মরুযাত্রা ১১শ পর্বঃ র‍্যামেসেস ও আইসিসের সঙ্গে রঁদেভু

মূল লেখার লিংক

“One’s destination is never a place, but a new way of seeing things.”Henry Miller
“Travel is more than the seeing of sights; it is a change that goes on, deep and permanent, in the ideas of living.”Miriam Beard
আসওয়ান কি পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল ? না… তা হয়তো নয়, কিন্তু ইতিহাসে প্রথম বারের মত পৃথিবীর পরিধি পরিমাপে এই নাম ও স্থানটার এক অমোচনীয় সংশ্লিষ্টতা রয়ে গেছে। ঐতিহাসিক ‘লাইব্রেরী অফ আলেক্সান্দ্রিয়ার’ প্রধান লাইব্রেরিয়ান এবং গ্রেকো-ইজিপশিয়ান ভূগোলবিদ ইরাতোস্থিনিস খৃঃ পূর্ব ৩য় শতাব্দীতে সর্বপ্রথম পৃথিবীর পরিধি নির্ণয় করেন সামার সোলস্টিসের সময় মিশরের এই আসওয়ান আর আলেক্সান্দ্রিয়া শহরে সূর্যের অবস্থানের কৌনিক দূরত্বের পার্থক্যের ওপর নির্ভর করে। দুই হাজার বছরেরও আগে করা তার হিসাব ছিল প্রায় নির্ভুল। এমনকি পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বও তিনি প্রায় নির্ভুল ভাবে বের করেন। আর এসবই করেন কোপার্নিকাসের প্রায় ১৮০০ বছর আগে (বলাই বাহুল্য, সূর্যকেন্দ্রিক বিশ্বতত্ত্বের প্রথম প্রবক্তা কোপার্নিকাস নন – ইরাতোস্থিনিসেরই আরেক সমসাময়িক গ্রীক জ্যোতির্বিদ – এ্যারিস্টার্কাস অফ সামোস)।
যাইহোক, লুক্সোর থেকে সড়কপথে ২৬১ আর কায়রো থেকে প্রায় হাজার কিলোমিটার দক্ষিণে মিশরের কালো নুবিয়ানদের বাসভূমি এই আসওয়ানেই এবার পাড়া দিলাম আমি। প্রাচীনকালে ‘সোয়েনেৎ’ অর্থাৎ বর্তমানের আসওয়ানকে মিশরের ‘প্রথম শহর’ বা ‘প্রবেশদ্বার’ হিসেবে গণ্য করা হত জীবনদায়ী নীলনদের মিশর-প্রবেশের পথে প্রথম শহর হওয়াতে। আসওয়ান অবশ্য আমার জন্য খানিকটা মধ্যবর্তী শহরই ছিল একটা। নিকটবর্তী নীলনদের ফিলে দ্বীপে দেবী আইসিসের রহস্যময় প্রাচীণ মন্দির, কিছু মিউজিয়াম আর প্রাচীণ মিশরের বহু পিরামিড, মন্দির, ওবেলিস্ক, স্ফিংক্স ইত্যাদিতে পাথরের যোগানদাতা হিসেবে বিখ্যাত পাথরখনিটিতে যাওয়া ছাড়া এখানে আর কোথাও গিয়েছি বলে মনে পড়ছে না। ছোটবেলায় পাঠ্যবইতে পড়া আসওয়ানের বিখ্যাত বাঁধটা কেন জানি আমাকে চোখের দর্শনে হতাশই করেছে।
নুবিয়ান গ্রাম। আসওয়ান। না, আসল না, মিউজিয়ামে। মন মাঝি।
আসলে উদ্দেশ্য ছিল পরের দিনই আরও ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণে সুদান সীমান্তে জনবিচ্ছিন্ন মরুঘাঁটি আবু সিম্বেলে প্রাচীন মিশরের সবচেয়ে বিখ্যাত মেগালোম্যানিয়াক, আত্নজাহিরপরায়ন, পরাক্রমশালী, গ্ল্যামারাস সেলিব্রিটি ফারাও এবং কারো কারো মতে হযরত মূসা (আঃ)-কে লোহিত-সাগরের দিকে ধাওয়াকারী সেই ফেরাউন – ফারাও ২য় র‍্যামেসেস ও তার স্ত্রী নেফেরতারির মন্দিরে যাওয়া।
আসওয়ানে প্রত্ন-পাথরখনি। মন মাঝি।
আসওয়ানে প্রথম দিনটা তাই বাঁধ, সিয়েনাইট নামের গ্রানাইট জাতীয় পাথরের প্রাচীণ খনি, আর মিউজিয়ামে ঘুরেই কাটিয়ে দিলাম। এই খনি থেকে আগেই যেমন বলেছি – সেই ৩ থেকে ৫ হাজার বছর আগে সারা দেশে দানবীয় সব মনুমেন্টের জন্য পাথর সরবরাহ করা হত। অনেক সময় শত শত টনের আস্ত একেকটি চাঙ্ক হিসেবে। কি করে এত বিশাল পাথরের ব্লক বা আস্ত কলাম কিম্বা ওবেলিস্ক সরাসরি খনি থেকে কেটে বের করে শত শত মাইল দূরে নিয়ে যাওয়া হত সেই প্রাচীণ যুগে, তা আজও অনেক কষ্টকল্পনার বিষয়।

…………………………..

পরদিন সকালেই রওনা দিলাম সীমান্তবর্তী মরুঘাঁটি আবু সিম্বেলের পথে। তবে যাত্রার এই পর্বটা আসলেই অদ্ভূত। নিরাপত্তার কারনে এই গন্তব্য টুরিস্টদের জন্য রেস্ট্রিক্টেড । ইচ্ছা করলেই যাওয়া যায় না। প্রতিদিন ভোরে ও সকালে একটা নির্দিষ্ট সময়ে আসওয়ান শহরের একটা নির্দিষ্ট পয়েন্টে সমস্ত টুরিস্ট বাসকে গিয়ে জড়ো হতে হয়। তারপর সেখান থেকেই সব টুরিস্টবাহী গাড়ি/বাসকে সামনে-পিছে সশস্ত্র পুলিশের শক্তিশালী এসকর্ট নিয়ে কাফেলার মত করে একসাথে রওনা দিতে হয় আবু সিম্বেলের পথে। ফেরাও ঐ একই ভাবে। শুনেছি আবু সিম্বেল যাওয়ার পথে এর আগে একবার নাকি পশ্চিমা টুরিস্টদের উপর ইসলামি সন্ত্রাসবাদীরা এ্যামবুশ করায় অনেক হতাহত হয়েছিল। তবে এই ঘটনার সত্যতার ব্যাপারে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই। বড় একটা হামলা হয়েছিল বটে ১৯৯৭ সালে – তবে সেটা এখানে নয়, বরং টুরিস্টবহুল লুক্সোরের বাদশাহি উপত্যকায়। তবে এই জায়গাটা যে – যে কোন ধরণের আকস্মিক সন্ত্রাসবাদী বা ডাকাতি হামলার জন্য আদর্শ সে ব্যপারে কোন সন্দেহ নেই। যদ্দুর মনে পড়ে, আসওয়ান থেকে আবু সিম্বেলের ৩০০ কিলো পথ প্রায় পুরোটাই বসতিহীণ মরুভূমি। এমনকি আবু সিম্বেলও একটা জনবিরল সীমান্তগ্রাম মাত্র। তার ওপারেই আবার সুদানের মরুভূমি, যেটা মনে হয় আরও বুনো। মোদ্দা কথায়, আসওয়ানের পর পুরো অঞ্চলটাতেই একটা আইনের নাগাল-বহির্ভূত, প্রত্যন্ত, বুনো, মরুময় আবহাওয়া বিরাজমান। যেন যে কোন কিছুই ঘটতে পারে এখানে। এক ভ্রমণসঙ্গী জানালেন, মরুভূমির মধ্যে এসব জায়াগায় টেরোরিস্টরা ছাড়াও সশস্ত্র বেদুঈন ডাকাত দল, চোরাকারবারি, হিংস্র আদম-পাচারকারীসহ নানা পদের ক্রিমিনালরা ঘুরে বেড়ায়। সত্যিমিথ্যা জানি না, একটু ভয় দেখিয়ে মজা করার জন্যই বলা হয়তো – কিন্তু আমার কল্পনার ফ্যাক্টরি তো আর তাতে থেমে থাকে না!
সবচেয়ে বড় কথা হল, আমার মত পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ (এবং আর্দ্র) দেশের একজন ক্রাউডোফাইল নগরকীটের, যার দেশে রাস্তায় বেরুনোর পর মুহূর্ত থেকে মানুষের সাথে ধাক্কাধাক্কি এড়ানোর কোন পথ থাকে না, তার কাছে এমন প্রত্যন্ত বিরান জনমানবহীণ বিজাতীয় শুন্যতার দিগন্তহীণ বিস্তার আর মাথার উপর অচেনা আকাশ – এককথায় রোমহর্ষক! (যেসব প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্য বা উত্তর আফ্রিকায় থেকে থেকে এসবে তিতিবিরক্ত, তাদের কথা হয়তো আলাদা)।
লেক নাসের। নেট।
নীল ও লেক নাসেরের মাঝে কোথাও। মন মাঝি।
আসওয়ান থেকে নীলনদ আর লেক-নাসের হয়ে টুরিস্ট লঞ্চেও আবু সিম্বেল যাওয়া সম্ভব। আগে জানা ছিল না। নীলনদ আর লেক নাসেরের এই অংশটা মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে অপার্থিব সুন্দর আর এগজটিক একটা জায়গাগুলির একটা। মরুভূমির মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ, ঝকঝকে নীলাকান্ত নদী – কিন্তু দুপাশে সবুজের নিঃসর্গ তার। তীরে সাদা কাশবন বা প্যাপিরাস ঝাড়। দূরে স্পষ্ট বা একটু ঝাপসা লালচে পাহাড়ের সারি। উপরে অবারিত নীল আকাশ আর নীচে নদীর পারে বা নানা রকম রহস্যময় দ্বীপের মধ্যে এখানে-সেখানেই গুঁজে দেয়া বা লুকিয়ে থাকা সভ্যতার উষালগ্নে তৈরি অদ্ভূত সুন্দর সব প্রাচীণ যাদুটোনাময় মন্দির, মূর্তি, সিংহমানব আর নানারকম দেবদেবীময় স্থাপনা – রূপকথার ‘অচিনপূরীর’ মত।
আর টুরিস্ট লঞ্চের বদলে যদি পাল-তোলা ফেলুক্কা নৌকোয় যাওয়া যায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। শীতের সূর্যের মিঠেকড়া ওম চাখতে চাখতে, বাতাসের শনশনানি আর নদীর কুলকুলানিতে কান পেতে হাওয়ায় টানে এঁকেবেঁকে নীলে নীলাক্ত হতে পারাটা তো আমার কাছে প্রায় অলৌকিক একটা ব্যাপার। কাব্যপ্রতিভা থাকলে কল্পনায় খৈয়ামের মত কিছু রুবাই পয়দা করে ফেলাও অসম্ভব কিছু না হয়তো। এই অভিজ্ঞতার সামান্য একটু আমার হয়েছিল লুক্সোরের কাছে। তবে লেক নাসের সংলগ্ন নীলের এই অংশটা মনে হয় আরও অনেক সুন্দর আর অলৌকিক।

…………………..

একটু ইতিহাস
ফারাও ২য় র‍্যামেসেস দি গ্রেট খৃষ্ট-পূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দীতে (জী. ১৩০৩ – ১২১৩ বি.সি.) শাসনকারী মিশর-সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত, পরাক্রমশালী, ক্ষমতাদর্পী, প্রচারপরায়ন, গ্ল্যামারাস, ক্যারিশমাটিক ও লিবিডাস সম্রাট ছিলেন। সেইসাথে – যে সময়ে মিশরের মানুষের গড় আয়ু মাত্র ৩০ বছর – সেসময় সে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী ও দীর্ঘতমকাল-শাসনকারী ফারাওদের অন্যতম ছিলেন তিনি। ৯০-৯১ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, শাসন করেন ৬৬ বছরেরও উপরে।
র‍্যামেসেস তার রাজত্বকালে এক অভূতপূর্ব সংখ্যক – মোট ১৪টি ‘সেদ উৎসব’ পালন করেন (একটি ‘সেদ’ উৎসব একজন ফারাওর ক্ষমতাগ্রহণের ৩০ বৎসর পর প্রথম পালিত হয়, এরপর প্রতি তিন বছরে একবার) – যা অনেক ফারাও এমনকি একবারও পালন করতে পারেননি নিয়মমত। ৩০তম জুবিলিতে প্রথম ‘সেদ’ উৎসব পালনের মাধ্যমে একজন ফারাওর উপরে সাক্ষাৎ-ঈশ্বরত্ব আরোপ করা হত। মিশরের ইতিহাসে ঈশ্বর-ফারাওদের এই এক্সক্লুসিভ এলিট ক্লাবে আছেন হাতে গোনা আর মাত্র কয়েক জন ফারাওই। র‍্যামেসেসকে তার পরবর্তী ফারাওরা পর্যন্ত ‘মহান পূর্বপুরুষ’ হিসেবে অভিহিত করতেন।
“টেন কমাণ্ডমেন্টস্‌”- নামের বিখ্যাত চলচ্চিত্রটি-সহ বর্তমান যুগের অনেক সাহিত্য আর চলচ্চিত্রে ২য় র‍্যামেসেসকেই হযরত মুসা (আঃ)-এর সমসাময়িক সেই ফেরাউন হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি মুসাকে পশ্চাদ্ধাবন করতে গিয়ে লোহিত সাগরে ডুবে মরেন – বাইবেলের ‘এক্সোডাস’ অংশের কাহিনি অনুসারে। তবে মেইনস্ট্রীম বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই তত্ত্বকে বাতিল করে দেন – তাদের মতে ২য় র‍্যামেসেস আরও অনেক আগের।
র‍্যামেসেস মন্দির। আবু সিম্বেল। মন মাঝি।
র‍্যামেসেস দি গ্রেট এক বহু যুদ্ধজয়ী সাম্রাজ্যবাদী ফারাও ছিলেন – পশ্চিমে লিবিয়া, উত্তর-পূবে এশিয়ার লেভান্ত অঞ্চলে কিনান, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, দক্ষিণে নুবিয়া (বর্তমানে সুদান) সহ বহু অঞ্চল মিশরীয় সাম্রাজ্যের পদানত করেন, হৃত অঞ্চল পুনরুদ্ধার করেন। তিনি মিশরে শান্তি, স্থিতিশীলতা, ভৌগলিক অখণ্ডতা, সমৃদ্ধি আর জৌলুস নিয়ে আসেন যা আগের শত বছরেও ছিল না। আর সেই সাথে নিজের কীর্তির কথা ফলাও করতে – সময়ের বুকে অক্ষয় করে রাখতে – তার সাম্রাজ্যের এমাথা থেকে ওমাথা, অর্থাৎ উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় পুরো মিশর ভরিয়ে দেন বিশালাকৃতির অজস্র মনুমেন্টে। আর কোন ফারাও মনে হয় নিজের নামে এত মনুমেন্ট বানাননি! এজন্যেই তাকে বলা হয় সবচেয়ে প্রোপাগান্ডিস্ট, মেগালোম্যানিয়াক বা আত্নপ্রচারকামী ফারাও।
কাদেশ যুদ্ধে র‍্যামেসেস। আবু সিম্বেল মন্দিরের দেয়ালচিত্রের পুণর্চিত্রায়ন। নেট।
র‍্যামেসেসের মত করে সারা মিশর ও নুবিয়া জুড়ে এত মন্দির, মূর্তি, প্রাসাদ, ভবন, নগরী – তাও অন্য সবার থেকে বড় করে – আর কোন ফারাও বানাননি। এই দক্ষিনপ্রান্তে যেমন রয়েছে তার আবু সিম্বেল মন্দির, তেমনি প্রায় হাজার মাইল উত্তরে নীলের মোহনাবর্তী বদ্বীপাঞ্চলে ছিল তার এককালের রাজধানি পাই-র‍্যামেসেস। প্রধান রাজধানি থিব্‌সে (লুক্সোর) তার প্রথম স্মৃতিমন্দির ‘র‍্যামেসিয়াম’ থেকে শুরু করে সর্বত্রই তার এই মনুমেন্ট-নির্মান অবসেশন প্রবলভাবে দৃশ্যমান। সর্বত্রই তিনি হয় নতুন কিছু বানিয়েছেন, নয়তো আগেরগুলি এনহান্স করেছেন নাটকীয় ভাবে। সব কিছুর উপরই তার নিজের সীল-ছাপ্পড় – এমনকি অনেক সময় অন্যদের গুলির উপরও। আর তার বানানো গুলি সবই ডিজাইন করা হত এমন ভাবে যাতে তারা র‍্যামেসেসের অতুলনীয় ঐশ্বরিক ক্ষমতা আর গরিমার দামামা নিরন্তর পিটিয়ে যেতে থাকে। অভিভূত আর ভীতিভক্তিবিহবল করে দেয় দর্শকদের। অনন্তকাল জুড়ে। হ্যাঁ, তিনি ইতিহাসেও অমর হতে চেয়েছিলেন। তার কমিশন করা সব স্থাপনার দেয়ালে দেয়ালেই থাকত তার নানা যুদ্ধজয়ের বোম্বাস্টিক বীরত্বগাঁথা আর ঈশ্বর-ভগবানদের সাথে বেজায় মাখামাখি আর দহরম-মহরমের অজস্র মুরাল, রিলিফচিত্র আর হিরোগ্লিফিক কাহিনি। কিন্তু র‍্যামেসেসের তীব্র অমরত্বপিয়াসী চোখে হঠাৎই একদিন ধরা পড়ে যায় – আগেকার ফারাওদের মন্দিরে অগভীর কিন্তু কারুকার্যময় রিলিফগুলি খুব সহজেই বদলে দেয়া যায়। ফলে অনেক উত্তরসূরী ফারাও পূর্বসুরীদের রিলিফ (পাথর বা দেয়ালে খোদাইচিত্র), শব্দ/হিরোগ্লিফিক ইত্যাদি মুছে দেন (অনেকটা আমাদের পরিচিত দুই নেতার মতই বলা যায় আর কি), এমনকি সে জায়গায় নিজেদের নাম পর্যন্ত ঢুকিয়ে দেন। তিনি নিজেই এমন কাজ করে হাত পাকিয়েছেন কিনা। সুতরাং র‍্যামেসেস তার রাজমিস্ত্রিদের আদেশ দেন তাদের কাজের পদ্ধতি বদলে ফেলে তার রিলিফগুলি আরও অনেক গভীর ভাবে পাথরের বুকে খোদাই করতে, যাতে করে সেগুলি পরবর্তীকালে সহজে বদলানো বা মুছে ফেলা না যায়। ইতিহাসে অমর হতে এমনই তীব্র বাসনা ছিল তার।
র‍্যামেসেস নিজের যত দৈত্যাকৃতির মূর্তি বানিয়েছেন, আর কোন ফারাও মনে হয় এর ধারে কাছেও বানাননি (ভিডিও)।
র‍্যামেসেসের বিশাল মূর্তি। মেম্ফিস। মন মাঝি।
৮ স্ত্রীর স্বামী (উপপত্নী কত তা হিসাবের বাইরে) ও প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ সন্তানের পিতা র‍্যামেসেসের লিবিডোও এক কিংবদন্তি। এক ফারাওয়ের এত সন্তানের ফল হল যে শুধু র‍্যামেসেসের সন্তানদের নিয়েই পরবর্তী ৪০০ বছর মিশরে একটা আলাদা বিশেষ শ্রেণী তৈরি হয়ে গিয়েছিল, যার থেকে অন্তত ১০০ বছর ধরে পরবর্তী ফারাওরা এসেছেন।

…………………………………….

র‍্যামেসেস মন্দির। আবু সিম্বেল। মন মাঝি।
তো, এই ফারাও ২য় র‍্যামেসেসেরই এক কালজয়ী কীর্তি দেখতে এসেছি আবু সিম্বেলে। আবু সিম্বেলের মন্দির প্রোপাগান্ডা, মেগালোম্যানিয়া আর শক্তিমদমত্ততার এক দুর্দান্ত নিদর্শন। মিশরের দক্ষিণ সীমান্তে বিজন মরুতে এত বড় আর অদ্ভূত মন্দির ও মূর্তি কাকে দেখানোর জন্য বানিয়েছিলেন তিনি? দেখে মনে হয়ে এই সীমান্ত অঞ্চলের বিদ্রোহশীল কালো নুবিয়ান আর অন্যান্য জনগনকে তার রাজসিক ও ঐশ্বরিক গরিমা দেখিয়ে অভিভূত ও ভীতিবিহবল করা ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। অমরত্ব তো বটেই।
আসওয়ান থেকে রওনা দেয়ার ৩/৪ ঘন্টার মাথায় এসে পৌঁছুলাম আবু সিম্বেলে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংরক্ষিত আবু সিম্বেল কমপ্লেক্সের প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকে বেশ অনেকখানি হেঁটে একটা পাথুরে পাহাড় ঘুরতেই লেক নাসেরের দিকে মুখ করে দাঁড়ানো পাহাড়ের গা কুঁদে দৈত্যাকৃতির মূর্তির সারি আর তার পেছনে পাহাড়ের ভিতর বিশাল দু’টি মন্দির দৃশ্যমান হল। এর মধ্যে বড়টা ফারাও র‍্যামেসেসের সেই অহমের মিনার, যদিও বাহ্যত দেবতা আমুন, রা-হোরাখ্‌তি আর প্টাহ্‌-র উদ্দেশ্যে নিবেদিত পাথুরে মন্দির। ঈশ্বরায়িত র‍্যামেসেসও অবশ্য এখানে অন্যতম দেবতা। আর অপেক্ষাকৃত ছোটটা দেবী ‘হাথরের’ অবতার রূপে তার প্রধান ও প্রিয়তমা স্ত্রী নেফেরতারির উদ্দেশ্যে নিবেদিত।
র‍্যামেসেস মন্দির। আবু সিম্বেল। মন মাঝি।
পাহাড়ের গা কুঁদে বের করা ফারাও র‍্যামেসেসের ৬০ ফুট উঁচু চারটা উপবিষ্ট ভঙ্গির মূর্তি র‍্যামেসেস মন্দিরের ১০৫ ফুট প্রশস্ত সম্মুখভাগ অলঙ্কৃত করে রেখেছে। দেয়ালের উর্ধ্বাংশ ২২ টা বেবুনের মূর্তির সারি বা ‘ফ্রিজ’-এ সজ্জিত। চারটা মূর্তির একটার উর্ধ্বাংশ ভূমিকম্পে ভেঙ্গে যায় – যার দেহকাণ্ড আর মাথা মাটিতে পড়ে আছে (ছবি দ্রঃ)।
নিচের দিকে মূর্তিগুলির পায়ের কাছে ছোট ছোট আরো বেশ কিছু মূর্তি দেখা যাচ্ছে। এগুলি র‍্যামেসেসের প্রধান স্ত্রী রানি নেফেরতারি, রানিমাতা মাৎ-তায়ি, র‍্যামেসেসের প্রথম দুই পুত্র আমুন-হের-খেপেশেফ্‌, র‍্যামেসেস, এবং তার প্রথম ছয় কন্যা বিন্তানাথ, বাকেতমাৎ, নেফেরতারি, মেরিতামেন, নেবেত্তাওয়ি আর ইসেট্‌নফ্রেট-এর মূর্তি। মন্দিরের অভ্যন্তরভাগের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে আরেকটা ছবিতে (এটা বড় না ছোট মন্দিরের ভিতরের দৃশ্য তা এখন আর মনে পড়ছে না অবশ্য)।
নেফেরতারি মন্দির। আবু সিম্বেল। মন মাঝি।
এখানে একটা মজার ব্যাপার লক্ষনীয়। র‍্যামেসেসের এই মন্দিরে বা আগে অন্য জায়গায় তার যত মূর্তির সাথে তার প্রিয়তমা স্ত্রী নেফেরতারির মূর্তি সংলগ্ন দেখেছি, তার সবখানেই নেফেরতারির মূর্তিটা র‍্যামেসেসের পায়ের চিপায় অতি ক্ষুদ্র আকারে – এমনকি হাঁটুর উচ্চতাতেও যায়নি! এমনিতে ফারাওরা ইশ্বরের অবতার হওয়াতে তাঁদের মূর্তি আর কোন মরণশীলের সাথে জোড়ায় বানানো হয় না। তাঁরা মরণশীলদের সাথে তুলনীয় না। কিন্তু র‍্যামেসেস-নেফেরতারি নাকি প্রায় লাইলি-মজনু ছিলেন, এতই প্রেমভালবাসা ছিল তাঁদের! এই জন্যই মহান র‍্যামেসেস তাঁর প্রিয়তমা লাইলি ওরফে নেফেরতারিকে সমস্ত রীতি ভঙ্গ করে নিজের মূর্তিতে স্থান দিয়েছেন। কিন্তু কিভাবে? হায়, নিজের বিশাল মূর্তির তলায় এক্কেবারে দুই গোড়ালির চিপায় হাস্যকর লিলিপুটের আকারে! কি মহৎ তিনি! ভালবাসার কি অমর উপাখ্যান! মাথা বা এমনকি কাঁধ সমান উচ্চতায় না হোক, গোড়ালির চিপায় ফানি লিলিপুটের মত করে হলেও তো দিয়েছেন, অন্য অনেকে তো তাও দেয়নি!
র‍্যামেসেসের দানবিক মূর্তিগুলির সাথে তার দানবীয় অহং-ও মনে হয় কিছুটা ধরা পড়ে এতে। কিম্বা কে জানে! তবে এর একটা ব্যতিক্রম তিনি করেছেন। এই আবু সিম্বেলে নিজেরটার পাশের আরেকটা অপেক্ষাকৃত ছোট মন্দির (ছবি দ্রঃ) তিনি নেফেরতারির জন্য বানিয়েছেন, যেখানে অবশেষে নেফেরতারির মূর্তি তার স্বামীর সম-উচ্চতায় পাশাপাশি দেখা যায়। মিশরীয় স্থাপত্য ও ভাষ্কর্যে শুধু রাণীর জন্য নিবেদিত মন্দিরের এটা ২য় এবং ফারাও ও তার স্ত্রীর সম-উচ্চতায় মূর্তির একমাত্র নিদর্শন। নেফেরতারির মন্দির বলেই হয়তো, এখানেও তাকে কি ওভাবে ছোট করা যায়? তবে এখানেও সেটা আলাদা মূর্তি হিসেবে, ঠিক জোড়ায় না। একেই বলে অমর প্রেমকাব্য।
নেফেরতারি মন্দির। আবু সিম্বেল। মন মাঝি।
বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখলাম মন্দিরগুলি। পিছনে লেক নাসেরের চোখ ধাঁধানো, শান্ত-নিস্তব্ধ তরল নীলাকান্তের অপূর্ব বিস্তার। তার মধ্যে জনমানবহীণ এই অদ্ভুত মন্দিরগুলি। মনে হচ্ছিল অচিন কোন গ্রহ যেখান থেকে মানুষজন হঠাৎ কোন বিপদে সবকিছু ফেলে-টেলে অন্য কোন গ্রহে পালিয়ে গিয়েছিল বহুদিন আগে – আর এখন তা মানবস্পর্শহীন নিষ্কলঙ্ক লেক আর মরুভূমিতে পরিণত। ঝকঝকে প্রশান্ত নীল জলরাশি আর নিস্তব্ধ সমাহিত মরুভূমি পাশাপাশি, এই নির্জনতায় প্রায় অলৌকিক এক জুটি।
লেক নাসেরের পটভূমিতে আবু সিম্বেল নেট।
আস্তে আস্তে একটা মন্দিরের ভিতরে ঢুকলাম (ছবি দ্রঃ)। আলো-আঁধারিতে ঢাকা বিশাল লম্বাটে হলঘর যার দুপাশে দেবতা অসিরিসের দৈত্যাকারের অনেকগুলি মূর্তি সারি দিয়ে দাঁড় করানো। মূর্তিগুলি মনে হয় কলামেরও কাজ করছে। ভিতরে ভীতিকর মূর্তিগুলির সান্নিধ্যে প্রায় ভৌতিক এক পরিবেশ। একবিংশ শতাব্দীর এক দিনের বেলা না হয়ে মাত্র কয়েকশ’ বছর আগের একটা সন্ধ্যা হলেও ভয়ে হার্টফেল করতাম এখানে। কি যে বলি, একলা রাতের বেলা এখানে ছেড়ে দিলে এখনো করবো !! মূর্তিহলের শেষ মাথায় একটা মঞ্চে দেবতা দেবতা রা, প্টাহ্‌, হোরাখ্‌তি আর র‍্যামেসেসের পাথরকোঁদা মূর্তি।
মন্দিরের ভেতরে। আবু সিম্বেল। মন মাঝি।
মন্দিরের ভিতরে দেয়ালে দেয়ালে দেবতাদের সাথে ফারাওর ইয়ারদোস্তি আর নানা যুদ্ধবিগ্রহের দেয়ালচিত্র। এখানকার বেশির ভাগ যুদ্ধসংক্রান্ত রিলিফ বা দেয়ালচিত্রই অবশ্য র‍্যামেসেসের ‘কাদেশের যুদ্ধ’-কে উদযাপন করছে। এই ‘কাদেশের যুদ্ধ’ হচ্ছে তার নিজের চোখে অন্তত সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ও মহত্তম যুদ্ধজয়, কারন এখানে তিনি আরেকটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষ সাম্রাজ্য – হিটাইটদের পরাজিত করেন। কাদেশের যুদ্ধ যদিও সম্ভবত শেষ পর্যন্ত একটা স্টেলমেট আর শান্তিচুক্তিতে ফয়সালা হয়, র‍্যামেসেস দেশে ফিরে এটা তার ঐতিহাসিক যুদ্ধবিজয় বলে প্রচার চালিয়ে দেশ ভাসিয়ে দেন – অজস্র দেয়াল চিত্র আর স্থাপনা নির্মান করেন এই উপলক্ষে। কবি ভাড়া করেন নিজের বীরত্বগাঁথা রচনা করার জন্য। এই আবু সিম্বেল মন্দিরটাও অংশত সেই যুদ্ধজয়ের বিজয়গৌরব উদযাপন আর ঘোষনা করার জন্য নির্মিত, একই সাথে দক্ষিণাঞ্চলের নুবিয়ানদেরও সাবধান করে দেয়ার জন্য। হুঁ হুঁ বাবা!
কাদেশের যুদ্ধক্ষেত্র। আবু সিম্বেল মন্দিরের দেয়ালচিত্রের পুণর্চিত্রায়ন। নেট।
বর্তমান কালের সিরিয়ার তখনকার অরোন্টেস নদীর তীরে কাদেশ শহরে ১২৭৪ বি.সি.তে মিশরীয় ফারাও ২য় র‍্যামেসেস আর হিটাইট সম্রাট মুয়াতাল্লির বাহিনির মধ্যে এই বিখ্যাত কাদেশ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধের বেশ কিছু ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। ইতিহাসে এটাই বোধহয় বৃহত্তম ‘রথযুদ্ধ’ – প্রায় ৫-৬ হাজার রথ এতে অংশগ্রহণ করে। লিপিবদ্ধ ইতিহাসে এটাই প্রাচীণতম যুদ্ধ যার রণকৌশল আর ফর্মেশন সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। এই যুদ্ধের ফলেই ঐতিহাসিকদের জানা মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম “আন্তর্জাতিক শান্তি চুক্তি” স্বাক্ষরিত হয়। তৎকালীণ আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষা ‘আক্কাদিয়ান’-এ লেখা মানব ইতিহাসের এই সর্বপ্রথম ‘আন্তর্জাতিক শান্তি চুক্তি’ একটা রূপার ফলকে খচিত হয়েছিল -যার একটা মৃৎফলক-অনুলিপি বর্তমান তুরষ্কে অবস্থিত প্রাচীন হিটাইট রাজধানী হাত্তুসায় পাওয়া যায়। এখন তা ইস্তাম্বুলের প্রত্নতত্ত্ব যাদুঘরে প্রদর্শিত হচ্ছে। এই কাদেশ শান্তিচুক্তির একটা বৃহদাকারের রেপ্লিকা বর্তমানে জাতিসঙ্ঘের সদর দপ্তরের দেয়ালেও শোভা পাচ্ছে।
র‍্যামেসেস অবশ্য দেশে ফিরে এত চুক্তি-সমঝোতার কথা বলেননি মনে হয়, বরং এটাকে তাঁর নিরঙ্কুশ, মহাকাব্যিক, অলৌকিক বিজয় হিসেবেই প্রোপাগাণ্ডা চালান। মন্দিরের দেয়ালচিত্রগুলিতেও সেই দুর্ধর্ষ রথযুদ্ধ আর তাঁর সেই মেলোড্রামাটিক বিজয়গাঁথার বোম্বাস্টিক বিবরণ ফুটে উঠেছে।
কাদেশের যুদ্ধক্ষেত্র। আবু সিম্বেল মন্দিরের দেয়ালচিত্রের পুণর্চিত্রায়ন। নেট।
আবু সিম্বেলের এই মন্দিরদুটি ১৮১৩ সালে সুইস ওরিয়েন্টালিস্ট ও পরিব্রাজক ইয়োহান লুডউইগ বার্খার্ড্‌ট আবিষ্কার করেন। তবে এটা তখন প্রায় সম্পূর্ণ মরুভূমির বালুর তলায় চাপা পড়েছিল, হারিয়ে গিয়েছিল বহু যুগের বিস্মৃতির অতলে। আবিষ্কারের পর বালু সরিয়ে একে প্রবেশযোগ্য করতে আরও চার বছর লেগে যায়। কথিত আছে আবু সিম্বেল নামের এক স্থানীয় বেদুঈন রাখাল বালকই নাকি এটা আসলে খুঁজে পায়, আর পরে তার কাছ থেকেই বার্খার্ড্‌ট এর কথা জানতে পারেন। সে হিসেবে আবু সিম্বেলেই আবু সিম্বেলের আসল আবিষ্কারক, তার নামেই এই ঐতিহাসিক স্থান এখন নামাঙ্কিত।
আরেকটি জিনিষ আবু সিম্বেল ছেড়ে যাওয়ার আগে না বললেই নয়। এই মন্দির দু’টা এখন যেখানে আছে, গোড়াতে ঠিক সেখানে এগুলি আসলে ছিল না। ১৯৬০-এর দশকে মিশরের প্রেসিডেন্ট নাসের মিশরের বন্যানিয়ন্ত্রন, কৃষি, সেচ, বিদ্যুৎসহ পানিসম্পদের কার্যকরী ব্যবহারের জন্য আসওয়ানে ‘আসওয়ান হাই ড্যাম’ নামে একটা বিশাল বাঁধ আর লেক নাসের নামে কৃত্রিম জলাধার নির্মানের উদ্যোগ নেন। প্রায় সোয়া ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এই জলাধার পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম মানবসৃষ্ট লেক। কিন্তু এই প্রকল্পের ফলে ঐ অঞ্চলে মিশরের প্রাচীণ ঐতিহ্যের বেশ কিছু নিদর্শন পানিতে ডুবে যাওয়ার হুমকিতে পড়ে। অনেক আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও নাসের এই প্রকল্প থেকে পিছু না হটায় অবশেষে ইউনেস্কোর অধীনে প্রত্নতত্ত্ববিদ, প্রকৌশলী, স্থপতি, হেভি ইকুইপমেন্ট অপারেটরদের একাধিক টীম এই নিদর্শনগুলি উঁচু স্থানে রিলোকেট করার এক অকল্পনীয় প্রকল্প হাতে নেন। এরই অংশ হিসেবে ১৯৬৪ থেকে ৬৮-র মধ্যে আবু সিম্বেলের মন্দির মূল সাইট থেকে একটু দূরে বর্তমানের উচু জায়গায় রিলোকেট করা হয়। পুরো মন্দিরই ২০-৩০ টন ওজনের বিশাল পাথরের ব্লকে কেটে কেটে নতুন জায়গায় এনে আবার মূল মন্দিরের মত করে নিখুঁত ভাবে প্রতিস্থাপন করা হয়। তবে স্থান ছাড়া আরেকটা মূল পার্থক্য হল, আদিতে মন্দির দু’টা একটা আসল পাহাড় খুদেই তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু এখন তাদের যে পাহাড়ে দেখা যাচ্ছে সেটা আসলে নকল পাহাড়। উপর থেকে দেখলেই অবশ্য বুঝা যায়।
আবু সিম্বেলের এই রিলোকেশনকে প্রত্নতাত্ত্বিক-প্রকৌশলের ইতিহাসে বৃহত্তম ও দুরূহতম চ্যালেঞ্জ ও অর্জন হিসেবেই এখনো গন্য করা হয়।
র‍্যামেসেস ও নেফেরতারি মন্দির। আবু সিম্বেল। মন মাঝি।

……………………………….

দেবী আইসিসের মন্দিরে

আধুনিক শিল্পীর দৃষ্টিতে দেবী আইসিস। নেট।
আবু সিম্বেল থেকে আসওয়ান আর লুক্সোর হয়ে কায়রো ফিরব। যে পথে এসেছিলাম, সে পথেই। আসওয়ান এসে ঠিক করলাম, নীলনদে নিকটবর্তী ফিলে দ্বীপে দেবী আইসিসের মন্দিরে দেবীর সাথে একটি বার দেখা করে যাব।
বাঁ থেকে – হোরাস, ওসিরিস, আইসিস। মিশরীয় দেব-ট্রিনিটি। নেট।
যারা হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের “শী” উপন্যাসটা পড়েছেন তারা দেবী আইসিস আর দেবতা ওসিরিসের কাহিনি ইতিমধ্যেই জানেন। আইসিস প্রাচীণ মিশরীয় পুরাকথায় মাতৃত্ব, যাদু আর উর্বরতার দেবী। সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রী এই দেবী ছিলেন ধনী-গরিব, পাপীতাপী, ছোঁড়াবুড়ো – সবার পরম ভরসার প্রতীক। শিশুদের প্রতি ছিল তার অপরিসীম ভালবাসা। তার মাতৃত্ব ও বাৎসল্যের প্রতীক হিসেবে সন্তান দেবতা হোরাসকে স্তন্যদানরত অবস্থায় তার অনেক ছবি আছে যার সাথে যীশুকে স্তন্যদানরত মাতা মেরির ছবিগুলির আশ্চর্য সাদৃশ্য লক্ষনীয়। অনেক বিশেষজ্ঞের ধারনা মেরির ঐ ছবির ধারনা আসলে আইসিস থেকেই এসেছে। মিশরের সব ফারাওকেই এক হিসেবে তার সন্তান হিসেবেই গন্য করা হত – ফারাওরা তার দেয়া সিংহাসনেই বসতেন। অর্থাৎ তিনি ছিলেন তাদের সব ক্ষমতার উৎস। আদি আইসিসের মুকুটে তাই একটা সিংহাসনের প্রতীকই দেখা যায় ।
হোরাসকে স্তন্যদানরত আইসিস। নেট।
আইসিসের একটা মীথ গ্রেকো-রোমান যুগে প্রাচীণ গ্রীক ও রোমান দুনিয়ায় ব্যপক জনপ্রিয়তা পায়। হ্যাগার্ডের “শী”-তেও এই কাহিনি আছে। আইসিসের স্বামী দেবতা ওসিরিসকে তার জিঘাংসু ভাই মরুভূমি, মরুঝড়, অন্ধকার আর নৈরাজ্যের হিংস্র দেবতা ‘সেথ’ হত্যা করে টুকরো টুকরো করে সারা পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে দেয়। আইসিস তার যাদুকরী ক্ষমতা খাটিয়ে সারা পৃথিবী থেকে সেই টুকরোগুলি অক্লান্ত সাধনায় সংগ্রহ করে জোড়া লাগিয়ে স্বামী ওসিরিসকে আবার বাঁচিয়ে তোলেন। ওসিরিসকে হত্যার পর প্রেমিক-স্বামীর জন্য আইসিসের শোকের অশ্রুতেই নাকি নীলনদে প্রতি বছর বন্যা আসত। সেই নীলনদেই তার মন্দির। সেখানেই আমি যাচ্ছি আজ।
ফিলে দ্বীপে দেবী আইসিসের মন্দিরের উদ্দেশ্যে যাত্রা। মন মাঝি।
খৃষ্টপূর্ব ৩-৪ হাজার বছর আগে থেকেই মিশরে দেবী আইসিসের পুরাকথা প্রচলিত থাকলেও এক সময় তার পূজা মিশর ছাড়িয়ে বহিঃর্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়ে। গ্রেকো-রোমান শাসনাধীন ইউরোপ, এশিয়া মাইনর, লেভান্ত, উত্তর আফ্রিকা ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আইসিসের কাল্ট ব্যপক জনপ্রিয়তা লাভ করে – এমনকি খোদ গ্রীস ও রোমেও। ইরাক থেকে বৃটেন পর্যন্ত আইসিসের অনুসারীদের চিহ্ন পাওয়া যায়।
লেভান্ত
খৃষ্টপুর্ব যুগে আলেক্সান্দারের মিশর আক্রমণের সময় থেকে আইসিস কাল্টের বৈশ্বিক প্রসার শুরু। খৃষ্টপরবর্তী কালে ৩য় শতকে সম্রাট কন্সটান্টাইনের সময় থেকে রোম সাম্রাজ্যে (মিশর যার অন্তর্ভূক্ত ছিল তখন) খৃষ্টানদের ক্ষমতা দখলের পর ১ম থিওডসিয়াসের সময় প্রথমে মূর্তিপুজা নিষিদ্ধ হওয়া এবং পরে দমনপীড়ন শুরু হলেও দেবী আইসিসের পূজা এই সুদূর দক্ষিণে নীলনদের গহীণ অঞ্চলে ফিলে দ্বীপে খৃষ্টীয় ৬ষ্ঠ শতক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এটাই প্রাচীণ মিশরীয় ধর্মের সর্বশেষে নেভা প্রদীপ।
আইসিস মন্দির। ফিলে দ্বীপ। নীলনদ। মন মাঝি।
খৃষ্টীয় ২য় শতকে আইসিস-ধর্মের এক বিখ্যাত পূজারী ছিলেন রোমান ঔপন্যাসিক ও ‘দ্য গোল্ডেন এ্যাস’-এর রচয়িতা লুসিয়াস এ্যাপুলেইয়াস। তার লেখায় আইসিসের নিজের কণ্ঠে দেবী আইসিসের এক চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায় এভাবে —

You see me here, Lucius, in answer to your prayer. I am nature, the universal Mother, mistress of all the elements, primordial child of time, sovereign of all things spiritual, queen of the dead, queen of the ocean, queen also of the immortals, the single manifestation of all gods and goddesses that are, my nod governs the shining heights of Heavens, the wholesome sea breezes. Though I am worshipped in many aspects, known by countless names … some know me as Juno, some as Bellona … the Egyptians who excel in ancient learning and worship call me by my true name…Queen Isis.

নীলনদে নৌঘাট। আসওয়ান। মন মাঝি।
তো, এই ‘ফিলে’ দ্বীপেই মহাদেবী আইসিসের মন্দিরের উদ্দেশ্যে আসওয়ানের কাছে নীলনদের ঘাট থেকে একটা বোট ভাড়া করে রওনা দিলাম। ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছিলাম- আইসিসের মন্দির এখন আর ফিলে দ্বীপে নেই। উপরে বলা আসওয়ান বাঁধের কারনে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে বাঁচাতে, এটাকেও আবু সিম্বেলের মতই ইউনেস্কোর রিলোকেশন প্রকল্পের আওতা্‌ কাছেই ‘এ্যাজিলিকা’ নামের আরেকটা দ্বীপে সরিয়ে নেয়া হয়। তবে সাধারনের সুবিধার্থে এটা এখনো ‘ফিলে’ নামেই পরিচিত।
আইসিস মন্দির। ফিলে দ্বীপ। নীলনদ। মন মাঝি।
এখন টুরিস্টরা যেতে পারলেও, রহস্যময় ফিলে দ্বীপে সে যুগে এর পবিত্রতা রক্ষার্থে শুধুমাত্র আইসিসের পুরোহিত ছাড়া অন্য কারো এখানে থাকা নিষিদ্ধ ছিল। এখনকার ফিলে দ্বীপেও বোধহয় অনেকটা তাই। কিংবদন্তি আছে – এমনকি পাখিরা পর্যন্ত এর উপর দিয়ে উড়তে সাহস করত না, মাছও এড়িয়ে যেত এর তীরকে সসম্ভ্রমে।
এখন ফিলের চতুর্দিকে লেক নাসের প্রভাবিত নীলনদের অপূর্ব জলরাশি। মন্দিরের এক কোনায় ‘ট্র্যাজান’স কিয়স্ক’ নামে একটা আলাদা স্থাপনা। এই কিয়স্কের পিছন থেকে আমার দেখা নীলনদের অন্যতম সেরা দৃশ্য দেখা যায়। এমন জায়গায় থাকতে পারলে সত্যি কৃতার্থ হতাম। আমি ফিলেতে আইসিস মন্দিরের বর্ননায় যাব না, শুধু ফেরার বর্ননাটা আগের এক লেখা থেকে কোট করি —
ফেরার সময় আবিস্কার করলাম আমাদের মাঝি সাহেব (মনমাঝি না, বোটের মাঝি) আমাদের এই জনবিচ্ছিন্ন দেবদেবী হন্টেড কিম্ভুতুড়ে দ্বীপে ফেলে হাওয়া হয়ে গেছেন। বিকেল ৫ টার পরে আবার এখানে কেউ থাকেনা। ৫টা অতিক্রান্ত। অনেকেই ইতিমধ্যে ফিরে গেছে। আমার সঙ্গীরা বিচলিত। আমি একটু চিন্তিত হলেও অবশ্য ফিরতি পথে অন্য টুরিস্টদের নৌকায় জায়গা পেতে অসুবিধা হয়নি তেমন। তবে এখন মনে হয়, ঐ রাতের মতো আটকা পড়ে গেলে কে জানে হয়তো দেবী আইসিসের সঙ্গে দেখা হয়েও যেতে পারতো ! হয়তো এ্যাপুলেইয়াসের সাথেও। সেবা প্রকাশনীর ‘তিনটি উপন্যাসিকা’র একটি গল্পে বাঙালি নায়কবাবাজি ইজিয়ান সাগরে গ্রীক পিশাচী মেডুসার রহস্যময় অচিন দ্বীপে আটকা পড়েছিল। সেই ভয়ঙ্করী পিশাচী মেডুসা, যার প্রতিটি চুল একেকটি জীবন্ত বিষাক্ত সাপ। যার অব্যাখ্যাত অতিজাগতিক রক্তহিম দৃষ্টি কারো উপর পড়া মাত্র সে পাথরের মুর্তিতে পরিণত হয় অনন্তকালের জন্য। ঐ দ্বীপে, কাহিণীটা যদ্দুর মনে পড়ে, দেবতার অভিশাপে পিশাচী মেডুসা নিজেই মুর্তি হয়ে বন্দী ছিল। শুধু সন্ধ্যা থেকে ভোরের মধ্যকার সময়টা ছাড়া। ঐ সময় সে প্রাণ ফিরে পেত। আর এই সময়ে কোন মানুষ ঐ দ্বীপে গিয়ে পড়লে তার আর রক্ষা ছিল না ! এই কাহিণী পড়ে, ছোটবেলা থেকেই আমিও ইজিয়ানের ঐ রহস্যময় দ্বীপে যাওয়ার জন্য ভীষণ উদ্বেল ছিলাম। তো একই রকম আরেক রহস্যময় দ্বীপ, আইসিসের দ্বীপে গিয়ে মনে হলো, আইসিসের দ্বীপেও কি ওরকম কিছু হতে পারে না ? পারে না তার মুর্তিগুলিও জীবন্ত হয়ে উঠতে রাতের বেলা ? তাছাড়া আইসিস তো আর পিশাচী নন, বরং সাক্ষাৎ জগদ্ধাত্রী ! নাহ্‌, দারুন মিস করেছি! একটা রাত থেকে গেলেই বোধহয় ভালো হতো।
আইসিস মন্দির। ফিলে দ্বীপ। মন মাঝি।
আইসিস মন্দির। ফিলে দ্বীপ। মন মাঝি।
আইসিস মন্দির। ফিলে দ্বীপ। মন মাঝি।
ট্র্যাজান’স কিয়স্ক। আইসিস মন্দির। ফিলে দ্বীপ। মন মাঝি।
নীলনদ আর লেক নাসেরের মধ্যে কোথাও। মন মাঝি।

………………………………………

আসওয়ান থেকে আবার লুক্সোর। লুক্সোর থেকে বিকেলে কায়রোর ফিরতি ট্রেন ধরার আগে পর্যন্ত সময়টাতে নীলনদে ব্যানানা আর ক্রকোডাইল আইল্যান্ডে গেলাম। দ্বীপে যাওয়াটা আসলে অজুহাত – আসল উদ্দেশ্য ফেলুক্কায় চড়ে অচেনা নীলের বুকে শীতের একটা অলস মধুর দুপুর পার করা। নদীবক্ষে সিয়েস্তা। এ যেন অনেকটা খাবার শেষে মনভোলানো ডেসার্ট দিয়ে মধুরেণ সমাপয়েৎ! কিন্তু এই ডেসার্ট আগের এক পর্বেই পরিবেশন করে ফেলেছি। সুতরাং আপার ইজিপ্টকে শেষ পর্যন্ত এখানেই বিদায়।
Advertisements

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: