একশো বছরের ছোটদের সচিত্র মাসিক পত্র: সন্দেশ

আহমাদ মাযহার
সন্দেশ কথাটা শুনলে আমাদের জিহ্বায় জল আসে! কারণ এই মজার খাবারটির জন্য আমাদের মনে এক ধরনের সাড়া পড়ে যায়! কিন্তু আমরা এখানে যে সন্দেশ-এর কথা বলছি তা আরেক ধরনের খাদ্য। ছোটদের জন্য একটা ভালো পত্রিকা তাদের মনের জন্য পুষ্টিকর খাদ্য হতে পারে। এমন খাদ্য বাংলার ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দেয়ার জন্যই উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী (জন্ম: ১০ মে ১৮৬৩-মৃত্যু ২০ ডিসেম্বর ১৯১৫)  সন্দেশকে হাজির করেছিলেন। সেটা এখন থেকে একশো বছর আগের ঘটনা। বাংলা ১৩২০ সালের বৈশাখ মাসে বেরিয়েছিল সন্দেশ। ‘ছেলেমেয়েদের জন্য সচিত্র মাসিক পত্র’ কথাটা লেখা থাকতো প্রচ্ছদে। মাঝে বেশ কয়েক বছর সন্দেশ বন্ধ ছিল। তবে সব মিলিয়ে এতগুলো বছর ধরে বাংলাভাষার আর কোনো পত্রিকা ছোটদের মনকে এমন ভাবে রাঙায়নি! পুরোনো দিনের ঝুলি খুলে একটু দেখে নেয় যাক কী করে এত বছর ধরে সন্দেশ ছোটদের মনরাঙানিয়া হয়ে রইল!

সম্পাদক উপেন্দ্রকিশোর কিন্তু সন্দেশকে মজার বস্তু হিসেবেই কল্পনা করেছিলেন। প্রথম সংখ্যায় এ-সম্পর্কে তিনি কী বলেছিলেন সেটা একটু দেখে নেয়া যাক! তিনি লিখেছিলেন,
সন্দেশ বলিলেই যে আমরা সকলের আগে একটা খাইবার জিনিসের কথা ভাবি সে আমাদের অভ্যাসের দোষ। ঐ শব্দের আসল অর্থ যে ‘সংবাদ’, সংস্কৃত অভিধান খুলিয়া দেখিলেই এ-কথার প্রমাণ পাওয়া যাইবে। সংবাদের অর্থ বদলাইয়া মিঠাই হওয়া খুবই আশ্চর্য, তাহাতে সন্দেহ নাই, কিন্তু এরূপ ঘটনা একেবারে অসম্ভব নহে। … আমরা যে সন্দেশ খাই, তাহার দুটি গুণ আছে। উহা খাইতে ভালো লাগে, আর উহাতে শরীরে বল হয়। আমাদের এই যে পত্রিকাখানি ‘সন্দেশ’ নাম লইয়া সকলের নিকট উপস্থিত হইতেছে, ইহাতেও যদি এই দুটি গুণ থাকে,অর্থাৎ ইহা পড়িয়া যদি সকলের ভালো লাগে আর কিছু উপকার হয়, তবেই ইহার সন্দেশ নাম সার্থক হইবে।

উপেন্দ্রকিশোরের লেখাটিতে কিন্তু দুটি দিকের ইশারা আছে। এক, এটা পড়ে যেন ভালো লাগে, যেন আনন্দ হয় সবার মনে। দুই, যেন কিছু উপকার হয়! আমরা এখন দেখব উপেন্দ্রকিশোর কিভাবে বাংলার ছেলেমেয়েদের আনন্দ দিতে পেরেছিলেন, কিভাবে উপকার হয়েছিল তাদের!

সন্দেশ পত্রিকার আগেও ছোটদের জন্য কয়েকটি পত্রিকা বেরিয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটির কথা বলি। কেশবচন্দ্র সেন সম্পাদিত বালকবন্ধু (১৮৭৮), প্রমদাচরণ সেনের সম্পাদিত সখা (১৮৮৩), জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সম্পাদনায় বালক (১৮৮৫), ভুবনমোহন রায় সম্পাদিত সাথী (১৮৯৩), ভুবনমোহন রায় সম্পাদিত সখা ও সাথী (১৮৯৪) কিংবা শিবনাথ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় মুকুল (১৮৯৫) পত্রিকার কথা বলা যায়। উপেন্দ্রকিশোর সম্পাদক হিশেবে গড়ে উঠছিলেন এই পত্রিকাগুলো দেখে এবং এর কোনো কোনোটাতে লিখে। এই পত্রিকাগুলো ছোটদের মনকে গড়ে তুলবার জন্য সাহিত্য সৃষ্টি করেছিল। সখা, সাথী, সখা ও সাথী কিংবা মুকুল পত্রিকায় তরুণ উপেন্দ্রকিশোর ছোটদের জন্য লিখতেন। প্রমদাচরণ সেনের সখার সঙ্গে সহকারী হিশেবে কাজও করতেন তিনি। এ-সব পত্রিকায় লিখে উপেন্দ্রকিশোর ছোটদের লেখক হিশেবে আগে যেন হাত পাকিয়ে নিয়েছেন। ছোটদের পত্রিকা কেমন হওয়া উচিত সেই স্বপ্নও দেখেছেন এগুলো নিয়মিতভাবে পড়তে পড়তেই!

সে-কালে মুদ্রণের ঊন্নত ব্যবস্থা ছিল না। তখনকার ছোটদের পত্রিকাগুলোতে ছাপা ছবি খুব একটা আকর্ষণীয় হতো না!  ছিল না পরিচ্ছন্ন। ফলে বেদনাবোধ করতেন উপেন্দ্রকিশোর। তিনি বুঝতেন যে পরিষ্কার হতে হবে ছোটদের পত্রিকার ছাপা। তখন ছোটদের পত্রিকায় যে ছবি ছাপা হতো তা প্রকাশিত লেখার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক হতে পারতো না। কেবল তাই নয়, তিনি অনুভব করেছিলেন যে, সেই ছবিকেও অনেক সময় হতে হবে মজাদার। সন্দেশ পত্রিকার পাতায় তাঁর আঁকা বা পরে তাঁর ছেলে সুকুমার রায়ের আঁকা ছবিগুলো দেখলেই তা বোঝা যায়। তাঁদের আঁকা ছবিগুলো দেখলে মনে হয় ওগুলো যেন কথা বলছে। রচনার সঙ্গে এমনভাবে আঁকা ছবি ছাপা হতো যে ছবিগুলোও আলাদা আনন্দের উৎস হয়ে উঠত। ছাপার উন্নত ব্যবস্থা চালু করতে তাঁর কত তৎপরতা! বিলেত থেকে ছাপাখানার উন্নত যন্ত্রপাতি আমদানি করিয়ে নিয়েছিলেন। ইংল্যান্ড থেকে বইপত্র আনিয়েছিলেন মুদ্রণ বিষয়ে। সেগুলো পড়ে ছাপার মান উন্নত করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন নিজে ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করে। তাঁর আবিষ্কৃত পদ্ধতি সম্পর্কে বিলেতের পত্রিকায় লেখাও ছাপা হয়েছিল কয়েকটি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে দুনিয়াজুড়ে মুদ্রণপ্রযুক্তির উন্নতিতে উপেন্দ্রকিশোরের অবদানও কম নয়! এখনও বিস্মিত হতে হয় কীভাবে এত সুন্দর রঙিন ছবি উপেন্দ্রকিশোর ছাপতে পেরেছিলেন সন্দেশ পত্রিকায়! এখন যে এত উন্নত প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় তার পরও রুচিশীল ছাপা ছোটদের পত্রিকা পাওয়া যায় কই!

বাংলা ১৩২০ সালের বৈশাখ মাসে (মানে ১৯১৩ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে) উপেন্দ্রকিশোর সন্দেশ নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। টানা চলেছিল ১৩৩৪ (১৯২৭ খৃষ্টাব্দ) পর্যন্ত। এই সময়টুকুকে বলা হয় সন্দেশ পত্রিকার প্রথম পর্ব। এই পর্বের কিছু দরকারি তথ্য জেনে রাখা যাক। যেমন ১৩২০ (১৯১৩ খৃষ্টাব্দ) থেকে ১৩২২ সালের পৌষ (অথাৎ ১৯১৫ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর) তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সম্পাদক ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র সুকুমার রায় (জন্ম ৩০ অক্টোবর ১৮৮৭-মৃত্যু: ১০ সেপ্টেম্বর ১৯২৩) সম্পাদক হন। অর্থাৎ বাংলা ১৩২২ সালের মাঘ (১৯১৫ খৃষ্টাব্দের জানুয়ারি) থেকে ১৩৩০  সালের ভাদ্র (১৯২৩ খৃষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত তিনিই সম্পাদনা করেন। পত্রিকায় সম্পাদক হিশেবে তাঁর পুরো নাম অর্থাৎ সুকুমার রায়চৌধুরী ছাপা হতো। সুকুমার রায়ের মৃত্যুর পর আরো ৩ বছর সন্দেশ চলেছিল। তখন সম্পাদক ছিলেন সুকুমার রায়ের ভাই সুবিনয় রায়; পত্রিকায় তাঁরও পুরো নাম সুবিনয় রায়চৌধুরী ছাপা হতো। উপেন্দ্রকিশোর সন্দেশ ছাপতেন তাঁদের নিজেদের প্রেস ইউ রায় এন্ড সন্স-এ। সুকুমারের মৃত্যুর কিছুকাল পর আর্থিক দেনার দয়ে প্রেসটি নিলামে ওঠে। সন্দেশও সংকটে পড়ে। বাংলা ১৩৩৩ সালে (১৯২৭ খৃষ্টাব্দ) সন্দেশ বন্ধ হয়ে যায়।
১৩৩৮ সালে সন্দেশ আবার প্রকাশিত হয়। এবারে সুবিনয় রায় যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেন সুধাবিন্দু বিশ্বাসের সঙ্গে। এবারে সন্দেশ স্থায়ী হয়েছিল বছর চারেক। দ্বিতীয় পর্যায়ের সন্দেশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিরতি পড়ে দীর্ঘকাল। বাংলা ১৩৬৮ সালের বৈশাখ মাসে (১৯৬০ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল) সুকুমার রায়ের পুত্র সত্যজিৎ রায় (জন্ম: ২ মে ১৯২১Ñমৃত্যু: ২৩ এপ্রিল ১৯৯২) কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের (জন্ম: ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯Ñমৃত্যু: ৮ জুলাই ২০০৩) সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করে আবার সন্দেশ প্রকাশ করতে শুরু করেন। ততদিনে চলচ্চিত্র পরিচালক হিশেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি। কত ব্যস্ততা এসে গেছে তাঁর জীবনে। আজ এই দেশ কাল ঐ দেশ করে সুস্থির হয়ে ভাববার সময় কই! কিন্তু তাহলে কী হবে! অন্তরে যদি ভালোবাসা আর স্বপ্ন থাকে তাহলে সব অভাবই অতিক্রম করা যায়! তাঁর আমলে সন্দেশ নতুন ভাবে আত্মপ্রকাশ করে। তিনি ছোটদের জন্য লিখতেও শুরু করেন সন্দেশ¬-এর পাতাতেই! কেবল তাই নয়।

তিনিও পিতা ও পিতামহের মতোই সন্দেশ-পত্রিকায় প্রকাশিত লেখার সঙ্গে এঁকে দিয়েছেন অসাধারণ সব ছবি। তিনি সম্পাদনা শুরু করেছিলেন সহপাঠী কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায় বেশিদিন এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন নি। তারপরে সম্পাদক হিশেবে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন সত্যজিতের ফুপু [উপেন্দ্রকিশোরের কন্যা পুণ্যলতা চক্রবর্তীর কন্যা] নলিনী দাশ (জন্ম: ০৫.০৮.১৯১৬Ñমৃত্যু:২৬.০৩.১৯৯৩) ও ফুপাতো বোন [সুকুমার রায়ের ভাই কুলদাররঞ্জন রায়ের কন্যা] লীলা মজুমদার (জন্ম: ২৬.০২.১৯০৮Ñমৃত্যু:০৫.০৪.২০০৭)। এঁরা দুজনেই শিশুসাহিত্যিক হিশেবে বিখ্যাত; তবে লীলা মজুমদারের ছোটদের বই নলিনী দাশের তুলনায় অনেক বেশি। উপেন্দ্রকিশোর পত্রিকার শুরুতে বলেছিলেন তাঁদের চেষ্টা থাকবে সন্দেশ যেন ‘সকলের ভালো লাগে আর কিছু উপকার হয়’। এর জন্য নলিনী দাশ ও লীলা মজুমদারের সঙ্গে কত ভাবনাই না বিনিময় করেছেন সত্যজিৎ। আকর্ষণীয় করে তুলবার জন্য কী সংগ্রামই না করেছিলেন তিনজনে মিলে! ১৯৯২ সালে সত্যজিতের মৃত্যুর পর লীলা মজুমদার, নলিনী দাশ ও সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায় সন্দেশ সম্পাদনা করতে থাকেন। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুর বছরখানেকের মধ্যেই নলিনী দাশও মারা যান। ১৯৯৩ সাল থেকে লীলা মজুমদার ও বিজয়া রায় যুগ্মভাবে সম্পাদনা চালিয়ে যান। কিন্তু কিছুকালের মধ্যে উভয়েই এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে সন্দেশ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। ১৯৯৪ সালে বিজয়া রায় ও সত্যজিৎ রায়ের পুত্র সন্দীপ রায় যুগ্মভাবে সন্দেশ সম্পাদনা করতে থাকেন। বিজয়া রায়ও অসুস্থ হলে মাঝে কিছুটা বিরতি পড়ে। ২০০৫ সাল থেকে সন্দীপ রায় ও ‘বহুকালের পুরোনো সন্দেশীÑলীলা মজুমদার ও সত্যজিৎ রায়ের হাতে গড়া’ সুজয় সোম যুগ্মভাবে হন সন্দেশ পত্রিকার সম্পাদক আর ২০০৬ থেকে সন্দীপ রায় সম্পাদনার দায়িত্ব পুরোপুরি গ্রহণ করেন। আগের জৌলুস পুরোপুরি না-থাকলেও এখনও সন্দেশ প্রকাশিত হয়ে চলেছে। বাংলা ভাষার সেরা ছোটদের পত্রিকার পঙ্ক্তিতেই এখনও তার স্থান। শতবছরের আয়ু নিয়ে চারপুরুষ ধরে পত্রিকাটি যে বেঁচে আছে সেটাও ইতিহাসের ব্যতিক্রমী ঘটনা। এখন সন্দেশ প্রকাশিত হয়ে চলেছে একটি সমবায় সমিতির পরিচালনায়।

এতক্ষণ আমরা সন্দেশ পত্রিকার ঠিকুজিকুলুজিটুকু জেনে নিলাম। মানে জানলাম কে কখন সম্পাদক ছিলেন এই পত্রিকার। পত্রিকাটির উদ্দেশ্য সম্পর্কেও জানলাম খানিকটা। কিন্তু কেমন ছিল এর ভেতরটা, কী ধরনের লেখা ছাপা হতো তাতে, কারা লিখতেন সে-সব কথা তো বলাই হয় নি। কিভাবে সন্দেশ সেরা ছোটদের পত্রিকা হয়ে উঠল সে-কথা একটু না বললে আসল কথাই বলা হলো না! তিনি প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে মজা করে বলেছিলেন,

ভাল বস্তু খাইয়া যেমন শরীরে বল হয়, তেমনি ভালে কথা জানিয়া মনে বল হয়। উহাই মনের আহার। তাহা যদি মিষ্ট হয়, তবে তাহাকে মনের লাড্ডু বলিতে দোষ কি?

তাঁর মনে হয়েছিল যে, শিক্ষার অর্থ কেবল স্কুলের বাঁধাধরা বিষয়ের পরিপুরক জ্ঞান বিতরণ নয়। তাই জ্ঞানকে আনন্দের উপকরণে রূপান্তর করতে চাইতেন। স্বদেশের ও বিদেশের সকল কালের মানবসভ্যতার ইতিহাসে কত ঘটনাই না ঘটছে, তিনি অনুভব করেন সেগুলো জানলে ছোটদের মনে অনেক জিজ্ঞাসা জাগবে। বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিস্কারের ফলে দুনিয়াজুড়ে নানা রকমের যেসব বদল ঘটছে সেগুলোও অনুপ্রাণিত করবে তাদের। তখন তো আর এখনকার মতো ইন্টানেটে সমকালীন পৃথিবীর জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নতির সব খবর মুহূর্তের মধ্যে জানা যেত না! তাই দরকারি খবরগুলো সংগ্রহ করে ছোটদের কাছে আনন্দদায়ক করে তুলে ধরতে চাইতেন যাতে ছোটরা নিজেদের ভালোভাবে গড়ে তুলতে পারে।

আজকাল যে আমরা ছোটদের পত্রিকাগুলোতে দেখি গল্প, কবিতা, গান, বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ, বিবিধ প্রবন্ধ, জীবনী, ভ্রমণকাহিনি, ধাঁধা দিয়ে সাজানো থাকে তার সার্থক শুরু হয়েছিল মোটামুটিভাবে সন্দেশ-এর মধ্য দিয়েই! উপেন্দ্রকিশোরের আমলের সন্দেশ-এ যে-সব গল্প প্রকাশিত হয়েছিল তার মধ্যে ছিল পৌরাণিক গল্প, রূপকথা ও উপকথা, হাসির গল্প, শিক্ষামূলক গল্প আর বিচিত্র ধরনের গল্প। কেবল দেশের গল্পই নয়, বিদেশি পুরাণের গল্পও হাজির করেছেন তিনি! কি রকম পুরাণের গল্প সন্দেশ পত্রিকায় ছিল তার খোঁজ করলে দেখা যাবে বিষ্ণুপুরাণ, মার্ক-েয় পুরাণ, পদ্মপুরাণ, শিবপুরাণ, এবং রামায়ণ ও মহাভারত মহাকাব্য থেকে বিভিন্ন কাহিনি সংকলন করেছেন; আর আছে জাপান, নরওয়ে ও পারস্য দেশের পুরাণকাহিনি। এই গল্পগুলো এমন ভাষায় হাজির করেছেন যে কখনও পুরোনো হয় না। বাংলার গ্রামে গ্রামে ছেলেমেয়েদের ঘুম পাড়ানোর জন্য দাদি-নানিরা গল্প শোনাতেন। সন্দেশ প্রকাশের কালে এইসব গল্প লেখা হতে শুরু করে। অনেকেই এইসব গল্প ছোটদের উপযোগী করে লিখতে থাকেন। উপেন্দ্রকিশোর সন্দেশ পত্রিকার মধ্য দিয়ে ছোটদের সাহিত্যের ভা-ারে দেশি ও বিদেশি রূপকথা ও উপকথার গল্প এনে জমা করলেন। কী সুন্দর পরিশীলিত ভাষায় লেখা সে-সব গল্প! আশ্চর্য যে, আজও পড়লে মনে হতে পারে এখনকার ছেলেমেয়েদের জন্য লেখা হয়েছে।

পুরাণের গল্প ছাড়াও এমন কিছু গল্প সন্দেশ পত্রিকার পাতায় আছে যেগুলো শুধু গল্প নয়! এমন একটা ভাব আছে যাতে ছোটদের মনের মধ্যে জাগবে নৈতিকতার বোধ। মানে গল্পের মজা তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে শিক্ষা। ছোটদের যেন মনে না হয় শিক্ষা মানে নিরস কোনো ব্যাপার! আর বিচিত্র গল্প দিয়ে মনোরঞ্জনের কত চেষ্টাই না করেছেন সন্দেশের সম্পাদকেরা! ছোটদের জন্য মৌলিক গল্প লেখার শুরুও অনেকটা সন্দেশ-এর পাতাতেই! আধুনিক কালে বাংলাভাষায় ছোটদের জন্য আলাদাভাবে কবিতা লেখাও সন্দেশ পত্রিকার বেশিদিন আগে শুরু হয় নি। বাংলা শিশুসাহিত্যের অনেক সেরা ছড়া বা কবিতাই সন্দেশ পত্রিকার পাতায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। উপদেশমূলক কবিতা, হাসির কবিতা, প্রকৃতিবর্ণনার কবিতা, উদ্ভটরসের কবিতাÑএই রকম বৈচিত্র্যেরও প্রায় শুরু বলা যেতে পারে সন্দেশ পত্রিকাতেই। আধুনিক বাংলা শিশুসাহিত্যের আদি কয়েকজন লেখকের মতো সুকুমার রায়ের আত্মপ্রকাশও সন্দেশ-এর পৃষ্ঠাতেই!

সম্পাদনা, ছবি আঁকা ও বিচিত্র রচনা লেখাÑসবই সুকুমার রায় করতেন। বিলেত থেকে মুদ্রণ প্রযুক্তি সম্পর্কে পড়াশোনা করে এসেছিলেন। সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়েছিলেন সন্দেশ-এর মুদ্রণে! তাঁর আবোল তাবোল বইটির সব কবিতাই সন্দেশ¬-এ প্রকাশিত হয়েছিল আগে। সুকুমার রায়ের ছোটদের কবিতার বৈচিত্র্য সন্দেশকে অনেক সমৃদ্ধ করেছিল। বাংলাসাহিত্যের আর এক বিখ্যাত কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘ইলশে গুড়ি’ বা কালিদাস রায়ের ‘তুলনা’ কবিতাও ছোটদের জন্য সন্দেশ-এর উপহার। ছোটদের জন্য গানও থাকতো সন্দেশ-এ! বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনী যে ছোটদের মহৎ হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা জাগাবে তা গভীর ভাবে অনুভব করেছিলেন সন্দেশ পত্রিকার আদি সম্পাদক উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমার-সুবিনয়রা! কিন্তু মনীষীদের জীবনের কিছু তথ্য হাজির করেই দায়িত্ব শেষ করতেন না সেইসব জীবনীর লেখকেরা। এমনভাবে সেগুলো লেখা হতো যে ছোটদের মধ্যে যেন শ্রমের মর্যাদা জাগে, অধ্যবসায়ে বিমুখ না হয়, যেন একাগ্রতার বোধ জন্মায়। ভূগোল, ইতিহাস আর ভ্রমণকাহিনিও হাজির ছিল সন্দেশ-এর পাতায় সেই গোড়ার দিকেই!

এমনভাবে সেগুলো উপস্থাপন করা হতো যেন শিশুরা আনন্দের মধ্য দিয়ে উন্নত জীবনের শিক্ষা পায়! সেই কোন কালেই উপেন্দ্রকিশোর বুঝেছিলেন ধাঁধার মাধ্যমে বুদ্ধির অনুশীলন করাতে হবে শিশুদের! শরীরচর্চা করলে যেমন স্বাস্থ্য ভালো হয় বুদ্ধির ব্যায়ামের মাধ্যমে ধারালো হয় বুদ্ধিও!

সত্যজিৎ রায়ের সম্পাদনায় সন্দেশ পিতা-পিতামহের পথ ধরে চললেও সময়ের নতুনত্বকে বরণ করে নিয়েছিল। যোগ করেছিল নতুন নতুন বিষয়। অর্থাৎ যুগের নতুনকে ছোটদের কাছে তুলে ধরতে না পারলে ছোটরা নিজেদের গড়ে তুলবে কী করে! অনেক বিখ্যাত লেখক নিজের সেরা লেখাটই পাঠাতেন সন্দেশ-এর জন্য। কিন্তু অনেক দুর্বল লেখাকে ছোটদের কাছে ঘষেমেজে উন্নত ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য সত্যজিৎ নিজে সম্পাদনা করে দিতেন; পান্ডুলিপির উন্নতি ঘটাতে পরামর্শ দিতেন লেখককে। লেখকদের বলতেন তাঁর পরামর্শ অনুসরণে নতুন করে লিখে দেয়ার জন্য! সত্যজিৎ রায় তখন অনেক ব্যস্ত মানুষ। তারপরও এতটা মনোযোগ দিয়ে অন্যের লেখার মান উন্নয়নের জন্য সময় দিতেন। কেবল ছোটদের ভালোবাসতেন বলেই তা সম্ভব হয়েছিল! সত্যজিৎ রায়ের সম্পাদনায় যখন সন্দেশ বের হতো তখন অনেকেই ছোটদের জন্য লিখতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। শিশুসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন নতুন একদল লেখক। পশ্চিমবঙ্গের বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসের দিকে তাকালেই সেটা বোঝা যাবে!

সন্দেশ পত্রিকার পাতায় ছাপা ছবির কথা আগেই কিছুটা বলা হয়েছে। কিন্তু বলা হয় নি যে সন্দেশ-এ প্রকাশিত ছবিগুলোর বৈশিষ্ট্য কী ছিল। কবিতা বা গল্পের ভাব অনুসরণ করে যে ছবি এঁকে দেয়া হয় তাকে ইলাস্ট্রেশন বা সচিত্রকরণ বলা হয়। সন্দেশ ছিল তার উন্নত নিদর্শন। উপেন্দ্রকিশোর বা সুকুমার দুজনেই ছিলেন এ ব্যাপারে বিস্ময়কর প্রতিভা। দুজনের কারো ছবি আঁকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না! অনেক পরে তৃতীয় পর্যায়ে উপেন্দ্রকিশোরের নাতি সত্যজিৎ রায় সন্দেশকে সমৃদ্ধ করেছিলেন অসাধারণ সৃষ্টিশীল গ্রফিক্স ও ইলাস্ট্রেশন সৃষ্টি করে। পিতামহের ঐতিহ্যকে মাথায় রেখে আশ্চর্য নতুন এক ধারার তিনি ¯্রষ্টা! তাঁর ইলাস্ট্রেশন ছিল অতি উচ্চ প্রতিভার দৃষ্টান্ত! তিনি ছাড়াও সন্দেশ পত্রিকার সচিত্রীকরণ তৃতীয় পর্বে আরো অনেকেই করেছেন। তার মধ্যেও অনেক অসাধারণ কাজ আছে। কিন্তু সত্যজিৎ রায় একে যেন উঠিয়ে নিয়েছিলেন একেবারে এভারেস্টের চূড়ায়! এ ক্ষেত্রে সন্দেশ-এর অবদানের কথা আলাদাভাবে আমাদের মনে রাখতে হবে!

উপেন্দ্রকিশোরের আমল থেকেই সন্দেশ পত্রিকার প্রতিটি সংখ্যায় নতুন নতুন ছবি থাকতো প্রচ্ছদে! সেকালে প্রায় ভাবাই যেত না এমন একটা রঙিন পত্রিকা বাঙলা দেশেই ছাপা হচ্ছে! ফটোগ্রাফ ছাপা যে কতো কঠিন ছিল সে-কথা আর এখন বলে বোঝানো যাবে না! একটা ফোটোগ্রাফের বিন্দু বিন্দু ছাপ অ্যাসিডে ডুবিয়ে জিঙ্কের পাতে তোলা হতো। তারপর সেই বিন্দুর ছাপ ছাপার যন্ত্রে চড়িয়ে তোলা হতো কাগজের ওপর। এই পদ্ধতির নাম ‘হাফটোন’। উপেন্দ্রকিশোর এই পদ্ধতিরই উন্নতিসাধন করেছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের আমলেও লেটারপ্রেসেই মূলত সন্দেশ ছাপা হতো। অবশ্য আরো আধুনিক অফসেট পদ্ধতিতেও ছাপা হয়েছিল শেষের দিকে। কিন্তু সময়ের বিবেচনায় উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমারের আমলের ছাপাই ছিল শ্রেষ্ঠ!

সন্দেশ পত্রিকার শতবর্ষ পরেও মোটামুটি ভালো মানের ছোটদের পত্রিকা নেই বাংলাদেশে। একটা কারণ উপেন্দ্রকিশোর-সুকুমার-সত্যজিতের মতো ভালোবাসা নিয়ে ছোটদের পত্রিকা সম্পাদনায় এগিয়ে আসছেন না কেউ! তাছাড়া এর প্রকাশনা ব্যয় অনেক বেশি। ব্যবসা হিশেবে সফল হয়েছে এমন ছোটদের পত্রিকা প্রায় নেই বললেই চলে। যেগুলো সফল হয়েছে তার পেছনে কাজ করেছে নানা আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা! আজকাল সরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ছোটদের পত্রিকা বের হয় আমাদের দেশেও। তাদের হয়তো অর্থাভাব নেই। প্রশ্ন জাগতে পারে ভালো পত্রিকা তাহলে বের হতে পারছে না কেন? তা যে হচ্ছে না তার কারণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা সীমাবদ্ধতা। এসব বাধা ঠেলে যারা এর দায়িত্বে থাকেন তাঁরা ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না। আর অতটা ভালোবাসা এবং আত্মত্যাগের মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসা মানুষটিইবা কই আমাদের সমাজে! উন্নত মুদ্রণব্যস্থার সঙ্গে যে ধরনের যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ দরকার এরকম পত্রিকা বের করতে গেলে সেরকম মানুষেরও যে অভাব! আর অভাব হবে না কেন? এসব কাজ যতটা কঠিন ততটা সম্মান বা পুরস্কার আমাদের রাষ্ট্র বা সমাজ এ-ধরনের কাজ যাঁরা করেন তাঁদের দিতে পারে না। ভালোবেসে আত্মত্যাগের মনোভাব নিয়ে কাজ না করলে এ-ধরনের কাজের যোগ্যতাই বা অর্জিত হবে কী করে! সন্দেশ পত্রিকার একশো বছরে এসে আমাদের মনে এই দুঃখ রয়ে গেল। কিন্তু এই দুঃখ নিয়েই কি বসে থাকব আমরা! এগিয়ে আসব না এই দুঃখ দূর করতে?

(লেখকের অনুমতিক্রমে প্রকাশিত)

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: