়িয়ে অন্যদিকের ট্রেইল দেখা হচ্ছে

একটি ছোট ট্রেসেল

বিশ্রাম

ট্রেইলে ঢোকার মুখে পাহাড়ের উপর, সামনে ওকানাগান ভ্যালী, দূরে পাহাড়ের নীচে ওকানাগান লেক

আরেকটি ট্রেসেলের উপর

টানেল

সহজ রাস্তা ছেড়ে রোমাঞ্চ খোঁজা

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: