টক ঝাল মেহিকো, পর্ব – ২

মূল লেখার লিংক
381385_10151172260655497_608590496_22792156_199697239_n

১ম পর্ব

২য় পর্ব

মেক্সিকো মানেই রূক্ষ লাল পাহাড়ের দেশ, নির্জলা, নিস্ফলা, কঠিন পাথুরে ভূমি। অতি বিরল সবুজের চিহ্ন মানে সেই পাথর ভেদ করে ওঠে কাঁটা ভরা ক্যাকটাসের দঙ্গল, প্রাণী মানে সেই মরুভূমির বিষাক্ত সাপ আর ভয়ানক গিরগিটি, পাখি বলতে মৃত্যুদূত শকুনের ডানা মেলা, মানুষ মানেই মাথায় বিশাল সমব্রেরো চাপিয়ে জাঁকালো গোঁফের পুরুষেরা ঘোড়ায় চেপে হা রে রে রে রে করে ছুটে চলেছে লাল ধুলোর মেঘ উড়িয়ে, গীটার বাজাতে এরা সমান দড় আর সেই সাথে কুখ্যাত পানীয় টেকিলা গলা দিয়ে শুষে নেবার জন্যও এদের দক্ষতা প্রশ্নাতীত, অবশ্য প্রশ্ন করারও সময় পাচ্ছেন না, তার আগেই আপনার মুণ্ডু উড়িয়ে দেবে ভীম দর্শন পিস্তলের নিমিষের মাঝে নিখুঁত তাক করে ছোড়া এক গুলিতে!

এই-ই তো! বস্তা পচা হলিউডি সিনেমা আর সেবার দুর্দান্ত ওয়েস্টার্ন বইগুলো পড়ে এমনি তো ছবি তৈরি হয়েছে মেক্সিকো নামের ক্যাকটাসের কণ্টকময় ভূখণ্ডটি নিয়ে, তাই না? এরপর যখন দেশটিতে সত্যিকারের রূঢ় বাস্তব গলে পা রাখবেন মুখ খিঁচিয়ে প্রস্তত থাকবেন দুই গালে বন্ধুত্বপূর্ণ চাঁটি পড়ার জন্য ( যেন আমার মত বেমক্কা দশা আপনাদের না হয় ), প্রথম চাঁটিটি খাবেন সেই দেশের সবুজ প্রকৃতির কাছ থেকে কারণ দেশটির এক তৃতীয়াংশই ঘন বন, তাও মানুষের বপন করা এক চিলতে সবুজ নয় রীতিমত চির হরিৎ বৃষ্টি অরণ্য! ২য়টি এই ভূখণ্ডের আপামর বন্ধুত্বপরায়ণ জনসাধারণের কাছ থেকে, ভাগ্য নেহাৎ খারাপ হয়ে কোন রমণীর কাছে থেকে, অবশ্য তখন আর চাঁটির কথা আপনার খেয়াল থাকবে না, বরং অবাক হয়ে ভাববেন – এই দেশটির তাবৎ রমণীকূলই কি দেখতে সালমা হায়েকের মত?

রাতের নক্ষত্রেরা নিজেদের মাঝে মান-অভিমান ভাঙ্গাতে ব্যস্ত, আমরাও ব্যস্ত কর্ডোভার আড্ডাতে। খানিক আগেই চলুলা থেকে গাড়ী চালিয়ে এই শহরে পৌঁছেছি, খুঁজে বাহির করলাম আমাদের ভ্রমণের তৃতীয় মাস্কেটিয়ার হুয়ান ভিদালকে, একসাথেই যাওয়া হল হুয়ানের প্রেমিকা এলিসা লেভেটের প্রাসাদোপম বাড়ীতে, সেখানের বিশাল বাগানেই উম্মুক্ত আকাশের নিচেই সবাই মাতাল হয়েছি জীবনের নেশায়।

না না, মাতাল শব্দটি শুনেই টেকিলা, রাম, সেরভেজা ইত্যাদি মোহনীয় শব্দগুচ্ছকে মাথার ভেতরে কল্পনার ডানা মেলতে দিয়েন না , কারণ সেই প্রাসাদে ঢোকার আগেই রাজকন্যা এলিসা ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিল কাতর কণ্ঠে এই বলে যে তার মা অত্যন্ত রক্ষণশীল ক্যাথলিক ধর্ম বিশ্বাসের মানুষ, ছেলে-মেয়েরা তার সামনে সাধারণ সেরভেজা ( বিয়ার) পান করবে এটা মেনে নিতেও আর আপত্তি, মানে মানেই সেই বাড়ীতে অবস্থানকালীন সময়টুকুতে আমাদের পানীয়বিহীন অবস্থাতেই থাকতে হবে। তখন আমি অবাক হয়ে সেই বাড়ীর বিশাল সীমানা প্রাচীর, বাগানের বনস্পতিদের দিকে অবাক হয়ে চেয়ে আছি, কেবল অস্ফুট কণ্ঠে বললাম, আমি যদি কোন দিন মেক্সিকোতে উপনিবেশিক আমল নিয়ে সিনেমা তৈরিতে হাত দিই, তোমাদের এই বাড়ীটা আমাকে ভাড়া দিও!

190486_500265211641_2456233_n

গত শতাব্দীতে তৈরি উপনিবেশিক আমলের বাড়ীটি রাতের আঁধারে ইতিহাসের এক বাতিঘর হয়ে দাড়িয়ে আছে আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে, এটি এলিসার নানার বাবার তৈরি, যিনি ছিলেন স্পেন থেকে আসা ভাগ্যানুসন্ধানী। শুনলাম, সারা কর্ডোভা শহরে এমন ঐতিহাসিক নিদর্শন আর দুটি নেই।

190625_500263306641_582736641_6501649_3608250_n

সুউচ্চ খিলান, বিশাল ছড়ানো বারান্দায় তখন পরিবারের অন্যান্যরা জমায়েৎ হয়েছে পারিবারিক আড্ডায়, এলিসার মা আর দুই ভাই তো আছেই, শহরের অন্য প্রান্ত থেকে এসেছে তার মামা, মামাতো ভাই-বোনেরা, সেই সাথে প্রায় পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সারমেয় পাল। তাদের সংখ্যা জানতে চেয়েই ছোট্ট একটা খাবি খেলাম, মোটমাট নয়টা গৃহমৃগ ঘুরে বেড়াচ্ছে সদম্ভে বাড়ী আর বিশাল বাগান জুড়ে, চোরের মায়েরও সাধ্য নেই এখানে গলাবাজি করার।

424790_10151368760245497_608590496_23422663_1593456543_n

কয়েক মুহূর্তের মাঝেই আমাদের আপন করে নিল এই পরিবারটিও, মামা তার লন্ডনের অবস্থাকালীন সময়ের অভিজ্ঞতার গল্প শোনালেন, এলিসার মা সিনোরা লেভিন নিজেই বিশাল বাড়ীটির বেশ কিছু কক্ষ বিশেষ করে তার প্রপিতামহের স্মৃতি বিজড়িত আলোকচিত্রগুলো ঘুরিয়ে দেখালেন আমার কৌতূহল লক্ষ করে।

190678_500264291641_582736641_6501653_6647083_n

তাকে গোঁড়া ধার্মিক তো মনে হলই না, বরং নানা বিশ্বাস নিয়ে জানতে উৎসাহী বলেই আশ্বাস পেলাম উপমহাদেশের ধর্ম নিয়ে কথা বলার, বললাম- ক্যাথলিকদের দখলদারিত্বের জন্য যেমন অস্ত্রের মুখে স্থানীয়রা আজ খ্রিষ্টান, ঠিক তেমনি আরবদের তরবারির মুখে আমার দেশের মানুষও ইসলাম গ্রহণ করেছে কয়েক শতাব্দী আগে, আর তার আগেও প্রচলিত হিন্দু ধর্মও অস্ত্রের জোরেই জবর দখল করেছে মধ্য এশিয়া থেকে এসে আমাদের উর্বর ভূমি, কাজেই আমাদের কিছু ইতিহাসের মাঝেই এক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে। আসলে তাদের বিশ্বাসটা মনে হল যতটা না ধর্মীয় তার চেয়ে অনেক বেশী সামাজিক-সাংস্কৃতিক।

185930_500264021641_582736641_6501651_3811847_n

জানা গেল সিনোরা লেভিনের নানা মাদ্রিদ থেকে ভাগ্যান্বেষণে কর্ডোভায় আসেন এখন বন্ধুর আমন্ত্রণে, তারা যৌথ ভাবে রকমারি পণ্যের ব্যবসা শুরু করেন, সেই সাথে ডাক্তারিরও। এক সময় তাদের পসার এই বেড়ে যায় যে গোটা শহরের রীতিমত বিত্তশালী হিসেবে তাদের নাম ছড়িয়ে পড়ে।

190718_500264176641_582736641_6501652_5235522_n

পারিবারিক হাতবদলের এক পর্যায়ে এটি বর্তমানে সিনোরার মালিকানাধীন, এবং তার দৃঢ় ইচ্ছা ভবনটির ইতিহাসময় অস্তিত্ব ধরে রাখা। আশা করি, সারা বিশ্বে গজিয়ে ওঠা সৌন্দর্যবোধের অনুভূতিশূন্য হাউজ বিল্ডিং কোম্পানিগুলোর শ্যেন চক্ষু উপেক্ষা করেই টিকে যাবে এই অনুপম স্থাপত্যটি।

সেইখানেই খেয়াল করলাম আড্ডার মাঝে একে অন্যকে নাম ধরে না ডেকে পাচি বলে সম্বোধন করছে! যেমন পাচি এদিকে তাকাও, পাচি এই জিনিসটা আমাকে দাও। কি ব্যাপার! আসলে আর্জেন্টিনায় যেমন একজন আরেকজনকে চে বলে ডাকে, রাজশাহীতে মামুর বুটা বলে ঠিক তেমনি মেক্সিকোতে পাচি!

সেই সাথে জানতে চাইলাম মেক্সিকো শব্দটিকে তারা মেহিকো বলে উচ্চারণ করে কেন, এর ইতিহাসের শিকড় আবার অনেক গভীরে। Mexico উচ্চারিত হয় অ্যাজটেক ভাষা নাহুয়াটলের রীতি অনুযায়ী, সেখানে এক্স টা হ হিসেবে উচ্চারিত হয়, যদিও এমন শব্দ অতীব বিরল! তারপরও ব্রাভো মেহিকো !

এর মাঝে রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব হল চিকোর, সে হুয়ান ভিদালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তার মনে প্রশ্নের উদয় হয়েছে জেগেছে যেহেতু আমরা গাড়ীতেই সারা মেক্সিকো চষে বেড়াব, সে কেন আমাদের সাথে যোগ না দিয়ে ঘরে বসে আঙ্গুল চুষবে এই গরমের মাঝে! আমিও আরেক কাঠি সরেস, বললাম, মেক্সিকো কেন, সারা ল্যাতিন আমেরিকার জন্যও যোগদান কর! বিমর্ষ মুখে চিকো ( এটি তার আসল নাম নয়, বন্ধুদের দেয়া ডাক নাম, চিকো মানে ছোট, সে আকৃতিতে একটু ছোট হওয়ায় সবাই এই নামে সম্বোধন করে, আমি চিকো বলতে অস্বীকৃতি জানালে সে হেসে বলে- আরে আমিগো, সারা জীবন এই নামেই মানুষ ডেকেছে, এটিই আমার ডাক নাম, কোন সমস্যা নেই! ) জানাল- তার পাসপোর্ট নেই বর্তমানে! এত জলদি সেটি পাবারও কোন ব্যবস্থা নেই,তাই সে কানকুন পর্যন্ত আমাদের ভ্রমণসঙ্গী, আর যদি গুয়াতেমালা বা বেলিজে যাওয়া হয়ই তাহলে সে মেক্সিকোর শেষ গন্তব্যে অপেক্ষা করবে।

378799_10151171514535497_608590496_22789551_1384051870_n

এই হল আমাদের মেক্সিকো ভ্রমণের সফরসঙ্গীদের গল্প। তার আবেদন মঞ্জুর হওয়ায় চিকো রাতভর বিশাল পার্টি আয়োজন করে ফেলল চোখের সামনেই, বাদ্যযন্ত্র, সঙ্গীত, পানীয়- অভাব নেই কোন কিছুর। কেবল সটকে পড়ার আগে তাকে শাসানো হল এই বলে- সকাল নয়টার মধ্যে আমাদের সাথে দেখা না হলে, তার যাত্রা বাতিল!

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গার পরপরই জানালা দিয়ে তাকাতেই নীল ক্যাথেড্রাল, সবুজ নারকেল বীথি ভেদ করে দূরের বরফের মুকুট পড়া আগ্নেয়গিরিটি চোখে পড়ল, শান্ত, সুমহান, অপেক্ষারত ফুসে উঠবার অপেক্ষায়। তার পাদদেশেই মৃদুমন্দ হাওয়ায় দুলছে মেক্সিকোর পতাকা।

427492_10151368759960497_608590496_23422662_1547537519_n

কি চমৎকার মন ভাল করা একটা দৃশ্য! এমন ভাবে শুরু হওয়া দিনটা নিশ্চয়ই খুব ভাল যাবে! না, কয়েক মিনিট পরেই এই বিশাল ভুল ধারণা ভাঙল নাস্তার টেবিলে!

পইপই করে বলে রেখেছি যখন যে দেশে যাব, তখন সেখানের খাবার চাখা হবে তারিয়ে তারিয়ে, বিশেষ করে যেখানে মেক্সিকান খাবারের সুনাম সারা বিশ্ব জুড়ে, বিশ্বকে মরিচ আর টম্যাটো উপহার দিয়েছে এই ভূখণ্ডের আদিবাসিন্দারা। এবারে অবশ্য আমাকে বলে নিল- নাস্তা হবে বেশ মশলাদার, আর এই দেশের সব খাবার টেবিলেই দুটি সস থাকবেই- ঘন সবুজ বর্ণের সালসা এবং গাঢ় লাল বর্ণের টাবাসকো। যদি খাবারে আরও ঝাল বা অন্য ফ্লেভার যোগ করতে চান সেই জন্য।

আসলো নাস্তা, একটা থালায় নিরীহ ছোট ছোট পিঠার মত দেখতে ময়দার তৈরি picaditas de salsa roja, verde y frijoles । উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়া চীজ, এর সাথে সালসা, টাবাসকোর সাথে আছে আরেক বিশেষ সস- চকলেটের নির্যাস। ইসাইয়াস বেশ ভারিক্কি ভঙ্গীতে সেটি খাবার নিয়ম হাতে কলমে দেখিয়ে দিল- একটি ছোট পিরিচে ৩টি করে নিয়ে তাতে ৩ ধরনের ভিন্ন ভিন্ন সস ঢেলে সেই ৩টা একে একে খাওয়া। এটিই নাকি মেক্সিকোর সবচেয়ে মশলাদার নাস্তা!

395716_10151178686900497_608590496_22822081_1038370426_n

মনে মনে আমি হেসেই খুন, যা ব্যাটা, নাগামরিচ নিয়মিত খাই আমরা বাংলাদেশে, বিশ্বকে মসলা কি তাই চেনালাম আমরা, আর দুই দিনের বৈরাগী মেক্সিকান আমাকে এসেছে মসলা শেখাতে। আপন মনে হাসতে হাসতেই টাবাসকো মাখানো পিঠেটা যেই না মুখ পুরে চিবানো শুরু করব— যেন ছোট একটা আগ্নেয়গিরির বিশাল বিস্ফোরণে ঘটল মুখগহ্বরের কন্দরে, ওরে বাবারে, বাংলামুলুকের সবচেয়ে ঝাল খাবারটিরও কমপক্ষে পনের গুণ বেশী ঝাল হবে মেক্সিকান এই নিরীহ দর্শন জলযোগ! ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায় জলের গ্লাস হাতে নিতেই পাশের চেয়ারে বসা বদের হাড়ি ইসাইয়াস ইশারায় জানাল জল মুখে গেলে ঝালের অনুভূতি অনেক বেশী বেড়ে যাবে, তাই ধীরে সুস্থে খেয়ে ফেলাটাই ভাল, সেই সাথে প্রচুর দুধ-চিনি সহযোগে কফি চলতে পারে!

কেমন জানি দুশমন, ব্যাটা তুমি এতটাই খলিফা তো আগে জানাবা না! তবে সে তো সাবধান করেই ছিল, আমিও তো বাংলার গর্বে গরীয়ান হয়ে তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলাম এই মসলার ঝাঁজকে, যার দরুন এখন নাক-কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে সমানে। তবে হ্যাঁ, খেতে বেশ! খুবই সুস্বাদু, এতটাই ভালো লাগল, যে প্লেট ফাঁকা হতে বেশীক্ষণ সময় লাগল না বরং মনে হতে থাকল- আরে নাস্তায় এমন মরিচ যদি ঠেসে নাই-ই দেয় তাহলে আর খাবার কিসের?

399980_10151178687280497_608590496_22822083_502354142_n

জলযোগের পাট চুকিয়ে ব্যাগ গোছানো শুরু করতেই হৈ হৈ করে অন্যরা হাজির, শুরু হল সড়ক পথে আমাদের মেহিকো ভ্রমণ—

399584_10150575694910901_582920900_11431154_1384486233_n

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: