ছুটছি: সেন্টমার্টিন- ছেড়াদ্বীপ

মূল লেখার লিংক
st-martin-beach1
সাগরের গর্জন, আঁধার ভেদ করে ফসফরাসের ঝলকনি, জোনাকি জ্বলে ওঠা মধ্যরাত-প্রচণ্ড রকমের উপভোগ্য আমার কাছে সেন্টমার্টিন্স আইসল্যান্ড।
সেই ২০০০ সাল থেকে এখনো। বয়স হয়েছে, আগের মত ট্রলারে ছুট দেই না ঠিকই, তবুও যাই। বেড়াতে কিম্বা বাণিজিক্য ভ্রমণে। বছওের ৬ থেকে ৭ বার। তবুও মন ভরে না।
এবারের আয়োজনটা ভিন্ন। আমার দুই পুত্র নাজিব ও নাকিবকে নিয়ে সেন্টমার্টিন্স যাচ্ছি। সব ঠিকঠাক থাকলে আজ শুক্কুরবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭ টায় গাড়ি ছাড়বে।
এটা একটা ভিন্ন রকমের অনুভূতি- নাজিব এর আগে কক্সবাজার গেছে। সেন্টমার্টিনে তার প্রথম যাত্রা। দেশে এই একটি দ্বীপ আমার কাছে অপার বিস্ময় এবং ভালোলাগার।

যে সময় ঢাকা ইউনিভার্সিটি ট্যুরস্ট সোসাইটিতে ছিলাম, ট্যুরের দায়িত্বে থাকতাম, সে সময় দল বেঁধে যেতাম, ঘোরঘুরিতে আমি একলা দুই চারজন নিয়া আনন্দ পাই কম, খুবই কম। আমার বন্ধু ও শত্রু বাবু আমার এক সময়কার ভ্রমণসঙ্গী। সেন্টমার্টিন্সে আমি আর ও একসাথে গেছিলাম।
তার পর বার বার অনেক বার। এ দ্বীপে যেতে আমার কখনো খারাপ লাগে না। মনে হলেই ছুটে যাই, সে রকম এক আনন্দময় এক দ্বীপ-সেন্টমার্টিন্স। পুরনো নাম নারকেল জিঞ্জিরা, দারুচিনি দ্বীপও বলা হয়্। আগে আরব্য ব্যবসায়ীরা এ দ্বীপে বিশ্রাম করতেন, দক্ষিণ পাড়ায় অনেক নারকেল গাছ। এক সময় কেবল নারকেলে জলপান নয়, মুখ ধোয়ার কাজেও ব্যবহার করতাম। এখন সেটা স্বপ্ন।
সেন্টমার্টিন্সের ডাবের চাহিদা মেটাতে মায়ানমার হাল ধরেছে!

সেন্টমার্টিন্সের অনেক ঘটনার মধ্যে নেক স্মৃতি আছে- প্রথম আমরা যখন দল বেঁধে গেলাম, সেবার জোছনা রাত। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। হুমায়ূন আহমেদের বই পড়তাম- জোছনা মানে আমার কাছে অন্য রকম একটা ব্যাপার।
এক রাতে আমরা পুরো দ্বীপ চক্কর মারলাম। সমুদ্রের মাঝখানে একটা রূপময় দ্বীপ ভেসে থাকলো, সন্ধ্যার পরে ছেড়াদ্বীপ থেকে ফিরতে ফিরতে আমাদের এ জোছনা দর্শন। মানুষ আমরা গোটা চল্লিশেক। সে সময় ছেড়দ্বীপ যাবার বাহন ছিল পা।
ফেরার পথে পানি বেড়ে গেছে, মানে জোয়ার। আমরা সে জোয়ারে হাবুডুবু খেয়ে ফিরছিলাম! তবুও আনন্দ, সীমাহীন সেই আনন্দ ছাড়াও সেন্টমার্টিনসের দক্ষিণ পাড়ার যাবার পথে অনেকগুলো প্রবাল পড়ে, সেখানে এক সন্ধ্যায় পা ডুবিয়ে সূর্যাস্ত দেখেছি, এমন মুগ্ধ আমাকে আর কিছুই করতে পারেনি, আমার ছেলেদের হাসি ছাড়া।

সেন্টমার্টিন্সের প্রেমে আমি মজনু। থাকতেও চা্ই। আজকে যখন গোত্তা মেরে জলের ভেতর আঁচড়ে পড়ে জাহাজের নোঙর, মনে হয় আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। লঞ্চের খট খট শব্দ, সিগালের ওড়াওড়ি দেখতে দেখতে নৌকার নাচন আর মাঝির ভিজ্ঞতা শুনতে শুনতে যে সেন্টমার্টিনস যাত্রা করতাম, সেই আমেজ পাই না।
তবুও
আজ যখন যাবো তখন অনেক স্মৃতি ভিড় করছে। আমরা যখন ট্যুর আয়োজন করতাম, ট্যুরের আগে সকালে আমি আর বাবু কেনাকটা করতে যেতাম বঙ্গবাজারে। ফিরতাম হলে, ফ্রেশ হয়ে ট্যুরিস্ট সোসাইটি অফিসে বসতাম। সবাই আসতো, গল্পে আড্ডায় আমরা ছুটতাম।

আজকের ভ্রমনটা একেবারই ভিন্ন। টিকিট করা গাড়ি একজন বয়সী-তরুণ উঠবে পরিবার পরিজন নিয়ে। সাথে ছোট ভাই, সেও বউ নিয়ে এবং বন্ধু সেও বউ-কন্যা নিয়ে। সময়ের স্রোতে কি দারুণ এক বদল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে, মধুর ক্যান্টিনের বাটার টোস্ট খেয়ে, মিস্টির রস চুষে নিয়ে আনোয়ারের সিগারেটে ফুঁ দেয়া ছেলেপুলো সব বড় হয়ে গেছে!
তবে এ অবকাশ যাপান আমরা কাছে একটা অনন্য ও অসাধারণ ঘটনা। আমার দুটো ছেলেই সাথে যাচ্ছে। সাথে তাদের মা। পিতা হিসাবে নিজেকে স্বার্থক মনে হচ্ছে। ওরা যখন বড় হবে, বার বার যাবে, নিজে যাবে, বান্ধবী-বউ নিয়ে যাবে। বুড়ো বাবা মাকেও নিয়ে যেতে পারে, যদি ততদিন তারা বেঁচে থাকে।
নাজিবের মুখের দিকে তাকালে আমার মনে হয়, পৃথিবীতে এর চেয়ে বেশি কিছু আমি চাইনি। বয়স ওর ৫ । বুদ্ধিভিত্তিক কিছু জটিলতা আছে। তবুও এ ছেলেটার কারণে আমি আজ অন্যরকম এক মানুষ। নাকিবকেও রাখতে হবে সে দলে, গুট গুট করে হাঁটে, টুক টুক করে কথা বলে। এত মায়াবী দুইখান পুত্র আমার। সাথে যাচ্ছে বন্ধু শামীম ও তার কন্যা এবং স্ত্রী আসমা এবং ছোটভাই শিপু ও তার স্ত্রী রীতি। আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে আমরা একসাথে বেড়ে উঠেছি।

তবুও আমি এখানে কারো শূণ্যতা খুব অনুভব করি, সামনেও করবো- মীর মামুন, বাবু, মাহমুদ, সাদিয়া , লিপি, মিটি, নিম্মি, খালিদ, দিলরুবা, গ্লোরিয়া- আরো অনেকে। মিস ইউ মাই ডিয়ার ফ্রেন্ডস, এনিমিজ, সিস্টারস অ্যান্ড ব্রাদারস।

লাভ ইউ সেন্টমার্টিন্স, লাভ ইউ অল।

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: