রাকচি নামের ইনকা গ্রামে, ভিরাকোচার মন্দিরে

মূল লেখার লিংক

379833_10151156296970497_608590496_22740987_202144000_n

পড়া শুরু করার আগে অনুগ্রহ করে উপরের আলোকচিত্রটিতে আরেকবারের জন্য দৃষ্টিপাত করুন। বহু বছর ধরে খুলনা নিবাসী আমার মহৎ হৃদয় অস্ট্রেলিয়ান চিত্রকর বন্ধু আশি ছুই ছুই ম্যালকম আর্নল্ড এই ছবিটি সম্পর্কে বলেছিল- Magic, Its Pure Magic !

কান পাতলেই যেন শুনতে পারবেন এখন আন্দেজের সুমহান নির্জনতায় বেজে ওঠা ইনকাদের প্যানপাইপের বাদ্যযন্ত্রের মোহময় সুর, যা হারিয়ে যায় না, বাতাসে ঝুলে থাকে দীর্ঘক্ষণ। আমাদের আবিষ্ট করে, বিস্ময়ে ঘিরে ধরে, কৃতজ্ঞতায় নতজানু করে ফেলে অন্য পৃথিবীর এই সৃষ্টি।

জীবনকে সুন্দর মনে হয়, পড়ে থাকা পথের ধুলোকেও অনেক আপন মনে হয়, মনে হয় এই ধুলোতে পা রেখেই আরো অনেক পথ এগোনো যায় সামনের দিনগুলোতে। এই সেই জাদু, সুন্দরকে অন্বেষণের আহ্বান, জীবনকে উপভোগের আহ্বান, কন্ডরের বিশাল পাখায় চেপে পাখির চোখে আমাদের গ্রহকে দেখার আমন্ত্রণ।

409052_10151325339420497_608590496_23269419_1032008289_n

অদ্ভুত কিছু স্থান টিকে আছে এখনো যন্ত্রসভ্যতার নীল বিষে জর্জরিত আমাদের এই বুড়ো পৃথিবীতে, যেখান বাতাস বয় অন্য ভাবে, সূর্যের আলো আজো সতেজ, বৃষ্টির ধারা আজো নির্মল, প্রকৃতি আজো সজীব রাসায়নিক সারের স্পর্শ ছাড়াই। এমন এক জনপদ আন্দেজের কোলে লুকিয়ে থাকা ভিলকানোতা নামের পাহাড়ি নদী ছুঁয়ে চলা একরত্তি ইনকা গ্রাম রাখচি, যেখানে জীবনের ও জীবনধারার পরিবর্তন এমন কিছু ঘটেনি গত হাজার বছরে। যাবেন সেখানে?

417578_10151325340835497_608590496_23269425_624043154_n

ইনকা রাজার গুপ্তধনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না, পায়রার ডিমের মত বড় বড় সবুজ পান্না, রক্ত লাল রুবি, জ্বলজ্বলে হীরে, চোখ ঝলসানো সোনার পিণ্ডের স্তূপ কোথায় লুকিয়ে আছে আমার জানা নেই, জানতে খুব একটা আগ্রহও বোধ করি না, কারণ, এইগুলো আসল গুপ্তধন নয়!

আসল গুপ্তধন হল আনন্দময় স্মৃতি, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিখাঁদ তৃপ্তি জুগিয়ে যায়, সেই সর্বক্ষণের সঙ্গী। এক পর্যায়ে হীরা ভর্তি উপত্যকা, বা বিশাল সোনার খনিও অর্থহীন হয়ে যায় জীবনে সুখস্মৃতি না থাকলে। এমন মনের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা অজস্র মুহূর্ত আপনাকে উপহার দেবে এই গ্রাম ও তার সন্তানেরা। চলুন, যাত্রা শুরু করা যাক—

425826_10151353026615497_608590496_23368017_2122069888_n

গ্রামের মূল ফটকে প্রবেশ করার আগেই চোখ পড়ল পাথরের প্রাচীর ঘেরা শস্যক্ষেত্র, শুনলাম সেগুলো ৫০০ বছর আগে নির্মিত! অথচ এখনো ফসলের হাসি উৎপাদনে সক্ষম। কুশলী কৃষক ইনকারা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পাথুরে বন্ধুর জমিকেই নতুন ভাবে সাজিয়ে উর্বর করে তুলত, সেই সাথে ছিল পাথরের দেয়াল দিয়ে ভূমিক্ষয় ও ভূমিধ্বস রোধের ব্যবস্থা। তাদের বংশধররাও বলবৎ রেখেছে পরিবেশবান্ধব কৃষিকাজের ধারাটি।

403056_10151210836330497_608590496_22928987_1990686247_n

মূল ফটক পেরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই বেশ খোলা মেলা চত্বর, তার এক কোণে মহাবিশ্বের জানা-অজানা সমস্ত রঙ নিয়ে বসেছে স্থানীয় ইনকাদের বাজার, এমনিতেই ইনকারা বিশ্বের সবচেয়ে রঙ ঝলমলে পোশাক ব্যবহারকারীদের অন্যতম জাতি, মেক্সিকান ইয়াইয়াস সেরণাও বলল মায়া বা অ্যাজটেকদের পোশাক এতটা রঙদার ছিলনা কখনোই। যেন বিশাল ম্যাকাও পাখির মেলা বসেছে বিকেলের পঞ্চো গায়ে গাঁয়ের সবার জমায়েতে।

406453_10151210836520497_608590496_22928988_1422821199_n

420272_10151303014730497_608590496_23207185_1270161684_n

নানা ধরনের পণ্য সম্ভার, বিশেষ করে ইনকা সভ্যতার স্মারকের চাহিদা খুব বেশী। সমানে চলছে বিকিকিনি, ইনকা পুরোহিত নরবলি দেবার কুঠারটির প্রতিলিপিই রয়েছে কয়েক হাজার ধরনের।

407023_10151199648245497_608590496_22887623_1989341956_n

দোকানীদের এড়িয়ে আপাতত চললাম গাঁয়ের অন্য প্রান্তে, যেখানে রয়েছে এই অঞ্চলের মূল আকর্ষণ। কিন্তু বাজারের পাশেই পাঁশুটে রঙের গির্জাটি ঠিকই স্মরণ করিয়ে দিল এই মাটির সন্তানদের উপর ইউরোপিয়ান উপনিবেশিকদের শারীরিক, মানসিক অকথ্য অত্যাচারের কালো অধ্যায়কে, যা আজও বর্তমান। গাঁয়ের মূল চত্বর থেকে সামান্য দূরেই নলখাগড়া ভর্তি এক জলা, তার পাড়েই সেই মহা আকর্ষক স্থাপত্য- দেবতা ভিরাকোচার মন্দির।

421349_10151325337765497_608590496_23269411_672839925_n

ভিরাকোচা ইনকা পুরাণ এবং প্রাক-ইনকা সভ্যতাগুলোর প্রধানতম দেবতা, তিনিই বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকর্তা,( তার আরেক নাম কনটিকি! ), সূর্য, চাঁদ, গ্রহ, নক্ষত্র, আকাশ প্রভৃতি সৃষ্টির পরে আবার তিনি অসীম ক্ষমতাবলে তাদের নিয়ন্ত্রণও করে থাকেন। তারই সন্মানে ইনকা সম্রাট এই বিশাল মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

যদিও আজ সেই কাঠামোর সামান্যই অবশিষ্ট আছে, কিন্তু তাতে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় এক কালে কি বিশাল কর্মযজ্ঞে মেতেছিল মন্দিরের নির্মাতারা। মাঝের মূল দেয়ালটি আজও দাড়িয়ে আছে তাবৎ ভূমিকম্পকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। সেটির ভিত্তি বিশেষ ধরনের পাথর দিয়ে তৈরি হলেও সামান্য উপর থেকেই বাকি অংশটুকু অত্যন্ত টেকসই পদ্ধতিতে কাদা ও নানা শস্যের খড় মিশিয়ে তৈরি করা হয়েছে।

403229_10151325339185497_608590496_23269417_1855708612_n

দেয়ালটির দুই ধারেই সমান দূরত্বে বেশ কিছু পাথরের কুয়ো মত, কৌতূহলের তাড়নায় উঁকি দিয়ে জানা গেল জলের কুয়ো নয়, এগুলো ছিল এককালে এই মন্দিরের স্তম্ভ, যাদের উপর ভর করে দাড়িয়ে ছিল মাঝের দেয়ালের দুই ধারে বিস্তৃত এক বিশাল ছাদ, সত্যি কথা বলতে ইনকা সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় ছাদ। এর দৈর্ঘ্য ছিল ৩২০ ফুট আর প্রস্থ ৮৪ ফিট! সবচেয়ে ক্ষমতাশালী ঈশ্বর বলে কথা!

423223_10151325338975497_608590496_23269415_273297836_n

কিন্তু মন্দিরটির বিগ্রহের কোন হদিস পাওয়া সম্ভব হয় নি, হয়ত লোভী স্প্যানিয়ার্ডরা গলিয়ে ফেলেছিল সমস্ত মূল্যবান ধাতু, লুট করেছিল সমস্ত অলংকরণ।

কিন্তু ইতিহাস ভুলে নি সেই ইনকাদের, বর্তমান কালেও যাদের প্রতি আমাদের বিস্ময় বাড়তেই থাকা ক্রমাগত নব নব আবিষ্কারের ফলে। মন্দিরের পরে আবার শুরু হয়েছে গ্রাম, সেখানে প্রাচীন কিছু কক্ষে ছিল পুরোহিত এবং সেবকদের থাকার ব্যবস্থা। সেই সাথে বিশেষ ভাবে নির্মিত গোলাকৃতি পাথরের ঘরের দেখা মিলল, এগুলো ছিল মূলত শস্যাগার, ভুট্টা এবং অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় শস্য সংরক্ষণ করে রাখা হত এমন ঘরে, এই অঞ্চলে জানা যায় শখানেক শস্যাগার ছিল এক কালে।

395642_10151183094425497_608590496_22837479_1090782444_n

গাঁয়ের সীমানার বাহিরেই পাহাড়ের শরীর একেবেকে চলা পাথরের স্থাপনা চোখে পড়ল, গাইড জানাল এগুলো ইনকাদের তৈরি গ্রাম সুরক্ষা প্রাচীর!

418025_10151303015395497_608590496_23207189_823584654_n

যেন বহিঃশত্রুরা নিঃশব্দে অতর্কিতে ঢুঁকে না পড়তে পারে আক্রমণে উদ্দেশ্যে তাই পাহাড়ি গ্রামগুলোতে এই ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হত, তখন কি আর তারা জানতেন দখলদারি শত্রুরা পাহাড় ডিঙ্গিয়ে নয়, আসছে মহাসাগর পাড়ি দিয়ে।

427614_10151303015210497_608590496_23207188_1368924064_n

স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে দেখা হল থেকে থেকেই, পশুচারণরত এক মহিলাতো পর্যটকদের দেখে মহা খুশী হয়ে হ্যাট হ্যাট বলে ভেড়া তাড়াতে লাগলেন, পরবর্তীতে অবশ্য এর বিনিময়ে সামান্য নগদ নারায়ণও দাবী করে বসলেন!

402390_10151156296605497_608590496_22740986_495791715_n

আর দেখা মিলল টিনটিনের! ল্যাতিন আমেরিকায় এক অভিযান চালানোর সময় এই বালকটির মতই বেশভূষা ছিল তার।

408725_10151183094785497_608590496_22837480_1470230595_n

কাঠকুড়োনী এক দাদীমা ফোকলা হেঁসে দেখছিলেন বেকুব বিদেশীদের কাজকারবার, পাথর কুঁদে তৈরি তার মুখমণ্ডলে প্রবল পরিশ্রম, অর্থনৈতিক অভাব ও গ্রাম্য সরল জীবনের সুখের ছাপ একই সাথে স্পষ্ট।

409085_10151183095685497_608590496_22837481_2019382238_n

সময়ের সল্পতা বিধায় আবার তাড়া খেয়ে সেই ইনকা বাজারে ফিরতে হল, ঢোকার অন্য পথে দেখি গ্রামের নামটি লেখা আছে লাল মাটির দেয়ালের গায়ে, এর প্রতিটি বর্ণ যেন জ্বলজ্বলে জীবন কাহিনী।

417339_10151325340605497_608590496_23269424_736863169_n

বাজারে হরেক দোকানীর সাথে ভাব বিনিময় করে কিছু কেনা হল, জিজ্ঞাস্য প্রশ্নের উত্তর জানা গেল কিছু কিছু, তাঁতের বয়ন ব্যবস্থা দেখলাম অভিভূত হয়ে।

404593_10151156297345497_608590496_22740988_108511135_n

406437_10151210836755497_608590496_22928989_158307169_n

419399_10151353026465497_608590496_23368016_2064203267_n

ইসাইয়াস কিছুক্ষণের জন্য উধাও হয়ে গিয়েছিল না বলেই, এর মানে অবশ্য ধরে নেয়া যায় প্রকৃতির অমোঘ আহবানে সে ব্যস্ত, কিন্তু না! খানিকপরেই এক কুঁড়ে থেকে বের হয়ে ফিসফিস করে বলল, দেখ কি পেলাম! এক ইনকা ওঝা ( শামান) কোঁকা পাতা থেকে তৈরি বিশেষ ধরনের পানীয় দিল ( অবশ্যই অ্যালকোহল), এটি দেহযন্ত্রের ভিতরে গেলে নাকি আর এই উঁচু পর্বতের পাৎলা অক্সিজেনের বাতাসে আমাদের আর খাবি খেতে হবে না ডাঙ্গায় তোলা মাছের মত! বিশ্বাস না হলেও, চেষ্টা করতে দোষ কি !

405430_10151303015645497_608590496_23207190_1684283482_n

পরের কয়েক মিনিট সেই জাদুগ্রামের অধিবাসীদের স্মৃতি ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে গেলাম ক্রমাগত ক্যামেরার শাটার টিপে, কারণ আসল জাদু কোনসময়ই স্থান, কাল, পাত্রে বন্দী করা যায় না। যায় কেবলমাত্র অনুভব করা।

402326_10151199647760497_608590496_22887620_370660717_n

লেখাটির ব্যাপারে আপনার মন্তব্য এখানে জানাতে পারেন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: