ইসলামের স্বর্ণযুগ – পর্ব ১

মূল লেখার লিংক
কোন যুগ বা জাতিকে বুঝতে হলে আমাদের সেই যুগ বা জাতির দর্শনকে বুঝতে হবে, আবার সেই দর্শনকে বুঝতে গেলে সেই যুগ বা জাতির অতীত-বর্তমান তথা সামগ্রিক অবস্থা বুঝতে হবে। এখানে একটি পারস্পরিক কার্য-কারণ সম্পর্ক রয়েছে। মানবজীবনের পারিপার্শিক অবস্থা তাদের দর্শন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আবার বিপরীতক্রমে তাদের দর্শন, তাদের পারিপার্শিক অবস্থা নির্ধারণে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যুগযুগব্যাপী এই মিথষ্ক্রিয়াটি চলছে।

এই মিথষ্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই মানবজাতি সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। মানব সভ্যতার যতগুলো পর্যায় রয়েছে প্রতিটি পর্যায়েই এই মিথষ্ক্রিয়াটি মূল ভূমিকা রেখেছে। আবার কোন একটি সভ্যতার শুরুতে একরকম, মাঝে আরেকরকম এবং শেষে আবার ভিন্নরকম হয়েছে; সেখানেও দেখা গিয়েছে তার শুরুর দিকে একরকম দর্শন ছিলো, মাঝে আরেকরকম এবং শেষে আবার ভিন্নরকম দর্শনের উদ্ভব হয়; অর্থাৎ দর্শনও বিকশিত হয়, আর সেইসাথে বিকশিত হয় মানবসভ্যতা।

কপিলের সাংখ্য দর্শন ও বুদ্ধের বৌদ্ধ দর্শন সমূহের বাংলার সভ্যতা। থালেস থেকে শুরু করে এরিষ্টটল-এর দর্শন সমূহের গ্রীক সভ্যতা, কনফুসিয়াস থেকে শুরু করে লিউ জোংঝৌ (Liu Zongzhou)-এর চৈনিক সভ্যতা, সিসেরো (Cicero) থেকে শুরু করে ফিলোপোনাস (John Philoponus) -এর রোমান সভ্যতা কোনটিই এর ব্যতিক্রম নয়। আবার বিভিন্ন জাতিকে আলাদা আলাদা ইউনিট হিসাবে দেখার পরও শেষ হিসাবে সমগ্র মানবজাতিই একটা ইউনিট। তাই দেখা গিয়েছে পৃথিবীর কালবিবর্তনের ধারাবাহিকতায় পূর্ববর্তি এক জাতির দর্শন পরবর্তি আরেক জাতির দর্শনকেও প্রভাবিত করেছে। কারন নীতি-আদর্শ-দর্শন-সাহিত্য-বিজ্ঞান-প্রযুক্তি কোন কিছুই রাজনৈতিক-ভৌগলিক সীমারেখায় সীমাবদ্ধ করে রাখা সম্ভব না।

আমার বর্তমান প্রবন্ধটি মানবসভ্যতার একটি পর্যায় বা যুগ নিয়ে। সেই পর্যায় বা যুগের নাম ইসলামী স্বর্ণযুগ।

৫৭০ খ্রীষ্টাব্দ
বিশ্বের ইতিহাসে সালটি অনেকগুলো কারণেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নিচে এই বিষয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা হলো।

৫৭০ খ্রীষ্টাব্দ নিয়ে আলোচনা করার আগে দুই-একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আলোচনা না করলেই না।

পৌরাণিক কাহিনী ইলিয়াডে বলা আছে যে, ট্রয়ের যুদ্ধে পরিশেষে গ্রীকরা জয়ী হয় ও ট্রয়ীরা পরাজিত হয়। যুদ্ধের শেষ রাত্রে ট্রয় নগরী যখন পুড়ছিলো তখন রাজপুত্র ইনিয়াস (Aeneas) শেষ চেষ্টা করছিলেন নগরীকে রক্ষা করার। বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করতে করতে একসময় তিনি দৈববাণী পেলেন যে, এই যুদ্ধে ট্রয়ীদের জেতার চেষ্টা করে কোন লাভ নেই, কারণ দেবতারা এখানে অংশগ্রহন করেছেন এবং তারাই এই ধ্বংসযজ্ঞে যোগ দিয়েছেন। ইনিয়াসের এখন দায়িত্ব হলো যেসব ট্রয়ীরা বেঁচে আছে, তাদের নিয়ে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়া। পলায়নের এক পর্যায়ে তিনি তার স্ত্রীকে হারান। স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়ার তিনি আবার নগরীতে ফিরে গেলে স্ত্রীর আত্মা ইনিয়াসের সাথে দেখা করে বলে, “আমাকে তুমি আর পাবেনা। তুমি পালিয়ে যাও, ট্রয়ীদের নিয়ে তুমি অমুক দ্বীপে চলে যাও, সেখানে তুমি এক রাজকন্যাকে পাবে, তাকে নিয়ে ঘর করবে। সেখানে তুমি গোড়া পত্তন করবে এক নতুন জাতির, ভবিষ্যতে এই জাতিই শৌর্য-বীর্যে এক খ্যাতিমান জাতিতে পরিণত হবে।” ইনিয়াসের মা ছিলেন সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতি (রোমানরা এই দেবীকে ভেনাস বলে)। ট্রয়ের রাজপুত্র অ্যাংকাইসিজ (Anchises) ছিলেন দেবীর অন্যতম প্রেমিক, তার সঙ্গে মিলনের ফলে জন্ম নিয়েছিলো ইনিয়াস। এই ইনিয়াসই রোমান জাতির জনক।

ইউরোপ মহাদেশে খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে রোম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর তা ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হতে থাকে এবং খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে রোম সাম্রাজ্যের সীমারেখা ইতালীর বাইরে বিস্তৃত হয়। একসময় সেই রিপাবলিক একনায়কতন্ত্রে পরিনত হয়। সাম্রাজ্যের প্রধান সম্রাট-এর পদের নাম ছিলো সিজার (কায়সার), এই সিজার বিশাল ক্ষমতার অধিকারী হন। রোমানরা ধীরে ধীরে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সবদিকেই সেই সময়ের পুরো পৃথিবী দখল করে নেয়। সাম্রাজ্যের এই তথাকথিত উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি ছিলো ‘দাসপ্রথা’। যুদ্ধজয়ের পর বিজিত অঞ্চলের সবাইই রোমানদের দাস-দাসীতে পরিণত হতো। এই দাস-দাসীদের মানবাধিকার বলে কিছু ছিলো না। তাদের সাথে রোমের অভিজাত সম্প্রদায় পশুর মত আচরণ করতো। ফলে পুরো সাম্রাজ্য জুড়ে ব্যাপক অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। এর ফলেই খ্রীষ্টপূর্ব ৭১ খ্রীষ্টাব্দে দাস গ্লাডিয়েটর স্পার্টাকাসের নেতৃত্বে ৭০০০০ দাসের এক বাহিনী রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, যার পরিসমাপ্তি ঘটে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। গ্ল্যাডিয়েটর-দাসদের এই যুদ্ধ তৃতীয় সারভিল ওয়ার হিসেবে এখন পরিচিত। স্পার্টাকাসকে হত্যার জন্য অনেক বাহিনী পাঠানো হয় কিন্তু গ্ল্যাডিয়েটররা তাদের অভিজ্ঞতা দিয়ে সহজেই তাদের পরাজিত করে। ৭১ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে, মারকুস ক্রেসুস ৫০,০০০ উন্নত প্রশিক্ষিত রোমান সৈন্য নিয়ে স্পার্টাকাসের বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রসর হন এবং ক্রেসুস দক্ষিণ ইতালিতে স্পার্টাকাসকে আটক করেন। শেষ পর্যন্ত বন্দী স্পার্টাকাসকে হত্যা করা হয়। তার ছয় হাজার অনুগামীদের বন্দী হয় এবং পরে তাদের ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল। তাদের মৃতদেহ দিয়ে কেপুয়া থেকে রোম পর্যন্ত রাস্তার ধারে লাইন তৈরি করা হয়েছিল।

রোম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাসদের এটি ছিলো আপাতঃ পরাজয়। কিন্তু দাসদের অসন্তোষ ও মুক্তির প্রচেষ্টা থেমে থাকেনি। অস্ত্র ও বাহুবল যা পারেনা, নীতি ও আদর্শ তা পারে। তাই দাসরা ও নিপিড়ীতরা স্বপ্ন দেখতে দেখতে থাকে যে, একজন ত্রাণকর্তা এসে তাদের এই অত্যাচার-অবিচার থেকে মুক্তি দেবে। স্পার্টাকাসের বিদ্রোহের ৭১ বছর পর সেই ত্রাণকর্তা এলেন। কোন অস্ত্র নয়, কোন যুদ্ধ নয়, নয় কোন হিংসা, তিনি কেবল শান্তির বাণী প্রচার করতে শুরু করলেন। আর সেই বাণীই কাল হলো রোমানদের জন্য। সেই ত্রাণকর্তার নাম যীশু (হযরত ঈসা (আঃ))। কোন বিলাসবহুল সুরম্য প্রাসাদে নয়, বরং তাঁর জন্ম হয়েছিলো বেথেলহামের এক গোয়াল ঘরে। অর্থাৎ অতি দরিদ্র সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে তিনি এসেছিলেন। যীশুর প্রাচারিত খ্রীষ্ট ধর্ম দলে দলে গ্রহণ করতে শুরু করে দাস-নির্যাতিত-নিপিড়ীতরা।

এই উত্তাল ঢেউয়ের মোকাবেলা করে টিকে থাকা সম্ভব হলোনা রোমানদের। পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলো তখন রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে চতুর্থ শতকের শুরুতে রোম সম্রাট কনস্টানটিন নিজেই খ্রীষ্টধর্ম গ্রহন করেন (যদিও এই নিয়ে সামান্য বিতর্ক রয়েছে, তবে তাঁর সময়েই যে প্রথম খ্রীষ্টানদের উপর থেকে নিপীড়ন তুলে নেয়া হয় এবং তাদেরকে অবাধে ধর্ম-কর্ম করার সুযোগ দেয়া হয় এটা নিশ্চিত)। এরপর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়ই খ্রীষ্টধর্ম বিকশিত হতে শুরু করে। এটি ছিলো ইউরোপের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট।

ইতিপূর্বে গ্রীক ও রোমানরা ছিলো পলিথেইস্ট প্যাগান, প্রাচ্যদেশীয় আব্রাহামিক ধর্ম খ্রীষ্টধর্ম গ্রহনপূর্বক তারা ধর্মান্তরিত হয়ে পরিণত হয় একেশ্বরবাদীতে। এদিকে গ্রীক ও রোমান দর্শন রাজানুকূল্য হারিয়ে ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে। প্রতিচ্যে খ্রীষ্টধর্মীয় দর্শন চর্চার গুরুত্ব দিন দিন বাড়তে থাকে। পাশাপাশি ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে খোদ রোম সাম্রাজ্য। কারণ ঐ সাম্রাজ্যের ভিত্তিই ছিলো দাসপ্রথা। কিন্তু খ্রীষ্ট ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সমাজে অভিজাত ও দাস সম্প্রদায় বলে আর কিছু রইলো না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠিত হলো সামাজিক সাম্য। যা রোম সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দিলো।

এক পর্যায়ে ৩৯৫ খ্রীষ্টাব্দে রোম সাম্রাজ্য বিভক্ত হলো দুটি ভাগে পশ্চিম রোম সাম্রাজ্য ও পূর্ব রোম সাম্রাজ্য। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিশাল রোম সাম্রাজ্যের এই পূর্ব-পশ্চিম বিভাজনম ঘটে। পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের আওতাধীন ছিল এশিয়ার মাইনর, মিসর, শাম, ফিলিস্তিন প্রভৃতি অঞ্চল। সম্রাট কনস্টানটাইন ৩২৬ খ্রিস্টাব্দে এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত বসফোরাস প্রণালির তীরে একটি শহরের পত্তন করেন। এটির নামকরণ করা হয়েছিল সম্রাটের নিজের নামের সাথে যুক্ত করে কনস্টানটিনোপল। পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের আরেক নাম বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য (আরবরা এটাকে রোম সাম্রাজ্যরূপেই অভিহিত করত)।

এই বাইজেনন্টাইন সাম্রাজ্যের এক সম্রাটের নাম ছিলো সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ান (৪৮২ খ্রিস্টাব্দ – ১৪ নভেন্বর ৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ), যিনি জাস্টিনিয়ান দ্য গ্রেট নামে পরিচিত। তার শাসনকাল ৫২৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। এই সময়কালে তিনি ধ্রুপদী পশ্চিমা রোমান সম্রাজ্যকে একীভূত করার চেষ্টা করেন। ৫২৯ থেকে ৫৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি বেশকিছু আইন জারি করেন। যেগুলো ইতিহাসে “জাস্টিয়ান কোড” (Justinian Code) নামে পরিচিত

সেই সময় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন আইন প্রচলিত ছিলো, মোটামুটিভাবে এলোমেলোই বলা যায়, এমনকি তারা লিখিত অবস্থায়ও নাই। জাস্টিনিয়ান সিদ্ধান্ত নিলেন যে, পুরো রোম সাম্রাজ্যকে গুছানো একই আইনের আওতায় আনবেন। সম্রাজ্যের সকলের জন্য একই আইন প্রযোজ্য হবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তিনি তাঁর বিচারকদের ও আইনজীবিদের নির্দেশ দিলেন আইনগুলো লিখতে। তারা আইনগুলো লিখলেন যাকে Twelve Tables বলা হয়। আইনগুলো লেখা সম্পন্ন হলে তারা সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করলেন যাতে একটি আইন আরেকটির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। পুরো কাজ শেষ হবার তারা এই আইন-সম্ভারের নাম দিলেন Justinian Code। বহু রাষ্ট্রই তাদের রাষ্ট্রীয় আইন তৈরীর ভিত্তি হিসাবে জাস্টিনিয়ান কোড ব্যাবহার করেছে। এমনকি আধুনিক আমেরিকার bill of rights তৈরীর ক্ষেত্রেও জাস্টিনিয়ান কোড ব্যবহার করা হয়েছিলো।

Corupus Iurus Civilis or the Justinian Code, was the result of Emperor Justinian’s desire that existing Roman law be collected into a simple and clear system of laws, or “code.” Tribonian, a legal minister under Justinian, lead a group of scholars in a 14-month effort to codify existing Roman law. The result was the first Justinian Code, completed in 529. This code was later expanded to include Justinian’s own laws, as well as two additional books on areas of the law. In 534, the Justinian Code, made up of the Code, the Digest, and the Institutes, was completed.

জাস্টিনিয়ান কোডের চারটি অংশের বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:
১। কোড (The Code) – ৫০০০ রোমান আইন, যা এখনো অতীব গুরুত্বপূর্ণ
২। সারসংগ্রহ (The Digest) – এটি একটি কেইসবুক যেখানে বিভিন্ন বিচার-মামলা এবং রায়-সিদ্ধান্ত সম্পর্কে লেখা আছে।
৩। প্রতিষ্ঠান (The Institutes)- পাঠ্যপুস্তক যা আইনের ছাত্রদের বলবে কিভাবে আইন ব্যবহার করতে হবে।
৪। প্রস্তাবসমূহ (The Novellae) – ৫৩৪ সালের পর প্রস্তাবিত সকল আইনসমূহ।

এরাই রোম সাম্রাজ্যের প্রথম লিখিত আইনসমূহ। এখানে আইনের সমতার উপর জোর দেয়া হয়েছে। এই আইন বলে যে, কথা ও কাজের সাক্ষী থাকে কিন্তু অভিপ্রায়-এর কোন সাক্ষী থাকেনা। যেমন, কোন ব্যাক্তি তার সম্পদের উইল নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী করতে পারে কিন্তু সে যদি তার সম্পদের ২৫% নিজ সন্তানদের জন্য না রাখে তা হলে সরকার সেই উইলকে অকার্যকর ঘোষণা করবে। কোন গাছ যদি বাঁকা হয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে ঝুঁকে পড়ে তাহলে প্রতিবেশী তা সরানোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে। কেউ যদি কারো অঙ্গহানী করে তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, তবে দাসকে মুক্ত ব্যক্তির তুলনায় অর্ধেক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কাউকে অপমান করলেও জরিমানা দিতে হবে। শবযাত্রায় নারীর কান্না বা বিলাপ করা যাবেনা।

সম্রাট জাস্টিনিয়ান এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে।

জাস্টিনিয়ান এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার পর যে ব্যক্তিটি উল্লেখযোগ্য তার নাম পোপ গ্রেগরী Pope Gregory I। উনার জন্ম যদিও জাস্টিনিয়ানের শাসনামলেই (৫৪০ খ্রীষ্টাব্দে) কিন্তু উনার কার্যক্রম মূলতঃ ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দের পর। তিনি পোপের পদ অধিকার করেন ৫৯০ খ্রীষ্টাব্দের ৩রা সেপ্টেম্বর এবং ৬০৪ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত আমৃত্যু ক্ষমতায় থাকেন।

পোপ গ্রেগরী রাষ্ট্রযন্ত্রকে চার্চের তথা খৃষ্টধর্মকে রক্ষার ও খৃষ্টধর্মের পথকে নির্বিঘ্নকরণের হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেন। তিনি প্রায়শ রাষ্ট্রীয় শক্তিকে খৃষ্টধর্মের মাঝে বিভেদ, পথভ্রষ্টতা ও পৌত্তলিকতা দমনে কাজে লাগাতেন। পোপ গ্রেগরী এটা নিশ্চিত করেন যে, শাসক ও খৃষ্ট-যাজকরা যেন একাত্ম হয়ে উঠেন, যা খৃষ্টধর্মকে “রাষ্ট্রীয় ধর্মে” উন্নীত করে। এর ফলে ইউরোপে খৃষ্টধর্মের অত্যাচার-নির্যাতন আরও চাংগা হয়ে উঠে এবং সেখানে “অন্ধকার যুগ”-এর সূচনা ঘটায়। খ্রীষ্টান ধর্মযুদ্ধ ক্রুসেড পোপ গ্রেগরীরই প্রবর্তিত। অসহায় অসংখ্য নারীকে “ডাইনী” আখ্যা দিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে হত্যা (মধ্যযুগীয় জার্মান ডঃ স্প্রেংগারের মতে ৯০ লক্ষের বেশী), বহু নাস্তিক খৃষ্টানকে হত্যা যার মধ্যে ছিলেন মেধাবী বিজ্ঞানী জিওরডানো ব্রুনো (Giordano Bruno) (বিখ্যাত বিজ্ঞানী গ্যালিলিও-র উপর নির্যাতন ও হুমকীও উল্লেখযোগ্য), ইউরোপের পৌত্তলিকদেরকে চরম বর্বরতামূলকভাবে সম্পূর্ণরূপে নির্মূলকরণ, ইউরোপ থেকে প্রাচ্য পবিত্র ভূমি (প্যালেস্টাইন) পর্যন্ত ইহুদীদের উপর ব্যাপক নির্যাতন ও গণহত্যা, ইউরোপে রক্তক্ষয়ী ক্যাথলিক-প্রটেস্টান্ট যুদ্ধ এবং দক্ষিণ আমেরিকায় প্রায় ৫০ লক্ষ আদিবাসী পৌত্তলিককে হত্যা ইত্যাদির বীজ বপন করেছিলেন পোপ গ্রেগরী।

চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীতে ইউরোপে খৃষ্টধর্মের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার প্রজ্ঞাশীলতা ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা-চেতনা ভিত্তিক চিরায়ত (ক্ল্যাসিকল) প্রাক-রোমান সভ্যতার বিলুপ্তি ঘটায় এবং “অন্ধকার যুগ” (৫ম-১০ম শতাব্দী) ও “মধ্যযুগ” (১১-১৭তম শতাব্দী) বয়ে আনে। খৃষ্টীয় রীতিনীতির প্রাধান্যের এ যুগ দু’টো ছিল প্রজ্ঞাহীনতা, কুসংস্কার ও নৈরাজ্যের যুগ, যখন ইউরোপ অর্থনৈতিকভাবে স্থবির হয়ে পড়ে; সাহিত্য, কলা, দর্শন, প্রজ্ঞাশীলতা ও বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়ে, এবং সহিংসতা ও নির্মমতায় ঝলসে উঠে। (৫৭০ খ্রীষ্টাব্দের আগে ছিলেন জাস্টিনিয়ান, ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দের পর এলেন গ্রেগরী।)

এই ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে পৃথিবীর অন্যান্য অংশে যে সকল পরিবর্তন ঘটেছিলোঃ

১। ভারত উপমহাদেশে গুপ্ত যুগের চূড়ান্ত অবসান ঘটে। এরপর শুরু হয় হর্ষবর্ধনের যুগ। গুপ্ত শাসকরা মিথ নির্ভর পলিথেইজম বৈদিক ধর্মের অনুসারী ছিলো, তাই এসময় ভারত ও বাংলায় বৈদিক ধর্ম (ব্রহ্মণ্যবাদ) রাজানুকূল্য পেত। পক্ষান্তরে রাজা হর্ষবর্ধন বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে বাংলা ও ভারতে ব্রহ্মণ্যবাদের প্রভাব কমে দর্শন ভিত্তিক ধর্ম বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে।
২। চীনে বিভিন্ন ধরণের বৌদ্ধ দর্শনের মধ্যে প্রতিযোগিতার অবসান ঘটে। ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম তাওইস্ট (Taoist) এনসাইক্লোপিডিয়া প্রকাশিত হয়।
৩। তিব্বতে যুদ্ধপ্রিয় রাজবংশ (Gnam-ri srong-brtsan, 570-619) এত বেশী প্রভাব ফেলে যে তা কার্যকরী তিব্বতের ইতিহাসের সূচনা করে।
৪। বাংলা থেকে চীন হয়ে উত্তাল সাগর পেরিয়ে বৌদ্ধ দর্শন যখন সুদুর জাপানে পৌছে, তখন জাপানের উন্নয়নের সূত্রপাত হয়।
৫। আমেরিকায় Nephite-influenced culture-এর মৃত্যু ঘটে।
৬। বৃটেন ও রোমান সাম্রাজ্যে মূল খ্রীষ্টধর্ম-কে উপড়ে ফেলা হয়।
৭। মিশরে – ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দ প্রাচীন শাসনক্ষমতার পরিসমাপ্তির সংকেত দেয়। কিছুকাল পরে বাইজেন্টাইন পাত্রিয়ার্খ-রা শাবস্থান করতে শুরু করে। এবং ৬৪১ খ্রীষ্টাব্দের পর হাজার হাজার বছরের পুরাতন ফেরাউন ডাইনাস্টির পতন ঘটে এবং মুসলিম যুগ শুরু হয়।

আর এই ৫৭০ খ্রীষ্টাব্দেই ঘটে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আরবের ধুসর মরুভূমিতে জন্ম নেন এক মহামানব, যিনি পুরো পৃথিবীটাকেই পাল্টে দিলেন। তাঁর নাম হযরত মুহম্মদ (সঃ)।

নবীজীর জন্মের বছরই মক্কা এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হয় – একে বলা হয় হস্তী বর্ষ বা হস্তিবর্ষ (ইংরেজী: The Year of the Elephant, ইয়ার অব দ্য এলিফ্যান্ট‎; আরবি: عام الفيل‎, ʿআমুল ফিল)। এটা হল ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে ইতিহাসে সঙ্ঘটিত একটি ঘটনার সময়কাল। নামটির আগমন ঘটেছে মক্কায় সঙ্ঘটিত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে: যা ছিল আবরাহা নামক ইয়েমেনের তৎকালীন সম্রাটের (Abraha – Christian viceroy of Saba’ in Yemen, ruled by Ethiopia) বিশাল সৈন্যবাহিনী সহ মক্কা আক্রমণ করে, কিন্তু প্রেরিত সহস্র আবাবিল নামক পাখির আক্রমণে উক্ত সেনাবাহিনী পরাজিত হয়। যা ছিলো নিঃসন্দেহে একটি অলৌকিক ঘটনা।

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: