বাংলাদেশের উচ্চতম রাস্তা

মুল লেখার লিংক

“ওরে আল্লাহ্‌, ডিম পাহাড়ে যাইবেন? টিপরাগুলো ধইরা কাইট্টা না ফালাইলেও ৩ দিন লুকায়ে রাইখা মিনিমাম ২ লাখ ট্যাকা আদায় কইরা ছাড়ব।“

আওয়াল সাহেব বেশ রসিক মানুষ। পৈতৃক বাড়ি নেত্রকোনা জেলায় হলেও আলীকদমে আছেন সেই ১৯৮১ সাল থেকে। অন্য অনেক নদীভাঙা গৃহহীন বাঙালীর মতই তিনিও জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় বান্দরবনে বসতি গেড়েছিলেন সেই সময়। এরপর পাহাড়িদের সাথে মারামারি কাটাকাটি শেষ করে এখন থিতু হয়েছেন। ছেলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ছে। নিজে ঠিকাদারি করে ভালই কামাচ্ছেন।

বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য আলীকদম বাজারের একটা ছাপরা দোকানে বসে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কথাটা শুনে চুমুক না দিয়ে আড়চোখে তাঁর দিকে তাকালাম। নাহ, এই ব্যাপারে তিনি সিরিয়াস। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই হাত দিয়ে গলা কাঁটার একটা ভঙ্গি করলেন। ধীরেসুস্থে চা’টা শেষ করে বললাম, “কিন্তু আমার যে যেতেই হবে।“

ব্যাস, হয়ে গেল। এইবার তিনি বুঝাতে শুরু করলেন কেন ওইদিকে যাওয়া যাবে না। ওই পথে বাঙালী দেখলে টিপরা’রা অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করে। গত সপ্তাহেই নাকি ২ জন বাঙালীকে অপহরণ করে ১ সপ্তাহ আঁটকে রেখেছিল। এছাড়া ডিম পাহাড়ের রাস্তাও নাকি ভয়ংকর। গত মাসেই আর্মির কনভয় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ২ জন মারা গেছেন (এইটা সত্য ঘটনা)। এই রাস্তায় যাওয়া আর কবরে যাওয়া নাকি সমান কথা। ঘরে তাঁর বিবি-বাচ্চা আছে অতএব যেতে পারবেন না। চুপচাপ শুনে শেষ ব্রহ্মাস্ত্রটা ছাড়লাম। তিনি যদি আমাকে সেখানে নিয়ে যান তাহলে কিছু পয়সাপাতি পাবেন। আরও কিছুক্ষণ গাইগুই করে শেষমেশ রাজী হলেন। চললাম তাঁর ১০০ সিসি’র বাইকে চড়ে ডিম পাহাড়ের পানে। উদ্দেশ্য বাংলাদেশের উচ্চতম রাস্তায় ভ্রমণ।

বাংলাদেশের উচ্চতম রাস্তার দৈর্ঘ্য ৩৩ কিলোমিটার। রাস্তাটি বান্দরবনের আলীকদম এবং থানচি উপজেলাকে সংযুক্ত করেছে। আলীকদম থেকে এই রাস্তা উপরের দিকে উঠেছে এবং ডিম পাহাড়ের কাছাকাছি রাস্তার উচ্চতা দাঁড়িয়েছে ২৫০০ ফুট। সেখান থেকে আবার নিচের দিকে নেমে থানচিতে গিয়ে শেষ হয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মিত সড়কটি তৈরিতে সময় লেগেছে ১০ বছরেরও বেশি। নির্মাণকালীন বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের ৩ জন সদস্য মৃত্যুবরণ করেছেন। তারমানে বুঝতেই পারছেন এই রাস্তা কতখানি দুর্গম।

৩৩ কিলোমিটার দূরত্বের ৩ কিলোমিটার পার হতে না হতেই রাস্তা উপরে উঠা শুরু করল। সেই সাথে বাঁক তো আছেই। ৫ কিলোমিটারের মাথায় একটা অবজারভেশন পোস্ট আছে। এইখানে থেমে খানিকক্ষণ ফটোসেশন করলাম। পিছনে ফেলা আসা আলীকদম শহরটাকে কেমন রহস্যময় লাগছিল।

যতই এগুতে লাগলাম চড়াই এবং উৎরাই এর পরিমাণ ততই বাড়তে লাগল। সর্পিল আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা কিছু কিছু জায়গায় এতটাই খাড়া হয়ে উঠে আবার নেমে গিয়েছিল যে বুকে কাঁপন ধরে যাচ্ছিল। শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যারের ভাষায় বলতে হয়, “ভয়ে পেটের ভিতর চাউলগুলো ভাত হয়ে যাচ্ছিল।“ তবে চড়াই এর মাথা থেকে চারপাশের দৃশ্য যে অপূর্ব লাগছিল সেটা অস্বীকার করবার কোন উপায় নেই। যতদূর চোখ যায় কেবল পাহাড় আর পাহাড়, মেঘ আর মেঘ।

১২ কিলোমিটার এর মাথায় আমরা প্রথম টি-ব্রেক দিলাম থিংকুপাড়ায়। এখানে একটা আর্মি ক্যাম্প আছে। সামনে এগুতে চাইলে আর্মি ক্যাম্পে নাম রেজিস্ট্রার করতে হয়। আওয়াল ভাই এখানে এসে সামনে না যাওয়ার জন্য গাইগুই শুরু করে দিলেন। কারণ থিংকুপাড়া থেকে থানচি পর্যন্ত আর কোন আর্মি ক্যাম্প নেই। এই পথটুকুই নাকি ঝুঁকিপূর্ণ। আমি গিয়েছিলাম জুন মাসের শুরুতে, তখনও রাস্তাটা চালু হয় নি বলে গণপরিবহণ নেই (এই মাসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাস্তাটা উদ্বোধন করেছেন)। আমি কি আর এইসব শুনব নাকি? এত কাছে এসে যদি ফেরত যেতে হয় তাহলে সারাজীবন আফসোস থেকেই যাবে। এইটুকু ঝুঁকি না নিলে কি আর ভ্রমণ সার্থক হয়?

পুনরায় যাত্রা শুরু করবার ৫ মিনিটের মাথায় বুঝতে পারলাম এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা কেবল সঠিকই নয়, বরং ফাটাফাটি ছিল। যতই উপরে উঠছিলাম, প্রকৃতির রঙ ততই গাঁড় সবুজ থেকে সবুজতর হচ্ছিল। মাঝে মাঝেই পাহাড়ের গায়ে ঘুমিয়ে থাকা টিপরাদের গ্রামগুলো দৃশ্যপটে ছবির মত ভেসে উঠেই আবারও অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল।

দ্বিতীয় টি-ব্রেক টা আমরা দিলাম রাস্তার পাশের একটা টিপরা পল্লীতে। আকাশ জুড়ে তখন মেঘের রাজত্ব। মেঘগুলো আড়মোড়া ভেঙে যে কোন মুহূর্তে ঝাপিয়ে পড়তে পারে। দৃষ্টির সীমানায় কেবল পাহাড় আর পাহাড়। মনে হচ্ছিল পাহাড়গুলো একটা সিঁড়ি তৈরি করেছে আর সেই সিঁড়ি বেয়ে আকাশের প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া যাবে।

আওয়াল ভাই শুরু থেকেই বলে আসছিলেন টিপরা’রা নাকি ভয়ংকর। এই বাচ্চাগুলোকে দেখে কি আপনাদের ভয়ংকর মনে হয়? যত্তসব জুজুর ভয়।

পাহাড়ি রাস্তায় এত পরিমাণ বাঁক মাঝে মাঝে মনে হয় সামনের পাহাড়টা বুঝি পথ আগলে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু না, একটু সামনে এগুতেই দেখা যায় কোন না কোন একটা রাস্তা ঠিকই বের হয়েছে। অসাধারণ এই কাজের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ধন্যবাদ দেওয়াই যায়। ১০ বছর সময় কি আর এমনি এমনিই লেগেছে এই রাস্তা তৈরিতে?

এইবার আমরা তৃতীয় এবং শেষ দফা টি-ব্রেক দিলাম। অবশ্য দিতে বাধ্য হলাম বলাটাই উচিৎ হবে। যে হারে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছিল তাতে ব্রেক না দিয়ে উপায় ছিল না। তবে স্বীকার করতেই হবে, চা টা দারুণ ছিল। আমার গাইড ভদ্রলোক অবশ্য চা-তেই সন্তুষ্ট ছিলেন না, ভয়ংকর (!) টিপরাদের দোকান থেকে বিস্কিটও নিয়েছিলেন।

পাহাড়ে আপনি যতই উপরে উঠবেন ততই বৃষ্টির সান্নিধ্য পাবেন। মেঘগুলো তখন আপনাকে স্পর্শ করবার জন্য অস্থির হয়ে যায় কি না। এই বৃষ্টি যেমন হুট করে আসে, তেমনি হুট করে চলেও যায়। এই যেমন আমরা বৃষ্টি থেমেছে দেখে যাত্রা শুরু করলাম। কিন্তু দুই মিনিট পরেই আবারও বৃষ্টি এসে আমাদের ভিজিয়ে দিল। এইবার যেহেতু আচ্ছাদন নাই তাই ভিজতেই থাকলাম। ভিজতে ভিজতেই অদ্ভুত একটা দৃশ্য চোখে পড়ল। আমরা অনেক উপরে বৃষ্টিতে ভিজছি, আর অনেক নিচে তখন রোদ।

চলতে চলতেই একসময় মেঘের আড়াল থেকে আমাদের সামনে প্রকাশিত হল রহস্যময় ডিম পাহাড়। চূড়ার আকৃতি ডিমের মতন হওয়াতেই এমন নামকরণ হয়েছে (১ম ছবিতে সবুজ তীর চিহ্নিত)। এইখানেই রাস্তার উচ্চতা ২৫০০ ফুটে পৌঁছেছে।

রহস্যময় বলছি এই কারণে যে ডিম পাহাড়কে ঘিরে টিপরাদের মাঝে একটা গল্প প্রচলিত আছে। টি-ব্রেকের সময় টিপরা দোকানদারের কাছ থেকে শোনা গল্পটা এইরকম,

উশে প্রু খুব মা ভক্ত ছেলে। মা’কে সে খুবই ভালোবাসে। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে মা’ই তাঁর একমাত্র সম্বল। সেই মা একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। প্রাণ যায় যায় অবস্থা। গ্রাম্য ওঝা উশে’র মাকে দেখে জানালেন এই রোগ নিরাময়যোগ্য নয়। ধুঁকে ধুঁকে তাঁর মা’কে মরতে হবে। তবে হ্যাঁ, মা’কে বাঁচানোর একটা উপায় আছে। কিন্তু সেই উপায় অত্যন্ত ভয়ংকর। প্রাণপ্রিয় মা’কে বাঁচানোর জন্য উশে যে কোন ঝুঁকি নিতে রাজী। সে জানতে চাইল কি করতে হবে।

উশে’র সম্প্রদায় যেখানে বসবাস করে সেখান থেকে ৩ দিনের হাঁটা দূরত্বে ডিম পাহাড়ের অবস্থান। প্রতি পূর্ণিমা রাত্রিতে ডিম পাহাড়ের চূড়ায় এক অদ্ভুত ফুল ফোটে। আবার সকালবেলায় সেই ফুল ঝরে পড়ে। সেই ফুলের রস যদি খাওয়ানো যায় তবেই উশে’র মা সুস্থ হবে।

ডিম পাহাড়ে আজ পর্যন্ত কেউই পৌঁছাতে পারে নি। যারাই চেষ্টা করেছে তারাই নিরুদ্দেশ হয়েছে। অনেকে বলে সেই পাহাড়ে এক দানো থাকে যে কি না ফুলগুলোকে পাহারা দেয়। কেউ পাহাড়ে উঠলেই দানোটা তাকে মেরে ফেলে। এতসব জানা সত্ত্বেও উশে সিদ্ধান্ত নিলে সে যাবেই। একা যেতে সাহস না পাওয়ায় বন্ধু থুই প্রু কে সাথে নিয়ে রওনা দিল ডিম পাহাড়ের উদ্দেশ্যে।

পাহাড়ি পথে তিন দিন তিন রাত হাঁটবার পর অবশেষে তাঁরা পৌঁছাল ডিম পাহাড়ের চূড়ার কাছাকাছি। থুই প্রু কে রেখে উশে একাই পাহাড়ের চূড়ার দিকে চলল। প্রয়োজন তাঁর, ঝুঁকি সে একাই নিবে। থুই প্রু দেখল তাঁর বন্ধু ধীরে ধীরে পাহাড়ের চূড়ার দিকে উঠে যাচ্ছে। ঠিক মাঝরাতে আকাশ যখন পূর্ণিমার আলোয় উদ্ভাসিত, তখন উশে কে আবারও দেখতে পেল থুই। থুইকে উদ্দেশ্য করে উশে কিছু একটা ছুঁড়ে মারল। সেটা গড়াতে গড়াতে থুইয়ের কাছাকাছি এসে থামল। থুই দেখে একটা থলে যার ভিতরে পাথর আর তাঁদের অতি আকাঙ্খিত পাহাড়ি ফুল। উশেকে ইশারা দিয়ে থুই জানাল যে সে ফুলগুলো পেয়েছে। উত্তরে উশে জানাল সে নিচে নামবে, থুই যেন তাঁর জন্য অপেক্ষা করে।

উশের সাথে থুইয়ের সেই শেষ দেখা। আর কোনদিন তাঁর খোঁজ পাওয়া যায় নি। পুরো একদিন একরাত থুই উশের জন্য অপেক্ষা করে ফেরত আসে। মা ভাল হয়ে গেলেও উশে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। কিন্তু মায়ের জন্য তাঁর এই আত্মত্যাগ চিরদিনের মত টিপরাদের মনে স্থায়ী হয়ে যায়।

রাস্তাটা পাহাড়চূড়ার একদম নিচ দিয়ে গেছে। সময়ের অভাবে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও চূড়ায় উঠতে পারি নি। বাংলাদেশের উচ্চতম রাস্তার একটা ভিডিওচিত্র এই সুযোগে দেখে নেওয়া যাক।

বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু রাস্তায় উঠবার আনন্দে পাহাড় আর মেঘকে পাশে নিয়ে এক চিমটি ফটোসেশন করাই যায়, কি বলেন?

ছবিতে যেই সাইকেলটা দেখছেন সেটা ঢাকার একটা সাইক্লিং গ্রুপের এক সদস্যের। এই গ্রুপের ৩ সদস্য সাইকেলে করে থানচি থেকে ডিম পাহাড় পর্যন্ত উঠেছে। যাবে আলীকদম পর্যন্ত। ছেলেগুলোর সাহস এবং ইচ্ছাশক্তির প্রশংসা করতেই হয়।

এখান থেকেই রাস্তাটা এঁকেবেঁকে থানচির দিকে চলে গেছে। পাহাড়ের কোলে ঘুমিয়ে থাকা থানচি শহরটাকে ডিম পাহাড় থেকে কিন্তু দারুণ দেখায়।

আরও একটা তথ্য দেই। এইখান থেকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড়চূড়া তাজিনডং দেখা যায়। তবে শর্ত হল আকাশ পরিষ্কার থাকতে হবে। তাজিনডং একবার আমাদের দেখা দিয়েছিল, কিন্তু ছবি তুলবার সময় আবার মেঘ এসে চারপাশ ঘিরে ধরেছিল।

ফিরতি পথ ধরলাম। ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, উশে’র আসলে কি হয়েছিল? সে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল? যাব নাকি তাঁর পথ ধরে ডিম পাহাড়ের গভীরে? ইচ্ছেটা তোলা থাকল। কোন একদিন এই রহস্য ভেদ করবার অভিযানে নামতে হবে। যাবেন নাকি কেউ আমার সাথে?

Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: